সাহিত্যে আবুল মনসুর আহমেদ আজও প্রাসঙ্গিক

আবুল মনসুর আহমেদের পরিচয় নানাবিধ। একাধারে তিনি রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, আইনজ্ঞ এবং একই সঙ্গে ক্ষুরধার সাহিত্যিক। তাকে নির্দ্বিধায় বলা যায় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্রূপাত্মক রচয়িতা। এত পরিচয় থাকতে কেন তিনি বারবার সাহিত্যিক হিসেবে উঠে আসবেন? কেন তার সাহিত্য আজও প্রাসঙ্গিক?
Abul Mansur Ahmed
আবুল মনসুর আহমদ (৩ সেপ্টেম্বর ১৮৯৮ – ১৮ মার্চ ১৯৭৯)।

আবুল মনসুর আহমেদের পরিচয় নানাবিধ। একাধারে তিনি রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, আইনজ্ঞ এবং একই সঙ্গে ক্ষুরধার সাহিত্যিক। তাকে নির্দ্বিধায় বলা যায় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্রূপাত্মক রচয়িতা। এত পরিচয় থাকতে কেন তিনি বারবার সাহিত্যিক হিসেবে উঠে আসবেন? কেন তার সাহিত্য আজও প্রাসঙ্গিক?

সাহিত্যে আবুল মনসুর আহমেদের প্রাসঙ্গিকতা অবিচল এবং অনেকটা বিপ্লব ধর্মী। সহজ কথায় বৈপ্লবিক। এখানে তার সবচেয়ে বড় মাধ্যম ব্যঙ্গ কৌশল। সমাজবোধ ও সমাজ কাঠামোতে তিনি আঘাত করতে চেয়েছিলেন বারবার। বিশেষ করে স্যাটায়ারই সবচেয়ে আকর্ষণের জায়গা। যেখানে তিনি তুলে ধরেছেন নানা পেশাজীবীদের।

ধর্মের বোধে যেখানেই ধর্মান্ধতা ও উগ্রকামী মনোভাব পেয়েছেন, সেখানেই তিনি আঘাত করেছেন অবলীলায়। সাহিত্যে তার প্রাসঙ্গিকতা ঘুরে ফিরে বারবার আসে। আজ সে প্রাসঙ্গিকতা আরও বৃহৎভাবেই দেখা যায় যখন একজন লেখক কী লিখতে পারবেন আর কী পারবেন না তা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।

আবুল মনসুর আহমেদের সাহিত্যের ভাষা ময়মনসিংহের আঞ্চলিক বুলিতে আশ্রিত। খানিকটা হাস্যরস প্রবণতার জন্যই তিনি এই ভাষা ব্যবহার করেছেন। পুরোপুরি শুদ্ধ ভাষার প্রকাশ হলে তা অনেকখানি বাস্তবতা হারায়। তার লেখায় একটি জিনিস প্রাসঙ্গিক যে তিনি স্পষ্টতই কোনো লুকোচুরি রাখেননি লেখায়। তা ধর্ম, সামাজিক, রাজনৈতিক, জীবনাচরণ সবক্ষেত্রেই। গঠনগত পরিবর্তনে যে ধারা চলমান তিনি তাতে কর্ণপাত করেননি। পরনির্ভরতার সংস্কৃতির ধার ধারেননি। সহজ ভাষায় সাহিত্যে পরিবর্তনকামী বলতে পারি আমরা।

পীর ফকিরি, ধর্মীয় রাজনীতির ব্যাপারে তার বক্তব্য ছিল স্পষ্ট। ধর্মীয় বিরোধ, সাম্প্রদায়িকতা এসেছে তার লিখনিতে। আয়না ও ফুড কনফারেন্স গল্পগ্রন্থ সেক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

ফুড কনফারেন্স গ্রন্থের প্রথম গল্প ‘ফুড কনফারেন্স ’ এ আবুল মনসুর আহমেদ যে ভাষা ও সমার্থক শব্দ ব্যবহার করেছেন তা নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। একটুখানি চোখ বুলিয়ে নেই  ফুড কনফারেন্সে:

‘কনফারেন্স বসলো টাউনহলে। ঘোড়দৌড়ের মাঠ থেকে মেট্রোলাইট হাউজ গ্র্যান্ড হোটেল ফার্পো এবং গ্রেট ইস্টার্ণের সামনে থেকে অনেক মোটর এসে টাউনহলের সামনে এসে দাঁড়ালো। টাউনহল লোকে ভরে গেল। সভাপতি হলেন শেরে-বাংলা। শেরে বাংলার উভয়পাশ ঘেঁষে মঞ্চের উপর বসলেন সিংগিয়ে বাংলা, মহিষে-বাংলা, গরুয়ে বাংলা, টাট্রয়ে বাংলা, গাধায়ে বাংলা, খচ্চরে-বাংলা, কুত্তায়ে-বাংলা, পাঁঠায়ে বাংলা, বিল্লিয়ে বাংলা, বেজিয়ে বাংলা, শিয়ালে বাংলা, খাটাশে বাংলা, বান্দরে বাংলা এবং আরও অনেক নেতা। তারাও মঞ্চের দুপাশে এবং সামনে চেয়ার পেতে সভা উজালা করে বসেছেন। হাতীয়ে বাংলা অতিমাত্রায় কলার রস খেয়ে বিভোর হয়ে পড়েছিলেন। তাই তিনি স্বয়ং আসতে না পেরে বাণী পাঠিয়েছেন। ’

ভাষাগুলো দেখুন। তিনি কিভাবে প্রাণী সমার্থক ব্যবহার করে সম্বোধন করেছেন। সুচারুভাবে ব্যঙ্গ ভাষায় তিনি উপস্থিত করেছেন নিপুণ হাতে। এবার পরের লাইনগুলো দেখুন। কুত্তায়ে বাংলাকে তিনি কিভাবে বলছেন। কুত্তায়ে বাংলার উচ্চারণে ঘেউ ঘেউ, গাধায়ে বাংলার শব্দ বিকট চিৎকার কিংবা মহিষে বাংলার জাবর কাটা। তিনি সচেতনভাবেই শব্দগুলোর ব্যবহার করে সম্বোধনের যথার্থতা প্রমাণ করেছেন।

ফুড কনফারেন্সের একটি গল্প ‘রিলিফ ওয়ার্ক ’। এই গল্পটি সবারই খুব চেনা। কেউ সাহিত্য প্রেমী না হলেও এই গল্পটি সম্ভবত পড়েছেন পাঠ্যবইতে থাকায়। এই গল্পে একটি ব্যাপারই দারুণভাবে সামনে এসেছে, তা হলো ধনীদের আজীবন অগ্রভাগে থাকা। দরিদ্ররা চিরকালীন বঞ্চিত। ধনীদের কেবল ক্ষতি হয়েছে গোলার ধান, অন্যদিকে ক্ষুধার্ত ও ভুখারা মারা পড়ছে খাবারের অভাবে। কিন্তু প্রথম জনের প্রতি দরদ ঝরে পড়লেও দ্বিতীয় জনের বেলায় পড়ছে নিষ্ঠুর কানুন। ধনীদের দ্বারা পরবর্তীতে স্বার্থ আদায় করার লোভ যেখানে প্রতীয়মান হচ্ছে।

অন্নদাশঙ্কর রায় যেমন আবুল মনসুর আহমেদ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আয়না লিখিয়া আবুল মনসুর আহমেদ প্রাতঃস্মরণীয় হইয়াছিলেন। ফুড কনফারেন্স লিখিয়া তিনি অমর হইলেন।’

বিশেষ করে সামাজিক কুসংস্কার, রাজনৈতিক ভণ্ডামি আবুল মনসুর আহমেদের লেখায় উঠে এসেছে এবং পরাভূত হয়েছে। এক্ষেত্রে সমাধানের পথটিও তিনি দেখিয়েছেন। আয়না গ্রন্থে ‘হুজুর কেবলা ’ গল্পে তিনি যেভাবে বর্ণনা করেছেন তা নিঃসন্দেহে সাহিত্যিকের প্রার্থনীয়। মুক্তবুদ্ধির চর্চাটা তিনি অনেকখানি এগিয়ে দিলেন। একটি প্রশ্ন এখানে প্রাসঙ্গিক যে, তখন আবুল মনসুর আহমেদ যেভাবে লিখেছেন তা এখনকার বাস্তবতায় কী তা লেখা সম্ভব? সেই সাহস কি আদৌ হবে? ধরুন হলো, কিন্তু সামাজিক বাস্তবতা কী তা মেনে নিবে? মেনে নেওয়া তো দূরে থাক আগে থেকেই উদয় হবে হামলার। এটি কিন্তু স্পর্শকাতরতার প্রশ্ন নয়। কেউ সাহস করে এগিয়ে আসলেও সম্মুখীন হবে নানা বাঁধার।

আবদুল গাফফার চৌধুরী যেমন বলেছিলেন, ‘আবুল মনসুর আহমদ বাংলাদেশের স্যাটায়ার রচনার ক্ষেত্রে যে পূর্ব বাংলার পরশুরাম। ’

কেন পরশুরামের তুলনা? সেই প্রসঙ্গে বলা চলে জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের আবুল মনসুর আহমেদ প্রসঙ্গে বলা একটি উক্তির কথা। ড. আনিসুজ্জামান বলেছিলেন, ‘পরশুরাম হিন্দু দেবদেবী নিয়ে অনেক কিছু বলেছেন, হিন্দু সম্প্রদায় তা সহ্য করেছে। আবুল মনসুর আহমদের দুঃসাহসিক ও কঠিন বাস্তবিক লেখা সেদিন সমাজ সহ্য করেছিল। আজ কোনো সম্পাদক এমন গল্প ছাপাতে সাহস করবে কিনা কিংবা সমাজ তা সহ্য করবে কিনা সে সম্পর্কে আমার সন্দেহ আছে। আবুল মনসুর আহমেদের আক্রমণের লক্ষ্য কোনো ব্যক্তি, ধর্ম বা সম্প্রদায় নয়। তার বিদ্রোহ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। ’

আবুল মনসুর আহমেদ ছিলেন প্রচণ্ড অসাম্প্রদায়িক। কিন্তু তিনি ধর্মের বিরুদ্ধে ছিলেন না। মননশীলতা ও সৃজনশীলতায় আবুল মনসুর আহমেদ সৃষ্টি করেছেন এক নবদিগন্ত। ধর্মের নামে কলুষতা ও ধর্ম ব্যবসার বিরুদ্ধে তিনি যেভাবে লিখেছেন, আজ তা কেউ কল্পনাও করতে পারে কিনা তা যথেষ্ট যুক্তিসংগত প্রশ্নের দাবি রাখে।

একটি ব্যাপার লক্ষণীয় যে, তখনো খুব কম সংখ্যক সাহিত্যিকই বাইরে এসে প্রতিবাদ করার সাহস দেখিয়েছেন। কাজী নজরুল ইসলামকে কাফেরও আখ্যা দেওয়া হয়েছিল তৎকালীন সময়ে। পরবর্তীতে হুমায়ূন আজাদ, শামসুর রাহমানের ওপর হামলা হয়েছে। অথচ কাজী নজরুল ইসলাম যখন গজল-নাত লিখলেন, তখন তাকেই মুসলমানের কবি বলে বিবেচনা করা হয়েছে তাকে। তেমনই ওয়াজেদ আলী, হুমায়ূন কবিররা এগিয়ে এসেছিলেন।’

আবুল মনসুর আহমেদ সমাজ সংস্কারকের চোখে তার সাহিত্য রচনা করেছেন। তার সাহিত্য গল্পের প্রয়োজনে কাহিনীর সৃষ্টি আর গল্পের ধাঁচে সাহিত্য নয়। বরং তার প্রতিটি লেখার মাঝেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক চরিত্রের চেয়ে গল্পের মূল উদ্দেশ্যই চোখে পড়ে বেশি। গল্পে ব্যক্তির প্রয়োজন থাকবেই এবং চরিত্রের প্রয়োজনে ব্যক্তি আসবেই। তার গল্পে ব্যক্তি এসেছে ঠিকই কিন্তু একটি রেশ থেকে যায়। এই রেশটাই তার গল্পের অসাধারণ উপাদান। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর ‘লালসালু ’ উপন্যাসে মজিদ এসেছে নিছকই চরিত্রের প্রয়োজনে। মজিদ কিন্তু মূল বিষয় নয়, মূল বিষয় মাজার ব্যবসা, তথা ধর্মের নামে ব্যবসা।

ঠিক তেমনই আবুল মনসুর আহমেদের আয়না গল্পগ্রন্থের গল্প ‘হুজুর কেবলা’র কথাই ধরা যাক। পোশাকের অন্তরালে নারীদেহের প্রতি যে কথিত ভণ্ড পীরের তীব্র ভোগের আকাঙ্ক্ষা তার দেখা মিলে এখানে। ‘হুজুর কেবলা’ আয়না গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্প। গল্পের রূপটা এমন- এমদাদ আগে ছিল কংগ্রেসের একনিষ্ঠ কর্মী। যেখানে তার পোশাক ছিল বিলেতি কাপড়-চোপড় তথা প্যান্ট-শার্ট, সেখানে সে হঠাৎই বদলে গিয়ে ধরলো লম্বা পাঞ্জাবি এবং সাদা লুঙ্গি, সঙ্গে রাখলো দাঁড়িও। যোগ দিলো অসহযোগ আন্দোলনে।  তারপর মুরিদ হলো পীরের। কিন্তু পীরের নানাবিধ কাজ-কর্মে তার মনে খটকা লাগলো। বিশেষ করে পীরের যে মুরিদের যে মেয়ে ভোগের লোভ তা গল্পেই প্রতীয়মান। গল্পে যেমন আছে, ওয়াজ করিবার সময় পীর সাহেবের প্রায়ই জযবা আসিত এবং কয়েক লাইন পরে আবার লেখা আছে ‘পীর সাহেবের মেয়েদের সামনে ওয়াজ করিবার সময়েই একটু বেশি হইত। এই সব ব্যাপারে এমদাদের মনে একটু খটকার সৃষ্টি হইল। ’

পরবর্তীতে যা হয় পীরের মুরিদের ছেলে রজবের সুন্দরী স্ত্রী কলিমন সম্বন্ধে। এবং গল্পের শেষ দিকে যেমন বিভিন্ন ভজকট পাকিয়ে পীর যে কলিমনকে বিয়ে করতে উদ্যত হয়  এবং সমাধানের জন্য চাপে পড়ে রজন স্বীয় স্ত্রীকে তালাক দেয় তাতে পীরের মুরিদদের যে প্রত্যক্ষ চাপ তাতে ধর্মান্ধ মুসলমানের আসল রূপই লোকদের মাঝে দেখা মিলে। যেখানে এমদাদের প্রতিবাদও কাজ হয়নি। উল্টো তাকে পাগল সাব্যস্ত করা হয়।  আয়নায় ফুটে উঠেছে ধর্মান্ধ মুসলমান ও পীর ব্যবসায়ের বাস্তবতা। চলন্ত জীবনের সার্থক প্রতিমূর্তি।

‘আয়না ’ গল্পগ্রন্থের ভূমিকায় কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন ‘এমন আয়নায় শুধু মানুষের বাইরের প্রতিচ্ছবিই দেখা যায়, কিন্তু আমার বন্ধু শিল্পী আবুল মনসুর যে আয়না তৈরি করেছেন, তাতে মানুষের অন্তরের রূপ ধরা পড়েছে। যেসব মানুষ হরেক রকমের মুখোশ পরে আমাদের সমাজে অবাধে বিচরণ করছে, আবুল মনসুরের আয়নার ভেতরে তাদের স্বরূপ-মূর্তি বন্য ভীষণতা নিয়ে ফুটে উঠেছে। মানুষের মুখোশ পরা এই বহুরূপী বনমানুষগুলোর সবাইকে মন্দিরে, মসজিদে, বক্তৃতার মঞ্চে, পলিটিকসের আখড়ায়, সাহিত্যসমাজে বহুবার দেখেছি বলে মনে হচ্ছে। ’

আবুল মনসুর আহমেদের সাহিত্য বরাবরই তীর্যভাষক। যাকে আমরা সহজ বাংলায় বুঝি চাঁছাছোলা ভাষা। এই ভাষাটি খুব কম সাহিত্যিকই ব্যবহার করেছেন। এই ভাষা ব্যবহারে আবুল মনসুর স্বতন্ত্র। হাস্যরস তথা রম্য সাহিত্যের একটি ধারাকে তিনি ব্যাপ্তি দিয়েছেন। রসের মাঝেই চিরন্তন যে বাস্তবতা, নিখাদ সত্যতা তিনি তুলে এনেছেন তা পাঠককের চিন্তার অবকাশ সৃষ্টি করে। সামাজিক জীবনের অব্যক্ত কথাগুলো যা মানুষ প্রকাশ না করে নিজের মাঝেই রেখে দেয় তা তিনি গল্পের চরিত্রের মাঝে প্রকাশ করছেন।

যেমন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম তার প্রবন্ধে লিখেছিলেন ‘কাজী নজরুল ইসলামের উপন্যাসের নাম মৃত্যুক্ষুধা, নজরুলের বন্ধু আবুল মনসুরের উপন্যাসের নাম- জীবন ক্ষুধা। এখানেও মৃত্যুর ছায়া আছে, কিন্তু আবুল মনসুর দেখিয়েছেন জীবনের যে তেজস্বীয়া তা কেমন করে তা সবকিছুকে ছাপিয়ে উঠতে চায়। উপন্যাসের নায়ক হালিম সামন্ত পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এসে ক্রমান্বয়ে বুর্জোয়া পরিবেশের দিকে প্রতিকূলতাকে ঠেলে দিচ্ছে দুহাতে। এই যাত্রার মধ্যে একটি শক্তি আছে। আবুল মনসুর আহমেদের সব রচনায় এই শক্তিটাকে দেখেছি। ’

সিরাজুল ইসলাম তার এক বক্তব্যে মনসুর আহমেদের সাহিত্য সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তার সাহিত্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে প্রবলতা ও রাজনীতি সচেতনতা। এই বৈশিষ্ট্য নজরুলের সাহিত্যে দেখা মিলে। মুখের ভাষাকে যিনি সাহিত্যের ভাষা করতে চেয়েছিলেন।’

আবুল মনসুর আহমেদের সাহিত্য একদিকে যেমন আকারে সংক্ষিপ্ত তেমনি সংক্ষিপ্তের মাঝেই বিস্তৃত। সাহিত্যের ভাষায় তিনি যা নির্মাণ করেছেন তা প্রচণ্ড বাস্তববাদী। তার কাল্পনিক সত্তার মাঝেও আমরা বাস্তবতার নিরিখ খুঁজে পাই।

তার ‘আবে হায়াত’ গ্রন্থে আমরা দেখতে পাই ভিন্ন এক লেখনি। এখানে সাহিত্যের ভাষা আঞ্চলিক এবং প্রচুর ফারসি ও আরবি শব্দের সমারোহ। আবে হায়াতে তিনি তুলে ধরেছেন হামিদ নামের এক প্রকৃত মানুষের গল্প। যেখানে পীর পরিবার তথা গোঁড়া  রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম নেওয়ার পরও হামিদ নামের ঐ যুবক স্বীয় প্রচেষ্টায় সংস্কারমনা ও আধুনিক হয়ে উঠেছে। যেখানে আবুল মনসুর আহমেদ প্রাধান্য দিলেন কী করে সমস্ত উগ্রতা আর ধর্মান্ধতার মধ্যে জন্ম নিয়ে নিজেকে গড়ে তোলা যায় আধুনিক মানুষরূপে।

একইভাবে গালিভারের সফরনামা গ্রন্থের শিক্ষা সংস্কার, গালিভারের সফরনামা, আহা যদি প্রধানমন্ত্রী হতে পারতাম-এর মতো রম্য রচনা বাস্তবতার কঠিন সাক্ষ্য বহন করে।

তাইতো বন্ধু আবুল মনসুর আহমেদ প্রসঙ্গে বলা কাজী নজরুল ইসলামের কথাটি আজও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। কাজী নজরুল বলেছিলেন, ‘বাঙলা ভাষায় ব্যঙ্গ-সাহিত্য খুব উন্নত হয়নি; তার করুণ, ব্যঙ্গ-সৃষ্টিতে অসাধারণ প্রতিভার প্রয়োজন। এ যেন সেতারের কান মলে সুর বের করা-সুরও বেরুবে, তারও ছিঁড়বে না। আমি একবার এক ওস্তাদকে লাঠি দিয়ে সরোদ বাজাতে দেখেছিলাম। সেদিন সেই ওস্তাদের হাত সাফাই দেখে তাজ্জব হয়েছিলুম। আর আজ বন্ধু আবুল মনসুরে হাত সাফাই দেখে বিস্মিত হলুম। ভাষার কান মলে রস সৃষ্টির ক্ষমতা আবুল মনসুরের অসাধারণ। এ যেন পাকা ওস্তাদী হাত।’

ঘুণে ধরা সমাজ ব্যবস্থা, রাজনীতির নামে লুটপাট, নিজস্ব স্বার্থ হাসিল, ধর্মের নামে ব্যবসা  আর ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে রম্য সাহিত্যের মধ্য দিয়ে যে কঠিন সত্য অবলীলায় আবুল মনসুর আহমেদ লিখে গেছেন তাতে বরাবরই বাংলা সাহিত্যে প্রাসঙ্গিক করে তুলবে।

আজ প্রখ্যাত সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক আইনজ্ঞ আবুল মনসুর আহমেদের প্রয়াণ দিবস। বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই তার প্রতি।

তথ্য সূত্র: ফুড কনফারেন্স (১৯৪৪), আয়না গল্প গ্রন্থের ভূমিকা/ কাজী নজরুল ইসলাম, আবে হায়াত (১৯৬৮), আয়না (১৯৩৫), আবুল মনসুর আহমেদের ‘আয়না’- আনিসুজ্জামান, আয়নার ফ্রেম- কাজী নজরুল ইসলাম, আবুল মনসুর আহমদ সংখ্যা (২০০৯) সম্পাদক- ইফফাত আরা

আহমাদ ইশতিয়াক [email protected]

Comments