ঋণ মানসম্মত না হলে বাড়তি চাপে পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহারের জন্য ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। ঋণ হিসেবে এই অর্থ দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ নজরদারি না থাকলে তা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
bangladesh bank logo

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহারের জন্য ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। ঋণ হিসেবে এই অর্থ দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ নজরদারি না থাকলে তা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত ১৫ মার্চ রিজার্ভ ফান্ড থেকে বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন ফান্ড (বিআইডিএফ) তৈরি করা হয়। এরপরই বিশেষজ্ঞরা এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় পায়রা বন্দরে একটি চ্যানেল ড্রেজিং প্রকল্পের জন্য বৈদেশিক মুদ্রায় পাঁচ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা (৫২৪ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ড) ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

এই প্রকল্পটির অর্থায়নের জন্য সরকারের অর্থ বিভাগ, পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সোনালী ব্যাংকের মধ্যে ত্রিপাক্ষিক ঋণ চুক্তি সই হয়েছে।

রেমিট্যান্স বৃদ্ধি ও মহামারির কারণে তুলনামূলক কম পণ্য আমদানি হওয়ায় সম্প্রতি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গত সপ্তাহে ছিল প্রায় ৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত বছরের একই সময়ে রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৩১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই সুশাসনের অভাবের কারণে প্রকল্পে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ব্যবহারে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে।

উন্নয়ন প্রকল্পে রিজার্ভের অর্থ ব্যবহারের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সম্প্রতি ১০ সদস্যদের একটি কমিটি গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কমিটি বৈদেশিক মুদ্রার সঠিক ব্যবহার সংক্রান্ত নীতিমালা ও তাদের সুপারিশ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছে গত ১১ মার্চ।

আর্থিক ক্ষেত্রে সুশাসনের অভাব ও সময়মত সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুর্বল রেকর্ডের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বিনিয়োগের ব্যাপারটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

ইতিপূর্বে সরকারকে তার অধিকাংশ অবকাঠামো প্রকল্পের সময়সীমা একাধিকবার বাড়াতে হয়েছে। এর জের ধরে প্রারম্ভিক বাজেটের চেয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ বেড়েছে অনেকগুণ।

যদি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে অর্থায়ন করা প্রকল্পেও একই ধারা অব্যাহত থাকে তবে তা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সমগ্র ব্যাংকিং খাতে কর্পোরেট সুশাসনের অভাব রয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে- রিজার্ভ থেকে নেওয়া ঋণের গুণগত মান কে নিশ্চিত করবে?’

সঠিক তদারকির অভাবে এই তহবিলটি সংকটে পড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কমিটি সুপারিশ করেছে, শুধুমাত্র সরকারের কৌশলগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেই রিজার্ভ থেকে ঋণ দেওয়া উচিত।

কমিটির একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, তারা কৌশলগত উন্নয়ন প্রকল্প বলতে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে বুঝিয়েছেন, যেগুলো সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত।

সেতু, মহাসড়ক, বন্দর ও পরিবেশ বান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে কৌশলগত উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বছরে সর্বোচ্চ দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ বরাদ্দ করবে। এই তহবিলের আওতায় থাকা ঋণের পরিমাণ পুরো রিজার্ভের ১০ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।

সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হচ্ছে জরুরি অবস্থা মোকাবিলা করার জন্য জমাকৃত অর্থ।

স্থিতিশীল মুদ্রা বিনিময় হার বজায় রাখা, রপ্তানি মূল্য প্রতিযোগিতামূলক রাখা, দুর্যোগকালীন সময়ে অর্থের তারল্য বজায় রাখা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় রাখার জন্য রিজার্ভ ব্যবহার করা হয়।

তিনি বলেন, ‘আমরা রিজার্ভের সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতির হারে সন্তুষ্ট। কিন্তু এই ধারা সব সময় এক রকম থাকবে না।’

সাবেক এই গভর্নর বলেন, ২০০৭-০৮ দেশ খাদ্য সংকটে ভুগছিল এবং বিভিন্ন ব্যাংকে তখন বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি ছিল। আমদানির খরচ জোগাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ করে ঋণদাতাদের সহায়তা করেছিল। এরকম সমস্যা আবারও হতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারিশকৃত নীতিমালায় বলা হয়েছে, নতুন কোনো প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দের আগে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে অন্তত ছয় মাসের আমদানির খরচ জোগানোর মতো যথেষ্ট অর্থ আছে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কমিটি জানিয়েছে, সরকারকে অবশ্যই সভরেইন গ্যারান্টি দিতে হবে, যে ঋণের দায়দায়িত্ব সরকারই নেবে। উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে রিজার্ভ থেকে ঋণ নিতে পারবে। যদি কোনো প্রকল্প সঠিক সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে না পারে, সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঐসব ব্যাংকের সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা অর্থ নিয়ে নিবে।

সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘জনগণের অর্থ সুরক্ষিত করতে সরকারের দেওয়া সভরেইন গ্যারান্টি যথেষ্ট না। কারণ আর্থিক খাতে সুশাসনের অভাব রয়েছে।’

কৌশলগত উন্নয়ন প্রকল্প ছাড়াও অন্যান্য প্রকল্প এই রিজার্ভ থেকে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে সতর্ক করেন তিনি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের ডিসটিংগুইশড ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকারকে বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে খরচ ও সময়সীমা বৃদ্ধির কারণে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। যদি সরকার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অর্থে পরিচালিত প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একই সমস্যায় পড়ে, তাহলে প্রকল্পগুলো সংকটে পড়বে।

তিনি জানান, সরকারের উচিত হবে একটি নিরপেক্ষ বোর্ড গঠনের মাধ্যমে এই প্রকল্পগুলোর গুণগত মান নিশ্চিত করা। বিনিয়োগের সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করবে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার ওপর।

বাংলাদেশ পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহারের এই পদ্ধতিটি অপ্রয়োজনীয়। কারণ প্রকল্পগুলো চাইলেই বর্তমান ব্যবস্থাতেই ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারে।

তিনি বলেন, ‘যদি সরকার নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে প্রকল্পের জন্য অর্থ খুব সহজেই বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে জোগাড় করা সম্ভব।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের কমিটির সুপারিশে ঋণ পরিশোধের জন্য পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১৫ বছর সময় দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলো দুই থেকে তিন শতাংশ হার সুদে এই ঋণ সুবিধা নিতে পারবে। ঋণদানের পদ্ধতি অনুযায়ী, প্রকল্পগুলো সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবে না। প্রথমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারি ব্যাংকগুলোকেই ঋণ দেবে। এরপর ব্যাংক থেকে ঋণ পাকে প্রকল্পগুলো।

এ ক্ষেত্রে লন্ডন ইন্টারব্যাংক অফার্ড রেটের সঙ্গে মিলিয়ে সুদের হার নির্ধারণ করা হবে। বিশ্ব ব্যাংকের হ্রাসকৃত হার কিংবা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্ধারন করা সুদের হারও ব্যবহার করতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, তারা তাদের সুপারিশ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, ‘এখন ব্যাপারটি পুরোপুরি সরকারের হাতে। তারা চাইলে আমাদের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে, আবার নাও করতে পারে।’

Comments

The Daily Star  | English

Babar Ali: Another Bangladeshi summits Mount Everest

Before him, Musa Ibrahim (2010), M.A. Muhit (2011), Nishat Majumdar (2012), and Wasfia Nazreen (2012) successfully summited Mount Everest. Mohammed Khaled Hossain summited Mount Everest in 2013 but died on his way down

49m ago