ভূগর্ভস্থ পানির অপব্যবহার

তীব্র পানি সংকটে বরেন্দ্র অঞ্চল

মতিউর রহমান ২০১১ সালে যখন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঝিলিম ইউনিয়নে ফল চাষ করে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনে উদ্যোগী হন, তখন সবচেয়ে বড় যে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি তিনি হয়েছিলেন তা ছিল পানি সঙ্কট।
পানির সংকটে রাজশাহীর তানোরে দূর দূরান্ত থেকে পানীয় জল আনতে হচ্ছে মানুষকে। ছবি: সংগৃহীত

মতিউর রহমান ২০১১ সালে যখন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঝিলিম ইউনিয়নে ফল চাষ করে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনে উদ্যোগী হন, তখন সবচেয়ে বড় যে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি তিনি হয়েছিলেন তা ছিল পানি সঙ্কট।

‘সবচেয়ে কাছের পানির উৎসটি ছিল আড়াই কিলোমিটার দূরে,’ বলছিলেন মতিউর যিনি সড়ক ও জনপথ বিভাগের একজন গাড়িচালক।

দূরের সেই পানির উৎস ছিল বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) একটি গভীর নলকূপ। মতিউর সেখান থেকেই পানি নিতে শুরু করেন। কিন্তু মাত্র ছয় বছরেই নলকূপটি শুকিয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়তে হয় তাকে।

শুধু সেচ নয় বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষকে পানীয় জলের জন্যও সংগ্রাম করতে হয়। পানির অভাবে অনেক চাষি ধান বাদ দিয়ে কম সেচ লাগে এমন ফসল চাষ করা শুরু করছেন। অনেকে ফসলি জমিকে মাছ চাষের পুকুর এমনকি ইটভাটায় রূপান্তর করছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তুলনামূলক কম বৃষ্টিপাতের এই অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। ধান চাষ ছাড়াও সেখানে চালকল এবং অন্যান্য শিল্পের প্রয়োজনে যথেচ্ছভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের খনিজ পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক চৌধুরী সারোয়ার জাহান বলেন, ‘দিন দিন পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে, কারণ ভূগর্ভস্থ পানিতে সব মানুষের অধিকার থাকলেও অল্প কিছু লোক তা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে তুলে নিচ্ছে।’

তিনি জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রায় ২৩ বর্গকিলোমিটার এলাকার ঝিলিম ইউনিয়নে কমপক্ষে ৩৫টি অটো রাইস মিল আছে যেগুলো প্রতিনিয়ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করছে। এর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে মাটির নিচের পানির স্তরে।

সম্প্রতি ঝিলিম ইউনিয়নে গিয়ে এই প্রতিবেদক দেখতে পান, আমনুরা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ সড়কের উভয় পাশে শুধু চালকল আর চালকল।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনসুর রহমান বলেন, ইউনিয়নের চালকলগুলোর প্রত্যেকটিতে কমপক্ষে তিনটি করে গভীর নলকূপ আছে।

মনসুরের অটো রাইস মিলে গভীর নলকূপ আছে ছয়টি। 

তিনি বলেন, ‘ভূগর্ভস্থ পানি ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প আমাদের কাছে নেই, আমাদেরকে তো ব্যবসা করতে হবে।’

ঝিলিমের পাশে কলেজপাড়া গ্রামের কৃষক মো. মোস্তফা ধান বাদ দিয়ে এখন মসুর ডাল চাষ করা শুরু করেছেন।

‘অনেক আবাদযোগ্য জমি, যেখানে আমরা কয়েক বছর আগেও তিন ফসল করেছি, পানির অভাবে এখন সেগুলো আর চাষযোগ্য নেই,’ তিনি বলেছিলেন।

মতিউরের স্বপ্ন পানির অভাবে অংকুরেই বিনষ্ট হতো। কিস্তু ২০১৬ সালে, একটি এনজিও ‘ডেভলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন ফর সেলফ রিলায়েন্স, কমিউনিকেশন, অ্যান্ড হেলথ’-(ডাসকোহ) তাকে একটি পানির পাম্প সরবরাহ করে এবং তাকে পানি সাশ্রয়ী ‘ড্রিপ সেচ’-এর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই সেচ পদ্ধতিতে গাছের গোড়ায় ধীরে ধীরে পানি দেওয়া হয়।

গত পাঁচ বছরে মতিউর একাধিক সরকারি পুরস্কার পেয়েছেন, হয়ে উঠেছেন দেশের অন্যতম সফল ফলের কৃষক।

তবে, বরেন্দ্র অঞ্চলের সব কৃষক মতিউরের মতো ভাগ্যবান নন। সেখানে পানির অপব্যবহার ব্যাপক। এটি এমন অঞ্চল যেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বৃষ্টিপাত সারা দেশরে গড় বৃষ্টিপাতের চেয়ে কম। এখানে শিল্প ও কৃষিক্ষেত্রে পানির যথেচ্ছ ব্যবহার মাটির নিচের পানির স্তর শূন্য করে দিচ্ছে।

গত ২২ মার্চ রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় গিয়ে এই প্রতিবেদক দেখেছেন যে সরমংলা খাল যেটা কিনা পদ্মা নদী থেকে পানি নিয়ে কৃষিজমিতে সেচের পানি সরবরাহ করার কথা, সেটি শুকিয়ে আছে। খালের দুই পাশেই স্থাপন করা হয়েছে গভীর নলকূপ।

খালের দুই পাশের কৃষকরা ডেইলি স্টারকে বলেন, খালটি শুকিয়ে যাওয়ায় তাদেরকে এই গভীর নলকূপগুলো থেকে ফসলের জন্য উচ্চ মূল্য পানি নিতে হচ্ছে।

নিম্নগামী ভূগর্ভস্থ পানির স্তর

অধ্যাপক চৌধুরী সারোয়ার জাহান জানান, ২০১৮ সাল পর্যন্ত সাত বছরে এই অঞ্চলের বার্ষিক বৃষ্টিপাত কখনও ১,৪০০ মিলিমিটার অতিক্রম করেনি, যা জাতীয় গড় ২,৫৫০ মিলিমিটার থেকে ৪৫ শতাংশ কম। গত বছর অবশ্য, এই অঞ্চলে ১৮০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল ও গোমস্তাপুর; রাজশাহীর তনোর ও গোদাগাড়ী; এবং নওগাঁর পোরশা, সাপাহার এবং নিয়ামতপুর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কমপক্ষে ৪৭ মিটার উঁচু।

তবে একই জেলাগুলোতে এমন কিছু অঞ্চল রয়েছে যেগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০ মিটার উঁচু উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ধান চাষের জন্য কেবল ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার এই উঁচু ও শুকনো অঞ্চলে পানীয় জল দুষ্প্রাপ্য করে তুলতে পারে।’

বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম ধান উত্পাদনকারী দেশ বাংলাদেশে সেচের জন্য যে পানি ব্যবহার হয় তার ৭৫ শতাংশই মাটির নিচ থেকে তোলা।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট হিসাব বলছে, এক কেজি বোরো ধান উত্পাদন করতে প্রায় তিন হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়।

‘চালকলগুলোতে যে পানির ব্যবহার হয় তা এই হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে,’ অধ্যাপক চৌধুরী বলেন।

তিনি জানান, গম ও ভুট্টায় প্রতি কেজি উত্পাদনে প্রায় ৪০০-৬০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়।

তার মতে, বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচের জন্য ভূপৃষ্ঠের পানি ব্যবহার করা উচিত। এছাড়া কম সেচ লাগে এমন ফল এবং সবজি চাষ এই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানি খাবার জন্য সংরক্ষণে সহায়তা করতে পারে।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবদুর রশিদ জানান, গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে এই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর মাত্র ৩০ ফুট নিচে ছিল যখন কৃষকরা সেচের জন্য শুধু নদী-খাল-বিল, হ্যান্ড টিউবওয়েল ও বৃষ্টির পানি ব্যবহার করতেন।

নব্বইয়ের দশকে বিএমডিএ গভীর নলকূপ স্থাপন করার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকরা বছরে তিনটি ফসলের চাষ শুরু করেন যার ফলে উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল দেশের অন্যতম প্রধান শস্য-উত্পাদনকারী অঞ্চলে পরিণত হয়।

কিন্তু বিএমডিএ’র কার্যক্রম অনুসরণ করে, সচ্ছল কৃষক, ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা নিজস্ব গভীর নলকূপ স্থাপন করতে শুরু করেন।

২০১২ সালে, যখন বিএমডিএ নতুন করে গভীর নলকূপ স্থাপন করা থেকে সরে এসে ভূপৃষ্ঠের পানির দিকে মনোনিবেশ করতে শুরু করে, বেসরকারি গভীর নলকূপের ব্যবহার কৃষি ও শিল্পে ব্যবহারের জন্য প্রসারিত হতে থাকে।

সম্প্রতি বিএমডিএ’র এক হিসাব অনুসারে বরেন্দ্র অঞ্চলের বার্ষিক ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের পরিমাণ ১৩,৭১০ মিলিয়ন ঘনমিটার যার প্রায় ৭০ শতাংশই বেসরকারি গভীর নলকূপ দিয়ে উত্তোলিত হচ্ছে। প্রকৌশলীদের হিসাব অনুযায়ী, এই পরিমাণ পানি এক বিঘা আয়তনের দুই মিটার গভীরতা বিশিষ্ট ১৮ লাখ পুকুর ভরে ফেলার জন্য যথেষ্ট।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে, ভূগর্ভস্থ পানি স্তর নাচোল উপজেলায় ভূপৃষ্ঠের ১০৭ ফুট নিচে রেকর্ড করা হয়েছিল যেটা ২০০৫ সালে ছিল ৭৮.৮ ফুট। মাত্র ১৩ বছরে এখানে পানির স্তর ২৮ ফুট নিচে নেমে গেছে।

বিএমডিএ’র প্রকৌশলী রশিদ বলেন, ‘পানির স্তর নিচে নামা এখনও অব্যাহত আছে। প্রতি সেচ মৌসুমের শেষে পানির স্তরটি কখনো কখনো ১৩০ ফুট পর্যন্ত নিচে চলে যায়।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে এখনই সুচিন্তিত জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।

দেশের প্রথম পানি শাসনের প্রকল্প

সরকারের পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো) এর মহাপরিচালক মো. দেলোয়ার হোসেন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ভূগর্ভস্থ পানির উপরে সবার সমান অধিকার আছে এবং পানির সর্বোত্তম ব্যবহার এটি নিশ্চিত করতে পারে।’

তিনি বলেন, বাংলাদেশ পানি আইন ২০১৩ এবং বাংলাদেশ পানি বিধিমালা ২০১৮ এই অধিকারগুলি নিশ্চিত করে। সরকার এখন পানি সম্পদগুলো চিহ্নিত করে এবং সেগুলোর সুরক্ষার জন্য আইন প্রয়োগ করা এবং সেগুলোর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এ লক্ষে গত ১৯ মার্চ ওয়ারপো রাজশাহীতে একটি অফিস স্থাপন করেছে এবং রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সরদহ ইউনিয়নে একটি পানি মডেলিং প্রকল্প উদ্বোধন করে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, এই প্রকল্পের আওতায় ওয়ারপো ভূগর্ভস্থ ও ভূউপরিস্থ পানিসম্পদের মানচিত্র তৈরি করবে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে পানির প্রাপ্যতা এবং পর্যাপ্ততা পরিমাপ করবে এবং এগুলো সুরক্ষিত করবে।

এটি ব্যক্তিগত, কৃষি ও শিল্প খাতে পানির চাহিদা নির্ধারণ করবে এবং ভূগর্ভস্থ পানির নিরাপদ উত্তোলন সীমা চিহ্নিত করবে এবং এইভাবে পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করবে।

ওয়ারপোর কর্মকর্তারা বলেছিলেন যে তারা প্রকল্পের অধীনে হাইড্রোলজিকাল তদন্তের সময় যদি পাওয়া যায় তাহলে কোনো অঞ্চলকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করবে।

ওয়ারপো প্রধানের মতে, এই পানি শাসন দেশে এটাই প্রথম।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও রাজশাহী—বরেন্দ্র অঞ্চলের এই তিন জেলায় প্রকল্পটি প্রাথমিকভাবে শুরু হচ্ছে। এই জেলাগুলো পানি সংকটের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই তিনটি জেলায় প্রকল্পের ফলাফল অনুসরণ করে শিগগিরই অন্যান্য অঞ্চলেও এই প্রক্রিয়া শুরু হবে বলেও জানান তিনি।

২০২০ সালের মার্চ মাসে পরিকল্পনা কমিশন ‘অপারেশনালাইজিং ইন্টিগ্রেটেড ওয়াটার রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট’ শীর্ষক ১৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন করে।

এটি কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে আটকে ছিল। গত মার্চে এর কার্যক্রম আবার শুরু হয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৩ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তিন জেলার প্রতিটি মৌজায় এই প্রকল্পের কাজ হবে।

সরকার ১০ কোটি ২৪ লাখ টাকা এবং সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কোঅপারেশন (এসডিসি) প্রকল্পের তহবিলের বাকী ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা সরবরাহ করবে।

ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডাব্লুএম) প্রকল্পটিতে পরামর্শ দিচ্ছে এবং এসডিসির অংশীদার ডাসকোহ বরেন্দ্র অঞ্চলে বাস্তবায়নে সহায়তা করছে।

দেশব্যাপী পানিসম্পদ ম্যাপিং ও মডেলিংয়ের জন্য আরও ৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে ওয়ারপোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চৌধুরী সারোয়ার জাহান বলেন, এই প্রকল্পটি এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের প্রয়োজন ছিল। ‘এর সফল বাস্তবায়ন জরুরি। আমরা যখন পানির পরিস্থিতি সঠিকভাবে জানব তখন আমরা আমাদের কৃষি ও শিল্প বিকাশের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারব।’

Comments

The Daily Star  | English
Temperature rise in Dhaka last 30 years

An April way hotter than 30-year average

Over the last seven days, temperatures in the capital and other heatwave-affected places have been consistently four to five degrees Celsius higher than the corresponding seven days in the last 30 years, according to Met department data.

11h ago