মুক্তিযুদ্ধ

যুদ্ধবিধ্বস্ত একাত্তরে যেমন ছিল রমজান

যুদ্ধবিধ্বস্ত একাত্তরের অক্টোবর। পাকিস্তানি হানাদারের হাতে জিম্মি দেশের কোটি কোটি মানুষ। বাংলার অসহায় স্বাধীনতাকামী জনতা, বিশেষত সাধারণ মানুষ যুদ্ধের মাঠে, দিনরাত ক্লান্তিহীন যুদ্ধ প্রক্রিয়ার ভেতরে অতিবাহিত করছে নিদারুণ জীবন। এর মধ্যে আসে রমজান মাস। সুফিয়া কামালের "একাত্তরের ডায়েরী" অনুযায়ী নভেম্বরের ১৭ তারিখ ছিল ২৭ রমজান। সে হিসেবে প্রথম রমজান ছিল ২২ অক্টোবর ১৯৭১। রণাঙ্গনের মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা কীভাবে পালন করেছে তাদের সিয়াম সাধনা?

যুদ্ধবিধ্বস্ত একাত্তরের অক্টোবর। পাকিস্তানি হানাদারের হাতে জিম্মি দেশের কোটি কোটি মানুষ। বাংলার অসহায় স্বাধীনতাকামী জনতা, বিশেষত সাধারণ মানুষ যুদ্ধের মাঠে, দিনরাত ক্লান্তিহীন যুদ্ধ প্রক্রিয়ার ভেতরে অতিবাহিত করছে নিদারুণ জীবন। এর মধ্যে আসে রমজান মাস। সুফিয়া কামালের "একাত্তরের ডায়েরী" অনুযায়ী নভেম্বরের ১৭ তারিখ ছিল ২৭ রমজান। সে হিসেবে প্রথম রমজান ছিল ২২ অক্টোবর ১৯৭১। রণাঙ্গনের মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা কীভাবে পালন করেছে তাদের সিয়াম সাধনা?

একদিকে পাকিস্তানিরা জানিয়েছিলে তারা প্রকৃত মুসলমান, অপরদিকে এই পবিত্রমাসেও তারা নির্যাতন, হয়রানি, লুটপাট, অত্যাচার, গণহত্যা চালায়। বিশ্ব দেখতে পায় তাদের দৈত্যরূপ। তারা ক্ষান্ত হয় না পবিত্র মাসেও। সেই পরিপ্রেক্ষিতে উপস্থাপন করবে কয়েকটি ঘটনা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার কাইয়ুমপুরে মঈনুল হোসেন (বীর উত্তম) সহ আট জন মুক্তিযোদ্ধা রাতে আগেভাগে সেহেরি খেয়ে নিলেন। তারপর নিজেদের গোপন শিবির থেকে বেরিয়ে পড়লেন। মুক্তিযোদ্ধাদের নেতৃত্বে ছিলেন মঈনুল হোসেন। তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক প্রতিরক্ষা অবস্থানে মর্টারের সাহায্যে আক্রমণ করবেন। রাতের অন্ধকারে দ্রুত এগিয়ে চললেন সেদিকে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, লক্ষ্যস্থলে যাওয়ার আগেই তারা নিজেরাই পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণের মুখে পড়লেন। অতর্কিত প্রচণ্ড মর্টার আক্রমণে থমকে গেল তাদের অগ্রযাত্রা। বিপর্যস্ত তারা। প্রাথমিক হকচকিত অবস্থা কাটিয়ে পাল্টা আক্রমণ করার আগেই পাকিস্তানিদের হাতে ধরা পড়ে গেলেন তিনিসহ দুজন। পাকিস্তানিরা তার চোখের সামনেই দুই সহযোদ্ধাকে গুলি করে হত্যা করল আর তার হাত-পা বেঁধে ফেলল। এরপর তার ওপর শুরু হলো নির্দয় নির্যাতন। নিষ্ঠুর নির্যাতনেও তিনি পাকিস্তানিদের কোনো তথ্য দিলেন না। পরে পাকিস্তানি সেনারা তাকেও হাত-পা বাঁধা অবস্থায় হত্যা করে। এ এইচ এম আবদুল গাফফারের (বীর উত্তম) নির্দেশে তারা সেখানে অপারেশনে গিয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনী গুপ্তচরের মাধ্যমে এ খবর আগেই পেয়ে যায় এবং পাল্টা অ্যামবুশ করে। (একাত্তরের বীরযোদ্ধা, খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা (প্রথম খন্ড)। প্রথমা প্রকাশন। মার্চ ২০১৩)

কমান্ডার মো. রহমতুল্লাহর ভাষ্যে বলা যায়, ‘মিত্রবাহিনীর কর্নেল রাও নির্দেশ দিলেন সকাল ৮টায় বিশেষ ট্রেনিংয়ে তুরা (ভারত) যেতে হবে। তখন ভোর ৫টা। সেদিন ছিল পয়লা রমজান। আগেই সাহরী খেয়ে নিয়েছি। সব যোদ্ধাকে প্রস্তুত হতে আদেশ দিলাম। যথাসময়ে ১০/১২টি ট্রাক এসে পড়ল। তুরা পার হওয়ার পর ইফতারের সময় হলো, ট্রাকেই আছি। কারো কাছে ইফতার করার মতো কোনো খাবার, এমনকি পানি পর্যন্ত ছিল না। আমার পকেটে সিগারেট ছিল, অগত্যা তা দিয়েই ইফতার (তখন জানতাম না এটি ইসলাম সমর্থন করে কিনা)। আমাদের সঙ্গে ইপিআর রফিক অবশ্য ধূমপান করেন না বিধায় কলেমা পাঠরত আল্লাহর নামে ইফতার করলেন। তুরা ট্রেনিংয়ের স্থানটির নাম এখন মনে করতে পারছি না। তবে জেলা সদর শহর পেরিয়ে আরো ৪/৫ ঘন্টা ট্রাক যাওয়ার পর একটি স্কুলের সামনে ট্রেনিং কমান্ডার যাত্রা স্থগিত করলেন। এখানে খাওয়া-থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। ট্রেনিং কমান্ডার বললেন, সময়মত খাদ্য আসবে। সারাদিন রোজা রাখা, ইফতারের পর ক্ষুধা বোধ করলাম। চারদিকে শুধু পাহাড়- জঙ্গল- অন্ধকার ভাগ্য ভালো, স্কুলে হারিকেন জাতীয় বাতি ছিল। রাত যখন ১০টা তখন রুটি-ডাল আসলো সবাই খেয়ে নিলাম (কোম্পানী কমান্ডার, সেক্টর ১১, একাত্তরের ডায়েরী, সুফিয়া কামাল)

লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাজ্জাদ আলী জহির বীর প্রতীক নিবন্ধকারকে জানান, 'যত দূর মনে পড়ে একাত্তরের অক্টোবরের দিকে ক্যাম্পে ছিলাম। আর সে মাসেই রোজা আসে। আমাদের থাকার জায়গা বিশেষ করে সিলেটের কুলাউড়া, বড়লেখা, মৌলভীবাজারের দিকে। যখন যেখানে গিয়েছিলাম আমরা প্রায় রোজা রাখতে পেরেছিলাম। বয়সও কম ছিল, শরীরে শক্তি সামর্থও ছিল। চা বাগানের পাশে এলাকাবাসী ইফতার দেয়ার চেষ্টা করতো। যুদ্ধ বিধ্বস্ত সময়েও আন্তরিকতা দেখাতো, বলত বাবারা আসো, বসো, একসাথে ইফতার করি। তাদের খুব আছে এমন না, তবু বলতো আমরা খুশি হতাম। আর ইফতার মানে চিড়া, মুড়ি, গুড় আর পানি। তা আমরা নিজেরাই সংরক্ষণে রাখতাম। সেহরী ইফিতার সাদামাটা হলেও মানিয়ে নিয়েছি। রমজান এলে আজও সে স্মৃতি ভাবায়।'

মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক পৌরসভা (চুয়াডাঙ্গা আলমডাঙ্গা) মেয়র এম সবেদ আলী বলেন, ‘রোজা শুরু হয় অক্টোবরে শেষ হয় নভেম্বরে। সে সময় আমাদের আলমডাঙ্গা মুক্তিযুদ্ধ অঞ্চল পাকিস্তানি সৈন্যদের থেকে মুক্ত হবার পথে। আমরা ব্যস্ত সেদিক নিয়ে। দিন রাত কাটে দৌড়ঝাঁপের মধ্য দিয়ে। যুদ্ধের সময় রোজা রাখার সুযোগ পাইনি। তবে কোনো কোনো বাড়িতে মেয়েরা রোজা রাখতো। তারা পানি খেয়েও এক দিন পার করে দিতে পারতো। আর আমি মাঝে মধ্যে দুই একটা রাখতে পেরেছি বলে মনে হয়। তাও এমন হয়েছে এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে হেঁটে যেতে যেতে ভোর হয়ে গেছে, তখন কারো বাড়িতে পান্তা ভাত, পোড়া বা কাচা মরিচ লবণ পেয়াজ দিয়ে খেয়ে নিয়েছি। ইফতারও হয়তো কারো বাড়িতে বা আশ্রয় কেন্দ্র বা তাবুতে মুড়ি গুড় মেখে কোনো রকম খেয়ে আবার দৌঁড়। স্থিরভাবে থাকার সুযোগ নেই।’

শেষ রোজায় জয়বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত, ‘ঈদের আগের দিন ১৯ নভেম্বর ‘এই ঈদে আমাদের প্রার্থনা হোক’ শিরোনামে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বাণী প্রকাশ করে জয়বাংলা পত্রিকা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দেশে এবার ঈদ এসেছে অত্যন্ত মর্মান্তিক পরিবেশে। দখলীকৃত এলাকায় শত্রুসৈন্যের তাণ্ডব চলছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে বিচ্যুত হয়ে শরণার্থী হয়েছেন, মুক্ত এলাকায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি চলছে শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য, রক্তের বিনিময়ে মানুষ মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম করছে। এবার ঈদে আনন্দ মুছে গেছে আমাদের জীবন থেকে, আছে শুধু স্বজন হারানোর শোক, দুর্জয় সংগ্রামের প্রতিজ্ঞা ও আত্মত্যাগের প্রবল সংকল্প।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং আমার নিজের পক্ষ থেকে, বাংলাদেশের জনসাধারণকে ঈদ উপলক্ষে আমি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। ঈদের যে আনন্দ আজ আমরা হারিয়েছি, তা আমাদের জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে সেদিনই, যেদিন আমরা দেশকে সম্পূর্ণরূপে শত্রুমুক্ত করব। আমি আপনাদের আশ্বাস দিচ্ছি যে, যথাসর্বস্ব পণ করে যে স্বাধীনতা সংগ্রামে আমরা লিপ্ত, তার চূড়ান্ত সাফল্যের দিনটি নিকটতর হয়ে এসেছে। সেই মুহূর্তটিকে এগিয়ে আনার সংগ্রামে আমরা সকলে যেন নিঃস্বার্থভাবে নিজেদের নিয়োগ করতে পারি, এই ঈদে তাই হোক আমাদের প্রার্থনা।’

রণাঙ্গনের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর জনসংযোগ কর্মকর্তা নজরুল ইসলামের ‘একাত্তরের রণাঙ্গন: অকথিত কিছু কথা’ গ্রন্থে মুজিবনগর সরকারের ঈদ উদযাপনের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। তিনি লিখেন, মুজিবনগর সরকারের সদর দপ্তরের ছোট মাঠে এক অনাড়ম্বর পরিবেশে ঈদুল-ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীন বাংলা সরকারের পক্ষ থেকে মুজিবনগরে খুব ঘটা করে ঈদুল-ফিতর উদযাপনের ব্যাপক প্রচার করা হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় সম্পর্কে মুসলিম দেশগুলোর কাছে ফ্যাসিস্ট পাকিস্তানিদের অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি দূর করার জন্যে। ইতিহাসের জঘন্যতম ঘটনা। কারণ, মুসলিম দেশগুলোর বিভ্রান্তি ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সৃষ্ট ভুল ধারণা মোচন করে তাদেরকে জানিয়ে দেয় যে বাংলাদেশের যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে নয়, কোনো মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে বিধর্মীদের যুদ্ধ নয়। এটা স্বাধীনতাকামী একটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে লড়াই। ধর্মের দুশমন, মানবতার দুশমন এই ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধেই মুক্তিযুদ্ধ।

Comments

The Daily Star  | English

Extreme heat sears the nation

The scorching heat continues to disrupt lives across the country, forcing the authorities to close down all schools and colleges till April 27.

7h ago