সাহিত্য

অক্তাবিও পাজ লোজানো: কবিতার আড়ালে লাতিন সাহিত্যে বিপ্লবের জাদুকর

“কোন সমাজই কবিতা ছাড়া থাকতে পারে না আবার কখনো সমাজকে কেবল কবিতা দিয়েও উপলব্ধি করা যায় না। সমাজের পথ কখনোই কাব্যিক নয়। কখনোবা কবিতা আর সমাজ একে অপরকে ভাঙতে চায়, কিন্তু আদতে তা সম্ভব নয়।”
অক্তাবিও পাজ লোজানো। ছবি: সংগৃহীত

“কোন সমাজই কবিতা ছাড়া থাকতে পারে না আবার কখনো সমাজকে কেবল কবিতা দিয়েও উপলব্ধি করা যায় না। সমাজের পথ কখনোই কাব্যিক নয়। কখনোবা কবিতা আর সমাজ একে অপরকে ভাঙতে চায়, কিন্তু আদতে তা সম্ভব নয়।”

লিখেছিলেন তিনি "দ্য বো অ্যান্ড লায়ার" এ।

এগুলিয়া ও সোল লুনা সিলভেস্টার, এল ল্যাবিরিন্তো দে লা সোলেদাদ, লা এস্তাসিয়োন বিওলেন্তা কিংবা পিয়েদ্রা দে সল এর কবিতা গুলো পড়তে পড়তে পড়তে তিনি পাঠককে নিয়ে যান কোন এক ক্ষুধার্ত পথপ্রান্তরে যেখানে বিগত যৌবনা নারী নুয়ে পড়েছে ভীষণ হতাশায়। হয়তো এক শুষ্ক নদী অপেক্ষা করছে সমুদ্রে মিলিত হওয়ার প্রতীক্ষায় কিংবা বয়সের ভারে বৃদ্ধ ন্যুব্জ সৈনিক ভাবছে তার উদ্যম যৌবনের কথা, কোনো যুদ্ধে বিধ্বস্ত  কিশোর তাকিয়ে আছে তার উড়ে যাওয়া পায়ের ভগ্নাংশের দিকে। 

বিটুইন দি স্টোন অ্যান্ড দি ফ্লাওয়ার পড়তে গিয়ে কেঁদে ফেলেনি এমন পাঠক খুঁজে পাওয়া যাবে না। লিখেছেন স্প্যানিশে কিন্তু বাঙালির হৃদয়ে যেন ছাপ ফেলেছে  বাংলার এক নিষ্ঠুর জমিদারের কাছে অভাবী বঞ্চিত কৃষকের ছবি। মনকে মুহূর্তেই ওলটপালট করার কী দোর্দণ্ড ক্ষমতা রাখেন এক কবি! তাইতো তিনি অক্তাবিও পাজ লোজানো। তাইতো তিনি চির রুক্ষের আকাশে পলকা হাওয়া, কখনোবা টর্নেডোর আঘাত, কিংবা সমুদ্রের বুকে বয়ে চলা উদ্যমী ঢেউ।

অক্তাবিও পাজের জন্ম মেক্সিকো সিটির পাশের এক এলাকায় এক প্রখ্যাত রাজনৈতিক পরিবারে। নিজের জন্ম নিয়ে বলেছিলেন "আমার জন্মটা যেন রুক্ষতার আদ্যপ্রান্ত, অমন বিদঘুটে সময়ে কেউ জন্ম নেয়। কী করে যে এলাম, তাইতো ভেবে পাই না।”

আসলেই কি তাই!  হয়তো তার জন্মের চার মাস পরেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা বলেই। বাবা পাজ সোলরজানো ছিলেন বিপ্লবী এবং আইনজীবী। মেক্সিকান বিপ্লবের বিখ্যাত নেতা এমিলিয়ান সাপাতার পরামর্শক ছিলেন। এমিলিয়ান ডায়াজ শাসনতন্ত্রের চরম বিরোধী ছিলেন, ছিলেন বিপ্লবী নেতাও। তাইতো সোলরজানোকে ছুটে বেড়াতে হতো। তাই মেক্সিকো সিটি ছেড়ে তাকে মায়ের সঙ্গে  চলে যেতে হয়েছিল প্রত্যন্ত মিক্সিকোয়াক গ্রামে। যেখানে ছিলেন তার দাদা ইরিনিও, মা জোসেফিনা আড় খালা এমেলিয়া পাজ। দাদা ইরিনিও নিজে ছিলেন সাহিত্যিক। প্রকাশক আর ঔপন্যাসিক হিসেবে বেশ পরিচিত চারপাশে। স্বাধীনচেতা বুদ্ধিজীবী ছিলেন, কিন্তু এককালে প্রেসিডেন্ট পোরফিরিও ডায়াজের ঘোর সমর্থক ছিলেন। এখানে থাকার সময়েই দাদার লেখালেখি, দর্শন এবং সাহিত্যের প্রতি উদার ভাবনা তাকে সমৃদ্ধ করেছিল। মিক্সিকোয়াক গ্রামেই মূলত সাহিত্যে হাতেখড়ি হলো তার। দাদার বিশাল লাইব্রেরি ও সংগ্রহ ছিল। যেখানে অক্তাবিও পাজের অবাধ প্রবেশের স্বাধীনতা ছিল, অন্যরা যেখানে বই ছুঁয়েও দেখত না। এখানেই সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ জন্ম নিল তার।

আত্মকথায় লিখেছিলেন অক্তাবিও পাজ, "বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আমার শৈশবটাই আমার আজন্মের প্রাপ্তি। আমি ফিরে যেতে চাই সেই গমের ক্ষেতে যেখানে আমরা সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে মেঘের মাঝে কবিতার খেরোখাতা আঁকতাম। কখনো বা জলাশয়ের বুকে চুপটি করে চেয়ে দেখতাম পাতা নড়ছে, দাদা তাকিয়ে বলতেন, স্থির হয়ে দেখো একটি পিঁপড়ার বাঁচার কী আপ্রাণ চেষ্টা। কিংবা কখনো আমরা জ্যোৎস্না  দেখতে গিয়ে বলতাম, সহস্র বছর ধরে এই প্রান্তরে কী অবাধ বিচরণ তার। রুখে দেয়ার শক্তি কি আছে? এই আঁধারের মাঝেই জ্যোৎস্নার আলো মনে হতো স্রেফ ঠাট্টা।" 

পাজের পরিবার মেক্সিকান বিপ্লবের বিখ্যাত নেতা এমিলিয়ানো সাপাতার ঘোর সমর্থক ছিল।  ১৯১৯ সালে সাপাতা নিহত হওয়ার পর পাজের পরিবার একটা সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হলো। 

পাজের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার সূচনা হয়েছিলো কলিগিও উইলিয়াম স্কুলে। ১৯২০ এর দশকে প্রখ্যাত ইউরোপিয়ান কবি জেরারদো ডিয়োগো, রোয়ান রেমন জিমেনেজ এবং এন্তোনিও মাচোদার কবিতার সঙ্গে পরিচয় হয় পাজের। তবে তখন তিনি প্রচণ্ড অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বিখ্যাত স্প্যানিশ লেখক আন্তোনিও মাচোদার প্রতি। তাইতো তার শুরুর দিকে লেখায় ভীষণ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এদিকে ১৯৩০ সালে মারা গেলেন প্রখ্যাত ইংরেজ কবি ও নাট্যকার ডি এইচ লরেন্স। তখন ১৬ বছর বয়স পাজের। কিন্তু ডি এইচ লরেন্সের মৃত্যু তাকে ভাবিয়ে তুললো। মৃত্যু ভয় গ্রাস করল তাকে। লরেন্সের সাহিত্যের সূচনাও হয়েছিলো কৈশোরে। ডি এইচ লরেন্সে অনুপ্রাণিত হয়ে কিশোর পাজ ক্যাবেরেল্লাসহ তার প্রথম জীবনের কিছু কবিতা প্রকাশ করলেন পত্রিকায়। দুই বছর পরে ১৯৩৩ সালে এলো তার কবিতা সংগ্রহ লুনা সিল্ভেস্টার (বুনো চাঁদ)। এর মধ্যেই চলছে তার কবিতা লেখা। তখন মেক্সিকোর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়ছিলেন পাজ। কিন্তু কবিতার নেশা তাকে গ্রাস করে তুললো। এর দু বছর পর স্বেচ্ছায় আইন পড়া ছেড়ে দিলেন। বলেছিলেন "সেই বিদঘুটে ক্লাস আর মাথার মধ্যে ধারাপাত ঘোরা। উফ কী অসহনীয়। মনে হচ্ছে মাথার মধ্যে পোকা কিলবিল করছে।" তাইতো আইন পড়া রেখে চলে গেলেন মেক্সিকোর অন্যতম প্রদেশ ইউকাতানের রাজধানী মেরিদায়। সেখানে দরিদ্র কৃষক ও শ্রমিকদের ছেলে মেয়েদের শিক্ষকতার কাজ শুরু করলেন। এসময়ই "বিটুইন দি স্টোন অ্যান্ড দি ফ্লাওয়ার" এর মতো দীর্ঘ কবিতাগুলোর জন্ম। এই কবিতাগুলো ছিল টি এস এলিয়ট দ্বারা প্রভাবিত। সে বছরই প্রথম তার পরিচয় হলো এলোরা গ্যারোর সঙ্গে। তারা প্রচণ্ড প্রেমে পড়লেন একে অপরের। 

এর দু বছর পর  ১৯৩৭ সালে মেক্সিকোতে যখন গৃহযুদ্ধ চলছিল, তখন পাজ স্পেনে দ্বিতীয় সংস্কৃতি রক্ষা আন্তর্জাতিক লেখক সম্মেলনে আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। সেই সম্মেলনে পাজ রিপাবলিকানদের সাথে সংহতি প্রকাশ করেছিলেন। বলেছিলেন বিশ্বের বিষফোঁড়া হলো ফ্যাসিবাদীরা। বিপ্লবই একমাত্র হঠাতে পারে ফ্যাসিবাদীদের। স্পেনে তার দেখা হয়েছিল কিংবদন্তী মার্কিন  ঔপন্যাসিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, বিখ্যাত কবি পাবলো নেরুদা,  বিখ্যাত ফ্রেঞ্চ ঔপন্যাসিক আন্দ্রে মালরাক্স, বিখ্যাত ইংরেজ কবি ও ঔপন্যাসিক স্টিফেন স্পেন্ডারের সঙ্গে। এসময় তিনি ফ্রান্সের প্যারিসেও গিয়েছিলেন। তখন ইউরোপে শুরু হলো পরবাস্তব সাহিত্যের নতুন যুগ। তিনি উদ্বুদ্ধ হলেন দারুণ ভাবে। ইউরোপ থেকে ফিরে আসার পর পাজ ‘টলার’ নামে একটি সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশ শুরু করলেন। কেবল কবিতা আর ছোট গল্পই নয়, প্রাধান্য পেত প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাহিত্য সমালোচনা আর ফ্যাসিবাদ বিরোধী আলাপ। সেখানেই উঠে আসতো মেক্সিকোর নানা প্রান্তে চলা হামলার খবর। সেই বছরই তার প্রেমিকা সাংবাদিক সাহিত্যিক এবং ঔপন্যাসিক এলোরা গ্যারোর সঙ্গে বিয়ে হলো পাজের। ১৯৩৯ সালেই মূলত কবি হিসেবে দোর্দণ্ড প্রতাপে আবির্ভূত হলেন পাজ। তার সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘টলার’ বের হলো ১৯৪১ সাল পর্যন্ত। 

এর মধ্যে চলছে তার সাহিত্যকর্ম, লেখালেখি। ১৯৪৩ এ গাগেনহেইম ফেলোশিপ পান অক্তাবিও পাজ। তখন তিনি পড়তে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলেতে গবেষণা  শুরু করেন।  তখনই মেক্সিকোর কূটনৈতিক সংস্থায় চাকুরি পেলে, থাকলেন নিউইয়র্কে। এর দুই বছর পর ১৯৪৫ সালে পাজ বদলি হয়ে গেলেন ফ্রান্সের প্যারিসে। এই সময়টাতে একাকীত্বের মাঝে নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করলেন পাজ। অফিসের কাজ শেষে ঘরে ফিরতেন, নিঃসঙ্গ জীবনযাপনে এই সময়ে তার সঙ্গই হয়ে দাঁড়ায় ব্যাপক পড়াশোনা ও কবিতার প্রতি প্রচণ্ড মোহগ্রস্ততা। সঙ্গে বিপ্লবের প্রতি অসম্ভব টান। এসময় মেক্সিকান আত্মপরিচয় ও চিন্তা নিয়ে "এল ল্যাবিরিন্তো দে লা সোলেদাদ " তথা  "একাকীত্বের গোলকধাঁধা" নামে নয়টি বৈপ্লবিক প্রবন্ধ লিখেছিলেন পাজ। ১৯৫২ সালে ভারতে প্রথমবারের মতো এসেছিলেন পাজ। এ সময়  হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে জানতে আগ্রহীও হয়েছিলেন তিনি। একই বছর জাপানে বৌদ্ধ ধর্মের দর্শন নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। তার লেখা "সূর্যপাথর" কবিতাটিকে পরাবাস্তবতাবাদী কবিতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বলা যায়। কবিতার প্রধান উপজীব্য ছিল ভালবাসা ও কাম, সময়ের প্রকৃতি ও বৌদ্ধিক দর্শন। ভারতে ও জাপানে গিয়ে চিত্রকলার প্রতি ভীষণ  অণুরাগের সৃষ্টি হয়েছিলো, যা তার এসময়ের লেখা কবিতা ও পরবর্তী সময়ে লেখা কবিতায় দেখা যায়। তার বেশকিছু কবিতা বালথুস, জ়োয়ান মাইরো, মার্সেল ডাচহ্যাম্প, এন্টোনি টাপিএস, রবার্ট রাশ্চেনবার্গ এবং রবার্টো মারিওর প্রতি উৎসর্গ করেছিলেন। 

 ১৯৫৪ তে পুনরায় মেক্সিকো সিটিতে ফিরে গেলেন পাজ। ১৯৫৬ সালে পাজ লিখলেন  "লা ইহা দে রাপ্পাচিনো" নামের একটি নাটক। সে নাটকটির আঙ্গিক গড়ে উঠেছে অধ্যাপক রাপ্পাচিনোর মনোরম বাগানের প্রতি একজন ইতালীয় ছাত্রের ঘোরাঘুরিকে কেন্দ্র করে, যেখানে ছাত্রটি গোপনে অধ্যাপকের কন্যা বিট্রেস এর প্রতি গোপনে লক্ষ্য রাখতো। একসময় ছাত্রটি বাগানের সৌন্দর্যের বিষাক্ত প্রকৃতি জেনে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। একই বছর বের হয়েছিল "লা এস্তাসিয়োন বিওলেন্তা"। পরের বছর প্রকাশিত হলো তার কাব্যগ্রন্থ সূর্যপাথর। যেটির  মূল নাম ছিল পিয়েরদা দি সল। একই বছর বের হলো তার  কবিতা সংকলন লিবারতাদ বাজো প্যালাব্রা বা মুক্তির শপথ। 

স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় পাজ রিপাবলিকানদের সাথে সংহতি প্রকাশ করেছিলেন ঠিক কিন্তু রিপাবলিকান কর্তৃক তার এক সহযোদ্ধার খুনের ঘটনা জানার পরে রিপাবলিকানদের প্রতি তার ক্রমশ মোহভঙ্গ হয় এবং প্রচণ্ড বিতৃষ্ণার জন্ম হয়। ১৯৫০ দশকের শুরুর দিকে ডেভিড রোসেট, আর্দ্রে ব্রিটন এবং আলবেয়ার কামুর মতো দার্শনিকদের ভাবনায় প্রভাবিত হয়েছিলেন পাজ। তখন সামগ্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতি, বিশেষ করে জোসেফ স্তালিনের বিরুদ্ধে তার সমালোচনামুখর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হতে থাকে। 

একটা সময় আবার প্যারিসে বদলি হলেন পাজ। আর ভারতে পুনরায় এলেন ১৯৬২ সালে মেক্সিকোর রাষ্ট্রদূত হয়ে। এসময়ে বুদ্ধদেব বসু, জি শঙ্কর কুরূপ, উমা শঙ্কর জেঠালাল যোশী, বিষ্ণু দে ও রামচন্দ্র বেন্দ্রের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তার। ভারতে থাকাকালীন কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন পাজ।  এসময় লেখা হয়েছিল তার এল মনো গ্রামাতিকো ও লাদেরা এস্তেসহ বেশ কিছু কাব্যগ্রন্থ। ভারতে থাকাকালীন পাজ

"ক্ষুধার্ত প্রজন্ম” নামের এক লেখকগোষ্ঠীর সাথে পরিচিত হয়েছিলেন। তারা ভীষণ প্রভাবিত হয়েছিলো তার সাহিত্যে। ক্ষুধার্ত আন্দোলনের কবিগোষ্ঠীদের ৩৫ মাসের দীর্ঘ বিচার চলাকালীন সময়ে ভীষণ সাহায্য করেছিলেন পাজ। ভারতে আসার আগেই স্ত্রী এলোরা গ্যারোর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়েছিল পাজের। এরপর তার  পরিচয় হয়েছিল তার ফরাসি বান্ধবী বোনার সঙ্গে। তাও আবার বিচ্ছেদ হয় ভারতে থাকাকালীন সময়ে ১৯৬৩ সালে।  

একই বছর মেরী হোসে ত্রামিনি নামের ফরাসি এক চিত্রশিল্পীর সঙ্গে বিয়ে হয় পাজের।  ১৯৬৮ সালে ত্লাতেলোকো এর প্লাজা দি লাস ত্রেস কালতুরাস নামক চত্ত্বরে সরকারি আদেশে প্রতিবাদী ছাত্রজনতা হত্যার ঘটনার প্রতিবাদে পাজ রাষ্ট্রদূতের চাকরি থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। এরপর কিছুদিনের জন্য চলে গেলেন প্যারিসে, পরের বছরই মেক্সিকো ফিরে এলেন। এ সময় পাজ কিছু স্বাধীনচেতা মেক্সিকান লাতিন আমেরিকান সাহিত্যিকদের নিয়ে প্লুরাল নামের একটি সাহিত্য পত্রিকা বের করলেন। এই সাহিত্য পত্রিকা চলেছিল ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত। যে বছর এই পত্রিকা বের হলো সে বছরই পাজ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে চার্লস এলিয়ট নর্টন অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পেলেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যলয়ে সে সময়ে দেয়া তার  লেকচার থেকেই জন্ম নিলো লস ইহোস দেল লিমো  বা কর্দমাক্ত  শিশু। ১৯৭৪ সালে দেশে ফিরে এলেন পাজ। আর ১৯৭৫ সালে মেক্সিকান সরকার তাদের সাহিত্য পত্রিকা প্লুরাল বন্ধ করে দেয়। একই বছর তারা নতুন করে বের  করলেন নতুন সাহিত্য সাময়িকী "বুলেতা"। বুলেতা এর ভাবাদর্শ প্লুরাল এর অনুগামী থেকে যায়। প্লুরাল ও বুলেতা ম্যাগাজিনে সাম্যবাদী ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরেছিলেন পাজ। এর ফলে লাতিন আমেরিকার বামপন্থী রাজনৈতিক অংশের কাছে তিনি শত্রু হয়ে গিয়েছিলেন। পাজ কমিউনিস্ট মতবাদ ত্যাগ করার পরে বহু মেক্সিকান বুদ্ধিজীবী তার সাথে প্রকাশ্য শত্রুতা শুরু করেছিল। তবে, পাজ সবসময়ই নিজেকে বামপন্থী চেতনার ধারক বলেই মনে করতেন। তিনি নিজেকে বলতেন গণতান্ত্রিক বামপন্থী ভাবধারক, গোড়া মতবাদধারী ও আধিপত্যবাদী ভাবধারার বাম নন।  

১৯৭৭ সালে পাজ সাহিত্যে পেলেন জেরুজালেম পুরস্কার আর  ১৯৮০ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি।  ১৯৯০ সালে পাজের  ১৯৫৭ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত লিখিত কবিতাগুলোর একটি সংকলন বের হয়েছিল।  ১৯৯০ সালে পতন হলো বার্লিন দেয়ালের। এসময় পাজ এবং তার বুলেতা ম্যাগাজিনের সহকর্মীরা কমিউনিজমের পতনের উপর আলোচনার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বুদ্ধিজীবী ও লেখকদেরকে মেক্সিকো সিটিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেই সম্মেলন ২৭ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মেক্সিকোর টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়। সে বছরই সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন অক্তাবিও পাজ লোজানো। 

নোবেল কমিটি ১৯৯০ সালে তাদের সাহিত্যের নোবেল ঘোষণার দিন বলেছিলো, "This year The Nobel Prize in Literature 1990 was awarded to Octavio Paz "for impassioned writing with wide horizons, characterized by sensuous intelligence and humanistic integrity."

কেবল কবিই নন প্রাবন্ধিক হিসেবেও অক্তাবিও পাজ ছিলেন অসামান্য। মেক্সিকান রাজনীতি ও অর্থনীতি, আজটেক শিল্প, নৃতত্ত্ববিদ্যা ও যৌনতা বিষয়ে অসংখ্য প্রবন্ধ লিখেছিলেন পাজ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালীন সময়ে "একাকীত্বের গোলকধাঁধা" প্রবন্ধ সংকলনে তিনি তার  দেশের মানুষের  মনের গভীরে অনুসন্ধান চালিয়েছেন এবং সেই সব মনকে একাকীত্বের মুখোশের পেছনে হারিয়া যাওয়া মন বলে বর্ণনা করেছেন তা অসামান্য। তিনি লিখেছিলেন "ঐতিহাসিক বাস্তবতায় হয় মেক্সিকানদের আত্মপরিচয় প্রাক কলম্বিয়ান ও স্প্যানিশ সংস্কৃতির মাঝামাঝি জায়গায় হারিয়ে গেছে, না হয় সেটা ক্ষয়িষ্ণু।" একাকীত্বের গোলকধাঁধা প্রচণ্ড প্রভাবিত করেছিল বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক কার্লোস ফুয়েন্তেসকেও। তাইতো তিনি বলেছিলেন বিপ্লব, সাহিত্য, জীবন রেখা যেথায় মিলিত যায় সেখানেই অক্তাবিও পাজের জন্ম হয়। 

কিংবদন্তী সাহিত্যিক ইলান স্ট্যাভান্স যেমন বলেছিলেন, "একজন আত্মপ্রতিমূর্তির জরিপকারী, একজন দান্তের ভার্জিল, একজন রেঁনেসা-পুরুষ হলেন পাজ।" 

কবি এবং সাহিত্যের বাইরে অক্তারিও পাজ লোজানোকে আলাদা করে রাখবে একজন অনুসন্ধিৎসু, প্রখর রাজনৈতিক সচেতন, মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ আর বৈপ্লবিক পুরোধা হিসেবে। 

যেমনটা তিনি লিখেছিলেন বো অ্যান্ড লায়ার এ,  কোন সমাজই কবিতা ছাড়া থাকতে পারে না আবার কখনো সমাজকে কেবল কবিতা দিয়েও উপলব্ধি করা যায় না।  

১৯৯৮ সালে আজকের দিনে চলে গিয়েছিলেন বিশ্বখ্যাত কবি অক্তাবিও পাজ লোজানো। প্রয়াণ দিবসে এই অসামান্য মানবদরদী কবির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। 

তথ্যসূত্র - From Art to Politics: Octavio Paz and the Pursuit of Freedom/ Yvon Grenier,

Octavio Paz: A Meditation/ University of Arizona Press

Octavio Paz / Wilson Jason 

Preface to The Collected Poems of Octavio Paz/ Eliot Weignberger

Comments

The Daily Star  | English

Cyclone Remal: Elderly man dies en route to shelter in Satkhira

He slipped and fell on the road while going to Napitkhali shelter with his wife on a cycle around 6:30pm

1h ago