আমাদের কালের বাতিঘর সরদার ফজলুল করিম

বরিশালের প্রত্যন্ত আটিপাড়া গ্রামের ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম তার। যে কৃষক পরিবারের অন্য সব চিন্তা বাদ দিয়ে খাবারের চিন্তায় দিন শুরু হতো। প্রতিদিন সকালে পান্তা খেয়ে বাবাকে ফসলের মাঠে সাহায্য করতে লাঙ্গল নিয়ে ছুটতে হতো তাকে। তিনি নিজেই লিখেছিলেন, ‘কৃষকের সন্তানের কোনো ভবিষ্যৎ নেই!’। অথচ সেই দরিদ্র কৃষক পরিবার থেকে উঠে এসে সরদার ফজলুল করিম হয়েছিলেন কালের মনীষী, প্রবাদপ্রতিম শিক্ষক, দেশের সেরা দার্শনিক। তিনি হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক, হয়েছিলেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য।
সরদার ফজলুল করিম। ছবি: সংগৃহীত

বরিশালের প্রত্যন্ত আটিপাড়া গ্রামের ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম তার। যে কৃষক পরিবারের অন্য সব চিন্তা বাদ দিয়ে খাবারের চিন্তায় দিন শুরু হতো। প্রতিদিন সকালে পান্তা খেয়ে বাবাকে ফসলের মাঠে সাহায্য করতে লাঙ্গল নিয়ে ছুটতে হতো তাকে। তিনি নিজেই লিখেছিলেন, ‘কৃষকের সন্তানের কোনো ভবিষ্যৎ নেই!’। অথচ সেই দরিদ্র  কৃষক পরিবার থেকে উঠে এসে সরদার ফজলুল করিম হয়েছিলেন কালের মনীষী, প্রবাদপ্রতিম শিক্ষক, দেশের সেরা দার্শনিক। তিনি হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক, হয়েছিলেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য।

অজপাড়াগাঁয়ের সেই অখ্যাত দরিদ্র পরিবার থেকে মেধার শীর্ষ পর্যায়ে  উঠে এসেও  সারাজীবন নিজের আদর্শে অটল ছিলেন সরদার ফজলুল করিম । নিঃসংকোচে বলতেন, ‘আরে আমি তো কৃষকের পোলাই।’

সরদার ফজলুল করিমের জন্ম বরিশালের আটিপাড়া গ্রামে ১৯২৫ সালের ১ মে। বাবা খবিরউদ্দিন সরদার  ছিলেন কৃষক, মা সফুরা বেগম গৃহিণী। তারা ছিলেন পাঁচ ভাই-বোন।

সরদার ফজলুল করিমের শৈশব ও কৈশোরের প্রথম ভাগ কেটেছে গ্রামে। স্থানীয় এক স্কুল থেকে প্রাথমিক ও বরিশাল কলেজ থেকে মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকায় আসেন ১৯৪০ সালে। মাধ্যমিকে তিনি মেধাতালিকায় স্থান পেয়েছিলেন। শিক্ষার সুযোগ পেয়ে আজীবন মা-বাবার প্রতি পরম কৃতজ্ঞ ছিলেন তিনি। লিখেছিলেন, ‘আমার বাবা-মা নিরক্ষর এবং একেবারে মাটির মানুষ ছিলেন। তাদের মতো লোকের কথা ছিল না আমাকে স্কুলে পাঠানোর। কিন্তু তারা আমাকে স্কুলে পাঠিয়েছেন। সেজন্য আমি এ-মাটির মানুষগুলোর কাছে ঋণী এবং এই দেশের মাটির প্রতি আমার মনের মধ্যে একটা ভক্তি জেগে আছে।’

সরদার ফজলুল করিম ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে। শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেবের মতো কিংবদন্তি শিক্ষকদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে দর্শনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ইংল্যান্ডে পড়ার জন্য বৃত্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু, সেই ইন্টারভিউ কার্ড  ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। এ প্রসঙ্গে স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন-

‘ইন্টারভিউ কার্ড নিয়ে আমি কলকাতায় যাই। রাইটার্স বিল্ডিংয়ে না গিয়ে আমি প্রথমে গেলাম কমিউনিস্ট পার্টির অফিসে। সেখানে মুজাফফর আহমেদ (যাকে আমরা কাকাবাবু বলতাম), নৃপেন চক্রবর্তী (যিনি পরে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন)। আমি হাসতে হাসতে বললাম, ‘আমি তো বিলেত যাচ্ছি।’ ওঁরা শুনে হাসতে হাসতে ঠাট্টার ছলে বললেন, ‘আপনি বিলেত যাবেন আর আমরা এখানে বসে ভেরেণ্ডা ভাজবো?  কাঁথা-কম্বল নিয়ে পার্টি অফিসে চলে আসেন।’ তো কাঁথা-কম্বল নিয়ে পরের দিন আমি পার্টি অফিসে যাইনি কিন্তু ইন্টারভিউ কার্ডটা ছিঁড়ে ফেলেছিলাম।’

বিলেতে পড়তে না গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন সে বছরই।

ছাত্রজীবনেই বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছিলেন। কথা বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অধিকার আদায়ে, শিক্ষার্থীদের পক্ষে। এক সময় কমিউনিস্ট পার্টিতে সময় দেওয়ার জন্য ছেড়ে দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি। পূর্ণাঙ্গ অনিশ্চিত জীবন যাকে বলে। ঘুরে বেড়িয়েছেন কৃষক, শ্রমিক, জনতার দাবি আদায়ে। কখনো কখনো গ্রামে আত্মগোপন করতে হয়েছিল তাকে। গ্রামের ছেলে যেন আরেক গ্রামেই ফিরে গেল। একটা সময় রাজনীতির কারণে তাকে আত্মগোপনে থাকতে হয়েছি নরসিংদীর অনেক গ্রামের কৃষকের বাড়িতে। আর যখন সুযোগ পেতেন লেখালেখির কাজে আত্মনিয়োগ করতেন। লুঙ্গি আর ফতুয়া পরে গ্রামে গ্রামে ঘুরতেন মানুষের দাবি, মানুষের স্বপ্নের বুনন খুঁজতে। নিজেকে কখনো নেতা মনে করতেন না সরদার ফজলুল করিম। মিশে যেতেন মাটি ও মানুষের সঙ্গে।

প্রথমদিকে শিক্ষক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইস্তফা দেওয়ার পরে তাকে থাকতে হয়েছিল কলকাতায় কবি আহসান হাবীবের বাড়িতে। সেখানে ছিল বিচিত্র জীবনযাত্রা। কিন্তু, এক রাতে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে চলে এলেন নরসিংদীতে। নরসিংদীর চালাকচরে এসে আত্মগোপন করলেন। কেমন ছিল সেই দিনগুলো? বলেছিলেন এক সাক্ষাৎকারে-  ‘রাতে থাকতাম  এই যেমন ধরুন, কোনো একটা গরুর ঘর, তার মধ্যে বিছানাপত্র বিছিয়ে আমি থাকতাম। ঐ গ্রাম গরিব এলাকা ছিল। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে তেমন কোন চাহিদা ছিল না আমার। হয়তো কোনদিন একটি পুঁটিমাছ দিয়ে বা কোনোদিন পাটকাঠি দিয়ে শুঁটকি মাছ পুড়িয়ে তা দিয়ে কিছু ভাত খেলাম। সে এলাকায় সাধারণ মানুষ সবসময় ভাত খেতে পেত না। ওটা আবার কাঁঠালের এরিয়া ছিল। কাঁঠালের সিজনে, সকাল বেলা কিছু কাঁঠাল দিত, সেই কাঁঠালের কোষ খেয়ে সারাদিন কাটিয়ে দিতাম।’

তখন কাপাসিয়া, মনোহরদী, চরসিন্ধুরসহ নানান গ্রামে আত্মগোপনে সাংগঠনিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। একসময় আবার ঢাকায় এলেন আত্মগোপনের মাঝেই। ১৯৪৯ সালের মধ্যভাগে ঢাকা জেলে রাজবন্দীরা ৪০ দিনব্যাপী অনশন ধর্মঘট শুরু করলেন। সরদার ফজলুল করিম তখনো গ্রেপ্তার হননি। এ অনশনের খবর পাওয়ার পর কর্মীরা দেওয়ালে দেওয়ালে পোস্টার লাগানোর চেষ্টা করে। তখন দেওয়ালে পোস্টার লাগানো ছিল বিপজ্জনক কাজ। পোস্টার লাগাতে গিয়ে অনেক ছাত্র ও তরুণ কর্মী গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে চলে গেলেন। এদের মধ্যে ছিলেন আলমুতী, কিশোর আলী আকসাদসহ অনেকে। ৪০ দিনের অনশনে রাজবন্দীরা কোনো দাবি আদায় করতে পারেননি। অবশেষে জেল কর্তৃপক্ষ এবং মুসলিম লীগের কোনো কোনো নেতার প্রতিশ্রুতিতে সে অনশন প্রত্যাহার করেন তারা। কিন্তু, তাদের ওপর নির্যাতনের আদৌ কোনো সমাধান না হওয়ায় ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে ঢাকা জেলের রাজবন্দীরা আবার অনশন ধর্মঘট শুরু করেন।

সরদার ফজলুল করিম ঢাকায় এসে উঠলেন সাংবাদিক ও কবি সন্তোষ গুপ্তের বাড়িতে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা শহরের তাঁতি বাজার থেকে সরদার ফজলুল করিম তাঁর কয়েকজন বন্ধুসহ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন। তিনি যখন কারাগারে যান তখন রাজবন্দী হিসেবে মর্যাদা আদায়ের দাবিতে রাজবন্দীদের অনশন ধর্মঘট চলছিল পুরোদমে এবং কারাগারে ঢুকে সাথীদের সঙ্গে তিনিও অনশনে যোগ দেন রাজবন্দী হিসেবে মর্যাদা আদায়ের দাবিতে। অনশনের প্রথম ছ’দিন ‘সেলের’ মধ্যে দিনরাত মেঝেতে চোখ বুজে শুয়ে থাকতেন। মাথার কাছে জেলের সিপাহী জমাদার সকাল বিকাল ভাত-তরকারি থালায় করে রেখে যায় তার সামনে। কিন্তু তিনি সেগুলো ছুঁতেন না। শুধু মাঝে মধ্যে কেবল সামান্য লবণ মিশিয়ে পানি খেতেন। ছ’দিন পর সরদার ফজলুল করিম স্বেচ্ছায় অনশন না ভাঙার কারণে তাকে হাসপাতালে আনা হয় এবং তাকে অন্যান্য অনশনরত বন্দীদের সঙ্গে জবরদস্তি করে খাওয়ানোর বা ‘ফোর্সড ফিডিং’ ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রোজ সকালে দশটার দিকে তাগড়া, জোয়ান একদল সাজাপ্রাপ্ত কয়েদীসহ জেল হাসপাতালের কম্পাউন্ডার বা ডাক্তার একটা বাহিনী নিয়ে এসে চড়াও হত। তাদের হাতে থাকত বালতির মধ্যে পানির সঙ্গে দুধের পাউডার মেশানো ‘দুধ-পানি’। ফোর্সড ফিডিং-এর এই বাহিনী প্রত্যেক বন্দির কাছে গিয়ে বন্দিরা যেন বাধা দিতে না পারে সেজন্য তার হাত পা চেপে ধরত। তাদের হাত পা চেপে ধরে তাদের নাকের মধ্য দিয়ে একটা রবারের নল পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত। এই রবারের নলের ওপর দিকে রাখা বাটি বা কুপিতে সেই দুধ মেশানো পানি ঢেলে দিত। এভাবেই খাওয়ানো হতো অনশনরত বন্দিদের। শুরু থেকে যারা অনশন করেছিলেন তাদের ৫৮ দিন পুরো হওয়ার পরে একটা ফয়সালা হয়। আর সরদার ফজলুল করিম ত্রিশ দিন পুরো অনশন করেন। এর মাধ্যমে কাপড়-চোপড় এবং থাকা খাওয়ার ব্যাপারে কিছু মর্যাদা এবং উন্নত অবস্থার স্বীকৃতি দেওয়া হয় তাদের। দীর্ঘ সোয়া পাঁচ বছর পর ১৯৫৫ সালের মার্চে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন সরদার ফজলুল করিম।

কারাবন্দী থাকা অবস্থাতেই গণপরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন সরদার ফজলুল করিম। বিখ্যাত মার্কিন পত্রিকাগুলো কারাবন্দী থাকা অবস্থাতে গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার খবর ফলাও করে ছেপেছিল। এক বিখ্যাত পত্রিকার শিরোনাম ছিল  ‘One communist from jail elected to constituent Assembly!’

১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত গণপরিষদের সদস্য ছিলেন তিনি। এসময় করাচীতে ছিলেন সরদার ফজলুল করিম। তার নামের আগে সরদার থাকায় পশ্চিম পাকিস্তানিরা মনে করত তিনি আসলেই সরদার গোষ্ঠীর এবং খুব প্রভাবশালী। কিন্তু, কিছুদিন পরেই ভুল ভাঙল তাদের।

তিনি আড্ডা দিতে পছন্দ করতেন। তার বাসাতে সবসময় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ভিড় লেগে থাকত। তার চালচলন ছিল সাদাসিধে। তখন সীমান্ত গান্ধী তথা খান আবদুল গাফফার খানের কর্মীরা তার সঙ্গে দেখা করতে আসত।

অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম তার স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, ‘সমারসেট হাউজে পার্লামেন্টের বাঙালি মেম্বাররা সাধারণত উঠতেন। একবার সরদার ভাই এসেছিলেন, আমাদের সরদার ফজলুল করিম। তার ওখানে গিয়েও দেখি সাক্ষাৎ প্রার্থীদের জমায়েত বটে। তবে এ আরেক কিসিমের। পাগড়ি মাথায়, পরনে লম্বা ঝুলের ঢোলা কামিজ, ঢোলা পাজামা পেশোয়ারি পাঠান। সবাই সীমান্তগান্ধী খান আবদুল গাফফার খানের অনুগত কর্মী।  রাজনৈতিক কারণে কারা নির্যাতিত এক বাঙালি সরদারের সঙ্গে এঁরা মিলতে এসেছেন। দেখবার মতো সে দৃশ্য। এদিকটায় ছ’ফুট/সোয়া ছ’ফুট ইয়া ইয়া দশাসই জওয়ান পাঠান-নন্দন ওরা কয়েকজন, বিপরীতে বসে ছোটখাটো কৃশকায় মলিন অবয়বের এক বাঙালি সরদার। পলিটিকাল কথাবার্তা… আগ্রহে-শ্রদ্ধায় ওঁরা শুনে গেলেন। কী বিষম অহঙ্কার আমার, বাঙালিদের মুল্লুকেও তাহলে সরদার জন্মায়। সরদার ভাইয়ের মুখে বিনীত হাসি।’

কিন্তু, ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করার পরে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হলো। গ্রেপ্তার হলেন সরদার ফজলুল করিম। চার বছর পরে মুক্তি পেলেন ১৯৬২ সালের ডিসেম্বরে। ১৯৬৩ সালে যোগ দিলেন বাংলা একাডেমীতে। ১৯৬৩ থেকে     ’৭১ সাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমীর সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যক্ষ ছিলেন সরদার ফজলুল করিম।

১৯৭১-এর সেপ্টেম্বরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। অন্য কারাবন্দী অধ্যাপক, শিক্ষকদের সঙ্গে তিনিও মুক্তি পান ডিসেম্বরের ১৭ তারিখ।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে, সেপ্টেম্বরে তাকে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী গ্রেপ্তার করে। অন্য কারাবন্দীদের সঙ্গে তিনিও ১৭ ডিসেম্বর মুক্তি পান। স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ সালে  জাতীয় অধ্যাপক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের আমন্ত্রণে সরদার ফজলুল করিম শিক্ষক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দিলেন। আগে ছিলেন দর্শন বিভাগে, এবার যোগ দিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেওয়া নিয়ে স্মৃতিকথায় সরদার ফজলুল করিম লিখেছিলেন,  ‘অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক আবার আমাকে নিয়ে এলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমি স্যারকে বলেছিলাম  আমি তো দর্শনের লোক। পলিটিকাল সায়েন্সে তো আমার এমএ নেই। আপনি আমাকে এখানে কেন নিয়ে এলেন? রাজ্জাক স্যার উত্তরে বলেছিলেন, ‘আপনি ফিলসফির উপর কি সব লেখালেখি করছিলেন না? ঐগুলা আমার দরকার।’ উনি বিশ্বাস করতেন, দর্শন ছাড়া রাজনীতি সম্ভব নয়।’

সে বছরই প্রকাশিত হলো সরদার ফজলুল করিমের প্রথম গ্রন্থ ‘নানা কথা’। নানা কথায় উঠে এসেছে অসাধারণ সব বিষয়। ১৯৭৩ সালে যেমন দর্শন কোষ লিখলেন। যা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দর্শন জ্ঞানকোষ। প্রথমে বাংলা একাডেমী থেকে দর্শনকোষ নিয়মিত বের হত, এরপর পূর্ণাঙ্গ বই করেন সরদার ফজলুল করিম। গ্রিক দর্শনের প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল সরদার ফজলুল করিমের। তাইতো প্লেটোর সংলাপ ও প্লেটোর রিপাবলিক অনুবাদ করলেন। তার অনুবাদে প্লেটোর রিপাবলিক আজও পাঠকপ্রিয়। কিংবা  ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত অ্যারিস্টটলের ‘পলিটিক্স’র অনুবাদ। কেবল গ্রিক দর্শনই নয়,  মূলত দর্শনের পূর্ণ চর্চায় তিনি মগ্ন থেকেছেন। রুশোর সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট, এঙ্গেলসের এন্টি ডুরিং, আমি রুশো বলছি তাই প্রমাণ করে। ‘আমি রুশো বলছি’ অনুবাদের মুখবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি এখনো রুশোর ভূতগ্রস্ত: রুশোর ভূতে পাওয়া।’ জানিয়েছিলেন তার রুশোর প্রতি মুগ্ধতার কথা।

তার অনুবাদের মান ছিলো বিশ্বমানের। শব্দের গহ্বর, অর্থের নানারূপ মাত্রা, আর দর্শনের প্রাণ সবটুকু যেন ঢেলে দিয়েছেন তিনি অনুবাদে। তিনি যেমন ছিলেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে মার্ক্সবাদী, আবার হেগেল নিয়ে লিখেছেন অজস্রবার। কমিউনিস্টরা তার আদর্শ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। বলেছিল, হেগেল দিয়ে কি হবে? হেগেল কোথায় নিয়ে যাবে আপনাকে? জবাবে কেবল একটা বাক্যই বলেছেন সরদার। বললেন, ‘হেগেল আমাকে মার্ক্সের কাছে নিয়ে যাবে।’

১৯৮৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরে চলে গেলেন সরদার ফজলুল করিম। ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হলো তার রুমির আম্মা ও অন্যান্য প্রবন্ধ। যে প্রবন্ধ সংকলনে ছিল মোট ১৭টি প্রবন্ধ। শুরুটা হয়েছিলো শহীদ রুমির মা শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে দিয়ে। জাহানারা ইমামের সঙ্গে তার স্মৃতি ও মুক্তিযুদ্ধ এবং জাহানারা ইমামের অসামান্য অবদানের কথা উঠে এসেছে এই প্রবন্ধে। কিংবা তার পরের প্রবন্ধ তিন বিখ্যাত নেতা মহাত্মা গান্ধী, বঙ্গবন্ধু ও ইন্দিরা গান্ধীর কথা। এই প্রবন্ধ সংকলনে ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল নিয়ে কয়েকটি প্রবন্ধ, বলেছেন বামপন্থী সমাজতন্ত্রী উদ্ভব ও বিকাশ প্রসঙ্গে। বাদ যায়নি তার বাবার স্মৃতি কিংবা পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজ নিয়েও তার অসামান্য ব্যাখ্যা। 

১৯৯৩ সালে ‘নূহের কিশতি এবং অন্যান্য প্রবন্ধ’ এটিও ছিলো অসাধারণ প্রবন্ধ সংকলন। একই বছর প্রকাশিত হলো তার লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ। যেখানে উঠে এসেছে জ্ঞানতাপস অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে তার আলাপচারিতা। যে গ্রন্থে তিনি তুলে ধরেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস থেকে শুরু করে  সূচনাপর্ব, আশুতোষ ভট্টাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম যুগের অধ্যাপকদের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় রামমোহন ও সৈয়দ আহমদের ভূমিকা। এসেছে শেরে বাংলার সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ, এসেছে ভাষা আন্দোলন নিয়েও নানা স্মৃতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব যোগ্যতা থেকে নির্বাচনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান, কাজী মোতাহার হোসেন থেকে মোনায়েম খাঁর বক্তৃতা, কাজী নজরুল ইসলামের ঢাকা আগমনের স্মৃতি, এই গ্রন্থে দু’জন জাতীয় অধ্যাপকের সাক্ষাৎকার আছে। প্রথমজন অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, আরেকজন কাজী মোতাহার হোসেন। এই গ্রন্থকে  এক অসামান্য স্মৃতিকথা বলা চলে সরদার ফজলুল করিমের।

এর পরের বছর প্রকাশিত হয়েছিল তার স্মৃতিকথা ‘চল্লিশের দশকের ঢাকা’। ১৯৪০ সালেই প্রথম ঢাকায় পা রাখেন সরদার ফজলুল করিম। তাই তার প্রথম স্মৃতিও শুরু করেছিলেন, ‘বরিশালের পোলার ‘ঢাকা’ আগমন’ শিরোনাম দিয়ে। পুরো গ্রন্থটাই ছিলো তার স্মৃতিকথা, ঢাকা কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও শিক্ষক হয়ে অবশেষে গ্রামে প্রত্যাবর্তন নিয়ে। এখানে উঠে এসেছে অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর স্মৃতিচারণা, এসেছে সাহিত্যিক ও বিপ্লবী সোমেন চন্দের হত্যাকাণ্ড ও তার কিশোর মনের প্রতিক্রিয়া। এসেছে তার শিক্ষক হরিদাস ভট্টাচার্যের স্মৃতি, সিনেমার গল্প, শিক্ষার্থী থাকাকালীন স্মৃতির কথা। ঢাকা কলেজ প্রথম দেখতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘কলেজ তো নয় যেন রাজপ্রাসাদ’। চল্লিশের দশকের প্রতিটি স্মৃতিই দারুণ সুখপাঠ্য। রুশোর সোশ্যাল কন্ট্রাক্টের কথা তো আগেই বলেছি। সেটি প্রকাশিত হয়েছিলো ২০০০ সালে। সমাজ, রাজনীতি, আইনের প্রসঙ্গ, দাসত্ব, সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রের অধিকার, ভোট, ধর্ম, এক নায়কতন্ত্র, রাজতন্ত্র ও  নির্বাচন নিয়ে সবিস্তারে লিখেছিলেন রুশো। সেই অনুবাদ যেন বাংলা ভাষায় প্রাণ পেল সরদার ফজলুল করিমের হাত ধরে। তিনি দেশীয় প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করেছেন বারেবারে।

কিংবা বলা যায় তার ২০০১ সালে প্রকাশিত ‘সেই সে কাল: কিছু স্মৃতি কিছু কথা’ গ্রন্থের কথা। যেখানে তিনি লিখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার কালের কথা। যেখানে এসেছে লাইব্রেরি সহকারী ওসমানের কথাও। সরদার ফজলুল করিম ১৯৭২ সালে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে গেলেন, তখন দেখা ওসমানের সঙ্গে। ঘটনা প্রসঙ্গে ওসমান বলছে, ‘স্যার আপনি তো একটা ডেঞ্জারাস লোক। আপনি সেই যে পাকিস্তান ভাঙ্গবেন বইলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাড়লেন, পাকিস্তান না ভাইঙ্গা আপনি আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরলেন না।’ সরদার ফজলুল করিম এরপর  লিখলেন, ‘আমার জীবনটাকে আমি এই দৃষ্টিতে দেখিনি। কিন্তু ওর অবজারভেশনে যে কিছুটা সত্য আছে তা অস্বীকার করি কি করে?’

তার লেখা স্মৃতিকথার আরেক গ্রন্থ যুগোস্লাভিয়া। যেখানে তিনি লিখেছেন ১৯৭৯ সালে সেপ্টেম্বর মাসে যুগোস্লাভিয়া সফরের কথা। এসেছে নোডিসাফ শহরের কথা, বেলগ্রেডের কাঁচাবাজারের কথা, এসেছে এক পাকিস্তানির সঙ্গে কথোপকথন, এক ফরাসি প্রেমিকের কথা। যেখানে তিনি তুলে এনেছেন, রাজনীতি, অর্থনীতি, চিরুনির দাম, ফুটপাতে মানুষের জীবন পর্যন্ত।

এছাড়া, আমি মানুষ গ্রন্থে সবিস্তারে তুলে ধরেছেন আড়াই হাজার বছর বয়সী এক বৃদ্ধের কথা,  যিনি কিনা এরিস্টটল। এরিস্টটলের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এসেছে ধূসরিত বাংলার প্রসঙ্গও। বলেছেন মানুষ হিসেবে মূল্যবোধের কথা, সেই প্রসঙ্গ তুলে আনতে ১৯৭১-এর  হানাদারদের ধ্বংসযজ্ঞের কথাও বলেছেন। বলেছেন মার্কিনের সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের সমস্যা নিয়ে, পেন্টাগনের সিআইএ’র বিষয়ও উঠে এসেছে এই গ্রন্থে।  এই গ্রন্থে বাদ যায়নি রবীন্দ্রনাথ, দেয়াল পঞ্জিকার সংস্কৃতিও।

সরদার ফজলুল করিম কেবল মৌলিক আর অনুবাদই করেছেন তা নয়। তিনি সম্পাদনা করেছেন একাধিক স্মারকগ্রন্থ। রঙ্গলাল সেনের সঙ্গে যৌথভাবে সম্পাদনা করেছিলেন ‘শহীদ জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা’ স্মারকগ্রন্থের। সম্পাদনা করেছেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত রাজনীতিবিদ মুজাফফর আহমেদ চৌধুরীকে নিয়ে ‘মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী’ স্মারকগ্রন্থ। এছাড়া নিয়মিত লিখেছেন পত্রিকায়, মতামত দিয়েছেন নানাভাবে।

সরদার ফজলুল করিমের পুরোটা জীবন ছিলো ত্যাগের। আজীবন লড়াই করেছেন শোষণের বিরুদ্ধে, মানুষের অধিকার আদায়ে। সেই বরিশালের আটিপাড়ার অজপাড়াগাঁয়ের এক দরিদ্র কৃষক পরিবার থেকে উঠে এসে দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে পদার্পণ করা কয়েকটি যুদ্ধ জয়ের সমান। সেই জায়গা ছাড়তেও ন্যূনতম কার্পণ্য করেননি তিনি। তার জীবনের চিন্তা আর লক্ষ্যই ছিলো গণঅধিকার। মানুষের অধিকার আদায়, কৃষক , শ্রমজীবী মানুষকে নিজের অধিকার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করা। নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো কারাগারে পার করেছেন তিনি।

শিক্ষকতা জীবনে যেমন ছিলেন ছাত্রদের প্রতি কর্মনিষ্ঠ, উদার, আন্তরিক ও বন্ধু বাৎসল্য ঠিক তেমনি গ্রামে গ্রামে সাধারণ  মানুষের মাঝে ছিলেন ভীষণ কোমল। কেবল তাই নয়, সময়ে অসময়ে পাওয়া অনেক লোভনীয় প্রস্তাব তিনি পাত্তা দেননি। বরং নিজেকে শাণিত করেছেন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে উজ্জীবিত করাই ছিলো তার ধ্যান।

দর্শন চিন্তা থেকে, সমসাময়িক রাজনীতি, অর্থনীতি, দুর্নীতি কোনো কিছুই তার দৃষ্টি এড়ায়নি। নিজের বুদ্ধিভিত্তিক চর্চা আর জ্ঞানের ভাণ্ডার আজীবন বিলিয়ে গেছেন একটি দেশ ও একটি জাতির জন্য। বাক স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপোষহীন। বুদ্ধিজীবী প্রসঙ্গে তিনি  লিখেছিলেন, ‘বুদ্ধিজীবী বলতে আজ আর কোন একটি আদর্শের অনুসারী ব্যক্তিকে বুঝায় না। এই বুদ্ধিজীবীর মধ্যেই রয়েছে শ্রমজীবী অর্থাৎ ব্যাপকতর মানুষের সংগ্রামের প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য শত্রু এবং এই বুদ্ধিজীবীর মধ্যেই রয়েছে শ্রমজীবীর সুহৃদ, মিত্র। এই উভয় অংশের স্বার্থ এবং চিন্তাগত বিরোধই নানা আবরণে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীর চিন্তাজগতকে আকীর্ণ করে আছে।’

সরদার ফজলুল করিম যেন তার কথাই বলে গিয়েছিলেন। যিনি আজীবন ছিলেন এই বাংলার মাটি ও মানুষের সবচেয়ে কাছের মানুষ। তাই নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে রাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী হয়েও তার পা চড়েনি মাত্র এক ইঞ্চি ওপরেও।

একটা ঘটনার কথা বলে শেষ করি। সেবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে তাকে মধ্যাহ্নভোজনের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তিনি বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, ‘Your time is valuable and my time is also valuable. Let us not waste our time.’ আজকের সময় বসে কোনো বুদ্ধিজীবী কী কল্পনা করতে পারবেন?

আজ কিংবদন্তি দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, প্রবন্ধকার সরদার ফজলুল করিমের জন্মদিন। আমাদের কালের বাতিঘরের প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা।

সূত্র:

দিনলিপি/  সরদার ফজলুল করিম।

চল্লিশের দশকের ঢাকা/ সরদার ফজলুল করিম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ: অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের আলাপচারিতা/ সরদার ফজলুল করিম

আমি সরদার বলছি/ সরদার ফজলুল করিম।

আহমাদ ইশতিয়াক [email protected]

আরও পড়ুন:

Comments

The Daily Star  | English

288 Myanmar security personnel sent back from Bangladesh

Bangladesh this morning repatriated 288 members of Myanmar's security forces, who had crossed the border to flee the conflict between Myanmar's military junta and the Arakan Army

22m ago