রক্তাক্ত, মলিন মুক্তিযুদ্ধের ঈদ

করোনাক্রান্ত হয়ে গত বছর ও চলতি বছর সাধারণ মানুষের ঘরে এসেছে আনন্দহীন ঈদ। ঠিক ৫০ বছর আগেও এমন বিবর্ণ ছিল ঈদের সময়। ১৯৭১ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে মানুষের কীসের ঈদ! আগের বছর ১৯৭০ সালেও প্রলয়ঙ্করী এক ঘূর্ণিঝড়ে নিষ্প্রাণ হয় হাজারো মানুষ। হারিয়ে গিয়েছিল বাঙালির ঈদ। মানুষের দীর্ঘ অনাহার। হাহাকারে খেয়ে না খেয়ে থাকা লাখো উদ্বাস্তুর কাছে রমজান ছিল অজানা অধ্যায়। জানে না কেউ কীভাবে হবে উদ্ধার!
কলকাতার থিয়েটার রোডে মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী সচিবালয় প্রাঙ্গণে ঈদ জামাত | ইত্তেফাক/২০১৬

করোনাক্রান্ত হয়ে গত বছর ও চলতি বছর সাধারণ মানুষের ঘরে এসেছে আনন্দহীন ঈদ। ঠিক ৫০ বছর আগেও এমন বিবর্ণ ছিল ঈদের সময়। ১৯৭১ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে মানুষের কীসের ঈদ! আগের বছর ১৯৭০ সালেও প্রলয়ঙ্করী এক ঘূর্ণিঝড়ে নিষ্প্রাণ হয় হাজারো মানুষ। হারিয়ে গিয়েছিল বাঙালির ঈদ। মানুষের দীর্ঘ অনাহার। হাহাকারে খেয়ে না খেয়ে থাকা লাখো উদ্বাস্তুর কাছে রমজান ছিল অজানা অধ্যায়। জানে না কেউ কীভাবে হবে উদ্ধার!

১৯৭০ এর নভেম্বরের শুরুতে সারা দেশজুড়ে শুরু হয় কলেরার প্রকোপ। বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, টাঙ্গাইল, ঢাকা, নরসিংদী, সিলেট, ফরিদপুর, যশোরসহ দেশের একটা বড় অংশ বিপন্ন হয়ে পড়ে। এই মহামারী ঠেকানোর বদলে, সরকার উল্টো এর দায় চাপিয়ে দেয় মুক্তিকামী মানুষের ওপর। সরকারি প্রেসনোটে বলা হয়, ‘পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও দূস্কৃতিকারীদের কারণে চিকিৎসা কর্মীরা আক্রান্ত এলাকায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারছে না।’

আর মুক্তিযুদ্ধের সময় ইতিহাস বলে শহরে ন্যাড়া মাথায় লাল ফট্টি বাঁধা বিহারী ও তাদের বাঙালি সাথীরা ছাড়া কারো মধ্যে উৎসবের আমেজ ছিল না। শুধু তাই নয়,  ঈদ উপলক্ষ্যে রাজাকারদের বেতন-ভাতা বাড়ে। পাকিস্তান অবজারভারে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায় কোম্পানি কমান্ডারদের বেতন নির্ধারিত হয় রেশনসহ ২৫৫ রুপি, রেশনছাড়া ৩০০ রুপি। প্লাটুন কমান্ডারদের রেশনসহ ও ছাড়া যথাক্রমে ১৩৫ ও ১৮৫ রুপি। সাধারণ রাজাকারদের ক্ষেত্রে ৭৫ ও ১২০ রুপি।

অন্যদিকে ঈদ উপলক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বাণী ছিলো, ‘দেশের জনগণের দুর্দমনীয় সাহস ও সেনাবাহিনীর জেহাদী শক্তি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার কবচ।’ পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধরত সৈনিকদের জাতির পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার পাশাপাশি ভারতে উদ্বাস্তুদের দেশে ফেরার আহ্বান জানান। তাদের সব ধরনের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের আশ্বাস দেন। গভর্নর মালিক বলেন, ‘ঈদের শিক্ষার মাধ্যমেই আমরা জাতীয় সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম হবো। দেশরক্ষায় যুদ্ধরত যেসব সৈনিক তাদের পরিবার পরিজনদের সঙ্গে মিলিত হতে পারছেন না তাদের এই ত্যাগ জাতি চিরদিন স্মরণ করবে।’ পল্টন ময়দানে এদিন ঈদের জামাত পড়েন মালিক। সেখানে তিনি বলেন, ‘এদেশের এক শ্রেণীর নেতারা জনগণকে বিপথে পরিচালনা করছে। জনগণের অধিকার আদায়ের নামে তারা জয় বাংলা ধ্বনি তুলছে, যা পাকিস্তানের জাতীয় সংহতি ও অখন্ডতা বিপন্ন করে তুলছে।’

সে সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ভারতীয় বাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করা শুরু করে। এদের একজন ৩১ পাঞ্জাবের কমান্ডিং অফিসার মেজর মুমতাজ হোসেইন শাহ পাকিস্তান ডিফেন্স জার্নালে সিলেটের যুদ্ধ নিয়ে স্মৃতিকথা লিখেছেন। সেখানে অবশ্য ২১ নভেম্বরকে ঈদের দিন বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্যে “It was 21st November, the Eid-ul-Fitr was being celebrated throughout the Muslim world with religious fervour. We had barely finished our Eid prayers, when my forward positions reported Indians concentration, requesting for artillery fire. The artillery duel commenced and continued till afternoon. (পাকিস্তান ডিফেন্স জার্নাল, ভারতীয় ও মার্কিন নথিপত্র)

মুক্তিযোদ্ধা গবেষক অজয় দাশগুপ্ত স্মৃতি কথায় লেখেন, `ঈদ রণাঙ্গনে, এ এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। অনেকেই অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ে। বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ে, যাদের অনেকেই রয়েছেন হানাদার বাহিনী কবলিত মৃত্যু উপত্যকায়। কেমন আছে তারা? বেঁচে থাকলে স্বাধীন বাংলাদেশে ঈদ করবেন তারা। আমার প্রত্যক্ষ যুদ্ধে জয়ের অভিজ্ঞতা এটাই প্রথম। কয়েক হাত দূরেই পাকিস্তানি বাহিনী। যারা এ অভিযানে যেতে পারেনি, তাদের মন খারাপ। এ অবস্থাতেই এক দুপুরে আমাদের মাঠে বসিয়ে কলাপাতায় গরম ভাত পরিবেশন করা হয়। সঙ্গে এক টুকরা করে খাসির মাংস। কেন এ বিশেষ খাবার, সে প্রশ্ন করায় উত্তর আসে- আজ ঈদ। ইংরেজি তারিখ ধরলে যত দূর মনে পড়ে ২০ নভেম্বর। ঈদ যেতে না যেতেই আসে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশে সিদ্ধান্ত পাকিস্তানিদের সম্মুখ সমরে পরাজিত করার চূড়ান্ত সংকেত।`

খ.

কেমন ছিল আমাদের সে সময়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী মুসলিমদের ঈদ? ‌‌“রোজার মাস। আর কয়টা দিন পরেই ঈদ। বাঙালি মুসলমানের সেই দুঃখের দিনের ঈদ। তার ডাক্তার স্বামী বলল: আমি একটু শহর থেকে ঘুরে আসি। বাচ্চাদের কয়টি জামা-কাপড় কিনে নিয়ে আসি। যদি পারি তোমার জন্যও একটি শাড়ি কিনে আনব। বৌ বলে: না, তোমার যেয়ে কাজ নেই। আমাদের আবার কিসের ঈদ। জীবনে যে বেঁচে আছি এটাই আমাদের ঈদের উপহার।” (জসীমউদদীন/ ইত্তেফাক ১৯৭৫)

‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইতে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ২০ নভেম্বর ১৯৭১ তারিখে ডায়েরিতে বেদনামাখায় বর্ণনা দেন, “আজ ঈদ। ঈদের কোন আয়োজন নেই আমাদের বাসায়। কারো জামাকাপড় কেনা হয়নি। দরজা-জানালার পর্দা কাচা হয়নি। ঘরের ঝুল ঝাড়া হয়নি। বাসায় ঘরের টেবিলে রাখা হয়নি আতরদান। শরীফ, জামী ঈদের নামাজও পড়তে যায়নি। কিন্তু, আমি ভোরে উঠে ঈদের সেমাই, জর্দা রেঁধেছি। যদি রুমীর সহযোদ্ধা কেউ আজ আসে এ বাড়িতে? বাবা-মা-ভাই-বোন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কোন গেরিলা যদি রাতের অন্ধকারে আসে এ বাড়িতে? তাদেরকে খাওয়ানোর জন্য আমি রেঁধেছি পোলাও কোর্মা, কোপ্তা কাবাব। তারা কেউ এলে আমি চুপিচুপি নিজের হাতে বেড়ে খাওয়াবো। তাদের জামায় লাগিয়ে দেবার জন্য একশিশি আতরও আমি কিনে লুকিয়ে রেখেছি।”

প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের মুখপত্র সাপ্তাহিক ‘জয়বাংলা’র ২৮তম সংখ্যা।

অবরুদ্ধ ঢাকায় ঈদের সময় অবস্থান করছিলেন শিল্পী হাশেম খান। ‘২০ নভেম্বর ১৯৭১’ শিরোনামে একটি লেখায় সেদিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “আজ ঈদ। আনন্দের দিন, উৎসবের দিন। কিন্তু, কী আনন্দ করবো এবার আমরা? নতুন জামা কাপড় বা পোশাক কেনা-কাটার আগ্রহ নেই! শিশু-কিশোরদের কোনো আবদার নেই, চাওয়া-পাওয়া নেই। বাড়িতে বাড়িতে কি পোলাও কোরমা ফিরনী সেমাই রান্না হবে? আমার বাড়িতে তো এসবের কোনো আয়োজন হয়নি। প্রতিটি বাঙালির বাড়িতে এরকমই তো অবস্থা।”

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ‘আমার একাত্তর’ গ্রন্থে লেখেন: ‘‘ঈদের কদিন আগে তাজউদ্দীন আমাকে ডেকে পাঠালেন। স্বভাবতই বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা হলো। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিদেশ-সফরের গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি কিছুটা ধারণা দিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, বঙ্গবন্ধুর বিচারের ফল যাই হোক, বিশ্ব জনমতের কারণেই, পাকিস্তানিরা তাঁকে হত্যা করতে পারবে না। মুক্তিযুদ্ধ যে চূড়ান্ত লক্ষের দিকে অগ্রসর হচ্ছে সে-বিষয়ে তাঁর সন্দেহ ছিল না। কথাবার্তার শেষে উঠে গিয়ে ঘরের মধ্যে রাখা আয়রন শেলফ থেকে একটা খাম বের করে তিনি আমার হাতে দিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম: ‘কী এটা?’ তিনি বললেন ‘সামনে ঈদ, তাই।’ খামে পাঁচশ টাকা ছিল- তখন আমার এক মাসের মাইনের সমান। আমি নিতে চাইলাম না। তিনি বললেন: ‘ঈদে আপনার বাচ্চাদের তো আমি উপহার দিতে পারি, নাকি।’ কথাটা বলতে গিয়ে তিনি নিজেই ভাবাবেগপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন, আমিও খুব অভিভূত হয়ে কিছু আর বলতে পারিনি।’’

মুজিবনগর সরকারের ঈদ

ঈদের দিন রাতে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সীমান্ত সংলগ্ন বাংলাদেশে প্রবেশ করার অভিজ্ঞতাও হয়েছিল। সেসময়ে রণাঙ্গনের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর জনসংযোগ কর্মকর্তা নজরুল ইসলামের ‘একাত্তরের রণাঙ্গন: অকথিত কিছু কথা’ গ্রন্থে মুজিবনগর সরকারের ঈদ উদযাপনের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। সে গ্রন্থে রয়েছে- “মুজিবনগর সরকারের সদর দপ্তরের ছোট মাঠে এক অনাড়ম্বর পরিবেশে ঈদুল-ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীন বাংলা সরকারের পক্ষ থেকে মুজিবনগরে খুব ঘটা করে ঈদুল-ফিতর উদযাপনের ব্যাপক প্রচার করা হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় সম্পর্কে মুসলিম দেশগুলোর কাছে ফ্যাসিস্ট পাকিস্তানিদের অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি দূর করার জন্যে। ইতিহাসের জঘন্যতম ঘটনা। মুসলিম দেশগুলোর বিভ্রান্তি ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সৃষ্ট ভুল ধারণা মোচন করে তাদেরকে জানিয়ে দেয় যে বাংলাদেশের যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে নয়, কোনো মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে বিধর্মীদের যুদ্ধ নয়। এটা স্বাধীনতাকামী একটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে লড়াই। ধর্মের দুশমন, মানবতার দুশমন এই ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধেই মুক্তিযুদ্ধ। এটাকেই প্রকৃত অর্থে সত্যিকারের জেহাদ বলা যেতে পারে। এজন্যে আগে থেকেই স্বাধীন বাংলা সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের দখলকৃত মুক্ত এলাকায় ঘটা করে ঈদুল-ফিতর উদযাপনের ব্যাপক আয়োজনের খবর ফলাওভাবে প্রচার করা হয়েছিলো।... ঈদুল-ফিতরের জামাত পরিচালনা করেছিলেন মওলানা দেলোয়ার হোসেন। বাংলাদেশের ভোলা নিবাসী এই মওলানা আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমদের খুব ভক্ত ছিলেন। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে কুরআন পাঠ এবং তাফসির করতেন বলেও জানা যায়।”

অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী

ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম জাতির উদ্দেশ্যে বাণী দেন। এটি প্রচার করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। ‘জয়বাংলা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ২৬ নভেম্বরে। বাণীতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বলেন- “পবিত্র রমজান মাসেও হানাদার বাহিনীর বর্বরতায় বাংলাদেশের মুসলমান, হিন্দু নির্বিশেষে অসংখ্য নরনারী নিহত হচ্ছে। গত বছর আমরা বারোই নভেম্বর প্রলয়ঙ্করী ঝড়ে নিহত দশ লাখ মানুষের শোকে মুহ্যমান অবস্থায় ঈদ পালন করতে পারিনি। এবারও আমরা ইয়াহিয়ার সৈন্যদের বর্বরতায় নিহত দশ লাখ ভাইবোনের বিয়োগ বেদনা বুকে নিয়ে ঈদের জামাতে শামিল হয়েছি। কিন্তু দুঃখ-কষ্ট যাই হোক, ত্যাগের মন্ত্রে আমরা উদ্বুদ্ধ এবং যে কোনো ত্যাগের মূল্যে স্বাধীনতার ঘোষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে বদ্ধপরিকর। দেশকে শত্রুর কবল থেকে মুক্ত করার পর মাত্রই ঈদুল ফতেহ বা বিজয়ের ঈদ উৎসব পালন করবো এবং  সেদিন খুব দূরে নয়, এই প্রতিশ্রুতি আমি আপনাদের দিতে পারি।”

ঈদের আগের দিন ১৯ নভেম্বর ‘এই ঈদে আমাদের প্রার্থনা হোক’ শিরোনামে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বাণী প্রকাশ করে ‘জয়বাংলা’ পত্রিকা। প্রধানমন্ত্রী বলেন- “আমাদের দেশে এবার ঈদ এসেছে অত্যন্ত মর্মান্তিক পরিবেশে। দখলীকৃত এলাকায় শত্রুসৈন্যের তাণ্ডব চলছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে বিচ্যুত হয়ে শরণার্থী হয়েছেন, মুক্ত এলাকায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি চলছে শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য, রক্তের বিনিময়ে মানুষ মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম করছে। এবার ঈদে আনন্দ মুছে গেছে আমাদের জীবন থেকে, আছে শুধু স্বজন হারানোর শোক, দুর্জয় সংগ্রামের প্রতিজ্ঞা ও আত্মত্যাগের প্রবল সংকল্প। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং আমার নিজের পক্ষ থেকে ‘বাংলাদেশের জনসাধারণকে ঈদ উপলক্ষে আমি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। ঈদের যে আনন্দ আজ আমরা হারিয়েছি, তা আমাদের জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে সেদিনই, যেদিন আমরা দেশকে সম্পূর্ণরূপে শত্রুমুক্ত করব। আমি আপনাদের আশ্বাস দিচ্ছি যে, যথাসর্বস্ব পণ করে যে স্বাধীনতা সংগ্রামে আমরা লিপ্ত, তার চূড়ান্ত সাফল্যের দিনটি নিকটতর হয়ে এসেছে। সেই মুহূর্তটিকে এগিয়ে আনার সংগ্রামে আমরা সকলে যেন নিঃস্বার্থভাবে নিজেদের নিয়োগ করতে পারি, এই ঈদে তাই হোক আমাদের প্রার্থনা।”

গ.

মুক্তিযুদ্ধে ঈদ পালন করেননি মুক্তিযোদ্ধারা বরং দেশ স্বাধীন করে ‘বিজয়ের ঈদ-উৎসব’ পালনের প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। সমগ্র জাতিই তখন যুদ্ধে শামিল। এরকম ঈদ মনে হয় জাতির জীবনে আর কখনো আসেনি। “আতঙ্ক, দেশ স্বাধীন করার সংকল্প, শরণার্থী শিবিরে অনিশ্চিত জীবন– এসব কিছু ঘিরেছিলো প্রতিটি মানুষের মন। রণাঙ্গনে ঈদের দিনেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চলছিল। সারাদেশে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ এবং শহীদ হওয়ার ঘটনা ঘটছিল। ভুরুঙ্গামারীতে শহীদ হয়েছিলেন বীর উত্তম আশফাকুস সামাদ।” (একাত্তরের ঈদ/ আসিফুর রহমান সাগর)

তবে কলকাতায় ঈদের নামাজ হয়েছিল। প্রবাসী সরকারের উদ্যোগে ঈদের নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। কলকাতার থিয়েটার রোডে মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী সচিবালয় প্রাঙ্গণে ঈদ নামাজের আয়োজন করা হয়েছিলো। নামাজে অংশ নিয়েছিলেন মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী, স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী এম কামরুজ্জামান, প্রধান সেনাপতি মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী, বিমানবাহিনী প্রধান এ কে খন্দকার, অধ্যাপক ইউসুফ আলী প্রমুখ।

কমান্ডিং অফিসার মেজর মুমতাজ হোসেইন শাহ পাকিস্তান ডিফেন্স জার্নালে স্মৃতিকথা। ছবি: পাকিস্তান ডিফেন্স জার্নাল, ভারতীয় ও মার্কিন নথিপত্র

“ঈদের দিন আমরা বানপুর ক্যাম্পে ছিলাম। সকালে নামাজ পড়ে খাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছি। হঠাৎ জানানো হলো জীবন (চুয়াডাঙ্গা) নগর-দত্তনগর এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদেরকে এক্ষুনি রওনা দিতে হবে। তারপর সারাদিন জীবননগর-দর্শনা এলাকা থেকে পাকিস্তানিদের সাথে লড়াই করেছি। (গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধে চুয়াডাঙ্গা জেলা ১৯৯৭)

অধ্যাপক নুরুন নাহার বেগম বলেন, কলকাতার পার্ক সার্কাসে ময়দানে এক মাস ধরে মেলা চললো- প্রথমে দুর্গাপূজা, পরে এক মাস ঈদুল ফিতর উপলক্ষে। প্রতিদিন অসংখ্যা লোকের জমায়েত হতো। ছেলে মেয়ে শিশু বৃদ্ধ নির্বিশেষে। বিভিন্ন ধরনের দোকান ছাড়াও মাঠের মধ্যখানে শিশুদের জন্য মেরি গো রাউন্ড, নাগর দোলা ইত্যাদির ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু পয়সা নেই, ছেলেটাকে একটা কিছু কিনে দিতেও পারি না। খুব খারাপ লাগতো একটা সময়।

সাংবাদিক এমআর আখতার মুকুল স্মৃতিচারণে বলেন, “আমরা যখন থিয়েটার রোডে পৌঁছালাম তখন কেবলমাত্র নামাজ শেষ হয়েছে। তাই প্রায় সবার সঙ্গে কোলাকুলি করলাম। এরপর সবার অশ্রুভেজা কণ্ঠে কেবল রণাঙ্গন ও ঢাকার আলাপ। প্রতি মুহূর্তে উপলব্ধি করলাম, দৈহিকভাবে আমরা মুজিবনগরে থাকলেও আমাদের মন-প্রাণ সবই পড়ে রয়েছে দখলীকৃত বাংলাদেশে। আর সেখানকার সব মানুষ তাকিয়ে আছে আমাদের সাফল্যের দিকে। বাঙালি জাতির এ রকম একাত্মতাবোধ আর দেখিনি।”

সাহিত্যিক আবু জাফর সামসুদ্দীন লেখেন, “ঈদের দিন শনিবার। যুদ্ধকালে কোনো জামাত জায়েজ নয়। নামাজে যাইনি। কনিষ্ঠ পুত্র কায়েসকে সঙ্গে নিয়ে সকাল ৯টায় ছিদ্দিক বাজারের উদ্দেশ্যে বেরোলাম। রিকশায় চড়ে দেখি সড়ক জনমানবশূন্য। টেলিভিশন অফিসে যেতে রিকশা ফিরিয়ে দিলো। ট্রাকে ট্রাকে টহল ও পাহারায়ও মিলিটারি — যাওয়ার সময় দেখলাম বায়তুল মোকাররম মসজিদে মিলিটারি পাহারায় ঈদ জামাত হচ্ছে– আমার জীবনে এই প্রথম ঈদের জামাতে শরিক হইনি।”

তথ্যসহায়ক:

আমি বিজয় দেখিছি/ এমআর আখতার মুকুল

আমার একাত্তর/ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

একাত্তরের দিনগুলি/ জাহানারা ইমাম

ঘাতকের দিনলিপি/ রমেন বিশ্বাস

বাংলাদেশ ১৯৭১/ আফসান চৌধুরী

স্মৃতিতে ১৯৭১/ অধ্যাপক নুরুন নাহার বেগম

সাপ্তাহিক জয় বাংলা/ মুক্তিযুদ্ধকালীন পত্রিকা

একাত্তরের রণাঙ্গন অকথিত কিছু কথা/  নজরুল ইসলাম

গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধে চুয়াডাঙ্গা জেলা ১৯৯৭

পাকিস্তান ডিফেন্স জার্নাল, ভারতীয় ও মার্কিন নথিপত্র (মুক্তিযুদ্ধের এক টার্নিং পয়েন্ট)

Comments

The Daily Star  | English

An IGP’s eye-watering corruption takes the lid off patronage politics

Many of Benazir Ahmed's public statements since assuming high office aligned more with the ruling party's political stance than with the neutral stance expected of a civil servant.

5h ago