২৮ মে ১৯৭১: কলসকাঠি গণহত্যা, নিউইয়র্কে আবু সাঈদ চৌধুরীর বক্তব্য

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ২৮ মে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এদিন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি আবু সাঈদ চৌধুরী নিউইয়র্কে বিভিন্ন রাষ্ট্রের কূটনীতিকদের এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বলেন, ‘এখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এই নির্মম গণহত্যার পর অখণ্ড পাকিস্তানে ফিরিয়ে যাওয়া কেবল অসম্ভবই নয়, হাস্যকর প্রস্তাবও বটে।’
1971.jpg
ভারতের ২৪ পরগনা ও নদীয়া জেলার বিভিন্ন স্থানে সোসাইটি পরিচালিত ১২টি শরণার্থী শিবির ও লঙ্গরখানায় প্রায় আড়াই লাখ শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল। ছবি: সংগৃহীত

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ২৮ মে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এদিন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি আবু সাঈদ চৌধুরী নিউইয়র্কে বিভিন্ন রাষ্ট্রের কূটনীতিকদের এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বলেন, ‘এখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এই নির্মম গণহত্যার পর অখণ্ড পাকিস্তানে ফিরিয়ে যাওয়া কেবল অসম্ভবই নয়, হাস্যকর প্রস্তাবও বটে।’

তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আসতে কিছুটা সময় প্রয়োজন। হয়তো তা ছয় মাস, কিংবা তারও বেশি। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই। বাংলাদেশকে কেউ দমাতে পারবে না। যে আদর্শের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে, তা আমরা স্বাধীন বাংলাদেশে বিনির্মাণ করব। বাংলাদেশ একটি সুখী, সমৃদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।’

এ ছাড়া, জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক সাহায্য না দেওয়ার অনুরোধ জানান আবু সাঈদ চৌধুরী।

ইন্দিরা গান্ধীকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের চিঠি

এদিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ইন্দিরা গান্ধীর কাছে পাঠানো চিঠিতে লেখেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টকে রাজি করাবে যুক্তরাষ্ট্র।’

তিনি একইসঙ্গে লেখেন, ‘অখণ্ড পাকিস্তান বজায় রাখাই আমাদের দায়িত্ব। পাকিস্তান সরকার আশা করি সামরিক অভিযান বন্ধে ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেবে।’

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গের চিঠি ও বিবৃতি

একই দিনে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুহার্তো ইয়াহিয়া খানকে পাঠানো চিঠিতে বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের বিষয়ে পাকিস্তানের সব সিদ্ধান্ত সমর্থন ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পূর্ণ শ্রদ্ধা পোষণ করে ইন্দোনেশিয়া।’

১৯৭১ সালের ২৮ মে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি হেমডিক ফ্যানডং কুষ্টিয়া সফর থেকে ফিরে তার রিপোর্টে কুষ্টিয়াকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত জার্মান শহরগুলোর সঙ্গে তুলনা করেন।

তিনি তার রিপোর্টে বলেন, ‘কুষ্টিয়াসহ বাংলাদেশের জেলা শহরগুলো এখন ধ্বংসপ্রায়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী নির্বিচারে নিরীহ মানুষদের ঘর-বাড়ি লুটপাট ও ধ্বংস করেছে। ক্রমাগত বিমান হামলায় কুষ্টিয়া ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এই শহর এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত, বসবাসের অযোগ্য নগর।’

এ ছাড়া, শরণার্থী শিবির পরিদর্শন শেষে ব্রিটিশ এমপি মাইকেল বার্নস পাকিস্তানকে সব ধরনের সামরিক সহযোগিতা বন্ধে বিশ্বের দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে যদি পাকিস্তান অবিলম্বে সেনা প্রত্যাহার না করে, তবে পাকিস্তানে চলমান সব ধরনের বৈশ্বিক সহায়তা বন্ধের আহ্বান জানাই। পাকিস্তানে যে নির্মম ও পৈশাচিক গণহত্যা চলছে, তা এখন কেবল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ই নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক বিষয়। পূর্ব বাংলার লাখ লাখ শরণার্থীর গন্তব্য এখন ভারত। এই শরণার্থী ও উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধান এখন কেবল আন্তর্জাতিকভাবেই সম্ভব। পূর্ব বাংলার মানুষের প্রতি ব্রিটেনের সহমর্মিতা ও পূর্ণ সমর্থন চলমান থাকবে।’

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভারতের ভূমিকা

ভারতের মাড়োয়ারি রিলিফ সোসাইটি এদিন শরণার্থীদের জন্য সীমান্তে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট একটি হাসপাতাল চালুর সিদ্ধান্ত নেয়।

কলকাতা পৌর করপোরেশন এদিন মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে সার্কাস অ্যাভিনিউয়ের নাম বদলে ‘বাংলাদেশ শহীদ স্মরণি’ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। একইসঙ্গে কলকাতা মেয়রের তহবিল থেকে বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্য এক লাখ টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হয়।

২৮ মে এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভারতের ২৪ পরগনা ও নদীয়া জেলার বিভিন্ন স্থানে সোসাইটি পরিচালিত ১২টি শরণার্থী শিবির ও লঙ্গরখানায় প্রায় আড়াই লাখ শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল।

কলসকাঠি গণহত্যা

১৯৭১ সালের এই দিনে বরিশালের কলসকাঠিতে নির্মম গণহত্যা চালিয়ে ৮৭ জন সাধারণ মানুষকে হত্যা করে হানাদার বাহিনী।

ক্যাপ্টেন হানিফের নেতৃত্বে ২৮ মে সকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ১০০ জন সদস্য দুটি লঞ্চে করে গিয়ে চতুর্দিক থেকে কলসকাঠি গ্রাম ঘিরে ফেলে এবং বিভিন্ন বাড়ি থেকে কয়েক শত হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষকে কলসকাঠি বন্দরে একত্র করে। এরপর তাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। গণহত্যার পর তাদের অধিকাংশের লাশ পানিতে ভাসিয়ে দেয়। কলসকাঠির খয়রাবাদ-ভুলাতলা নদীর পানি রক্তে রঞ্জিত হয় সেদিন। গণহত্যা শেষে পাকিস্তানী হানাদারেরা হিন্দুদের বাড়িঘর গান পাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়।

দেশজুড়ে গণহত্যা, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ ও পাকিস্তানের পক্ষে বিবৃতি

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এদিন দেশজুড়ে গণহত্যা চালায়। দেশের বহু জায়গায় হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর সম্মুখযুদ্ধ হয়।

একই দিনে শর্ষিনার পীর মওলানা শাহ আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ মুক্তিবাহিনীকে নির্মূল করে পাকিস্তানকে রক্ষায় এগিয়ে আসার জন্য সেনাবাহিনীকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। তিনি মুক্তিবাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, সমর্থকদের নির্মূল করতে সেনাবাহিনীকে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।

সেদিন ঢাকায় কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির আহ্বায়ক খাজা খয়রুদ্দিন এক সভায় বলেন, ‘পাকিস্তানকে ধ্বংস করার কাজে লিপ্ত ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও দলকে নির্মূলে নিয়োজিত সশস্ত্র বাহিনীকে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করা আমাদের ওপর ফরজ কাজ। ভারতের চর, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী মুক্তিবাহিনীকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।’

এ ছাড়া, ৭১ সালের ২৮ মে সকালে একদল মুক্তিযোদ্ধা কুমিল্লার দক্ষিণে রাজারমার দীঘিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণ করে একটি বাঙ্কার উড়িয়ে দেয়। অভিযান শেষে বেশ কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের দখলে নেয়।

এদিন মুক্তিবাহিনীর একটি দল কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়কে মনোহরপুর এলাকায় অ্যামবুশ করলে কয়েকজন পাকিস্তানি সৈন্য হতাহত হয়। এরপর পাকিস্তানী হানাদারেরা পিছু হটলেও কিছুক্ষণ পর তারা আবারও সংগঠিত হয়ে ফিরে আসে। এর মধ্যেই মুক্তিযোদ্ধারা চলে গেলে, হানাদারেরা মনোহরপুর ও পাশের মাগুরা গ্রামে আগুন দেয়।

১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানী হানাদারদের একটি দল কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারিতে মুক্তিবাহিনীর ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে ভুরুঙ্গামারির দখল নেয়। এরপর মুক্তিযোদ্ধারা গোলকগঞ্জের সোনাহাট সীমান্ত এলাকার মুক্তাঞ্চলে সোনাহাট ও কোচবিহারের সাহেবগঞ্জ সীমান্তে আশ্রয় নেয়।

সূত্র:

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র সপ্তম, অষ্টম, নবম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড।

দৈনিক পাকিস্তান, ২৯ মে ১৯৭১

দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা, ২৯ মে ১৯৭১

দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৯ মে ১৯৭১

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর দুই, পাঁচ ও সাত।

আহমাদ ইশতিয়াক

[email protected]

Comments

The Daily Star  | English

Lucky’s sources of income, wealth don’t add up

Laila Kaniz Lucky is the upazila parishad chairman from Raypura upazila of Narshingdi and a retired teacher of a government college.

46m ago