সিএএ নিয়ে আবার সরব বিজেপি

ভারতে নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসেই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বাস্তবায়নে আদা-জল খেয়ে নেমে পড়েছিলেন। ক্ষমতাসীন বিজেপির মূল মস্তিষ্ক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের লক্ষ্য ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করা। সেই লক্ষ্যেই বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে এনআরসি চাইছে।
আসামের নগাঁও জেলায় নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) প্রতিবাদে সমাবেশ। ছবি: রয়টার্স ফাইল ফটো

ভারতে নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসেই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বাস্তবায়নে আদা-জল খেয়ে নেমে পড়েছিলেন। ক্ষমতাসীন বিজেপির মূল মস্তিষ্ক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের লক্ষ্য ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করা। সেই লক্ষ্যেই বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে এনআরসি চাইছে।

অটলবিহারী বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের মধ্য দিয়ে ভারতের মুসলমানদের নাগরিকত্ব হরণের পদ্ধতি শুরু করেছিল বিজেপি। নরেন্দ্র মোদি সেই পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ করতে উঠে-পড়ে লেগেছেন।

পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা ভোট শেষ হতে না হতেই মোদি সরকার ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) বলবতের প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশের কাছ থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরের চুক্তির প্রধান শর্ত ছিল সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা। সেই চুক্তিকে অস্বীকার করে সিএএ কার্যকরে কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অমুসলিমদের নাগরিকত্বের জন্যে আবেদনের আহ্বান জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে।

গুজরাট, ছত্তিশগড়, রাজস্থান, পাঞ্জাব ও হরিয়ানার ১৩টি জেলায় পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, জৈন, পার্শি, খ্রিস্টানদের নাগরিকত্বের জন্যে আবেদনের আহ্বান জানিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে।

গুজরাটের রাজকোট, মোরবি, পাটান, ভাদোদরা; ছত্তিশগড়ের দুর্গ, বালোদবাজার; পাঞ্জাবের জলন্ধর; হরিয়ানার ফরিদাবাদ; রাজস্থানের পালি, বার্মার, সিরোহি, জালোর ও উদয়পুরে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, খ্রিস্টান ও পার্শিরা নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারবেন বলে কেন্দ্রীয় সরকারের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, যে পাঁচটি রাজ্যে এই সিএএ’র বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে মোদি প্রশাসন, সেই রাজ্যগুলোর মধ্যে তিনটিতেই ক্ষমতায় আছে কংগ্রেস। রাজস্থান বিধানসভায় ইতোমধ্যেই সিএএ কার্যকর না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সিএএ আইনের সব বাধা উপেক্ষা করে গত বছর বিজেপি সরকার নতুন উদ্যোগ নিলেও করোনা মহামারির কারণে তা নিয়ে তারা সাময়িক চুপচাপ ছিল। এরই মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামসহ ভারতের পাঁচটি রাজ্যে ভোট হয়।

ভোটের আগেই আসামে সেখানকার বিজেপি সরকার একদিকে মুসলমানদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা অপরদিকে ক্যাম্পে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবাইকে নিতে শুরু করে তা নিয়ে ভারতজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়।

শাহিনবাগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় না থেকে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নাগরিক সমাজ ভারতীয়দের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করার যে ষড়যন্ত্র বিজেপি সরকার করছে, তার প্রতিবাদ করে। সেই আন্দোলনকে ভেস্তে দিতে পুলিশ নির্যাতন করে দিল্লি ও এর আশ-পাশের সংখ্যালঘু মুসলমান নাগরিকদের উপর।

রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ার বাইরে সিএএ-বিরোধী আন্দোলন ভারতে বিজেপি’র সাম্প্রদায়িক নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটা নয়া দিগন্ত প্রসারিত করতে শুরু করেছিল।

কোভিডজনিত পরিস্থিতিতে সেই আন্দোলন চাপা পড়ে যায়।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদ্য সমাপ্ত ভোটে এই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের আবেগকে কাজে লাগাতে বিজেপি চেষ্টার ত্রুটি করেনি। বিরোধী নেত্রী থাকাকালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এনআরসির দাবিতে সোচ্চার ছিলেন। সেই সময়ের বামফ্রন্ট সরকার ভোটার তালিকার কারচুপি করছে, তাই এনআরসি’র প্রয়োজন— এটা ছিল তখন বিরোধী নেত্রী মমতার দাবি। সেই দাবিতে তিনি ভারতের চতুর্দশ লোকসভার অধিবেশনে তৎকালীন অধ্যক্ষ আটোয়ালজীর দিকে কাগজের তোড়াও ছুঁড়েছিলেন।

মোদি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর এনআরসি ও সিএএ ঘিরে নিজের প্রতিবাদী অবস্থানটিকে মমতা বজায় রেখেছেন। বিধানসভা ভোটের ফলাফলের নিরিখে এটা বলতে হয় যে, সিএএ নিয়ে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের একটা অংশের মানুষকে যাই বোঝানোর চেষ্টা করে থাকুক না কেন, হিন্দুত্ববাদীদের স্তোকবাক্যে মানুষ একেবারেই ভোলেনি।

বিজেপি যে এই আইনের ভেতর দিয়ে হিন্দুদেরও আদৌ কোনো ভালো করবে না, সেটা আসামের অভিজ্ঞতার নিরিখে মানুষ বুঝেছে। এক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের প্রশংসনীয় ভূমিকার কথাও বিশেষভাবে বলতে হয়।

করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই হিন্দি বলয়ের পাঁচটি রাজ্যে সিএএ বাস্তবায়ন কার্যক্রম চালু করে ভারত সরকার এটাই বোঝাতে চাইছে যে, পশ্চিমবঙ্গে তাদের দল বিজেপি পরাজিত হলেও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের পথ থেকে তারা সরবে না। সেই উদ্দেশ্যে ত্রিপুরার আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই সিএএ ইস্যুর ওপর ভিত্তি করে হিন্দু- মুসলমানের বিদ্বেষকে নির্ভর করেই যে বিজেপি ভোটে যাবে, সেটা তাদের কার্যক্রম থেকে পরিষ্কার।

এর পাশাপাশি বলতে হয়, কেবলমাত্র ২০২৪ সালে ভারতের লোকসভা ভোটকেই টার্গেট করে এই বিভাজনের রাজনীতিকে বিজেপি ও আরএসএস তীব্র করে তুলছে, তা ভাববার কোনো কারণ নেই।

২০১৪ সালে ভারতের লোকসভা ভোটের আগে উত্তরপ্রদেশের মুজফফরনগরে এ ভাবেই দাঙ্গা লাগিয়ে তার ফসল তুলেছিল ভোটের বাক্সে। ২০২৪ সালে ভারতের লোকসভা ভোটকে টার্গেট করে সেই পথেই আরএসএস-বিজেপি হাঁটার পরিকল্পনা করছে— এখন থেকেই সেই অনুমান করা যেতে পারে।

Comments

The Daily Star  | English

Another victim dies, death toll now 45

The death toll from last night's deadly fire in a building on Bailey Road in the capital rose to 45 as another injured died at the Dhaka Medical College Hospital this morning

34m ago