সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বেড়েছে, সেবার মান বাড়েনি ‘কমেনি দুর্নীতি’

প্রায় প্রতি বছরই বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও ভাতার জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। আগামী ৩ জুন সংসদে যে প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা হতে চলেছে সেটিও এর ব্যতিক্রম নয়।

প্রায় প্রতি বছরই বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও ভাতার জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। আগামী ৩ জুন সংসদে যে প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা হতে চলেছে সেটিও এর ব্যতিক্রম নয়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে ২০২১-২২ অর্থবছরে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৭১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে যা গত বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।

প্রস্তাবিত বাজেটের ১১ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যয় এ খাতে ধরা হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাজেটে এই খাতে ব্যয় ছিল ১১ দশমিক ৬ শতাংশ।

প্রতি বছর বাজেটে এই বিপুল পরিমাণ বরাদ্দ নিয়ে সবার মনে একটি প্রশ্নই জাগে: সরকারি সেবার মানও কি বরাদ্দের সঙ্গে বাড়েছে?

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দিন আহমেদ এ প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘উত্তরটি নিশ্চিতভাবেই না বোধক।’

২০১৫-১৬ অর্থবছরে চালু করা নতুন বেতন স্কেল অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল, এবং পরবর্তী বছর তাদের জন্য বরাদ্দ করা অন্যান্য ভাতাও বাড়ানো হয়। এছাড়া তারা ফ্ল্যাট ও গাড়ি কেনার জন্য অল্প সুদে ঋণ নেওয়ার সুবিধা ভোগ করেন।

নতুন বেতন স্কেল দুই অর্থবছর সময় নিয়ে কার্যকর করা হয়েছিল এবং এর জন্য সরকারকে তখন আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করতে হয়েছিল।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে সরকারি কর্মচারীদের বেতনের জন্য বাজেটে ২৮ হাজার ৮২০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে নতুন বেতন স্কেল চালু হওয়ার পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯ হাজার ৪৩ কোটি টাকায়।

অর্থ মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, প্রধানমন্ত্রীর অফিস ও বাংলাদেশ পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং সেন্টারে বিভিন্ন মেয়াদে প্রায় ৩৭ বছর চাকরি করা নাসিরউদ্দিন আহমেদ বলেন, বেতন বাড়ার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা করা যায় যে সেবার মান বাড়বে এবং দুর্নীতি কমে আসবে।

‘দুর্নীতি মূলত দুটি কারণে হয়ে থাকে, চাহিদা ও লোভ। লোভের সমাধান করা যায় না, কিন্তু চাহিদা মেটানো যায়—এবং সরকার অষ্টম বেতন কাঠামো চালুর মাধ্যমে এ সমস্যাটির সমাধান করার চেষ্টা করেছিল’, বলেন তিনি।

কিন্তু তারপরেও দুর্নীতি যে পর্যায়ে ছিল, সেখানেই থেকে গিয়েছে, বলেন নাসিরউদ্দিন, যিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন সাবেক কমিশনার।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) এর দুর্নীতির ধারণাসূচক ২০২০ এ বাংলাদেশের অবস্থান দুই ধাপ পিছিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দুর্নীতিতে বাংলাদেশ শুধুমাত্র আফগানিস্তানের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে। বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশ নিচের দিক থেকে ১২তম স্থান দখল করেছে। সূচকে উচ্চক্রম (ভালো থেকে খারাপের দিকে) অনুযায়ী, টানা তিন বছর ধরে বাংলাদেশের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। এবারও ১৪৬তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুরের মতে সরকার তার প্রশাসনের হাতের মুঠোয় বন্দী হয়ে আছে।

‘তারা জনগণের টাকায় জমিদারের মত জীবন যাপন করছেন। আমরা আমাদের প্রাপ্য সেবাগুলো পাচ্ছি না। কোন খাতে সেবার মান উন্নত হয়েছে আর ঘুষ লেনদেনের প্রবণতা কমেছে? তাহলে বেতন বাড়ানোর উদ্দেশ্য কী ছিল? জবাবদিহি ও কর্মদক্ষতার ক্ষেত্রে কোনো উন্নতি হয়নি—পুরোটাই চোখে ধুলো দেওয়ার মতো ব্যাপার’, বলেন তিনি।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক অর্থনীতিবিদ মনসুর বলেন, সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপারটি হচ্ছে সরকারি কর্মচারীদের স্বদিচ্ছার অভাবে উন্নয়ন বাজেটের একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়।

প্রতিটি অর্থবছরের শেষের দিকে এসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য বরাদ্দ সংশোধন করে কমিয়ে দেওয়া হয় যাতে বাস্তবায়নের হারকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা যায়।

বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১৯-২০ সালে সংশোধিত এডিপির বাস্তবায়নের হার ছিল ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ। নতুন বেতন স্কেলের চালুর পর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাস্তবায়নের হার ছিল ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ।

এখন কাজ চলছে এরকম বেশ কিছু প্রকল্পের সময়সীমা আগামী বছর শেষ হয়ে যাবে কিন্তু এগুলোর কোনটিই বাস্তবায়নের কাছাকাছি পর্যায়েও পৌঁছুতে পারেনি।

প্রায়ই দেখা যায় যে প্রকল্পের নকশায় সমস্যা তা বেশ কয়েকবার পরিবর্তন করতে হয়। ফলশ্রুতিতে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা দেখা দেয় এবং প্রকল্পের খরচ বাজেটকে ছাড়িয়ে যায়।

কাজের গুণগত মান নিয়েও আছে প্রশ্ন

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সাবেক সচিব আহমেদ বলেন, এডিপি বাজেটের দায়ভার অর্থ মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হলে এবং তারা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে সহায়তা পেলে সার্বিক পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব।

তিনি প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে আরও উপযোগী পরিবীক্ষণের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘প্রকল্প পরিচালকরা প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়ভার নেন না। তারা শুধুমাত্র দামি গাড়ি ও বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে উৎসাহী।’

তবে যেসব খাতে অটোমেশন ঘটেছে, সেখানে সেবার মানের উন্নয়ন হয়েছে।

‘তবে আমি যখন এনবিআরে কর্মরত ছিলাম, তখন অটোমেশন চালুর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে দেখেছি’, বলেন তিনি।

উদাহরণস্বরূপ, মূল্য সংযোজিত কর (ভ্যাট) পদ্ধতির অটোমেশন কার্যক্রম ২০১৩ সালে শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পটির সময়সীমা বেশ কয়েকবার বাড়ানোর পর অবশেষে এটি আগামী মাসে বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে।

আহমেদ আরও বলেন, ‘কর কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের মাঝে একটি যোগসাজশ রয়েছে যারা অটোমেশনের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছেন। ব্যবসায়ীর আজকাল রাজনীতিবিদদের মতো আচরণ করেন। এক্ষেত্রে একটি বড় আকারের প্রিন্সিপাল-এজেন্ট সমস্যা রয়েছে।’

অর্থনীতির সংজ্ঞা অনুযায়ী প্রিন্সিপাল-এজেন্ট সমস্যাটি হচ্ছে একটি দ্বন্দ্ব, যেখানে একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ এবং তাদের নির্বাচন করা প্রতিনিধির ব্যক্তিগত স্বার্থের মধ্যে সংঘাত দেখা দেয়। এক্ষেত্রে প্রতিনিধিটি এমন আচরণ করতে পারেন যা তার ‘প্রিন্সিপাল’, অর্থাৎ তিনি যাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তাদের স্বার্থের পরিপন্থী হয়।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান

Comments

The Daily Star  | English
Bangladesh lacking in remittance earning compared to four South Asian countries

Remittance hits eight-month high

In February, migrants sent home $2.16 billion, up 39% year-on-year

2h ago