ঐতিহাসিক ছয় দফা ও আবুল মনসুর আহমদের সমর্থন

ঔপনিবেশিক শাসনের পর পাকিস্তান নানান ভাবে অত্যাচার নিপীড়ন করেছিল পূর্ব বাংলাকে। স্বপ্ন হারিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির পথ খুঁজছিল সর্বস্তরের জনগণ। বিষয়টি অনুধাবন ও চিহ্নিত করে দুঃশাসন থেকে মুক্তির দিশারী হিসেবে আসে দীর্ঘ প্রস্তুতির ছয় দফা। তবে এ ছয় দফা কোনো রাতারাতি কর্মসূচি ছিল না। লাহোর প্রস্তাবের পর দেশ ভাগ হয়। তারপর ভাষার দাবি ও ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, চুয়ান্ন সালের যুক্তফ্রন্টের বিজয়, ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন- তিলে তিলে ছয় দফার ভিত তৈরি করেছে।
পাকিস্তান ট্রেড ডেলিগেশনের নেতা আবুল মনসুর আহমদ (সস্ত্রীক) পূর্ব বাংলার বাণিজ্যমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করছেন (১৯৫৭)। ছবি সূত্র: কালের ধ্বনি আবুল মনসুর আহমদ বিশেষ সংখ্যা ২০১৫

ঔপনিবেশিক শাসনের পর পাকিস্তান নানান ভাবে অত্যাচার নিপীড়ন করেছিল পূর্ব বাংলাকে। স্বপ্ন হারিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির পথ খুঁজছিল সর্বস্তরের জনগণ। বিষয়টি অনুধাবন ও চিহ্নিত করে দুঃশাসন থেকে মুক্তির দিশারী হিসেবে আসে দীর্ঘ প্রস্তুতির ছয় দফা। তবে এ ছয় দফা কোনো রাতারাতি কর্মসূচি ছিল না। লাহোর প্রস্তাবের পর দেশ ভাগ হয়। তারপর ভাষার দাবি ও ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, চুয়ান্ন সালের যুক্তফ্রন্টের বিজয়, ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন- তিলে তিলে ছয় দফার ভিত তৈরি করেছে।

ছয় দফা কর্মসূচি জনগণের মাঝে পৌঁছে দিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমগ্র পূর্ববাংলা সফর করেন এবং বাঙালির বাঁচার দাবি হিসেবে অভিহিত করেন ছয় দফাকে। প্রসঙ্গত, দফা ঘোষণার পর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি পূর্ব পাকিস্তান প্রধান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ শেখ মুজিবুর রহমানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি এই যে ৬ দফা দিলেন তার মূল কথাটি কী?’ আঞ্চলিক ভাষায় এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন শেখ মুজিব: ‘আরে মিয়া বুঝলা না, দফা তো একটাই। একটু ঘুরাইয়া কইলাম।’

আজ ৭ জুন ঐতিহাসিক ৬ দফা দিবস। ১৯৬৬ সালের এ দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ৬ দফা দাবির পক্ষে দেশব্যাপী তীব্র গণআন্দোলনের সূচনা হয়। ছবি: সংগ্রহীত

কিন্ত কথাটা খুব সহজ শোনা গেলেও তা সহজ না। তার রয়েছে ঐতিহাসিক ভিত্তি। আবুল মনসুর আহমদ বলছেন ছয় দফা মুজিবের অন্যতম দূরদর্শিতা। ইতিহাস পাঠক মাত্র জানেন, সাহিত্যিক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক আবুল মনসুর আহমদ— ত্রিধারার অভিজ্ঞতায় বাংলার একজন অভিভাবক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শ্রদ্ধাস্পদ নেতা ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু সগৌরবে আবুল মনসুর আহমদকে ‘লিডার’ বলতেন এবং কলেজ জীবন থেকে নিজেকে তার শিষ্য বলে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। সে লিডার ঐতিহাসিক ছয়দফাকে নিয়ে ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছরের’ মধ্যে মুজিবের দূরদর্শিতা’ শিরোনামে অসাধারণ এক পরিচ্ছেদ যুক্ত করেন। এর কিছু অংশ পাঠকের জন্য (তার নিজস্ব বানান রীতিতে) তুলে ধরছি।

‘নেতাদের এই ওয়াদা খেলাফের ঐতিহ্যের প্রেক্ষিতে যখন ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নূতন নেতা শেখ মুজিব নির্বাচনী ওয়াদায় দৃঢ়তা দেখাইলেন, তখন ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁর কাজে প্রীত ও গর্বিত হইলাম। শেখ মুজিব দুই দিক হইতে এই দৃঢ়তা দেখাইলেন। প্রথমতঃ নির্বাচনের আগে তিনি ছয় দফাকে সাধারণ ওয়াদা না বলিয়া রেফারেন্ডাম বলিলেন। তাঁর কথার তাৎপর্য ছিল এই যে, হয় তাঁর পক্ষে ‘হ্যাঁ’ বলিবেন, নয় ‘না’ বলিবেন। তার মানে, ভোটাররা হয় তাঁর পক্ষে সব ভোট দিবেন, নয়ত এক ভোটও দিবেন না। পূর্ব-পাকিস্তানের ভোটাররা সব হাঁ বলিলেন। শেখ মুজিব প্রায় সব আসন পাইলেন। শুধু নির্বাচনে নয়, তিনি রেফারেণ্ডামেও জিতিলেন। শাসনতন্ত্র রচনার ব্যাপারে তিনি পূর্ব-পাকিস্তানের একক মুখপাত্র হইলেন।

নির্বাচনের পরে শেখ মুজিব যা করিলেন সেটা আরও প্রশংসার যোগ্য। নির্বাচনের ইতিহাসে একটা অনুকরণযোগ্য ঐতিহাসিক ঘটনা। নির্বাচনের পরে ৩রা জানুয়ারি, ১৯৭১, তিনি সুহরাওয়ার্দী ময়দানে বিশ লাখ লোকের বিরাট জনসমাবেশে মেম্বরদেরে দিয়া হলফ করাইলেন, নিজে হলফ করিলেন- ‘ছয় দফা ওয়াদা খেলাফ করিব না।’

এই হলফনামা ছিল একটি মূল্যবান দলিল। হলফ গ্রহণ ছিল একটি সুদূরপ্রসারী তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। সেজন্য এ সম্বন্ধে একটু বিস্তারিত আলোচনা করিতেছি। ঘটনাটি নানা কারণে স্মরণীয়।

১৯৭১ সালের ৩রা জানুয়ারি বেলা ২টার সময় ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে (পরে সুহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসমক্ষে আওয়ামী মেম্বররা হলফ উঠাইবেন, এটা আগেই ঘোষণা করা হইয়ছিল। ফলে সে সভায় বিপুল জনসমাগম হইয়ছিল। আওয়ামী লীগ টিকিটে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় মেম্বর-সংখ্যা তখন ১৫১ এবং প্রাদেশিক মেম্বর সংখ্যা ২৬৭। কারণ ঘূর্ণীঝড়-বিধস্ত উপকূল অঞ্চলের নির্বাচন তখনও হইতে পারে নাই। ফলে মোট ৪১৮ জন আওয়ামী সদস্যের সকলেই এই শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়াছিলেন।

হলফনামা একটি ছাপা দলিল। আল্লাহর নামে এই হলফনামার শুরুর হইয়াছিল। আরবী ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’-এর হুবহু বাংলা তর্জমা করিয়া লেখা হইয়াছিল- পরম করুণাময় আল্লাহর নামে হলফ করিয়া আমি অংগীকার করিতেছি যে আমাদের নির্বাচনী ওয়াদা ছয় দফা অনুসারে শাসনতান্ত্রিক সংবিধান রচনা করিব; এ কাজে পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের সহযোগিতা কামনা করিতেছি ইত্যাদি। হলফনামায় ব্যাংক, ইনশিওরেন্স ও পাট ব্যবসায় জাতীয়করণের অংগীকারসহ আরও কিছু প্রতিজ্ঞা করিয়া দুইটি জয়ধ্বনিতে হলফনামার উপসংহার করা হইয়াছি। এই দুইটি মুদ্রিত জয়ধ্বনি ছিল- ‘জয় বাংলা’, ‘জয় পাকিস্তান’।

মুদ্রিত হলফনামার এক এক, কপি সমবেত ও কাতারবন্দী মেম্বরদের প্রত্যেকের হাতে ছিল। পার্টি নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বুলন্দ আওয়াযে হলফের এক একটি বাক্যাংশ পড়িয়া গিয়াছেন, আর সমবেত কাতারবন্দী মেম্বররা সমস্বরে নেতার কথা আবৃত্তি করিয়াছেন। এতে গোটা অনুষ্ঠানের পরিবেশটা একটা ধর্মীয় গাম্ভীর্যে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল। সমবেত প্রায় বিশ লাখের বিশাল জনতা পরম শ্রদ্ধায় অবনত মস্তকে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এই হলফের প্রত্যেকটি কথা নীরবে শুনিয়অছে। একটি ‘টু’ শব্দও হয় নাই। অনুষ্ঠান শেষে জনতা বিপুল হর্ষধ্বনি করিয়া তাদের সমর্থন ও উল্লাস জানাইয়াছে।

ধর্মীয় গাম্ভীর্য্যরে হলফকে আরও রাজনৈতিক গুরুত্ব দিবার জন্য সমবেত জনতার কাছে শেখ মুজিব আরও বলিলেন- ‘ছয় দফা নির্বাচনী ওয়াদা আপনাদের নিকট আমাদের দেওয়া আমাদের পবিত্র ওয়াদা। এ ওয়াদা যদি আমরা খেলাফ করি, তবে আপনারা আমাদেরে ক্ষমা করিবেন না’। আরও বেশি জোর দিবার জন্য শেখ মুজিব বলিলেন- ‘আমি নিজেও যদি এই ওয়াদা খেলাফ করি, তবে আপনারা নিজ হাতে আমাকে জীবন্ত মাটিতে পুঁতিয়া ফেলিবেন।’ নিজেদের নির্বাচনী ওয়াদার নির্ভুলতা ও কার্যকারিতা সম্বন্ধে দৃঢ় প্রত্যয় না থাকিলে এমন নিরংকুশ সুস্পষ্ট চরম অনঢ় ওয়াদা কেউ করিতে পারেন না। ফলতঃ এই ঘটনার পরে শেখ মুজিবের পক্ষে কোন কারণে, কোন যুক্তিতেই ছয়-দফা-বিরোধী কাজ করা সম্ভব ছিল না।

বস্তুতঃ আমার জ্ঞান-বিশ্বাস মতে শেখ মুজিব ইচ্ছা করিয়াই এটা করিয়াছিলেন। তিনি ভাবিয়া-চিন্তিয়াই এভাবে নির্বাচনী ওয়াদা খেলাফের সব রাস্তা ও ছিদ্র বন্ধ করিয়াছিলেন। পাঠকগণ, তখনকার অবস্থাটা একবার বিবেচনা করুন। একেই ত ৪১৮ জন মেম্বরের এত বড় পার্টি। তাতে আবার সুস্পষ্ট কারণেই এঁদের মধ্যে সবাই পরীক্ষিত, অনুগত, পুরাতন ও নির্ভরযোগ্য নন। বোধগম্য কারণেই অনেক অজানা-অচেনা প্রার্থীকে নমিনেশন দিতে হইয়াছে। এঁদের মধ্যে কেউ সুযোগ-সুবিধা পাইলে দলত্যাগ করিবেন না, এমনটা আশা করা বুদ্ধিমানের কাজ হইত না। আরও একটা কারণ ছিল। আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ পশ্চিমারা শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতার অধিকারীই ছিলেন না, বিপুল ধন-বিত্ত-প্রতিপত্তিরও অধিকারী ছিলেন। পার্লামেন্টারি রাজনীতিতে তাঁদের করণীয় কাজও খুব বেশি ছিল না। রাষ্ট্র-ক্ষমতা, অর্থ-বিত্ত ও প্রতিপত্তির সাহায্যে আওয়ামী লীগের অন্ততঃ গণপরিষদে নির্বাচিত নবাগতদের মধ্যে এক দলকে হাত করিয়া আওয়ামী লীগের, মানে পূর্ব পাকিস্তানের, মেজরিটিকে নিষ্ক্রিয় করা মোটেই কল্পনাতীত ছিল না। তাই শেখ মুজিব বিশ লাখ লোকের জনসমাবেশে মেম্বরদেরে দিয়া ঐ হলফ করাইয়াছিলেন। নিজেও হলফ নিয়াছিলেন। এতে এক সঙ্গে দুইটা লাভ হইয়াছিল। এক আওয়ামী মেম্বরদেরে হুঁশিয়ার করা হইয়াছিল। দুই, পশ্চিমা নেতা ও দণ-কুবেরদেরেও হুঁশিয়ার করা হইয়াছিল। আওয়ামী মেম্বরদের মধ্যে যদি কারো কোনও উচ্চভিলাষ থাকিয়াও থাকিত, তবে ঐ বিশাল জনতার দরবারে হলফ নেওয়ার ফলে সে উচ্চাকাংখা সেই মুহূর্তে পলাইয়াছিল।’ (আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর। আবুল মনসুর আহমদ। প্রথমা ২০১৭)

আবুল মনসুর আহমদের কথার যৌক্তিকতা পাই বঙ্গবন্ধুর নিজের ভাষ্যে। ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগ কর্মীরা যথেষ্ট নির্যাতন ভোগ করেছে। ছয় দফা দাবি যখন তারা দেশের কাছে পেশ করেছে তখনই প্রস্তুত হয়ে গিয়াছে যে তাদের দুঃখ কষ্ট ভোগ করতে হবে। এটা ক্ষমতা দখলের সংগ্রাম নয়, জনগণকে শোষণের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য সংগ্রাম।’

Comments

The Daily Star  | English

Loan default now part of business model

Defaulting on loans is progressively becoming part of the business model to stay competitive, said Rehman Sobhan, chairman of the Centre for Policy Dialogue.

4h ago