রাজশাহী: লকডাউন ও করোনায় ৯ নাগরিকের ভাবনা

সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে স্থানীয় প্রশাসন ইচ্ছা করলে অনেক আগে করোনা ভাইরাসের ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ রোধ করতে পারত। মে মাসের মধ্যভাগে যখন চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছিল তখন দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার করে সতর্ক করেছিল। ভারতের উদাহরণ চোখের সামনে থাকলেও তা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন সময়মতো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। ফল হিসেবে দেশের বিভিন্ন জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।

সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে স্থানীয় প্রশাসন ইচ্ছা করলে অনেক আগে করোনা ভাইরাসের ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ রোধ করতে পারত। মে মাসের মধ্যভাগে যখন চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছিল তখন দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার করে সতর্ক করেছিল। ভারতের উদাহরণ চোখের সামনে থাকলেও তা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন সময়মতো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। ফল হিসেবে দেশের বিভিন্ন জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক এবং জেলার নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে তাদের এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।

পরামর্শ দিয়ে তারা বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত স্বাস্থ্যখাতের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের কলেবর বৃদ্ধি করা। কারণ দেরিতে লকডাউন শুরু করায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বাড়তি সময় লাগতে পারে। এর মধ্যেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক নাট্যকার মলয় কুমার ভৌমিক বলেছেন, ‘করোনার এবারের যে সংক্রমণ সেটা ইচ্ছা করলেই ঠেকানো যেত কিন্তু কেউ সেটা করেনি। চাঁপাইনবাবগঞ্জে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার অনেক আগে থেকে এটা আশঙ্কা করা হয়েছিল। রাজশাহী অঞ্চলের চাঁপাইনবাবগঞ্জ লকডাউন করা হলো কিন্তু অন্য জেলাগুলো খোলা থাকল। এতে যেটা হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কর্মজীবী মানুষ দলে দলে রাজশাহী হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন যখন চারিদিকে সংক্রমণ ছড়িয়েছে তখন লকডাউন অনেকটা অর্থহীন। পরিস্থিতি অনেক অবনতি ঘটেছে। করোনাভাইরাস ছড়িয়ে যেতে দেওয়া হয়েছে।’

অধ্যাপক ভৌমিক আরও বলেন, ‘কোটি টাকার আমের ব্যবসার অজুহাতে লকডাউনে বিলম্ব করা হয়েছে। কিন্তু সে সময়ে (মধ্য মে) আমের ব্যবসা শুরুই হয়নি। এখন আমের ভরা মৌসুমে লকডাউন দিতে হলো, এখনকার ক্ষতির দায় কে নেবে? এটা কেবল স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতা ও অদক্ষতা নয়, এটা একরকমের ক্ষমতা প্রদর্শন। জাতীয়ভাবে লকডাউনের সুপারিশ থাকার পরও স্থানীয় প্রশাসন চুপ থেকেছে। পরবর্তীতে যখন পানি ঘোলা করে লেজেগোবরে অবস্থা হয়েছে তখনই নড়েচড়ে বসেছে। স্থানীয় প্রশাসন তাদের দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। এর খেসারত কতটা দিতে হতে পারে সেটা সময় বলে দিবে।’

তিনি বলেন, স্থানীয় প্রশাসন যখন সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না তখন রাজনীতিবিদদের এগিয়ে আসা উচিত ছিল। তারাও সেটা করতে পারেনি। তারা সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলের কারো মতামতও গ্রহণ করেনি।’

‘মহামারি এমন একটি মহা দুর্যোগ যা শতবর্ষে একবার এসেছে। আগেও এমন দুর্যোগ এসেছে তবে অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এখনকার মতো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েনি। এমন দুর্যোগ মোকাবিলায় সর্বজনীন কমিটি করে তা গ্রাম পর্যায়ে বিস্তৃত করে এগোতে হতো। কিন্তু এ কাজে কোথাও কোনো সমন্বয় দেখা যায়নি’, অধ্যাপক মলয় কুমার ভৌমিক বলেন।

নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদ বলেন, স্থানীয় প্রশাসনগুলোর মধ্যে লকডাউন নিয়ে সমাজে একটা সংশয় টিকিয়ে রাখার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে যে সংক্রমণের শুরুতেই লকডাউন দিয়ে বিস্তৃতি ঠেকানো গেছে। পদ্মা নদীর ওপারে ভারতের উদাহরণও ছিল। যখন আশঙ্কা করা হচ্ছিল যে ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে তখন কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি বরং আমরা উল্টোটা ঘটতে দেখেছি।’

‘মানুষের জীবিকা কেন সবসময় বাজারের উপর ছেড়ে রাখতে হবে? তাহলে সরকার থাকার দরকার কী? এটা একটা মহা দুর্যোগের সময় এখানে সরকারকেই সব দায়িত্ব নিতে হবে। এখন কারও ব্যবসা বাঁচানোর সময় নয়। এখন লকডাউন দেওয়ার পরও সংক্রমণ কিছু দিন বাড়তেই থাকবে, এটা স্বাভাবিক। এই প্রকোপ সামলাতে হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো উচিত ছিল। আমরা তো যথেষ্ট সময় পেয়েছি কিন্তু গত দেড় বছরে হাসপাতালগুলোতে সক্ষমতা কতটুকু বেড়েছে? সামাজিক নিরাপত্তা বলয় বাড়ানো উচিত। বড় ব্যবসায়ী বা যাদের সক্ষমতা রয়েছে তাদের চেয়ে যাদের সক্ষমতা কম বা নেই সেই মানুষ যাতে তিন বেলা খেতে পারে সেদিকে নজর দেওয়া বেশি জরুরি।’

সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সুলতানা মোসতাফা খানম বলেছেন, ‘আমরা সঠিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারিনি। শুধু প্রচার করেছি যে মাস্ক পরতে হবে। কিন্তু কেন পরতে হবে সেটা মানুষকে বোঝানো যায়নি। অন্যান্য রোগের সঙ্গে করোনাভাইরাসের পার্থক্যটাও মানুষকে বোঝানোর দরকার ছিল। সেই রকম কার্যকর কোনো উদ্যোগ আমাদের চোখে পড়েনি। মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাস নিয়ে নানা ধারণা রয়েছে। যেমন: কেউ বলছে যে এটা ধনীদের রোগ, গরিবদের হবে না। অনেকে বলছে যারা অফিসে বসে কাজ করে তাদের এটা হবে, যারা কায়িক শ্রম দেয় তাদের হবে না। কিন্তু বাস্তবে কেউই এখন সুরক্ষিত নয়। এখানেই সচেতনতা বাড়াতে হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সাজেদা আক্তার বলেন, সময়মতো লকডাউন দিতে না পারায় দায় তো স্থানীয় প্রশাসনের কিছুটা থেকেই যায় তবে এখন তারা খুব বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক অবস্থানে দেখা যাচ্ছে এটা খুব আশাব্যঞ্জক।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেলের পরিচালক অধ্যাপক আবু বকর মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত অনেক বিশাল হওয়ায় সেটা নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন এবং স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষে জোরালো ভূমিকা নেওয়া কঠিন ছিল। কারণ জীবিকার প্রশ্ন জড়িয়ে ছিল।

সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের রাজশাহীর সভাপতি আহমেদ শফি উদ্দিন বলেন, করোনাভাইরাসের নিয়ম হলো যে দুই সপ্তাহ যদি একে বন্দী রাখা যায় তাহলে এটা হারিয়ে যাবে। এই সহজ পদ্ধতিতে জানা থাকা সত্ত্বেও সময়মতো পদক্ষেপ না নেওয়ার ফলে ছড়িয়ে যাওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক।

শফি উদ্দিনের স্ত্রী ও কন্যা করোনা আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

তিনি বলেন, রাজশাহী তো করোনা মুক্তই ছিল। সংক্রমণের একটা পথই খোলা ছিল। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে মানুষ এসে বিনা বাধায় রাজশাহী চষে বেড়িয়েছে।

‘আমরা তো কোন দেশ থেকেই শিক্ষা নিলাম না। অনেক দেশ করোনা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে, অনেক ব্যর্থ হয়েছে। এখানে বরং যেটা হয়েছে সেটা সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে জুয়া খেলা হয়েছে। করোনা নিয়ন্ত্রণ কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। মসজিদের ইমাম, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও ইউনিয়ন পর্যায়ের সচেতন নাগরিকদের এ কাজে লাগানো যেতে পারত। পাড়ার ছেলেদের দায়িত্ব দেওয়া যেত যে তারা যেন মানুষকে সচেতন করার কাজটি করে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে কমিটি করে দিয়ে তাদেরকে ভলান্টিয়ার নিয়োগ করা যেত। কেউ দায়িত্ব নিয়ে কোনো কাজ করেনি। তেমনি অনেকে তাদের নির্ধারিত দায়িত্ব অবহেলা করেছে।’

রাজশাহীর পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মাহবুব টুংকু বলেন, এখনকার লকডাউনে কিছুটা লাভ হয়তো হবে কিন্তু ক্ষতি যেটা সেটা তো হয়ে গেছে। তার দায় কে নেবে। সামনে জুলাই মাসে আবার ঈদ আছে তখন কী করবে? পরিকল্পনাতেই ভুল হয়ে গেছে। উদাহরণ থাকতেও তারা সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেছে। করোনা নিয়ন্ত্রণে যে কমিটি রয়েছে আমার কাছে মনে হয়েছে যে এরা করোনার চেয়ে অন্য কিছু নিয়ে বেশি ব্যস্ত ছিল। বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, এখনে লকডাউন দিয়েও করোনা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। সেখানে এরকম একটা সিদ্ধান্তহীনতার জন্য চরম মূল্য দিতে হতে পারে। এমনকি বিশেষজ্ঞ যে কমিটিগুলোর রয়েছে সে কমিটিগুলোর কোনো মতামত গ্রহণ করা হয়নি।

আশির দশকে আমরা দেখেছি যে পরিবার পরিকল্পনা, সমবায় ও সঞ্চয় নিয়ে ব্যাপক প্রচার চলছে। সে রকম আন্তরিক কোন প্রচারণা করোনা নিয়ে দেখা যায়নি। অথচ এটা শত বছরের মধ্যে একটা বড় ধরনের বিপর্যয়। কর্তারা শুধু রেডিও-টিভি ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করতে চেয়েছে। কিন্তু মানুষকে বোঝানোর জন্য আরও আন্তরিক প্রচেষ্টা দরকার।

ব্যবসায়ী নাজমুল হোসেন বলেন, লকডাউন হলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু সরকার তো ব্যবসায়ীদের ট্যাক্স, ভ্যাট, বিদ্যুৎ বিল মওকুফ করে দিতে পারত। ব্যবসায়ীরা করুণ অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। ঈদের সময় যে পণ্য আমরা বিক্রির জন্য এনেছি তার পাঁচ ভাগও বিক্রি করতে পারিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে বড় ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিয়ে লকডাউন বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল। স্বাভাবিকভাবে ব্যবসায়ীরা আন্দোলন করেছে এবং লকডাউন সফল হয়নি। পরিকল্পনাতেই গলদ ছিল। সিদ্ধান্তহীনতা প্রতিটি পদে-পদে ধরা পড়েছে।’

উন্নয়ন কর্মী মো. তাজমুল হোসেন বলেন, যখন চাঁপাইনবাবগঞ্জের পরিস্থিতি অস্বাভাবিক, রামেক হাসপাতালে মৃত্যুহার বাড়ছে, ভারতের উদাহরণ সামনে, তারপরেও প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকেরা কেন লকডাউনে গেলেন না আমার বোধগম্য হয় না।

নিজেও করোনা থেকে সেরে উঠে তাজমুল হোসেন বলেন, দীর্ঘ মেয়াদি লকডাউনে যাবার সামর্থ্য আমাদের দেশের নেই। তাই উচিত ছিল হটস্পটে লকডাউন দেওয়া। তাতে দেশের অন্য অঞ্চলে অতিমারি ছড়াত না। চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রশাসনের দ্রুত কার্যকরী লকডাউনের কারণে পরিস্থিতি অল্পদিনেই নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে।

‘রাজশাহী বিভাগীয় সদর দপ্তর এবং সিটি করপোরেশন এলাকা। এখানে কর্তাব্যক্তিদের সংখ্যাও বেশি। তাদের মধ্যে কেউ দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে এলেন না। অন্যদিকে আমরা দেখলাম সিভিল সার্জন এবং রামেক হাসপাতালের প্রতিদিনের মৃত্যুর পরিসংখ্যানে গড়মিল। এটি কি সম্বনয়হীনতা নয়?’

Comments

The Daily Star  | English

A different Eid for residents of St Martin's Island

Number of animals sacrificed half than usual, price of essentials high

1h ago