বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে হয়তো মমি করে রাখতে হতে পারে একদিন

একটি আধা-সরকারি অফিসের মিটিং রুম। মহাপরিচালক তার কর্মকর্তাদের নিয়ে মিটিং করছেন। মহাপরিচালক তার ভালো কাজের ফিরিস্তি দিচ্ছিলেন। বক্তব্য শেষ হওয়ার পর কর্মকর্তারা বিভিন্ন প্রশংসাসূচক বক্তব্য রাখলেন। শেষে একজন ‘আহাম্মক’ শ্রেণির কর্মকর্তা, যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী, আবেগে আপ্লুত হয়ে স্যারকে তেল দেওয়ার জন্য বলে উঠলেন, ‘স্যার, কী যে সব কাজ করছেন আপনি। আমার ইচ্ছা করতিছে আপনাকে মমি করে রাখি।’
DU

একটি আধা-সরকারি অফিসের মিটিং রুম। মহাপরিচালক তার কর্মকর্তাদের নিয়ে মিটিং করছেন। মহাপরিচালক তার ভালো কাজের ফিরিস্তি দিচ্ছিলেন। বক্তব্য শেষ হওয়ার পর কর্মকর্তারা বিভিন্ন প্রশংসাসূচক বক্তব্য রাখলেন। শেষে একজন ‘আহাম্মক’ শ্রেণির কর্মকর্তা, যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী, আবেগে আপ্লুত হয়ে স্যারকে তেল দেওয়ার জন্য বলে উঠলেন, ‘স্যার, কী যে সব কাজ করছেন আপনি। আমার ইচ্ছা করতিছে আপনাকে মমি করে রাখি।’

মহাপরিচালক বিব্রত হলেও কিছু বললেন না। কারণ, ওই কর্মকর্তা তারই এলাকার এবং তারই হাতে নিয়োগপ্রাপ্ত। এই গল্প বলার কারণ হলো ‘মমি করে রাখার’ প্রসঙ্গটির যথার্থতা এখনো দেখতে পারছি সর্বক্ষেত্রে। চারিদিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত এমনসব ব্যক্তিত্ব দেখতে পাই, যাদের কাজকর্ম দেখলে আমারও ইচ্ছা করে মমি করে রাখতে।

যেমন বিভিন্ন কাজকর্মের জন্য আলোচিত-সমালোচিত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ। তিনি রাত ৩টা ২০ মিনিটে একটি ক্লাস নিয়েছেন, তিনি অভিনয় করতে চেয়েছেন এবং এরইমধ্যে তাকে নিয়ে সিনেমার একটি দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এর আগেও তিনি ক্যাম্পাসে নেচেছেন, ক্যাম্পাসে তোপের মুখে দীর্ঘদিন পেছনের দরজা দিয়ে নিজগৃহে প্রবেশ করেছেন।

অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ সময়ে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নিয়োগ দিতে তৎপরতা শুরু করেছেন বলে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। চার মাসে একে একে ৪৭টি পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন। অনলাইনে আয়োজন করেছেন শিক্ষক নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা।

এবার আসি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্যবিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সোবহানের আলোচনায়। গত ৬ মে ১১ জনকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। একইদিন শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ১৩৮ জনকে অ্যাডহকে নিয়োগ দিয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এ নিয়োগ দেন উপাচার্য। তিনি নিজেই বিদায়কালে তার এই নীতি লঙ্ঘনের কথা স্বীকার করে গিয়েছেন।

এরও আগে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সস্তায় চপ, সমুচা, সিঙ্গারার কথা বলে যথেষ্ট হাসাহাসি ও ট্রলের মুখে পড়েছেন। তার বক্তব্যে তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই যে ১০ টাকায় চা, চপ, সিঙ্গারা পাওয়া যায়, এটাই নাকি বিশ্ববিদ্যালয়টির ঐতিহ্য। বিশ্ববাসী জানলে নাকি ‘গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডে’ নাম লিখে রাখত। ভিসির এই বাণী এতটাই সাড়া জাগিয়েছিল যে, প্রথমদিনই আড়াই লাখ মানুষ এই ভিডিও দেখেছেন। ফেসবুকে শেয়ার করেছেন তিন হাজারেরও বেশি মানুষ। সবগুলো ঘটনাই বেশ ‘মমি করে’ রাখার মতো ঘটনা।

উপাচার্য স্যারদের কথা তুলে ধরার কারণ একটাই। তা হলো তারাই দেশের সেরা বিদ্যাপীঠ বলে পরিচিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চালান। এখান থেকেই লাখো শিক্ষার্থী প্রতিবছর পাস করে বের হচ্ছে। অনেকেই খুব ভালো ফলাফল করে বিদেশেও পড়তে যাচ্ছে। কিন্তু, আমরা কি লক্ষ করছি না যে দিনকে দিনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পড়াশোনাসহ সার্বিক মান কিভাবে অধোমুখী হচ্ছে?

সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড রেঙ্কিংয়ের একটা হিসাব চোখে পড়ল। প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয়তে বিশ্বের কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয় আছে, সে কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। ভারতের আটটি আর পাকিস্তানের তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে শীর্ষ ৫০০-তে। আর আমাদের প্রাচ্যের অক্সফোর্ড আছে ৮০০-১০০০ এর মধ্যে। ২০১২ সালেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল ৬০১, ২০১৪ সালে সেটির অবস্থান হয় ৭০১। একটি দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান কমতে থাকা মানে সেই দেশের সার্বিক গুণগত মান কমছে।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ভর করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্যদের দূরদৃষ্টি, শিক্ষা, প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের ওপর। কারো নাম ধরে বলার দরকার পড়ে না, স্পষ্ট চোখে দেখতে পারছি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য নিয়োগে রাজনৈতিক মেরুকরণ দেশে শিক্ষার মেরুদণ্ড একদম ভেঙে দিয়েছে।

উপাচার্যের রাজনৈতিক নিয়োগের বিধান বহুবছর ধরেই চলছে। কিন্তু, এর একটা মান ছিল। ক্রমশ সেই মান কমতে কমতে শূন্যের কোঠায় গিয়ে ঠেকেছে। ভিসি এমন একটি সম্মানজনক পদ, যাকে নিয়ে ট্রল বা হাসাহাসি, দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতির অভিযোগ করা মানে, সেই পদকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেওয়া।

একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান সস্তায় চপ, সমুচা, সিঙ্গারা দিয়ে তো বজায় রাখা যাবে না। প্রধানত এটি নির্ভর করে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের মানের ওপর। শিক্ষকরা কী পড়াচ্ছেন, শিক্ষার্থীরা কতটা গ্রহণ করছে তার ওপর। শিক্ষক হবেন সেসব সেরা শিক্ষার্থীরা, যারা ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও যোগাযোগ করার সক্ষমতাসম্পন্ন। যার বিষয় ভিত্তিক জ্ঞান ছাড়াও সেই বিষয়ে কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। নিজে পড়াশোনা করার পাশাপাশি অন্যকে পড়া বোঝানের সক্ষমতা থাকতে হবে। স্পষ্ট স্বরে কথা বলাসহ নির্ভুল ভাষার ব্যবহার জানতে হবে।

আর অ্যাকাডেমিক দিক থেকে ডক্টরেট, গবেষণা করার ক্ষমতা, জার্নালে লেখালেখির অভিজ্ঞতা থাকা বাঞ্ছনীয়। শুধু স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণি পেলেই শিক্ষক, এই ধারা পরিবর্তন করা না হলে মান এমনভাবেই কমতে থাকবে। আর রাজনৈতিক কোটায় শিক্ষক নিয়োগ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে।

সম্প্রতি খবরে দেখলাম অনার্সে এক বিষয়ে ফেল ও দ্বিতীয় শ্রেণি পেয়েও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন ইন্দ্রনীল মিশ্র নামে এক ব্যক্তি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আইসিই) বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগ পেয়েছেন।

ফলাফল খারাপ হওয়ায় স্নাতকোত্তরে থিসিস করতে না পারলেও হয়ে গেছেন শিক্ষক! ইন্দ্রনীলের বাবা অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন মিশ্র বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন। তাহলেই বুঝেন, এই নবনিযুক্ত শিক্ষক ও তার বাবার মতো শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে? বাবার কি উচিত ছিল না ছেলের এই নিয়োগে বাধা দেওয়া? আদর্শগত জায়গা থেকে উনি এই দায় এড়াতে পারেন না। এরকম কাহিনী একটা নয়, অনেক পাওয়া যাবে।

শিক্ষাখাতে আমাদের বাজেট কম। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে বাজেট আরও কম। এখানে যারা পড়াচ্ছেন, তারা প্রায় সবাই বাড়তি আয়ের জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করছেন। শিক্ষকদের জন্য আরও গবেষণা, ফেলোশিপ ও স্কলারশিপের ব্যবস্থা বাড়ানো দরকার। শিক্ষাখাতে ব্যয় না বাড়ালে, দক্ষ মানুষকে বিশ্ববিদ্যালয় চালানোর দায়িত্ব না দিলে, শিক্ষকদের সরাসরি রাজনীতিতে জড়ানো বন্ধ না হলে বা রাজনীতি ভিত্তিক নিয়োগ ও চুরিদারি বন্ধ না হলে, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাঙ্কিং যে কোথায় গিয়ে ঠেকবে, কে জানে। কর্তৃপক্ষ চাইলেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খণ্ডকালীন বিদেশি শিক্ষক আনতে পারেন। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে ডক্টরেট প্রোগ্রাম চালু করতে পারেন। তাহলে শিক্ষার্থীদের জন্যও একটা জানালা খুলে যাবে।

আলোচনা প্রসঙ্গে ছোট একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। এরশাদ সরকারের সময়ে পাস করেছি বলে বহুবছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন হয়নি। পরে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠান দেখলাম, মনে হলো বিশ্বের সব বিশ্ববিদ্যালয়েই বোধহয় এভাবেই সমাবর্তন হয়। মনে বিরাট দুঃখবোধ তৈরি হয়েছিল। মধ্য বয়সে পৌঁছে আমার যখন সুযোগ হলো যুক্তরাষ্ট্রের একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে উপস্থিত থাকার, তখন দুঃখবোধ আরও কয়েক কাঠি বেড়ে গেল। সেখানে দেখলাম দেশের নামকরা সব ব্যক্তিত্ব এসেছেন এবং তারা নিজ নিজ বিষয়ের ওপর ছোট করে পথ প্রদর্শনমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন। কোনোরকম বালখিল্য কথাবার্তার স্থান ছিল না।

আমাদের খেলাধুলা, উচ্চশিক্ষা, রাজনীতি, বিভিন্ন পেশা, আমলাতন্ত্র, আর্ট, সাহিত্য, সংগীত কিংবা নাটক— সবক্ষেত্রেই চরম নিম্নগামী যাত্রা। কিন্তু, কেন হলো এমন? এর একটি কারণ যেমন প্রতিষ্ঠানের রাজনীতিকরণ এবং আরেকটা কারণ পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার। পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারে যারা ভোগে, তারা অন্যের জীবনকে অনুকরণ করে, তারা কখনো বিষয়বস্তুর অর্থ ঠিকমতো বোঝে না, নিজেদের কগনিটিভ লিমিটেশনের জন্য। কোনো বিষয়ের মূল কনসেপ্ট তারা কখনোই বুঝতে পারে না। ফলে তাদের দূরদৃষ্টি থাকে না এবং প্রকৃত অগ্রগতিও হয় না।

পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্তরা যখন প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করে নেয়, তখন সেগুলোও ক্রমশ অন্তঃসারশূন্য ও অনুকরণ-নির্ভর হয়ে পড়ে। শিক্ষাখাতে বাজেট না বাড়ালে, আমাদের শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষা পদ্ধতি ও ভর্তি প্রক্রিয়া পরিবর্তন না করলে এসব বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় একসময় শুধু বোঝা হয়েই দাঁড়াবে। সেইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও হয়তো মমিই করে রাখতে হতে পারে।

শাহানা হুদা রঞ্জনা: সিনিয়র কোঅর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

(দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নেবে না।)

Comments

The Daily Star  | English

Flood situation in Sylhet, Sunamganj worsens

Heavy rains forecast for the next 3 days in region

9h ago