৩০ জুন ১৯৭১, পরিস্থিতি অনুকূলে এলেই শরণার্থীরা দেশে ফিরে যাবেন: ইন্দিরা গান্ধী

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ৩০ জুন গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল একটি দিন। এদিন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে দেওয়া এক ভাষণে বলেন, ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলছে এবং প্রিয় মাতৃভূমি থেকে দখলদার বাহিনীর শেষ সৈনিকটিকে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত তা চলবে।’ তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ এখন মাঝপথে রয়েছে। মুক্তিফৌজের বীর যোদ্ধারা রণাঙ্গনেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ঔদ্ধত্যপূর্ণ বেতার ভাষণের জবাব দেবে। বাংলাদেশের জনগণ ইয়াহিয়ার ভাষণকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইয়াহিয়ার শাসনতান্ত্রিক পরিকল্পনা সাড়ে সাত কোটি বাঙালির সঙ্গে একটি নিষ্ঠুর রসিকতা ছাড়া কিছুই নয়।’
ইন্দিরা গান্ধীর শরণার্থী শিবির পরিদর্শন। ছবি: সংগৃহীত

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ৩০ জুন গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল একটি দিন। এদিন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে দেওয়া এক ভাষণে বলেন, ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলছে এবং প্রিয় মাতৃভূমি থেকে দখলদার বাহিনীর শেষ সৈনিকটিকে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত তা চলবে।’ তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ এখন মাঝপথে রয়েছে। মুক্তিফৌজের বীর যোদ্ধারা রণাঙ্গনেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ঔদ্ধত্যপূর্ণ বেতার ভাষণের জবাব দেবে। বাংলাদেশের জনগণ ইয়াহিয়ার ভাষণকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইয়াহিয়ার শাসনতান্ত্রিক পরিকল্পনা সাড়ে সাত কোটি বাঙালির সঙ্গে একটি নিষ্ঠুর রসিকতা ছাড়া কিছুই নয়।’ 

৩০ জুন ময়মনসিংহে এক জনসভায় পাকিস্তানের সাবেক প্রাদেশিক মন্ত্রী হাশিমউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীরা নানা ষড়যন্ত্রমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। যা পাকিস্তানের জন্য ভাবনার বিষয়। দেশবাসীকে তাদের সব ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।’

ঢাকায় এদিন

৩০ জুন প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক সিডনি শ্যানবার্গকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহিষ্কার করা হয়। এদিন তিনি নিউইয়র্ক থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। তেজগাঁও বিমানবন্দরে নামার পরপরই তার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে নিষেধাজ্ঞা জারি করে সামরিক প্রশাসন। কারণ হিসেবে সামরিক প্রশাসন জানিয়েছে, ‘তার কার্যক্রমের কারণে বহির্বিশ্বে পাকিস্তান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় পাকিস্তানী সামরিক কার্যক্রম ও সামরিক বাহিনী নিয়ে নিয়মিত মিথ্যাচার করেছেন। পূর্ব পাকিস্তানে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতাকেও উসকে দেওয়ার জন্য তিনিই দায়ী।’ এর আগে মার্চ মাসেও তাকে নিষিদ্ধ করেছিল পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসন। 

ভারতে এদিন 

৩০ জুন দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেস সেবাদল ক্যাম্পে এক ভাষণে বলেন, ‘শরণার্থীদের নিয়ে ভারত বিপর্যয়ের মধ্যে থাকলেও, ভারত শরণার্থীদের সহায়তা চালিয়ে যাবে। ভারত দরিদ্র দেশ হলেও আমাদের মানুষের আত্মায় চিরকাল পূর্ব বাংলার মানুষেরা থাকবেন। বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোকে শরণার্থীদের পূর্ব বাংলায় ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে উপযুক্ত অবস্থান তৈরি করার জন্য পাকিস্তানকে বাধ্য করতে হবে। শরণার্থীরা যেমন প্রাণের ভয়ে আশ্রয় নিয়েছেন, ঠিক তেমনিভাবে মানবিকতার খাতিরেই আমরা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছি। পরিস্থিতি অনুকূলে এলেই শরণার্থীরা দেশে ফিরে যাবেন।’ তিনি এসময় শরণার্থীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করার জন্য দেশবাসীকে অনুরোধ করেন।

আন্তর্জাতিক মহলে এদিন

৩০ জুন ওয়াশিংটনে মার্কিন সরকারের মুখপাত্র বলেন, ‘২৫ মার্চের পর মার্কিন সরকার পাকিস্তানকে সামরিক অস্ত্রের জন্য কোনো নতুন লাইসেন্স দেয়নি এবং বাতিল হওয়া লাইসেন্সও নতুন করে সংশোধন করেনি। তবে, অস্ত্র বিক্রি নিষেধাজ্ঞার আগে পাকিস্তানকে যে লাইসেন্স দিয়েছিল, তার চালান এখন পাকিস্তানের পথে। এর মধ্যে একটি ভিড়েছে, আরেকটি পথে আছে এবং আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে বাকি পাঁচটি জাহাজও সামরিক সরঞ্জামাদি নিয়ে পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে।’

৩০ জুন লন্ডনে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ‘পূর্ব বাংলা থেকে এখন পর্যন্ত ছয় মিলিয়নেরও বেশি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। ভারত উদ্বাস্তু সমস্যার জন্য তার ভয়াবহ সময় পার করছে। এই অবস্থা সমাধানে আমি বিশ্বের বিভিন্ন সরকার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই। পূর্ব বাংলায় স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে সবার সঙ্গে সমঝোতা ও আলোচনার জন্য জাতিসংঘের দ্বার সর্বদা উন্মুক্ত রয়েছে।’ 

৩০ জুন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটোর সঙ্গে পূর্ব বাংলার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। এসময় সরদার শরণ সিং বলেন, ‘পূর্ব বাংলার পরিস্থিতি ও শরণার্থী সমস্যার জন্য একমাত্র দায়ী পাকিস্তান। পাকিস্তান গণহত্যা চালিয়ে তাদের দেশত্যাগ করতে বাধ্য করেছে। এই অবস্থায় পাকিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ না করা পর্যন্ত পাকিস্তান নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসবে না।’ তিনি প্রেসিডেন্ট টিটোকে এসময় পাকিস্তানের ওপর চাপ প্রয়োগ করার অনুরোধ করেন। একইসঙ্গে শরণার্থীদের বিষয়ে সার্বিয়াকে অবহিত করেন। এসময় যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের শরণার্থীদের দুরবস্থায় তার সমবেদনা প্রকাশ করেন এবং সহযোগিতা ও সমর্থন দানের জন্য নিশ্চয়তা দেন।

৩০ জুন কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিচেল শার্প কানাডার কমন্স সভায় এক বক্তব্যে বলেন, ‘কানাডা পাকিস্তানকে দেওয়া সমস্ত সামরিক সরঞ্জামাদির চালানের অনুমোদন বাতিল করেছে। একইসঙ্গে কানাডা পাকিস্তানকে সামরিক কার্যক্রমে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। কানাডা থেকে আর কোনো প্রকার সামরিক ও আর্থিক সহায়তা পাকিস্তানে দেওয়া হবে না। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জামাদি বহন করা জাহাজ মন্ট্রিলে অস্ত্র বোঝাইয়ের জন্য ভিড়েছিল তখন। কানাডা সরকার করাচীগামী পদ্মা জাহাজে যেন কানাডার কোনো প্রকার অস্ত্রের চালান না যায়, তার জন্য কড়া নির্দেশ দিয়েছিল।’

দেশব্যাপী প্রতিরোধ যুদ্ধ

৩০ জুন মুক্তিবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে নীলমনিগঞ্জ, হালসা ও আলমডাঙ্গা রেললাইন বিস্ফোরকের সাহায্যে উড়িয়ে দিয়ে হানাদার সেনাদের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

৩০ জুন হাবিলদার মতিনের নেতৃত্বে এক প্লাটুন মুক্তিযোদ্ধা লক্ষ্মীপুর থেকে কালির বাজারগামী হানাদার বাহিনীর একটি দলকে আক্রমণ করেন। এসময় কয়েকজন হানাদার আহত হয়। পরে হানাদার সেনারা কালির বাজারে আগুন লাগিয়ে পালিয়ে যায়। 

৩০ জুন মুক্তিবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা ফেনীর ফুলগাজীর বন্দুয়ায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর ওপর তীব্র আক্রমণ গড়ে তুলেন। এসময় বেশ কয়েকজন হানাদার সৈন্য হতাহত হয়।  

৩০ জুন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে অতর্কিত হামলায় চালায়। এসময় মুক্তিবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারাও তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেন। 

সূত্র:

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র: পঞ্চম, অষ্টম, দশম, দ্বাদশ খণ্ড

দৈনিক পাকিস্তান, ১ জুলাই ১৯৭১

দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা, ১ জুলাই ১৯৭১ 

আহমাদ ইশতিয়াক

[email protected]

Comments

The Daily Star  | English
Inner ring road development in Bangladesh

RHD to expand 2 major roads around Dhaka

The Roads and Highways Department (RHD) is going to expand two major roads around Dhaka as part of developing the long-awaited inner ring road, aiming to reduce traffic congestion in the capital.

15h ago