কোনো না কোনো পক্ষ ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করছে: সালাহউদ্দিন আহমদ

কোনো না কোনো পক্ষ ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করছে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি আরও বলেন, 'নির্বাচনকে নিয়ে যেন দুএকটা পক্ষ ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছে।'
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় 'রাষ্ট্রীয় মদদে মানবতাবিরোধী অপরাধের কৌশল উন্মোচন' শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন 'মায়ের ডাক' এই সেমিনারের আয়োজন করে।
সালাহউদ্দিন বলেন, 'আমার ছবিটা আজকে ওখানেই থাকার কথা ছিল—ফটো নিয়ে স্বজনরা ওখানে বসে আছেন। আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান ফোটো না হয়ে আজকে আমি এখানে জিন্দা আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে পারছি। আমার সহকর্মীদের মধ্যে অনেকেই সেই সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেনি এখনো। আয়নাঘর, কেন যেন নেত্র নিউজ নাম দিলো, সেটা সবার মনে লাগে গেল এবং এটা গ্রহণযোগ্য হয়ে গেল। কিন্তু আয়নাঘরে তো আয়না নেই! আয়নাঘরে যমদূত ছিল, আয়নাঘরে মৃত্যুর পরোয়ানা ছিল, সেই আয়নাঘরে আমরা ছিলাম।'
এ সময় নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, 'আজকের এই অধিবেশনে গুমের শিকার ব্যক্তির পরিবারের কেউ নতুন করে যোগদান করেননি। এটা একটা সুসংবাদ। তারা আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী দিনের রাজনীতিবিদরা যেন এটা নিশ্চিত করে, ভবিষ্যতে যেন গুমের শিকার ব্যক্তির পরিবারের কাউকে এ রকম কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত না হতে হয়। আসলে সে জন্যই অনবরত সংগ্রাম করে যাচ্ছি আমরা—গণতন্ত্রের সংগ্রাম।'
'আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আপনাদের সামনে এই কথা বলতে পারি, যদি জনগণ আমাদেরকে ম্যানডেট দেয়, ইনশাআল্লাহ, গুম প্রতিরোধের জন্য, গুমের সংস্কৃতি নিশ্চিহ্ন করার জন্য প্রথমেই আমাদেরকে যা যা করতে হয়: আইন প্রণয়ন এবং সেটা কার্যকর করার জন্য, সব কিছু করা হবে। আমরা সেই বাংলাদেশের জন্য অপেক্ষা করছি, যে বাংলাদেশে কোনো দিন ঘুমের শিকার হয়ে কোনো ব্যক্তিকে রাস্তায় দাঁড়াতে হবে না,' যোগ করেন তিনি।
সারা দেশে এক হাজার ৮৫০ জন গুমের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সংখ্যাটা অবশ্য এখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার অধীনে আছে। এক সময় হয়তো একটু কম-বেশি হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন তিন হাজারের বেশি। এভাবে হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড—সব কিছু যোগ করে সেই সংখ্যাটা আগে ছিল সাত হাজার ১৮৮, এখন সেটা বেড়ে আরও অনেক বেশি হবে। এ রকম একটা বিভীষিকাময় অবস্থায় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটা চলেছে।
তিনি বলেন, 'যারা এই কাজটা করে গেছে, তাদের কিন্তু এখনো অনুশোচনা নেই। তারা এখনো তাদের অপরাধের স্বীকার তো দূরের কথা, উল্টো গণঅভ্যুত্থানকারীদের অপরাধী হিসেবে নামকরণ করছে। এরপরও বাংলাদেশের মানুষ কি কখনো তাদেরকে রাজনীতিতে আহ্বান করতে পারবে? বাংলাদেশের মানুষ তাদেরকে কখনো ক্ষমা করতে পারবে? ক্ষমা তো চায়নি! আমরা এমন একটা পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য অপেক্ষা করছি।'
বিএনপির এই নেতা বলেন, 'আমরা সবাই মিলে আলোচনা করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংস্কারগুলো প্রণয়ন করছি এবং এই পরিবেশটা বাংলাদেশে অতীতে কল্পনাও করা যেত না। সব রাজনৈতিক দল এবং রাজনৈতিক-সামাজিক শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়েছে—রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কার চাই। সমস্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের মধ্য দিয়ে শক্তিশালীভাবে নির্মাণ করতে চাই।'
তার মধ্যে আছে নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, বিচার বিভাগ ও সংসদ এবং সবার উপরে থাকবে ফ্রিডম অব প্রেস। বাকি রইলো গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকা, জানান তিনি।
গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে সালাহউদ্দিন বলেন, 'যদি মালিকদের চাকরি আপনারা করেন, সাংবাদিক বন্ধুরা বিবেকের কাছে যদি দায়বদ্ধ না থাকেন, তাহলে সেই স্বাধীনতা নিশ্চিত কখনো করা যাবে না। সুতরাং বিবেকের কাছে আপনারা চাকরি করবেন, বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ হবেন, মালিকের কাছে দায়বদ্ধ হবেন না। তাহলে এখানে প্রেস ফ্রিডম নিশ্চিত করা যাবে। সে জন্য আইনি যেসব সুরক্ষা দেওয়া দরকার, আপনারা পরামর্শ দেবেন, সেই হিসেবে ভবিষ্যতে আইন পরিণত হবে ইনশাআল্লাহ।'
কোনো না কোনো পক্ষ ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করছে আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, 'আমরা তর্ক করছি, বিতর্ক করছি, সংস্কারের জন্য আলাপ-আলোচনা করছি কিন্তু নির্বাচনকে নিয়ে যেন দুএকটা পক্ষ ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছে।'
ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য এ দেশের মানুষ দীর্ঘ ১৬ বছর সংগ্রাম করেছে, রক্ত দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, 'অনেকগুলো অধিকারের মধ্যে প্রধানতম অধিকারের দাবি ছিল ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করা। সেই ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যখন একটা রাস্তা সুগম হয়েছে, এই রাস্তায় যেন আমরা কোনো কাঁটা না বিছাই—এই আহ্বান সব রাজনৈতিক দলের কাছে রাখবো।'
'এই নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার জন্যই তো আমরা বিগত এক বছর অনেক আলাপ-আলোচনা এবং সরকারের সঙ্গে দর কষাকষি করে সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে এই জায়গায় আসতে পেরেছি,' বলেন তিনি।
নির্বাচন নিয়ে সংশয় থাকলে রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান বিএনপির এই নেতা।
সালাহউদ্দিন আরও বলেন, 'আমরা এমন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করবো যার মধ্য দিয়ে অতীতের ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতি মানুষ প্রত্যাখ্যান করবে। যদি আমরা ভালো, আদর্শিক, রাজনৈতিক এবং গণতান্ত্রিক চর্চাকে চালু রাখতে পারি, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ফ্যাসিবাদী সব চর্চা, অতীতের সব ইতিহাস ধুয়ে মুছে যাবে।'
Comments