রক্তাক্ত কোটা সংস্কার, বন্ধকি বিবেক

নুরুলরা ‘কোটা’ নিয়ে কথা বলেছেন। ‘কোটা’ যে কত ভয়াবহ মাত্রায় অযৌক্তিক পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে, তা যুক্তি দিয়ে তুলে ধরেছেন। তাদের যুক্তির পেছনে গবেষণা-তথ্যের যোগান দিয়েছেন ড. আকবর আলী খানসহ সমাজের কিছু বিদগ্ধ মানুষ। নুরুলরা অযৌক্তিক অন্যায্য কোটা পদ্ধতির যৌক্তিক সংস্কার চেয়েছেন, চেয়েছেন ন্যায্যতা।

নুরুলদের অপরাধ কী? কেন তাদের উপর এই বর্বর নির্যাতন?

ক. নুরুলরা এমপি-মন্ত্রী বা বড় ব্যবসায়ীর সন্তান নন। তারা গ্রামীণ চাষা-ভুষার সন্তান। এটা তাদের অপরাধ।

খ. যাদের দামি গাড়ি আছে। যাদের সন্তানরা ২০ হাজার ডলার মূল্যের ঘড়ি পরেন। গাড়ির নিচে পিষে মানুষ মারেন, তাদের কাছে ন্যায্যতার কথা বলা, নিঃসন্দেহে অপরাধ। যে অপরাধ নুরুলরা করছেন।

২.

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘আর কি করার ছিল?’ বা ‘আর কিছু করার ছিল না’ - একদল মানুষ আছেন সব কিছুর পক্ষ নিয়ে যারা একথা বলেন। ৫ জানুয়ারি নির্বাচন, দায়মুক্তির আইন, সবচেয়ে বেশি ব্যয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে নিম্নমানের সড়ক, বিদ্যুৎ-গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি, জনসম্পৃক্ত এসব বিষয়ে বারবার তারা এসব কথা বলেছেন।

যখন যুক্তি দেওয়া যায় না, তখন কুযুক্তি দেওয়া হয়। কুযুক্তিতে খুব একটা সুবিধা হয় না। তখন কুৎসিত বিষোদগার শুরু হয়। যুক্তির কাছে, কুযুক্তি-বিষোদগার, সবই তুচ্ছ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে যুক্তি।

যারা ক্ষমতাবান-যারা বিত্তবান, তারা ‘আর কিছু করার ছিল না’ বলে অপকর্মের পক্ষে অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেন। যুক্তি যারা দেন, তাদের উপর ক্ষিপ্ত হন। ক্ষিপ্ততা গোপন থাকে না, প্রকাশ দেখা যায়।

৩.

নুরুলদের ক্ষেত্রেও ক্ষিপ্ততার প্রকাশ দেখা গেছে। নুরুলরা ‘কোটা’ নিয়ে কথা বলেছেন। ‘কোটা’ যে কত ভয়াবহ মাত্রায় অযৌক্তিক পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে, তা যুক্তি দিয়ে তুলে ধরেছেন। তাদের যুক্তির পেছনে গবেষণা-তথ্যের যোগান দিয়েছেন ড. আকবর আলী খানসহ সমাজের কিছু বিদগ্ধ মানুষ।

নুরুলরা অযৌক্তিক অন্যায্য কোটা পদ্ধতির যৌক্তিক সংস্কার চেয়েছেন, চেয়েছেন ন্যায্যতা।

যুক্তি না থাকায় ক্ষমতাসীনরা কোটা সংস্কার আন্দোলনকে সরকার বিরোধী ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখিয়ে বলেছেন ‘হঠাৎ করে কেন এই আন্দোলন?’

নুরুলরা তথ্য-যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন, তাদের কোটা সংস্কারের দাবি গত কয়েক বছরের, হঠাৎ করে নয়। বলা হয়েছে, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা ‘জামায়াত- শিবির’। অসত্য অভিযোগ ভিত্তি পায়নি।

তারা বঙ্গবন্ধুর ছবি বুকে ধারণ করে ন্যায্যতা প্রত্যাশা করেছেন। দৃশ্যমানভাবে প্রমাণ করেছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে সরকার বিরোধী ষড়যন্ত্রের কোনো সম্পর্ক নেই। তারপরও পুলিশ-র‍্যাবকে দিয়ে পেটানো হয়েছে। ছাত্রলীগকে দিয়ে আক্রমণ করানো হয়েছে। হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। হল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। রাস্তা থেকে গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

কোনো কিছুই কোনো কাজে আসেনি। নুরুলরা চেয়েছিলেন ‘কোটা সংস্কার’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন ‘কোটা থাকারই দরকার নেই’। সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, কোটা বাতিল হয়ে গেছে। এটা নিয়ে আর কিছু বলার নেই। এও বলেছেন, মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি কোটা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।

কিন্তু কোটা বাতিল বা সংস্কারের যে উদ্যোগ, সে বিষয়ে দীর্ঘ সময় ‘নীরবতা’ পালন করা হয়েছে। কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। ‘কিছু জানি না, নির্দেশ পাইনি’ ‘অগ্রগতি নেই’- জাতীয় কথা সচিব বলেছেন। নুরুলরা রাস্তায় নেমেছেন। তখন বলা হয়েছে, ‘প্রজ্ঞাপন জারির কাজ চলছে’।

‘প্রধানমন্ত্রী ব্যস্ত, বিদেশ থেকে ফিরলেই প্রজ্ঞাপন, রোজার পরে, ঈদের পরে’ প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। প্রধানমন্ত্রী ফিরেছেন, রোজা-ঈদ গেছে, প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়ে কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। গভীর নীরবতা চলছে।

৪.

কেন নীরবতা, সে বিষয়ে একটি সংবাদ সম্মেলনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন নুরুলরা। মনে রাখতে হবে, তারা আন্দোলনের জন্যে রাস্তায় নেমে আসেননি। সরকার পতনের ডাক দেননি। তারা সংবাদ সম্মেলন করে বলতে চেয়েছিলেন, কোটা বাতিল বা সংস্কারের প্রজ্ঞাপন জারি করছেন না কেন, প্রজ্ঞাপন জারি করুন।

বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে, এ কথা বলা যাবে না? আওয়ামী লীগের নেতারা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে, নুরুলদের সঙ্গে আলোচনায় বসে বলবেন, প্রজ্ঞাপন জারির কাজ চলছে, আর ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেবেন পেটানোর জন্যে? এ কেমন নীতি? যেকোনো অন্যায়ের প্রতিবাদকারী হিসেবেই তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গর্ব করে বাংলাদেশ। দেশের মানুষ তো সে কারণেই তাদের শ্রদ্ধা করেন। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটা অংশ বহিরাগতদের সঙ্গে নিয়ে, ন্যায্যতার দাবিতে আন্দোলনরতদের এমন নির্লজ্জভাবে প্রহার করবে? বঙ্গবন্ধুর গড়া ছাত্রলীগ, লাঠিয়াল-মাস্তান বাহিনী হয়ে উঠল? ন্যায্যতার বিরুদ্ধে অন্যায্যতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে, সাধারণ শিক্ষার্থী নুরুলদের পিটিয়ে আহত-রক্তাক্ত করবে?

তুলনায় আপনি ক্ষিপ্ত হলেও স্মরণ করে দেখেন, আইয়ুব খানের কুখ্যাত এনএসএফ সাধারণ শিক্ষার্থীদের এমন নির্দয়ভাবে নির্যাতন করেনি, ছাত্রলীগ এখন যা করছে। শিক্ষকদের কাছে অভিভাবকরা তাদের সন্তানকে পাঠান। শিক্ষিত শিক্ষকরা যে অন্ধ হয়ে গেছেন, তারা যে কানে শোনেন না, চোখে দেখেন না- গ্রামের কৃষক অভিভাবকরা তা জানেন না।

‘ভিসির বাড়ি কেন ভাঙল’- তেজী মূর্তিতে গর্ত থেকে একবার বেরিয়েছিলেন শিক্ষকরা। তখন লিখেছিলাম ‘ভিসির বাড়ি কারা ভাঙল’ তদন্ত করে তা প্রকাশ করার বা ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস শিক্ষক, সরকার বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নেই। বাড়ি ভাঙচুরের ভিডিও চিত্রে যাদের ছবি দেখা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার নৈতিক সাহস গর্ত থেকে বের হয়ে আসা সেই সব শিক্ষকরা বহু আগে বন্ধক রেখেছেন। তারা আবার গর্তে ঢুকে গেছেন।

নুরুলদের যারা লাথি-ঘুষি-পিটিয়ে রক্তাক্ত করল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও শিক্ষকরা তাদের প্রায় সবাইকে চেনেন-জানেন। চিনি না বলার সুযোগ নেই, কারণ ভিডিও চিত্রে প্রায় সবাইকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এদের অনেকের কাছে শিক্ষকরা পদ-পদবির জন্যে তদবির করেন। অনেককে নিজের বা নিজেদের শক্তির জন্যে লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করেন। তারা পৃষ্ঠপোষক হয়ে, কী করে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলবেন!

৫.

শিক্ষক হয়ে নিজে যিনি ঘুষি দিয়ে আরেক শিক্ষকের নাক ফাটিয়ে দেন, শিক্ষার্থীদের দেখে রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তার উপর। তার শক্তির উৎস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী কৃষকের সন্তান নুরুলরা নয়। তার শক্তির উৎস লাঠিয়াল বাহিনী, যে লাঠিয়াল বাহিনী পেটায় কৃষকের সন্তান নুরুলদের। মানুষের বিবেক, শিক্ষকদের বিবেক কতটা নির্দয় হতে পারে! সন্তানতুল্য নুরুলদের পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হলো, শিক্ষকরা নিশ্চিন্তে ক্লাবে আড্ডা দিলেন, বাসায় ফিরে সন্তানকে আদর করলেন, ভাত খেলেন, ঘুমালেন। হাসপাতালে শুয়ে থাকা, মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখা নুরুলদের, একবার স্বপ্নেও দেখলেন না! রক্তাক্ত নুরুলের মুখ, আহত- গ্রেপ্তার রাশেদের মুখ, শিক্ষকদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে না। যারা নুরুলদের পিটিয়ে রক্তাক্ত করল তারা অক্ষতই থেকে গেল। যারা আহত হলো গ্রেপ্তারও হলো তারাই। এই আকালে একজন অধ্যাপক জাবেদ বাঁচাতে চেয়েছিলেন নাক- মুখ ফেটে রক্ত বের হওয়া নুরুল হককে। রক্তাক্ত নুরুল অধ্যাপক জাবেদের পা আকড়ে ধরে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন। আর কোনো শিক্ষক এগিয়ে আসেননি। রক্ষা করতে পারেননি অধ্যাপক জাবেদ, নিজে কিছুটা আহত হয়েছেন ছাত্রলীগের আক্রমণে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের আক্রমণের শিকার হয়েছেন।

এই বাংলাদেশে ৫৬ শতাংশ সরকারি চাকরি হয় কোটায়।

এই সেই শিক্ষকরা, যারা বাতাসের গতি বুঝে নুরুলদের কাছে গিয়ে সংহতি জানিয়েছিলেন।

এই সেই ছাত্রলীগ, কোটা আন্দোলনের প্রথম ‘বিজয়’ মিছিলটি যাদের দিয়ে করানো হয়েছিল। আগের রাতে আন্দোলনকারীদের পিটিয়ে, মাঝরাতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ধাওয়া খেয়ে সূর্যসেন হলে আশ্রয় নিয়েছে যে ছাত্রলীগ, আবার পরের দুপুরে ‘বিজয়’ মিছিল করেছে সেই ছাত্রলীগ।

এই সেই ছাত্রলীগ, যাদেরকে দিয়ে সাধারণ ছাত্রীদের যৌন নিপীড়ন করানো হয়েছে।

এই সেই ছাত্রলীগ, যাদেরকে দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী নুরুলদের জখম-রক্তাক্ত করানো হলো।

Comments

The Daily Star  | English
Corruption in Bangladesh civil service

The nine lives of a corrupt public servant

Let's delve into the hypothetical lifelines in a public servant’s career that help them indulge in corruption.

9h ago