প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার ইভিএম প্রকল্প

জাতীয় নির্বাচনের মাত্র চার মাস সময় বাকি থাকতে সারাদেশে ৩০০ আসনের মধ্যে ১০০ আসনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন।
গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে গত ২৬ জুন রানী বিলাস মনি উচ্চ বিদ্যলয় কেন্দ্রে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহার করে নির্বাচন কমিশন। ছবি: স্টার

জাতীয় নির্বাচনের মাত্র চার মাস সময় বাকি থাকতে সারাদেশে ৩০০ আসনের মধ্যে ১০০ আসনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন।

জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে তীব্র আপত্তি রয়েছে বিএনপিসহ সরকারের বাইরে থাকা বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের। ইসির সঙ্গে সংলাপসহ বাইরের বিভিন্ন আলোচনায় ইভিএমের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানের কথাও তুলে ধরেছে। এর মধ্যেই গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে কমিশনের সচিব হেলালউদ্দিন আহমেদ ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা জানালেন।

ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে নির্বাচন হবে জানিয়ে ইসি সচিব বলেন, নির্বাচন আইনের সংস্কার,রাজনৈতিক দলের মতামতসহ সবকিছু ঠিক থাকলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এক তৃতীয়াংশ আসনে ইভিএম ব্যবহার করবে নির্বাচন কমিশন।

হেলালউদ্দিন বলেন, ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণের জন্য দেড় লাখ ইভিএম মেশিন লাগবে। এসব মেশিন ক্রয়ের জন্য খরচ হবে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

দ্য ডেইলি স্টারের হাতে আসা পরিকল্পনা কমিশনের এসংক্রান্ত নথি থেকে দেখা গেছে, ইভিএম ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কোনো কাজ সম্পন্ন হয়নি। গত ১৯ আগস্ট ইভিএম নিয়ে একটি পর্যালোচনা বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও সেটি স্থগিত করা হয়।

প্রয়োজনীয় এসব কাজ সম্পন্ন না হলেও নথিতে দেখা যাচ্ছে, দেড় লাখ ইভিএম মেশিন ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য ৩,৩১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে নিবন্ধিত মোট ভোটার রয়েছেন ১০ কোটি। হিসাব অনুযায়ী ১০০ আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হলে অন্তত তিন কোটি মানুষ ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে ভোট দেওয়ার জন্য বিবেচিত হবেন। বর্তমান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সুযোগ নেই।

ইসি সচিব জানান, ইভিএম ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই আরপিও সংশোধন করে পৃথক বিধান যুক্ত করতে হবে।

কোন প্রক্রিয়ায় ইভিএম ক্রয় করা হতে পারে জানতে চাইলে গতকাল তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের ভিত্তিতে ইভিএম সরবরাহের টেন্ডার আহ্বান করবে নির্বাচন কমিশন।

এর আগে গত ২৬ আগস্ট নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা সভাপতিত্বে আরপিও সংশোধন নিয়ে একটি বৈঠক করেছে ইসি। গতকালের ব্রিফিংয়ে হেলালউদ্দিন বলেন, আগামীকাল বৃহস্পতিবার আরপিও সংশোধন নিয়ে ফের বৈঠক করবে কমিশন। বৈঠক থেকে আসা সিদ্ধান্তের আইনি মত (ভেটিং) যাচাইয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

‘আরপিও সংশোধন হয়ে গেলে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করবে কমিশন [ইভিএম ব্যবহার নিয়ে মতামত জানতে]। এর পরই সিদ্ধান্ত হবে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে কি না।’

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ৮০ শতাংশ প্রস্তুতি এর মধ্যেই শেষ হয়েছে বলেও জানান তিনি।

আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে ঢাকায় মেলা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের। এর মাধ্যমে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে চায় তারা। দেশের অন্য জেলাগুলোতেও অনুরূপ আয়োজনের ইচ্ছা রয়েছে সাংবিধানিক এই সংস্থাটির।

নির্বাচন কমিশনের হাতে বর্তমানে ৩৮০টি ইভিএম রয়েছে। সম্প্রতি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে খুলনায় তিনটি কেন্দ্রে, সিলেটে দুটি কেন্দ্রে, বরিশালে ১১টি কেন্দ্রে ও রাজশাহীতে দুটি কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছে।

জাতীয় নির্বাচনের ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত এমন সময় নেওয়া হলো যখন মাত্র কয়েক মাস সময় বাকি রয়েছে। বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন সময় ইভিএম ব্যবহারের বিরোধিতার কথা বলে এসেছে।

নির্বাচন নিয়ে ইসি’র সর্বশেষ সংলাপের সময়ও নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩৫টি দলই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিরোধিতা করেছিল। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার জোটসঙ্গী পাঁচটি দল বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের একাংশ, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এম-এল) ও জাকের পার্টি ইভিএম’র পক্ষে মত দিয়েছিল।

ইভিএম নিয়ে বিএনপির অভিযোগ, নির্বাচনে কারচুপির সুযোগ থাকায় ইভিএমের পক্ষে কথা বলছে ক্ষমতাসীন দল।

Comments