মাহফুজ আনামের বিশ্লেষণ: সত্যি কি 'অবাধ ও সুষ্ঠু' নির্বাচনের দিকে যাচ্ছি

‘কী হতে যাচ্ছে’ সে সম্পর্কে কোনো প্রকার ধারণা না থাকায় দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে যে ধরনের আশা-উদ্দীপনার প্রয়োজন, তা আমাদের মধ্য থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
মির্জা ফখরুলের জামিন
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ফাইল ছবি

নির্বাচন আসন্ন। এই সময়টাতে আমাদের ব্যস্ত থাকার কথা যোগ্য প্রার্থীর খোঁজে এবং আগে যারা নিরাশ করেছে, তাদেরকে শাস্তি দিতে। কিন্তু এর পরিবর্তে আমরা প্রতিটি রাত পার করছি উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর আশঙ্কায়—কখন যেন সাদা পোশাকের পুলিশ বা তাদের বেশে অন্য কেউ জোর করে ঘরে ঢুকে 'গুম' করে দেয়। অপরাধ হলো, আমার কোনো বন্ধু বা আত্মীয় কোনো এক সময়, কোনো এক জায়গায় বিরোধী দলের কোনো এক মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন।

আবার আমাদের অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, দোকান, কারখানা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে, অন্যথায় হামলার ঝুঁকি নিয়ে এগুলো চালু রাখতে হচ্ছে।

সবচেয়ে কঠোর ভাষায় আমরা উভয়পক্ষের রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি দাবি জানাই, বর্তমানে যে রাজনীতি চলছে, তা থেকে বিরত থাকুন এবং এই অসহনীয় পরিবেশের অবসান ঘটান।

একের পর এক মেগা প্রকল্পের উদ্বোধন হচ্ছে—বঙ্গবন্ধু টানেল, বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে। সরকারের এসব অর্জনে আমরা সবাই অত্যন্ত গর্বিত।

কিন্তু এসব অর্জনের মর্ম পুরোপুরি বুঝে ওঠার আগেই দেশের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমাদেরকে আতঙ্কিত করছে। আর এর জন্য দায়ী সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই। এ ক্ষেত্রে সরকারের দায় বেশি। কারণ, বিরোধী দল রাস্তায় নেমে আন্দোলন ও সহিংসতা শুরুর আগে সরকার বিদ্যমান মতভেদ নিরসনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

'কী হতে যাচ্ছে' সে সম্পর্কে কোনো প্রকার ধারণা না থাকায় দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে যে ধরনের আশা-উদ্দীপনার প্রয়োজন, তা আমাদের মধ্য থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।

প্রতিদিনই বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী নেতা, ব্যাংকার ও বুদ্ধিজীবীরা সতর্ক করছেন যে আমাদের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। জনগণ উচ্চ মূল্যস্ফীতির অভিঘাতে জর্জরিত, যা অক্টোবরে ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশে পৌঁছে গেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি রেকর্ড ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশে পৌঁছেছে। রপ্তানি আয় কমছে, আর তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কমছে টাকার মান ও ডলারের রিজার্ভ।

আমাদের নেতারা এতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন কেন? তারা কেন এত সব অশনি সংকেতকে আমলেই নিচ্ছেন না?

আমাদের প্রধানমন্ত্রী বারবার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের অঙ্গীকারের কথা বলে এসেছেন। কিন্তু তার নিজের এবং তার দলের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড কি তাই বলে? বিরোধী দলকে 'সন্ত্রাসী সংগঠন' বলা, বিরোধী নেতাদের নিয়ে বিষোদগার, হুমকি—এসব কি সৌহার্দ্যপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ তৈরিতে ন্যূনতম সহায়ক হচ্ছে?

বুধবার দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশ যাদেরকে খুঁজছে, তাদের না পেলে পরিবারের সদস্য, ড্রাইভার, সহকারী, এমনকি বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয়দের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের কাজ কেবলমাত্র তখনই করা সম্ভব, যখন আইনের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধাটুকুও আর থাকে না।

অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত একজন ব্যক্তি নিরপরাধ—আইনের এই মৌলিক শিক্ষা হয়তো আমরা ভুলে গেছি। তাই তো 'যাকে পাওয়া যাবে, তাকেই শাস্তি দিতে হবে', এমন পদ্ধতিতে চলছি। সন্তান, জীবনসঙ্গী, বয়স্ক আত্মীয়, নিকটাত্মীয়, বন্ধু, এমনকি বেতনভুক্ত গৃহকর্মীদেরও শাস্তি দেওয়া যাবে, যাতে পুলিশ যাকে খুঁজছে তিনি ধরা দিতে বাধ্য হন। এটা ন্যায়বিচারের প্রতি সবচেয়ে বড় উপহাস।

বিএনপির তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ অক্টোবরের পর থেকে সারা দেশে তাদের মোট ৮ হাজার ৯৫১ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ৬৩৬ বিএনপি নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার ও তাদের বিরুদ্ধে ১১২টি মামলা করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে গ্রেপ্তারের হিসাব বিবেচনায় নিলে সংখ্যাটি আরও অনেক বড় হবে।

এরপর প্রশ্ন আসে, বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কারাগারে কেমন আচরণ করা হচ্ছে। তাদেরকে যেহেতু বেআইনি জনসমাবেশ, পুলিশকে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি, বিস্ফোরণ ও ভাঙচুরের মতো সুনির্দিষ্ট অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তাই তাদেরকে সাধারণ কয়েদি হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে, রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে নয়। ফলে, রাজনৈতিক নেতা হিসেবে কারাগারে তারা ডিভিশন পাচ্ছেন না। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী মির্জা আব্বাস সম্প্রতি আদালতে দাবি করেছেন, কারাগারে তাকে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের সঙ্গে মাটিতে ঘুমাতে বাধ্য করা হয়েছে।

৮ নভেম্বর প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৬৮টি কারাগারে প্রায় ৭৭ হাজার কয়েদি আছেন। ২২ সেপ্টেম্বর সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য থেকে এই সংখ্যাটি জানা যায়। তবে গত ৭ নভেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, কয়েদির সংখ্যা ৮৮ হাজার, যা কারাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি।

গত ২৮ অক্টোবর ঢাকায় সমাবেশের পর বিএনপি নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের কারণেই মূলত হঠাৎ করে কয়েদির সংখ্যা এত বেড়েছে। কারাগারের নিয়ম অনুযায়ী, প্রত্যেক কয়েদির অন্তত ৬ ফুট বাই ৬ ফুট জায়গা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ এখন সেই সুবিধাটুকুও দিতে পারছে না।

রাজনীতিবিদদের শাস্তি দিতে কীভাবে আইন ব্যবহার করা হচ্ছে, তার উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে জ্যেষ্ঠ ও সম্মানিত রাজনীতিবিদ এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ঘটনাটি। তার বয়স ৭৫, হৃদরোগসহ নানা অসুস্থতায় ভুগছেন। গত ২৯ অক্টোবর সকালে 'প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলা চালানো'র মতো অবাস্তব কারণ দেখিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২ নভেম্বর তিনি জামিন আবেদন করতে গেলে জানতে পারেন, বিচারক শুনানির দিন ধার্য করেছেন ২০ নভেম্বর।

এখানে দুটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো। প্রথমত, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য যে তার মতো একজন মানুষ প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলা চালাবেন। এই বিষয়টি কি সম্মানিত বিচারকের মনোযোগ আকর্ষণ করলো না? দ্বিতীয়ত, ১৮ দিন পর শুনানির দিন ধার্য করার মাধ্যমে মির্জা ফখরুলকে তার মৌলিক অধিকার নিয়ে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার আগেই অন্তত ১৮ দিনের কারাবাস নিশ্চিত করা হলো। ভবিষ্যতে যারা বিরোধী দলের কোনো সমাবেশে যোগ দেওয়ার কথা ভাববেন, তাদের সবার জন্য এখানে রয়েছে একটি পরিস্কার বার্তা।

এটা কি কল্পনা করা যায় যে এমন একটি পরিস্থিতিতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব? সরকারের নিপীড়ন এবং সবচেয়ে বড় বিরোধী দলকে ধ্বংস করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চলমান থাকলে একটি নির্বাচনের আর কি আশা থাকে? একাই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা যায় কি? শুরু থেকেই এই দুই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে যতটুকু দূরত্ব ছিল, তার সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে সীমাহীন রাগ, অসম্মান, অবিচার ও দুর্ব্যবহার। বিরোধী দলকে 'অপশক্তি' হিসেবে উপস্থাপনের যে প্রয়াস চলছে, তাতে চলমান সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের যৎসামান্য সুযোগটুকুও আর রইলো না।

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের নামে বিএনপিকে ভেঙে টুকরো টুকরো করার নীতিতে এগোচ্ছে সরকার। এমনকি বিরোধী দলের কিছু হতাশ নেতাকর্মীকে প্রলুব্ধ করে নতুন নতুন দল গঠনের মতো ঘৃণ্য নীতিও নিয়েছে সরকার, যাতে তারা পরবর্তীতে সরকারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে চলে।

সার্বিকভাবে যা চলছে তা হচ্ছে, নির্বাচনী কারসাজি। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের কোনো প্রস্তুতিই নেওয়া হচ্ছে না। এর জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে এবং পুলিশ, বিভিন্ন সংস্থা ও আইনি ব্যবস্থাকে কাজে লাগানো হচ্ছে। এর সার্বিক ফলাফল হলো, জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের নেতা বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে না, বরং নানা কারসাজি ও ছল-চাতুরীর মাধ্যমে আগে থেকে বেছে রাখা নেতাদের চাপিয়ে দেওয়া হবে আমাদের ওপর। অন্য যেকোনো দেশ হলে একে অভিহিত করত প্রহসন হিসেবে। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে এটাই হচ্ছে 'যেকোনো মূল্যে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা' অব্যাহত রাখার প্রক্রিয়া।

মাহফুজ আনাম, সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার

ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান

Comments

The Daily Star  | English
Shipping cost hike for Red Sea Crisis

Shipping cost keeps upward trend as Red Sea Crisis lingers

Shafiur Rahman, regional operations manager of G-Star in Bangladesh, needs to send 6,146 pieces of denim trousers weighing 4,404 kilogrammes from a Gazipur-based garment factory to Amsterdam of the Netherlands.

1h ago