ঐতিহ্যময় কুস্তি, পর্ব-২

ছিল তিন শতাধিক কুস্তির আখড়া, এখন একটিও নেই

জানা গেছে, ঢাকা শহরে এককালে তিন শতাধিক কুস্তির আখড়া তথা কুস্তি খেলা চর্চার কেন্দ্র ছিল। কিন্তু বর্তমানে নিয়মিত কুস্তি চর্চার জন্যে একটিও স্থান নেই।

এককালে ঢাকা শহরের কুস্তিবিদদের খ্যাতি উপমহাদেশ জুড়ে থাকলেও বর্তমানে ঢাকায় কোনো কুস্তিগির নেই। খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, ফেডারেশনভূক্ত ঢাকার ১৫টি কুস্তি ক্লাবের মধ্যে বর্তমানে একজনও ঢাকা শহরে বেড়ে উঠা কুস্তিগির নেই। ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবের কুস্তিগিরদের সকলেই ঢাকার বাইরে থেকে আগত।

জানা গেছে, ঢাকা শহরে এককালে তিন শতাধিক কুস্তির আখড়া তথা কুস্তি খেলা চর্চার কেন্দ্র ছিল। কিন্তু বর্তমানে নিয়মিত কুস্তি চর্চার জন্যে একটিও স্থান নেই। ঢাকায় অধিকাংশ কুস্তির আখড়াগুলোর স্থলে গড়ে উঠেছে ব্যক্তি মালিকানাধীন ভবন। কিছু কিছু আখড়ার স্থলে গড়ে উঠেছে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরএর কার্যালয় ও কমিউনিটি সেন্টার। সেখানে 'শরীরচর্চা কেন্দ্র' রূপে একটি বা দুটি কক্ষ বরাদ্দ রাখা হলেও বর্তমানে কুস্তি চর্চার কোনো ব্যবস্থা নেই। 

মুঘল আমল থেকে কুস্তি ছিল ঢাকার অন্যতম জনপ্রিয় খেলা। সমাজের অভিজাত ব্যক্তিরা কুস্তির পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। ঢাকার কুস্তির অবনমন শুরু হয় মূলত ব্রিটিশ আমলের শেষভাগে। বিশ শতকের শুরু থেকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবীরা কুস্তির আখড়াগুলোকে কেন্দ্র করে শরীর চর্চা করতেন, ছাত্র তরুণদের বিপ্লবে উদ্বুদ্ধ করতেন। এ জন্যে কুস্তির আখড়াগুলোর উপর সরকারের ছিল খড়গহস্ত। পরবর্তী পাকিস্তান আমলেও কুস্তি তেমন পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি। কিছু কিছু আখড়াকে 'ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার' রূপে রূপান্তর করা হয়। বাকী প্রায় সকল আখড়া পাকিস্তান আমলের শেষভাগে বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় সামাজিকভাবে নিয়মিত কুস্তির চর্চা । তখন দিবস-ভিত্তিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে ঢাকার কুস্তির চর্চা, যা এখনো অব্যাহত আছে।  বর্তমানে কুস্তি ফেডারেশন নামে পরিচিত বাংলাদেশ অ্যামেচার রেসলিং ফেডারেশন আয়োজিত কুস্তি বিষয়ক বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে একমাত্র নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে বিজয় বিদস ও স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কুস্তি প্রতিযোগিতা। 

ব্রিটিশ আমল

১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত রহমান আলী তায়েশ-এর 'তাওয়ারীখে ঢাকা' গ্রন্থে উল্লেখ আছে, আগে মল্লযুদ্ধ ও শক্তি পরীক্ষায় লোকজনের খুবই আগ্রহ ছিল। প্রতি মহল্লায় দু'একটি আখড়া থাকতো। লোকজন ওখানে ডন ও মল্লের অনুশীলন করতো।

বিশ শতকের ত্রিশের দশকে হাকিম হাবিবুর রহমান রচনা করেছিলেন 'ঢাকা পাচাশ্ বারস্ পহেলে' (ঢাকা পঞ্চাশ বছর আগে) শীর্ষক গ্রন্থ। তাতে 'কুস্তি ও ব্যায়াম' অধ্যায়ে উল্লেখ করেন, আমি নিজের বাল্যকালে দেখেছি যে ঢাকাতে কী হিন্দু, কী মুসলিম , কী আরমেনীয়, কী ধনী-গরীব সবারই কম বেশী কসরত এবং কুস্তির অনুরাগ ছিল। শহরের সব মহল্লাতেই ডাণ্ডাখানা খোলা হয়েছিল এবং প্রত্যেক ব্যক্তিও কিছু না কিছু ব্যবহার করতো। শোনা যায় আগে তিন শতের অধিক আখড়া ছিল। আমার বাল্যকালে এক দেড়শ থেকে কম ছিল না।

বাংলাপিডিয়ায় ইতিহাসবিদ সিরাজুল ইসলামের লেখা 'আখড়া' শীর্ষক ভুক্তিতে বলা হয়. 'সংস্কৃত 'অক্ষবাট' শব্দ থেকে উদ্ভূত আখড়া শব্দের মূল অর্থ ছিল মল্লভূমি বা ক্রীড়াভূমি। পরবর্তীকালে অর্থ সম্প্রসারণের ফলে আখড়া বলতে কুস্তি খেলার স্থান, নৈতিক ও শারীরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র, বৈষ্ণব সঙ্গীত-কেন্দ্র ইত্যাদিকেও বোঝায়। কখনও কখনও সাধু-সন্তবৃন্দ তাঁদের বাসস্থান এবং আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধনের কেন্দ্র হিসেবেও আখড়া গড়ে তুলতেন। তরুণদের শারীরিক ও নৈতিক উৎকর্ষ সাধনের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি বাংলার কিছু জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিল। ব্রিটিশ-পূর্ব যুগে স্থানীয় জমিদারগণ এবং সরকারও বিভিন্ন সময়ে ভূমি মঞ্জরির মাধ্যমে আখড়ার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।

হাকিম হাবিবুর রহমান-এর গ্রন্থে উল্লেখ আছে, আজ থেকে ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছর পূর্বেও চুড়িহাট্টা, ফরাশগঞ্জ, আরমানিটোলা, বকশীবাজার, বেচারাম দেউড়ির আখড়ার বড় প্রসিদ্ধি ছিল।

ঢাকায় কুস্তির আখড়াগুলোর প্রধান বার্ষিক উৎসব ছিল মহরম উপলক্ষে পুরান ঢাকার কেন্দ্রস্থল বলে পরিচিত চক চত্বরে সারারাত ব্যাপী বিভিন্ন শারীরিক কসরত প্রদর্শন। ব্রিটিশ আমলের শেষভাগেও এই প্রথার প্রচলন ছিল বলে হাবিবুরের গ্রন্থ থেকে জানা যায়। এ প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, 'মহরমের ১০ তারিখ সন্ধ্যায় দলবদ্ধভাবে ও ধূমধামের সঙ্গে এরা চকে জমা হতো এবং নিজের নিজের কৌশল দেখাত। বিভিন্ন আখড়া ভিন্ন ভিন্ন কৌশলের জন্য বিখ্যাত ছিল।'

তিনি আরো উল্লেখ করেন, 'চকে আশুরার রাতে প্রত্যেক আখড়ারই নির্দিষ্ট স্থান থাকতো, কেউ কারো জায়গা দখল করতে পারতো না। রাতে শহরের বাইরে থেকে বাঙালী মুসলমানদের আখড়াও আসতো। শহরের আখড়ায় 'তাসা' (অর্ধ বৃত্তাকার ঢোল) বাজান হতো এবং গ্রামের লোকেরা রওশন চৌকি সাথে নিয়ে আসতো।'

পাকিস্তান আমল

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে মহরম উপলক্ষে প্রতি বছর চকবাজার শাহী মসজিদের সামনের চত্বরে কুস্তি খেলা ও শারীরিক কসরত প্রদর্শনের রেওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে চক চত্বরের একমাত্র মসজিদ চকবাজার শাহী মসজিদের খতিব ও ইমামরা ছিলেন জৈনপুরী সিলসিলা পন্থী। জৈনপুরী তরিকার অনুসারীরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মুহররম পালন করে থাকেন। পঞ্চাশের দশকে চকবাজার শাহী মসজিদের খতিব ও ইমামের দায়িত্ব গ্রহণ করেন দেওবন্দ মতাদর্শের আলেমরা। দেওবন্দের আলেমরা মুহররম উপলক্ষে আনুষ্ঠানিকতার বিরোধী।

ঢাকা গবেষক ও পুরান ঢাকার বাসিন্দা হাশেম সূফী এ প্রসঙ্গে বলেন, ঢাকায় আগে কুস্তি চর্চার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন নবাব, জমিদারসহ বিভিন্ন অভিজাত ব্যক্তিরা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ হয়ে যায়। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ঢাকায় মহল্লায় মহল্লায় কুস্তি চর্চার ঐতিহ্য ক্রমশ স্তিমিত হয়ে আসে।

তিনি আরো উল্লেখ করেন, পাকিস্তান সরকার ঢাকায় কুস্তি চর্চা বিষয়ে সহানুভূতিশীল ছিল না, সন্দিগ্ধ ছিলেন। পাকিস্তান সরকার কমিউনিস্টদের রাষ্ট্রের শত্রু বলে বিবেচনা করতো। আর কুস্তির আখড়াগুলোকে কমিউনিস্টরা পৃষ্ঠপোষকতা করে বলে সরকার সন্দেহ করতো। তাই পাকিস্তান সরকার চাইতো না ঢাকায় কুস্তি চর্চার প্রসার হোক। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর আখড়াগুলো পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হলো। এমনকি কোনো কোনো আখড়া আক্রান্তও হয়েছিল।

ঢাকা গবেষক হাশেম সূফী এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন দোলাই নদীর তীরে ঋষিকেশ দাস রোডের কুস্তির আখড়াটির কথা। সূফী জানান, এই আখড়াটি  বিগত শতকের পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত ছিল ছিল। ব্রিটিশ আমলের শেষভাগে ও পাকিস্তান আমলের শুরুতে কমিউনিস্ট পার্টির ঢাকা জেলার সম্পাদক অনিল রায়ের (বিপ্লবী লীলা নাগ-এর স্বামী) তত্ত্বাবধানে আখড়াটি গড়ে উঠেছিল। ১৯৫০ সালে সাম্পদায়িক দাঙ্গার পর অনিল রায় দেশত্যাগ করার সময় আখড়াটি হস্তান্তর করেছিলেন রোকনপুর এলাকার প্রগতিশীল মুসলিমদের সংগঠন 'কালচার' ও 'নতুন সংঘে'র কাছে। ১৯৫৪ সালে পুলিশের সহায়তায় মুসলিম লীগের কর্মীরা আখড়াটি দখল করে নিয়েছিল, যা বর্তমানে ক্যাপিটাল বিস্কিটের কারখানা।

ক্রীড়া গবেষক ও মাসিক ক্রীড়াজগত সম্পাদক মাহমুদ হোসেন খান দুলাল পাকিস্তান আমলে কুস্তিতে একটি রাজনৈতিক প্রবণতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ষাটের দশকে একদল ছাত্র তরুণ জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কুস্তি চর্চা শুরু করেছিলেন। তারা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি হিসাবে কুস্তির চর্চা করতেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আবদুর রাজ্জাক, মোস্তফা মহসিন মন্টু, নায়ক খসরু তাঁদের অন্যতম।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দ্রুতই কমতে থাকে কুস্তির আখড়ার সংখ্যা। এছাড়াও তখন আখড়াকে 'ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার/স্কুল' রূপে রূপান্তরের প্রচেষ্টা নেয়া হয়। সদরঘাটে প্রতিষ্ঠা করা হয় ঢাকায় কুস্তির বার্ষিক নতুন প্রধান উৎসবস্থল, সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় কায়েদে আজম ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার ও কুস্তি স্টেডিয়াম। মহরমের পরিবর্তে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস হয়ে উঠে ঢাকায় কুস্তির প্রধান উৎসব। সদরঘাটের কুস্তি স্টেডিয়ামে পাকিস্তান আমলে প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বর্ণাঢ্য-ভাবে কুস্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো। সদরঘাটের কুস্তি স্টেডিয়াম ছাড়াও তখন ঢাকায় বেশ কিছু মহল্লায় কুস্তির আখড়ায় স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কুস্তি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো।

ঢাকার ঐতিহ্যবাহী কুস্তির আখড়াগুলো সাধারণত অঞ্চল এবং আখড়া পরিচালনাকারী ওস্তাদের নামে পরিচিত ছিল। যেমন ছোট কাটরার বৃন্দা পালোয়ানের আখড়া, সুরিটোলার হামিদ পালোয়ানের আখড়া, শাহাবুদ্দিন পালোয়ানের আখড়া ইত্যাদি। পাকিস্তান আমলে বৃন্দা পালোয়ানের আখড়াকে গামা ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার, সুরিটোলার আখড়াকে ঢাকা ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার ইত্যাদি নামে নামকরণ করা হয়। ঢাকার বেশ কিছু বড় আখড়া ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার রূপে রূপান্তর হয়ে চলে যায় তৎকালীন ঢাকা মিউনিসিপালিটির অধীনে, যা পরবর্তীকালে ওয়ার্ড কমিশনারের কার্যালয়ে রূপ নেয়। 

ঢাকায় কুস্তির চর্চা বিষয়ে অনুসন্ধান-কালে জানা যায়, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর কুস্তির আখড়ার সংখ্যা কমে গেলেও ষাটের দশক পর্যন্ত চকবাজার, হোসেনী দালান, আমলীগোলা, আর্মানীটোলা, বংশাল, সুরিটোলা, সাত রওজা,  মৈশু-ি ইত্যাদি মহল্লায় বিভিন্ন আখড়ায় কুস্তির চর্চা হতো. অনুষ্ঠিত হতো কুস্তি প্রতিযোগিতা। ।

কুস্তিগির ও কুস্তি সংগঠক হিসাবে গত ৬০ বছর ঢাকার কুস্তি চর্চার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রবীণ ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব ও হোসেনী দালান সংলগ্ন মহল্লার বাসিন্দা তবিবুর রহমান পালোয়ান। তবিবুর রহমান পালোয়ান দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, হোসেনী দালানের উত্তর দিকে ছিল একটি কুস্তির আখড়া, যা পাকিস্তান আমলের শেষদিকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। হোসেনী দালান সংলগ্ন পূর্ব দিকের মহল্লা নবাব কাটরায় ছিল আরেকটি কুস্তির আখড়া। এটিও পাকিস্তান আমলের শেষভাগে বিলোপ হয়। রমনা কালী মন্দিরের পুকুরের পাশে ছিল একটি কুস্তির আখড়া, যেখানে মূলত হিন্দুরা শরীর চর্চা করতেন। এটিও বিলুপ্ত হয় পাকিস্তান আমলের শেষভাগে। 

তবিবুর রহমান পালোয়ান আরো জানান, বেগমবাজারে তাজমহল সিনেমা হলের পাশে ছিল একটি কুস্তির আখড়া। ছোট কাটরায় ছিল একটি আখড়া। প্রথমে বৃন্দা পালোয়ান নামে পরিচিত করিম পালোয়ান আখড়াটি পরিচালনা করতেন। মিটফোর্ড বালুর মাঠে ছিল একটি আখড়া। বর্তমান আলিয়া মাদ্রাসার পিছনে একটি কুস্তির আখড়া। আমলিগোলায় আজাদ মুসলিম ক্লাবে ছিল একটি আখড়া। পরিচালনা করতেন শুকুর পালোয়ান। আজিমপুর বটতলায় ছিল একটি আখড়া।

তবিবুর রহমান পালোয়ান আরো জানান, সুরিটোলা পুকুরপাড়ে একটি আখড়া ছিল, পাকিস্তান আমলে যার নামকরণ করা হয়েছিল ঢাকা ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (ডিপিটিসি)। আখড়াটি পরিচালনা করতেন হামিদ পালোয়ান। সত্তর দশকেও আখড়াটি টিকে ছিল।

সুরিটোলায় হামিদ পালোয়ানের কাছে কুস্তি বিষয়ে শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন ষাট ও সত্তরের দশকে ঢাকার বিখ্যাত কুস্তি খেলোয়াড় ছিলেন বংশালের বাসিন্দা হাজী ইব্রাহিম পালোয়ান। দ্য ডেইলি স্টারকে হাজী ইব্রাহিম পালোয়ান জানান, ষাটের দশকে বংশাল, নাজিরাবাজার, সুরিটোলা ইত্যাদি অঞ্চলে কুস্তির চর্চা ছিল। বংশালের কুস্তি চর্চার প্রধান কেন্দ্র ছিল বংশাল পুকুরের উত্তরপশ্চিম দিকে আবদুল্লাহ সরকার লেনে মিল্লাত শরীর চর্চা কেন্দ্রটি। বংশালের পাশের মহল্লা সুরিটোলার কুস্তির আখড়াটিও বিখ্যাত ছিল। হামিদ পালোয়ান আখড়াটি পরিচালনা করতেন। হামিদ পালোয়ানের বেশ কয়েকজন শিষ্য কুস্তিগির হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। হাজি ইব্রাহিম পালোয়ানও নিজেও প্রথম কুস্তি বিষয়ে শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন হামিদ পালোয়ানের কাছে। বংশাল অঞ্চলে এছাড়াও বংশাল-মালিটোলায় একটি কুস্তির আখড়া ছিল। 

বংশালের প্রবীণ কুস্তিগির হাজি ইব্রাহিম তায়ামিয়া পালোয়ান জানান, পাকিস্তান আমলে প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হতো কুস্তি প্রতিযোগিতা। মহল্লাবাসী খুবই আগ্রহ ও উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে কুস্তি খেলা উপভোগ করতো। মুক্তিযুদ্ধের পরেও কয়েক বছর কুস্তি খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ইব্রাহিম তায়ামিয়া পালোয়ানের স্ত্রী আসিয়া খাতুন বাপের ও স্বামীর পরিবারে কুস্তি খেলার ঐতিহ্য ছিল। আসমা খাতুন জানান, ষাটের দশকে তিনি সুরিটোলা নিয়মিত কুস্তি প্রতিযোগিতা হতে দেখেছেন। এমনকি সত্তরের দশকের প্রথম দিকেও সুরিটোলায় কুস্তি খেলা হতো।

বাংলাদেশে অ্যামেচার রেসলিং ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক ও পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বঙ্গবীর শরীরচর্চা কেন্দ্রের সংগঠক মেহবাহউদ্দিন আজাদ জানান, ছোট কাটরার কুস্তির আখড়াটি ব্রিটিশ আমলে তাঁর দাদা বৃন্দা পালোয়ান নামে পরিচিত করিম পালোয়ান,  পরবর্তীকালে তাঁর বাবা মোসলেহউদ্দিন বগু পালোয়ান পরিচালনা করতেন। পাকিস্তান আমলে আখড়াটির নাম গামা রেসলিং ফিজিক্যাল ট্রেনিং স্কুল করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের পর আবার নাম পরিবর্তন করে 'বঙ্গবীর শরীরচর্চা কেন্দ্র' রাখা হয়।

তিনি আরো জানান, পাকিস্তান আমলে প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ছোট কাটরা ও বুড়িগঙ্গা নদীর মধ্যবর্তী চত্বরে অনুষ্ঠিত হতো কুস্তি প্রতিযোগিতা। পরবর্তীকালে প্রতিযোগিতার স্থান পরিবর্তিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর কয়েক বছর মিটফোর্ড ছাত্রাবাস মোড় এবং এরপর কয়েক বছর বুড়িগঙ্গার তীরে নলগোলা বালুর মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সত্তরের দশকের শেষভাগেও স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে নলগোলায় কুস্তি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতে দেখেছেন বলে দ্যা ডেইলি স্টারকে জানান। 

মৌলভীবাজার-আর্মাানিটোলা অঞ্চলের কুস্তির প্রধান আখড়া ছিল বর্তমান বেচারাম দেউড়ি নামে পরিচিত অঞ্চলে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় প্রাঙ্গণে। ক্রীড়া সংগঠক ও পুরান ঢাকার আনন্দ বেকারির কর্ণধার মোহাম্মদ ইউসুফ আলী শৈশব, কৈশোর তারুণ্যের সময় কাটিয়েছেন মৌলভীবাজার-আর্মাানিটোলা অঞ্চলে। বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক মোহাম্মদ ইউসুফ আলী দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, বিগত শতকের ষাটের দশকে প্রতি বছর বর্তমান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হতো কুস্তি প্রতিযোগিতা। এছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ দিবসে কুস্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো। মুক্তিযুদ্ধের পর সত্তরের দশকের প্রথমভাগেও প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে মৌলভীবাজারে কুস্তি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতে তিনি দেখেছেন বলে জানান। মোহাম্মদ ইউসুফ আলী আরো জানান, মৌলভীবাজারে কুস্তি প্রতিযোগিতার আয়োজনের রেওয়াজ বন্ধ হয়ে যায় মূলত সত্তরের দশকের শেষভাগে। 

প্রবীণ ক্রীড়া সাংবাদিক ও পুরান ঢাকার বাসিন্দা কাশীনাথ বসাক ঢাকার কুস্তি চর্চা সম্পর্কে বলেন, প্রতিটি মহল্লায় কুস্তি চর্চার যে সংস্কৃতি এককালে ঢাকায় ছিল, পাকিস্তান আমলে তার অবসান হয়। পাকিস্তান আমলে বিশেষত বিগত শতকের ষাটের দশকে ঢাকায় কুস্তি চর্চা হয়ে উঠে দিবস-ভিত্তিক। স্বাধীনতা দিবসসহ বিভিন্ন সরকারি দিবসে আয়োজন করা হতো কুস্তি প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরও দিবস-ভিত্তিক কুস্তি প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ঢাকার কুস্তি। 

বাংলাদেশ আমল

ঢাকায় কুস্তি খেলার বর্তমান অবস্থা জানতে কুস্তি খেলা তত্ত্বাবধান-কারি বিধ্বিদ্ধ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ অ্যামেচার রেসলিং ফেডারেশনে যোগাযোগ করা হলে সাধারণ সম্পাদক তবিবুর রহমান পালোয়ান পুরান ঢাকার অবস্থিত মোসলেহ উদ্দিন বগু ভাই শরীরচর্চা কেন্দ্র, সুরিটোলার ঢাকা ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার, মৌলভীবাজার যুব শরীর চর্চা কেন্দ্র, বংশালের মিল্লাত শরীরচর্চা কেন্দ্র, নাজিরাবাজার শরীরচর্চা কেন্দ্র, ছোট কাটরার বঙ্গবীর শরীরচর্চা কেন্দ্র, সদরঘাটের নবযুগ শরীরচর্চা কেন্দ্র, আমলীগোলার আজাদ মুসলিম ওয়েলফেয়ার কমপ্লেক্স নাম উল্লেখ করেন এবং ঢাকায় কুস্তি চর্চা বিষয়ক মাঠ পর্যায়ের তথ্য উল্লিখিত শরীরচর্চা কেন্দ্রসমূহ থেকে সংগ্রহ করতে পরামর্শ দেন।

কুস্তি ফেডারেশনের পরামর্শ অনুযায়ী, উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানসমূহ সরজমিন পরিদর্শন করা হয়। উল্লিখিত ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানের একটিতেও কুস্তির চর্চার কোনো ব্যবস্থা নেই। কুস্তি খেলার জন্য প্রয়োজন হয় লালমাটি ও তৈলাক্ত পদার্থ  মিশিয়ে তৈরি করা কুস্তিস্থল অথবা সিনথেটিক টার্ফ। ফেডারেশন ভুক্ত ঢাকা শহরের বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটিতে লালমাটি দিয়ে তৈরি কুস্তিস্থল অথবা সিনথেটিক টার্ফ নেই। পুরান ঢাকার উল্লিখিত কেন্দ্রগুলোতে এখন মূলত বডি বিল্ডিং ও ভারোত্তলন চর্চা হয়ে থাকে।

বিষয়টি নিয়ে পরবর্তীতে আবার ফেডারেশনে যোগাযোগ করা হলে তবিবুর রহমান পালোয়ান বলেন, ঢাকা শহরে কুস্তি খেলার জন্যে ফেডারেশনে একটি সিনথেটিক টার্ফ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ফেডারেশনের উদ্যোগে প্রতিযোগিতা, ট্যালেন্ট হাট ইত্যাদি ইভেন্টে  আয়োজন করা হয়। তখন এই সিনথেটিক টার্ফে খেলা হয়।

ফেডারেশনের কাছে রক্ষিত সিনথেটিক টার্ফে নিয়মিত কুস্তি চর্চা সুযোগ নেই। কারণ জায়গার অভাব। সদরঘাটের কুস্তি স্টেডিয়াম বিলুপ্ত করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন মালটিপারপাস ভবন তৈরির পর ঢাকায় বর্তমানে কুস্তি খেলার নির্ধারিত স্থায়ী কোনো স্থান নেই। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের জিমন্যানেশিয়াম, ভলিবল স্টেডিয়াম, কাবাডি স্টেডিয়াম, রোলার স্ক্যাটিং কমপ্লেক্স ইত্যাদি স্থান সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে কুস্তি ফেডারেশন প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করে থাকে। মাঝে মধ্যে অন্য ফেডারেশনের স্থানে চর্চা করতে গিয়ে অপ্রীতিকর পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশে কুস্তি খেলার বিধিবদ্ধ সংস্থা বাংলাদেশ অ্যামেচার রেসলিং ফেডারেশনভুক্ত ঢাকা শহরের ১৫টি ক্রীড়া সংগঠন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মোসলেহ উদ্দিন বগু ভাই শরীরচর্চা কেন্দ্র, স্টার অব বাংলাদেশ, ঢাকা সবুজ ক্লাব, নাজিম উদ্দিন রোড স্পোর্টিং ক্লাব, দ্য মুসলিম ইন্সটিটিউট, অগ্রণী সংসদ, ঢাকা ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার, মৌলভীবাজার যুব শরীর চর্চা কেন্দ্র, ঢাকা সিটি ক্লাব, মিল্লাত শরীরচর্চা কেন্দ্র, নাজিরাবাজার শরীরচর্চা কেন্দ্র, বঙ্গবীর শরীরচর্চা কেন্দ্র, নবযুগ শরীরচর্চা কেন্দ্র, আজাদ মুসলিম ওয়েলফেয়ার কমপ্লেক্স ও ক্রিসেন্ট ক্লাব।

বাংলাদেশ অ্যামেচার রেসলিং ফেডারেশন আয়োজিত সর্বশেষ ঢাকা মহানগর কুস্তি প্রতিযোগিতায় উল্লিখিত ১৫টি ক্রীড়া সংস্থা অংশ নিয়েছিল বলে ফেডারেশন সূত্রে জানা যায়। অনুসন্ধান-কালে জানা যায়, ১৫টি ক্রীড়া সংস্থার কুস্তি দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ঢাকা শহরে জন্মগ্রহণ ও বেড়ে উঠা একজন খেলোয়াড়ও নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ঢাকার কুস্তি ক্লাবগুলোর অধিকাংশ খেলোয়াড় বর্তমানে খুলনা, নড়াইল, যশোর, রাজশাহী, কুমিল্লা, মুন্সীগঞ্জ ইত্যাদি জেলা থেকে আগত।

বাংলাদেশ অ্যামেচার রেসলিং ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক মেসবাহউদ্দিন আজাদ এ প্রসঙ্গে বলেন, আগে ঢাকায় মহল্লায় মহল্লায় কুস্তির চর্চা হতো। ফলে প্রচুর কুস্তিগির ছিলেন ঢাকায়। কিন্তু ঢাকা শহরে এখন কুস্তির চর্চা হয় না। মহল্লাগুলোতে বডি বিল্ডিং এবং ভারোত্তোলন চর্চা হয়ে থাকে। তাই ঢাকায় বেড়ে উঠা কিশোর-তরুণদের মধ্যে এখন কুস্তিগির নেই। ফলে ঢাকার ফুটবল ক্লাবগুলোর মতো ঢাকার কুস্তির দলগুলোও গঠন করা হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খেলোয়াড়দের নিয়ে।

বাংলাদেশ অ্যামেচার রেসলিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক পালোয়ান এ প্রসঙ্গে বলেন, আমরা যখন খেলেছি, তখন ঢাকায় প্রচুর কুস্তি খেলোয়াড় ছিল। বিভিন্ন মহল্লায় ছিল কুস্তির আখড়া। কিন্তু এখন ঢাকায় কুস্তি চর্চার একটি স্থায়ী জায়গা নেই। চর্চার স্থায়ী জায়গা না থাকলে খেলোয়াড় তৈরি হবে কিভাবে? ঢাকা শহরে কুস্তি চর্চার জন্য দরকার একটি স্থায়ী জায়গা, যেখানে নিয়মিত কুস্তি চর্চা করা যাবে।

Comments

The Daily Star  | English
44 killed in Bailey Road fire

Tragedies recur as inaction persists

After deadly fires like the one on Thursday that claimed 46 lives, authorities momentarily wake up from their slumber to prevent recurrences, but any such initiative loses steam as they fail to take concerted action.

14h ago