শেষ মুহূর্তে স্পষ্ট হলো আ. লীগ-বিএনপির গৃহদাহ 

কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের মনোনয়ন জমা ও যাচাই-বাছাই শেষ হয়েছে। মেয়র পদে জমা দেওয়া ৬ জনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। তবে জমে উঠেছে মাঠের রাজনীতি, সামনে উঠে এসেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিভাজন।
(বামে থেকে) আরফানুল হক রিফাত, মাসুদ পারভেজ খান ইমরান, মনিরুল হক সাক্কু ও নিজাম উদ্দিন কায়সার। ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের মনোনয়ন জমা ও যাচাই-বাছাই শেষ হয়েছে। মেয়র পদে জমা দেওয়া ৬ জনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। তবে জমে উঠেছে মাঠের রাজনীতি, সামনে উঠে এসেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিভাজন।

বিএনপি নির্বাচনে আসবে না বলে আগেই ঘোষণা দিয়েছে। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন বিএনপির দুই নেতা, যাদের মধ্যে একজন বর্তমান মেয়র। তবে দুই জনকেই আজ বহিস্কার করেছে বিএনপি।

অপরদিকে আওয়ামী লীগ থেকে ১৪ জন মনোনয়নপ্রত্যাশীর মধ্যে একজন মনোনয়ন পেলেও 'বিদ্রোহী' একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে শেষ মুহূর্তে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। অনেকেই বলছেন, কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের ফল তাই যে কোনো দিকেই যেতে পারে।

শেষ মুহূর্তে আ. লীগের নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী

গত ১৩ মে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড কর্তৃক একক মেয়র প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণা করা হয় কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাতকে।

এতে দলের মনোনয়ন চেয়ে না পাওয়া ১৩ জন মনোনয়নপ্রত্যাশীর ১২ জনই দলীয় সিদ্ধান্তে অনুগত থাকেন। তবে শেষমুহূর্তে মঙ্গলবার মেয়র পদে নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা উপকমিটির সদস্য মাসুদ পারভেজ খান ইমরান।

যিনি প্রয়াত প্রবীন আওয়ামী লীগ নেতা আফজল খানের ছেলে ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আঞ্জুম সুলতানা সীমার ছোট ভাই।

এ বিষয়ে মাসুদ পারভেজ খান ইমরান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, তার প্রার্থীতা মূলত আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে নয়। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই গত ১০ বছর ধরে কুমিল্লায় আওয়ামী লীগ এমপি আ ক ম বাহাউদ্দীন বাহার ও বিএনপি নেতা মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। যা ইতোমধ্যে কুমিল্লাকে আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত করেছে।

তিনি দাবি করেন, কুমিল্লার জনগণ ও কর্মী বাহিনীর প্রত্যাশার চাপেই তিনি মেয়র প্রার্থী হয়েছেন। কুমিল্লার মানুষের জন্য রাজনীতি করেন তাই তার প্রার্থীতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাবে না বলেই তিনি বিশ্বাস করেন।

এরইমধ্যে তার বোন আঞ্জুম সুলতানা সীমা গত সোমবার মহানগর আওয়ামী লীগ (একাংশের) নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে নৌকার পক্ষে কাজ করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন।

দ্য ডেইলি স্টারকে সীমা জানান আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হয়ে নৌকার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। 

ছোট ভাই ইমরান খানের প্রার্থীতার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, এটি তার নিজের সিদ্ধান্ত। দলের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নিলে কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত আসে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগামী ২৬ তারিখ মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষদিন পর্যন্ত কোনো পরিবর্তন আসে কিনা দেখা যাক।

অন্যদিকে মাসুদ পারভেজ খান ইমরানের প্রার্থীতায় আওয়ামী লীগের ভোটে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত।

তবে কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা উপকমিটির সদস্য ইমরানের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন কিনা তা কেন্দ্রের উপর তা নির্ভর করছে বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতার স্বতন্ত্র প্রার্থীতার মধ্য দিয়ে এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঐক্যবদ্ধ একক প্রার্থীতায় কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।

স্বতন্ত্র প্রার্থী, অতঃপর বিএনপি থেকে বহিস্কার

দল নির্বাচন করবে না তাই দলীয় নয়, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন বর্তমান মেয়র ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনিরুল হক সাক্কু এবং মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি নিজাম উদ্দিন কায়সার।

নিজাম উদ্দিন কায়সার গতকাল দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছিলেন, তিনি মূলত কুমিল্লায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নির্বাচন করছেন। বর্তমান মেয়র সাক্কু বিএনপির আদর্শচ্যুত হয়েছেন বিধায় তিনি নিজেই বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। যদিও বিএনপি বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো ধরনের নির্বাচনে অংশ নেবে না।

অন্যদিকে বিএনপি নেতা মনিরুল হক সাক্কু দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, তিনি অতীতেও বিএনপি থেকে অব্যাহতি নিয়ে নির্বাচন করেছেন। যেহেতু বিএনপি নির্বাচন করবে না তাই জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি প্রার্থী হয়েছেন।

বিএনপির নিজাম উদ্দিন কায়সারের প্রার্থীতার ব্যাপারে তিনি বলেন, 'ও বাচ্চা ছেলে। যেহেতু রাজনীতি করে নির্বাচন করার তার অধিকার আছে।'

তবে আজ বৃহস্পতিবার মনোনয়ন জমা দেওয়ার একদিন পর দুই নেতাকেই বহিস্কার করেছে বিএনপি। সন্ধ্যায় দলীয় শৃঙ্খলা বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার জন্য কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মনিরুল হক সাক্কুকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে আজীবন বহিস্কার করা হয়েছে বলে জানানো হয়।

এর আগে বিকেলে সংগঠনের সব পর্যায়ের পদ থেকে কায়সারকে বহিস্কার করে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে প্রচার কিংবা পরোক্ষ নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবে না কোনো নেতাকর্মী।

পদত্যাগ করেছি: সাক্কু

এদিকে বহিস্কারের পর মনিরুল হক সাক্কু জানিয়েছেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে বিকেলেই চিঠি দিয়েছিলেন তিনি।

মনিরুল হক সাক্কু গণমাধ্যমকে বলেন, 'আজ আমার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। বিএনপির কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমি কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক থেকে পদত্যাগ করেছি।'

ইতোমধ্যেই পদত্যাগপত্র দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি রাবেয়া চৌধুরীর কাছে পাঠানো হয়েছে। পদত্যাগপত্রের অনুলিপি বিএনপি মহাসচিব ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

অপরদিকে আজ বেলা সাড়ে ১১টায় এক সংবাদ সম্মেলনে সিটি নির্বাচনে অপর মেয়র প্রার্থী মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন কায়সারও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এবং কুমিল্লা মহানগর শাখার সভাপতির পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে চিঠি দিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেন।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের এই প্রার্থীতা এবং বহিস্কার-পদত্যাগের খবরে এক ভোটার জানান, নির্বাচনের মোড় কোথাও না কোথাও ঘুড়ে যেতে পারে।

কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. শাহেদুন্নবী চৌধুরী জানান, মেয়র প্রার্থী হিসেবে ৬ জন মনোনয়ন দাখিল করেছিলেন। আজ বৃহস্পতিবার যাচাই বাছাই শেষে তাদের সবার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন।

গত ১৭ মে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিনে মোট ১৬৪ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। এর মধ্যে ৬ জন মেয়র প্রার্থী, ১২০ জন সাধারণ কাউন্সিলর এবং ৩৮ জন সংরক্ষিত কাউন্সিলর।

আগামী ২৬ মে প্রার্থীতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। ২৭ মে প্রতীক বরাদ্দ এবং ভোট আগামী ১৫ জুন।

Comments

The Daily Star  | English

Hefty power bill to weigh on consumers

The government has decided to increase electricity prices by Tk 0.34 and Tk 0.70 a unit from March, which according to experts will have a domino effect on the prices of essentials ahead of Ramadan.

9h ago