এখন ডিজিটাল লেনদেনের যুগ

এক প্রজন্ম যখন মানি অর্ডারের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে, অন্য প্রজন্ম তখন দ্রুত ডিজিটাল পেমেন্টের সুবিধার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।
অলঙ্করণ: আনোয়ার সোহেল/ স্টার ডিজিটাল গ্রাফিক্স

বছরের পর বছর ধরে একই নিয়মে দিন শুরু করছেন বগুড়ার এক নির্জন গ্রামের ৬৮ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক রহমান আলী।

তিনি সকালে নিজের জন্য চা বানিয়ে খবরের কাগজ পড়েন। তারপর নিজের গ্রামটি ঘুরে বেড়ান, স্কুলের আশেপাশে যান, সময় কাটান গ্রামের বাজারে।

তবে, তার আজকের কাজটি অন্যরকম। ঢাকায় মেয়ের জন্য মানি অর্ডার পাঠাতে স্থানীয় পোস্ট অফিসে যেতে হবে। এ কাজ তিনি আগেও বহুবার করেছেন।

আজকাল তিনি যখন পোস্ট অফিসে যান, তখন তার অন্যরকম অনুভূতি হয়। এক সময়ের ব্যস্ত পোস্ট অফিসে এখন মানুষ হাতে গোনা।

ঐতিহ্যের আনন্দ

রহমান আলীর কাছে মানি অর্ডার করে কোথাও টাকা পাঠানো নিছক লেনদেনের চেয়ে বেশি কিছু। এটি ঐতিহ্যও বটে।

তিনি সতর্কতার সঙ্গে ফর্ম পূরণ করেন। যত্নের সঙ্গে টাকা গোনেন। ডাক অফিসের অনেকে পরিচিত হওয়ায় কুশল বিনিময় করে তা তুলে দেন পোস্টমাস্টারের হাতে।

'আমি এই ব্যবস্থায় আস্থা রাখি,' আত্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি আরও বলেন, 'এটা নির্ভরযোগ্য। জানি, মেয়ে নিরাপদে টাকা পেয়ে যাবে।'

অন্যদিকে, ২৫ বছর বয়সী উদ্যোক্তা আয়মান সিদ্দিক ঢাকায় তার ছোট্ট অফিস থেকে হস্তশিল্পের ব্যবসা করছেন। অর্ডার-পেমেন্ট নিয়ে ব্যস্ত আয়মানের কাছে সময়টাই আসল।

তিনি বলেন, 'এক সময় পোস্ট অফিসে দাঁড়িয়ে থাকতে বিরক্ত লাগতো। এখন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে টাকা লেনদেন করতে পারি। সব বদলে গেছে।'

এক প্রজন্মের ব্যবধান

রহমান আলী ও আয়মান সিদ্দিকের ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেশের চলমান আর্থিক পরিস্থিতিতে দুই প্রজন্মের দুই ধরনের ভাবনাকে তুলে ধরে। এক প্রজন্ম যখন মানি অর্ডারের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে, অন্য প্রজন্ম তখন দ্রুত ডিজিটাল পেমেন্টের সুবিধার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, ২০১১-১২ অর্থবছরে দুই হাজার ২১৮ মানি অর্ডারের মাধ্যমে মোট লেনদেন হয় ৬২৫ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এই পরিমাণ টাকা লেনদেনের মাধ্যমে বোঝা যায় যে, এই ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থার ওপর মানুষের নির্ভরতা ছিল চোখে পড়ার মতো।

কিন্তু ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এই সংখ্যা কমে যায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। সে সময় ৭৯৬ মানি অর্ডারের মাধ্যমে পাঠানো হয় ১৯৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা। ডিজিটাল পদ্ধতি শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ের চিত্র এটি।

কয়েক বছর পর এই সংখ্যা আরও কমে যায়। ২০১৯-২০ সালে লেনদেন ৬২ দশমিক ১৯ শতাংশ কমে হয় ১১৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।

গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে ৯৯ মানি অর্ডারে লেনদেন হয়েছে ২২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এটি ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যাপক প্রসারকেই তুলে ধরছে।

ডিজিটাল পদ্ধতিতে লেনদেন বেড়ে যাওয়ায় বিগত বছরগুলোয় দেশে এমএফএস ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। লেনদেনের সংখ্যা ও টাকার পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে লেনদেন ছিল ১৩ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত তা বেড়ে হয়েছে ৪২ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। এমন প্রবৃদ্ধি ডিজিটাল পদ্ধতির চাহিদা ও সেবার মান সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেয়।

প্রচলিত মানি ট্রান্সফার পদ্ধতি থেকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল লেনদেনের দিকে। প্রতিবছরই ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে গ্রাহকের সংখ্যা বাড়ছে। গত এপ্রিলে এই সংখ্যা ছিল ৮৫ লাখের বেশি।

গত এপ্রিলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে মোট লেনদেন হয় ৯৭ হাজার ১০০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে তা ছিল তিন হাজার ৭৯০ কোটি টাকা।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের গবেষণা পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এখন প্রযুক্তি অনেক উন্নত। সবাই এই প্রযুক্তি গ্রহণ করছেন।'

ডিজিটাল ব্যবস্থার সুবিধা বেড়েছে কারণ লেনদেনের জন্য ঘর থেকে বের হতে হয় না। রাস্তায় যানজটে ভুগতে হয় না। করোনা মহামারির কারণে ডিজিটাল পরিষেবা অনেক বেড়ে যায়। কেননা, সেসময় কাউকে বাইরে না গিয়েই সবকিছু হাতে পেতে হয়েছিল।

ডিজিটাল পদ্ধতির সমস্যা প্রসঙ্গে অধ্যাপক বিদিশা বলেন, 'ডিজিটাল লেনদেন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের ওপর নির্ভর করে। গ্রামে এসব সবসময় থাকে না।'

ডিজিটাল শিক্ষার অভাবকে আরেকটি বাধা মনে করেন তিনি। তার ভাষ্য, 'পুরো প্রক্রিয়াটি নিজেকেই সারতে হয়। যেমন, আপনার পিন কোড কাউকে দেখালে ক্ষতি হতে পারে। প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেকেই সচেতনতার অভাবে এমনটি করে থাকেন।'

তিনি মনে করেন, ডিজিটাল লেনদেন দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। যত বেশি লেনদেন হয়, আর্থিক ব্যবস্থা তত শক্তিশালী হয়। জনগণ, বিশেষ করে বাজার ব্যবস্থার বাইরে থাকা নারীরা যাতে এই ধরনের পরিষেবা নিতে পারেন সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

ঢাকা মহানগর সার্কেলের পোস্টমাস্টার জেনারেল ফরিদ আহমেদ ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ডাক অধিদপ্তরে খুব কম খরচে ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার সার্ভিস (ইএমটিএস) বা লেনদেনের ব্যবস্থা আছে।'

'দেশের গ্রামগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে এটিকে আরও কার্যকর করতে ইউনিয়ন পর্যায়ে সুবিধা জোরদার করতে হবে। উপজেলার সাব-পোস্ট অফিসগুলো ইএমটিএস পরিষেবা দিচ্ছে,' যোগ করেন তিনি।

পরিবর্তনকে মেনে নিন

বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শরিফা ঐশী তার অভিজ্ঞতা জানিয়ে ডেইলি স্টারকে বলেন, 'টাকা লেনদেন সবসময়ই ঝামেলার। মনে আছে বাবা-মা উৎসবের আগে দাদা-দাদিকে মানি অর্ডারে টাকা পাঠাতেন। এই প্রক্রিয়াটি ধীর।'

'এখন মানি অর্ডার করি না। বিকাশ ও নগদে টিউশনির টাকা দিই, বই কিনি। বন্ধুদের সঙ্গে বিল ভাগাভাগি করে নিই। এমনকি টিউশনির টাকা পাই।'

ঐশীর মতো দেশের লাখো তরুণ ডিজিটাল ব্যবস্থায় টাকা লেনদেন করছেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো অনেক সুবিধা দিচ্ছে। কোনো দীর্ঘ লাইন নেই, নগদ টাকার প্রয়োজন হয় না। যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গায় টাকা পাঠানো যায়।

নগদ লিমিটেডের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হেড অব মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশনস মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ডিজিটাল ব্যবস্থায় লেনদেনের ক্ষেত্রে গত ১৩-১৪ বছরে প্রযুক্তিগত ব্যাপক উন্নতি হওয়ায় এটি সম্ভব হয়েছে।'

'এখন টাকা পাঠাতে কয়েক সেকেন্ড লাগে। আমরা যদি ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সুফল নিশ্চিত করতে পারি তাহলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী সহজেই এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারবে।'

তিনি মনে করেন, এসব সুযোগ-সুবিধা ও ডিজিটাল ব্যবস্থা সম্পর্কে গ্রামের মানুষকে আরও শিক্ষিত করতে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার লড়াই

সবাই ডিজিটাল ব্যবস্থাকে সহজ বলে মনে করেন না। যেমন, ৫৫ বছর বয়সী ইয়াসমিন আরা ডিজিটাল পরিষেবা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।

তিনি বলেন, 'পোস্ট অফিসের ওপর আমার ভরসা অনেক। ডিজিটাল ব্যবস্থাকে জটিল মনে হয়। একবার ভুল নম্বরে টাকা পাঠিয়েছিলাম। তারপর তা কীভাবে ফিরে পাব তা নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তা হয়েছিল।'

শুধু যে তারই এমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল এমন নয়। অনেক বয়স্ক ব্যক্তি ডিজিটাল পেমেন্টে ভয় পান। তারা টাকার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন। তারা প্রচলিত পদ্ধতির ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও টাকার নিশ্চয়তাকে বেশ গুরুত্ব দেন।

ইয়াসমিন তার প্রযুক্তিবান্ধব ছোট ছেলের সহায়তায় সম্প্রতি ডিজিটাল ব্যবস্থায় টাকা লেনদেন করেছেন। তিনি যতটা জটিল ভেবেছিলেন তা ততটা জটিল নয়। তবুও মানি অর্ডার পুরোপুরি ছাড়াতে চান না তিনি।

দেশে যত উদ্ভাবনী কাজ হচ্ছে, টাকা লেনদেনের ভবিষ্যৎ ততই ডিজিটাল হচ্ছে। শুধু পরিসংখ্যানের দিক থেকে মানি অর্ডার কমে গেছে বিষয়টি তা নয়। এ থেকে বোঝা যায় যে দেশ আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে আরও ডিজিটাল ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

আয়মান, ঐশী ও তাদের মতো লাখ লাখ মানুষের ডিজিটাল লেনদেন দেশের অগ্রগতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রহমান আলী ও ইয়াসমিন আরার জন্য 'ঝামেলাপূর্ণ' মনে হলেও তাদেরকে সেদিকেই যেতে হচ্ছে।

বিকাশের চিফ কর্মাশিয়াল অফিসার আলী আহম্মেদ ডেইলি স্টারকে বলেন, 'অংশীদারদের সহায়তার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার দিকনির্দেশনা চলমান থাকলে এমএফএস খাতে ধারাবাহিক উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের ডিজিটাল ব্যবস্থায় আর্থিক লেনদেনকে শক্তিশালী করা কঠিন হবে না।'

দেশে ২২ কোটি ৬০ লাখ এমএফএস অ্যাকাউন্ট আছে। এর মধ্যে ৫৬ দশমিক ২১ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে। গ্রামে এমএফএস ব্যবহারকারীদের ৫৭ দশমিক শূন্য সাত শতাংশ নারী।

এ থেকে বোঝা যায়, গ্রামের মানুষের এমএফএস অ্যাকাউন্টের সংখ্যা শহরের বাসিন্দাদের তুলনায় বেশি। বিশেষ করে নারীদের এমএফএসের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কাজে যুক্ত হওয়া গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ওপর নানান প্রভাব ফেলছে।

এটি মূলত দুই প্রজন্মের গল্প। প্রত্যেকে তাদের নিজেদের মতো করে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। দেশ যেহেতু ডিজিটাল যুগের দিকে যাচ্ছে তাই এই পরিবর্তন সবাইকে সহজে অর্থ লেনদেনের সুবিধা দেবে এটাই প্রত্যাশা।

Comments