গোলাপখাস, রানিপছন্দ, সূর্যপুরী, বউভোলানো, হাতিঝোলা—আমের এমন নাম শুনেছেন?
গোলাপখাস, রানিপছন্দ, সূর্যপুরী, বউভোলানো, হাতিঝোলা—নামগুলো একসঙ্গে বললে প্রথমে মনে হয়, এগুলো বুঝি আলাদা আলাদা গল্পের চরিত্র। কিন্তু উত্তরবঙ্গের আমবাগানে দাঁড়ালে বোঝা যায়, এরা গল্প না—মাটির ভেতর থেকে উঠে আসা বাস্তব স্বাদ, গন্ধ আর সময়ের আলাদা আলাদা চিহ্ন। কোনোটি ঘ্রাণের কারণে, কোনোটি স্বাদের, কোনোটি আবার একেবারে আকার দেখে। কিন্তু সমস্যা একটাই—এই নামগুলোর কোনো একক মান নেই। একই নাম, একেক জেলা, একেক চেহারা। তবু চাষিদের স্মৃতি, গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকার অভিজ্ঞতা আর কৃষি অফিসের পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে এদের একটা মোটামুটি রূপ দাঁড় করানো যায়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ—এই তিন জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল একসময় দেশি আমের এক ধরনের জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া ছিল। এখনো আছে, কিন্তু ফিকে হয়ে এসেছে সেই বৈচিত্র্য। বাজারে কিছু নির্দিষ্ট জাতের দাপট, পরিবহনের চাপ, আর দ্রুত ফলনের চাহিদা—সব মিলিয়ে বহু পুরোনো জাত ধীরে ধীরে গাছ থেকে হারিয়ে এখন থেকে গেছে শুধু মানুষের স্মৃতিতে।
গোলাপখাস দিয়েই শুরু করা যাক। গোলাপখাসের ক্ষেত্রে প্রথমেই চোখে আসে এর রঙ। পাকার সময় খোসা হালকা সোনালি হলুদ, কোথাও কোথাও লালচে ব্লাশ—যেন সূর্য ডুবে যাওয়ার পর আকাশের শেষ আলোটা ফলের গায়ে আটকে গেছে। আকারে ছোট থেকে মাঝারি, একটু ডিম্বাকৃতি, হাতে নিলে খুব ভারী নয়। কেটে ফেললে ভেতরের শাঁস নরম, মসৃণ, প্রায় ক্রিমের মতো। রস খুব বেশি না হলেও ঘন। খাওয়ার সময় প্রথম ধাক্কা দেয় একটা হালকা আতর ধরনের সুবাস, তারপর ধীরে ধীরে আসে নরম মিষ্টতা।
নওগাঁর সাপাহারনিবাসী সোলায়মান আলীর রয়েছে বিশাল আমবাগান। সেখানে আছে সাত-আট প্রকারের আমগাছ। আমচাষের সঙ্গে বহুদিন ধরে যুক্ত এই মানুষটি এখনো বাগানে আগলে রেখেছেন কিছু দেশি জাতের স্মৃতি, যদিও বাজারের কারণে বেশিরভাগ জায়গা দখল করে নিয়েছে পরিচিত বাণিজ্যিক আম। এই আমগুলোর ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘গোলাপখাস পাকার সময় গাছের নিচে দাঁড়ালে আলাদা একটা গন্ধ পাওয়া যায়। খুব বেশি তীব্র না, কিন্তু খেয়াল করলে বোঝা যায় এটা অন্য আমের মতো না। কেটে খাওয়ার সময় প্রথমে ওই ঘ্রাণটা আসে, তারপর নরম মিষ্টি স্বাদটা মুখে লাগে। এখন এই আমটা আগের মতো চোখে পড়ে না, গাছ আছে কিন্তু ফলন আর আগের মতো নেই।’
রানিপছন্দ আমের গড়নটা একটু আলাদা। এটি সাধারণত মাঝারি আকারের, লম্বাটে-ডিম্বাকৃতি। পাকার সময় খোসা গভীর হলুদ হয়ে ওঠে, কখনো সবুজের হালকা রেখা রয়ে যায়। সূর্যের আলোতে এর গায়ে একটা মসৃণ উজ্জ্বলতা দেখা যায়, যেন তেল মাখানো। ভেতরের শাঁস ঘন, প্রায় আঁশহীন, কাটা অংশে পরিষ্কার কমলা-হলুদ রঙ ধরা পড়ে। সোলায়মান আলী রানিপছন্দ নিয়ে বলেন, ‘এই আমটা খুব বেশি কড়া মিষ্টি না। কিন্তু খেলে স্বাদটা মুখে লেগে থাকে। গলা ভরিয়ে দেয় না, বরং ধীরে ধীরে মুখে লাগে।’
সূর্যপুরী আবার দেখতে একেবারেই অন্যরকম। কাঁচা অবস্থায় গাঢ় সবুজ, মাঝে মাঝে হালকা ধূসর আভা। পাকলে সেটা ধীরে ধীরে হলুদ-সবুজ মিশ্র রঙে বদলায়, যেন রোদ আর ছায়া একসঙ্গে আটকে আছে খোসার ভেতরে। আকার মাঝারি, একটু লম্বাটে। কাটলে ভেতরের শাঁস উজ্জ্বল কমলা-হলুদ, মাঝেমধ্যে আঁশ চোখে পড়ে, কিন্তু সেটা স্বাদের ভেতরেই একটা আলাদা আবহ তৈরি করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট ইউনিয়নের কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার আবদুল্লাহ আল আজাদী বলেন, 'সূর্যপুরী আম ঠাকুরগাঁওয়ের। আগে এদিকেরও পুরোনো বাগানগুলোয় ছিল। এখন বাণিজ্যিক জাতের কারণে এই ধরনের দেশি আম কমে গেছে। শুধু সূর্যপুরী না, পুরো রাজশাহী অঞ্চলেই দেশি আমের বৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে। আগে একেকটা গ্রামে আলাদা আলাদা স্বাদের দেশি আম ছিল, এখন সেই সংখ্যা অনেক কম। কৃষকরা এখন এমন জাত বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন যেগুলো দ্রুত ফলন দেয়, দেখতে আকর্ষণীয় এবং বাজারে সহজে বিক্রি হয়।'
তিনি আরও বলেন, ‘এটা শুধু সূর্যপুরীর গল্প না, এটা পুরো দেশি আমের হারিয়ে যাওয়ার গল্প। অনেক আমের নাম এখন নতুন প্রজন্ম জানেই না। গাছ থাকলেও আগের চেয়ে সংখ্যা অনেক কমে গেছে।’ কাঁচা সূর্যপুরী তীব্র টক, কাটা অংশে সবুজ-সাদা টোন, মুখে দিলে ঝাঁঝালো অনুভব দেয়। কিন্তু পাকলে সেই টক নরম হয়ে ভেতরে ঢুকে যায়, রেখে যায় টক-মিষ্টির ভারসাম্য—যেটা একসময় একে আচার আর ঘরোয়া ব্যবহারের জন্যও জনপ্রিয় করেছিল।
বউভোলানো নামটার উৎস কী তা নিশ্চিত জানা যায় না। ধারণা করা হয় নরম, মিষ্টি এই আমটি দিয়ে স্বামীরা নতুন বউয়ের মন জয় করতেন। এই আমের আকারও একটু আলাদা। কোথাও এটি ছোট, প্রায় ডিমের মতো, কোথাও একটু লম্বাটে। পাকলে খোসা খুব হালকা হলুদ, প্রায় সাদা-হলুদ মিশ্র রঙে চলে যায়। কাটার সঙ্গে সঙ্গেই ভেতর থেকে খুব নরম, প্রায় গলে যাওয়া শাঁস বের হয়। রঙ গভীর কমলা, রস এত বেশি যে অনেক সময় হাতে লেগে থাকে। আবদুল্লাহ আল আজাদী বলেন, ‘বউভোলানো নামে যে আমটার কথা বলা হয়, এটা মূলত চাঁপাইয়ের আম। এটা খুব মিষ্টি, নরম ও সুস্বাদু আম, তাই হয়তো এমন নাম হয়েছে। তবে এক জায়গার বউভোলানো আরেক জায়গার থেকে স্বাদে কিছুটা আলাদা হতে পারে। তাই এটাকে একক পরিচয়ে ধরা কঠিন।’ এই আম এতটাই নরম যে বেশি পাকলে অনেক সময় চামচ দিয়েও খেতে হয়।
হাতিঝোলার নামের কারণ এর আকার। বড়, ভারী, হাতে তুললেই ওজন টের পাওয়া যায়। খোসা মোটা, সবুজ থেকে হলুদে বদলায় ধীরে। কাটলে ভেতরের শাঁস তুলনামূলক কম হলেও ঘন রসালো অংশ চোখে পড়ে। রঙ সাধারণত গাঢ় হলুদ, কখনো কমলা-হলুদের মিশ্রণ। সোলায়মান আলী বলেন, ‘হাতিঝোলা আমগুলো খুব বড় হয়। একেকটা হাতে নিতে গেলে ভার লাগে। গাছ থেকে নামানোও সহজ না। খেতে গেলে মনে হয় একটা আমেই পেটভরে অনেকটা খাওয়া হয়ে গেল।’ এই ধরনের আম সাধারণত বেশ ভারী একটা অনুভূতি দেয়। আকারের কারণে একে আলাদাভাবে মনে থাকে।
এই পরিচিত নামগুলোর বাইরে আরও বহু দেশি আম ছিল—ক্ষীরসাপাত, লক্ষ্মণভোগ, গোবিন্দভোগ, তোতাপুরী, মল্লিকা, দশেরী, নীলম—যাদের কেউ কেউ এখনো টিকে আছে, কেউ আবার আধুনিক জাতের ভিড়ে প্রায় অদৃশ্য। আবদুল্লাহ আল আজাদী বলেন, ‘আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি বাজারের চাপ, দ্রুত ফলন, পরিবহন সুবিধা আর বাণিজ্যিক চাহিদা—সব মিলিয়ে পুরোনো দেশি জাতগুলো ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। নতুন জাতগুলো চকচকে, ইউনিফর্ম, সহজে বহনযোগ্য—ফলে বাজারে এগুলোর দাপট বাড়ছে।’
কিন্তু এই পরিবর্তনের ভেতরে একটা নিঃশব্দ ক্ষয় আছে; গন্ধের বৈচিত্র্য, স্বাদের ভিন্নতা, আর নামের ভেতরের গল্পগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। নওগাঁর সাপাহার উপজেলার সোলায়মান আলীর বাগান তাই শুধু ফলচাষের জায়গা না, হারিয়ে ফেলা সময়ের এক ধরনের রেফারেন্স পয়েন্টও।
তিনি বলেন, ‘আমের অনেক নাম এখন আর কেউ মনে রাখে না। কিন্তু গাছে যখন ফল ধরে, তখন মনে হয় পুরোনো সময়টা এখনো বেঁচে আছে। কিছু স্বাদ আসলে হারায় না, শুধু চোখের আড়ালে চলে যায়।’
গোলাপখাসের হালকা গোলাপি গন্ধ, রানিপছন্দের সোনালি রঙ আর স্নিগ্ধ মিষ্টি, সূর্যপুরীর রোদ-ভেজা টক স্বাদ, বউভোলানোর নরম গলে যাওয়া আদুরে স্বাদ আর হাতিঝোলার বড় আকার ও মিষ্টতা—সব মিলিয়ে এই আমগুলো শুধু ফল না, গ্রামবাংলার হারাতে বসা এক আর্কাইভ।

