সাপাহার এখন ৩ হাজার কোটি টাকার আমের বাজার

জুন থেকে আগস্ট—এই দুই মাস নওগাঁর সাপাহার উপজেলা শহরের চারমাথা-জিরো পয়েন্টে দাঁড়ালে চারদিকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার পর্যন্ত দেখা যাবে শুধু আমের ক্যারেট (ফল পরিবহনের প্লাস্টিকের ঝুড়ি)। অথচ, পাঁচ বছর আগেও এমনটা দেখা যায়নি।
সেই ভোরে শুরু হয়, তারপর রাত পর্যন্ত চলে সাইকেল থেকে অটোরিকশা, অটোরিকশা থেকে কাভার্ডভ্যান, কাভার্ডভ্যান থেকে বাস-ট্রাকে লাখো ক্যারেট আম পরিবহন।
এ দৃশ্য নওগাঁর সাপাহার আম বাজারের। সাহাপার বাজারে জুলাই থেকে শুরু করে প্রায় আড়াই মাস ধরে এই একই দৃশ্য দেখা যায়।
সাপাহার উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সাপাহার বাজার থেকে গত বছর প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার আম সারাদেশে গেছে। এখানে নওগাঁ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও জয়পুরহাটের কৃষকরাও আম নিয়ে আসেন।

সাপাহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেলিম আহমেদ বলেন, সাপাহার দেশের সবচেয়ে বড় আম বাজার। এর ইজারা মূল্য দুই কোটি ২১ লাখ টাকা।
১০ বছরে যেভাবে বদলেছে নওগাঁর কৃষি মানচিত্র
ধানের জন্য বিখ্যাত নওগাঁ জেলা। তবে গত ১০ বছরে আম চাষের জন্য খ্যাতি অর্জন করেছে। বদলে গেছে নওগাঁর কৃষি মানচিত্র।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৫ সালেও নওগাঁয় আম চাষ হয়েছে ৬ হাজার হেক্টরের কম জায়গায়। ২০১৭ সালে নওগাঁয় আমের বাগান ছিল ১৭ হাজার ৯০৭ হেক্টর জমিতে। বর্তমানে এ জেলায় আম বাগানের পরিমাণ ৩০ হাজার ৩০০ হেক্টর। এ বছর নওগাঁয় আম উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৯০ হাজার টন, যার বাজার মূল্য প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
স্থানীয় কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা জানা গেছে, নওগাঁয় সেচের পানির তীব্র সংকট থাকায় অনেক উঁচু জমিতে কোনো ফসল উৎপাদন করা যেত না। কিন্তু ২০০০ সালের পর চাঁপাইনবাবগঞ্জের কিছু কৃষক নওগাঁয় জমি লিজ নিয়ে আম বাগান করে সফল হন। তখন থেকে স্থানীয় কৃষকরাও আম বাগান শুরু করেন।

২০১৪ সালে সাপাহারের রুপগ্রামের কৃষক সোহেল রানা মাত্র ১২ বিঘা জমিতে আম চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তিনি প্রায় ২০০ বিঘা জমিতে বিভিন্ন জাতের আম চাষ করছেন।
সোহেল রানা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এই এলাকার মানুষের জমিজমা অনেক। কিন্তু ধান চাষে আগে অনেক লোকসান হতো। ২০০০ সাল পর্যন্ত কেবলমাত্র বর্ষায় উঁচু জমিতে কিছু আমন ধানের চাষ হতো, বাকি সময় অনাবাদী থাকতো।'
তিনি আরও বলেন, 'এ সময় থেকে নওগাঁয় আম্রপালি চাষ শুরু হয়। কৃষক লাভবান হতে শুরু করে। এক বিঘা জমিতে আম চাষ করে তখন কৃষক বিঘায় ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা মুনাফা পেতো। সেই থেকেই উঁচু জমিতে আম বাগান শুরু করে সবাই।'
'বর্তমানে মুনাফা কিছুটা কম হলেও প্রতি বিঘা জমিতে লাভের পরিমাণ ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা,' যোগ করেন সোহেল।
তার ভাষ্য, 'প্রথম দিকে প্রতিবিঘা জমিতে আম চাষে খরচ কম ছিল। জমি ১০ থেকে ১২ বছরের জন্য লিজ নিতে খরচ হতো ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। বর্তমানে প্রতিবিঘা জমি ১২ বছরের জন্য লিজ নিলে জমির মালিককে দিতে হয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। প্রতি মৌসুমে একবিঘা জমিতে আম চাষের খরচ বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার টাকা।'

নওগাঁ পোরশা উপজেলার বন্ধুপাড়ার রায়হান সিদ্দিকী নিজের ৮ বিঘা জমিতে ২০০৪ সালে প্রথম আম চাষ শুরু করেন।
দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, 'এখন প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে গৌরমতি চাষ করেছি। খরচ বাদ দিয়ে প্রতি বিঘায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হয়। অথচ আগে এই জমিতে ধান চাষ করে বিঘায় পেতাম মাত্র ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা।'
নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার গোবিন্দবাটী গ্রামের কৃষক সাখাওয়াত হাবিব মাত্র ৪ বিঘা জমিতে আম চাষ শুরু করেন ২০০৬ সালে। বর্তমানে ৪৬০ বিঘা জমি লিজ নিয়ে তিনি আম চাষ করছেন।
সাখাওয়াত দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'শুরুর দিকে উৎপাদন খরচ কম ছিল। বর্তমানে জমির দাম বেশি, তাই উৎপাদন খরচও বেশি। আবার গত তিন বছর ধরে থ্রিপস নামের পোকা আমের রং কালো করে দিচ্ছে। কোনো কিটনাশকে কাজ হচ্ছে না। এর জন্য দাম কম পাচ্ছি।'

কৃষকের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও জীবনমানের উন্নয়ন
উঁচু জমিতে ধানের পরিবর্তে আম চাষে ভাগ্য বদলেছে কৃষকের। আম চাষে কৃষকের হাতে বেড়েছে নগদ টাকার পরিমাণ, সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থান। জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হয়েছে বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সেইসঙ্গে বেড়েছে জমির আর্থিক মূল্য।
কৃষক সোহেল রানা বলেন, 'আম চাষে কৃষকের জীবনমানের উন্নতি হয়েছে। সাপাহারে অবকাঠামোগত উন্নয়ন দৃশ্যমান। নতুন স্কুল-কলেজ হচ্ছে, গড়ে উঠছে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক। ফলে অন্যান্য উপজেলা থেকে মানুষ এখন সাপাহারে আসছেন।'
সরকারি-বেসরকারি মিলে প্রায় ৮টি ব্যাংক রয়েছে সাপাহারে। আমের মৌসুমে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেই কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে।
তার মতে, ২০১০ সালে সাপাহার শহরে যে জমির দাম ৫০ হাজার টাকা শতক ছিল, তা এখন ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা। নওগাঁ ও বগুড়া জেলা শহরের চেয়েও এখানে জমির দাম বেড়ে গেছে।

সাপাহার উপজেলা আম আড়ৎদার সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমাম হোসেন রিফাত দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, '২০০৭ সালের পর থেকে সাপাহার বাজারে প্রায় ৫০০টি আমের অস্থায়ী বাজার গড়ে উঠেছে। এখানে তিন মাসের জন্য প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। মৌসুমে প্রতিদিন প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ গাড়ি আম দেশের বিভিন্ন জেলায় যায়।'
রপ্তানি সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত মৌসুমে সারাদেশ থেকে আম রপ্তানি হয়েছিল ১ হাজার ২৯০ টন। এ বছর ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত আম রপ্তানির পরিমাণ ২ হাজার ১৬৭ টন।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত বছর নওগাঁ থেকে মাত্র ৬৩ টন আম ইউরোপে রপ্তানি হয়েছে। কিন্তু এ বছর ২৪ আগস্ট পর্যন্ত নওগাঁ থেকে ইউরোপে প্রায় ২৮৭ টন আম রপ্তানি হয়েছে।
সোহেল রানা এ বছর কাতারে বাংলাদেশ দূতাবাসের আয়োজনে আম উৎসবে সাড়ে চার টন আম বিক্রি করেছেন। প্রতিকেজি আম কাতারে পাঠাতে তার খরচ হয়েছে ৩৫০ টাকা। কেজিতে মুনাফা করেছেন ৩০০ টাকা।

তার ভাষ্য, 'বাংলাদেশে যে পরিমাণ আম উৎপাদন হচ্ছে, তার ২০ শতাংশও যদি রপ্তানি করা যায়, তাহলে ফল আমদানিতে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়, তারচেয়ে বেশি আয় করা সম্ভব।'
'আমি অনেক দেশ ঘুরে দেখেছি, তারা বিলিয়ন ডলার মূল্যের আম প্রক্রিয়াজাত পণ্য, যেমন—ড্রাই ম্যাংগো, ম্যাংগো পাউডার, ম্যাংগো পাল্প, আমের জ্যাম-জেলি রপ্তানি করে। অথচ আমাদের দেশের ৩০ শতাংশ আম পঁচে নষ্ট হয়,' যোগ করেন তিনি।
তিনি মনে করেন, 'আমাদের শিক্ষিত ছেলে-মেয়েদের যদি সরকার প্রশিক্ষণ দেয়, তাহলে আম প্রক্রিয়াজাত পণ্য হিসেবে রপ্তানি করেও আমরা বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারি।'
সাপাহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমের মৌসুমে সরকার যদি রাজশাহী বিমানবন্দর থেকে একটি কার্গো বিমান পরিচালনার ব্যবস্থা করে, তাহলে উত্তরবঙ্গ থেকে অনেক বেশি আম রপ্তানি করা সম্ভব।'

সেন্ট্রাল প্যাকিং হাউসের উপ-পরিচালক আমিনুর রশিদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'বাংলাদেশে এখন অনেক কৃষক রপ্তানিযোগ্য আম চাষে সক্ষম। কিন্তু ভাড়া বেশি হওয়ায় বেশি আম রপ্তানি করতে পারছে না এক্সপোর্ট কোম্পানিগুলো। এ বছর প্রতিকেজি আম ইউরোপে পাঠাতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৬০০ টাকা। অথচ দুবছর আগেও সেটা ছিল ২৫০ টাকার কম।'
হযরত শাহজালাল অন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মরত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহজাহান সিরাজ বলেন, 'আম রপ্তানির একটি বড় সমস্যা হলো, এক এক দেশের নিয়ম এক এক রকম। এসব শর্ত পূরণে অনেক ধরনের প্রযুক্তি লাগে। এ ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।'
তবে, আম রপ্তানিতে অচিরেই উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমাদের কোনো কার্গো বিমান নেই। একই আম ভারত-পাকিস্তান অনেক কম ভাড়ায় রপ্তানি করছে। অথচ, আমাদের ভাড়া পড়ে তাদের দ্বিগুণ। কেজিপ্রতি ২০০ টাকা বেশি দিয়ে বিদেশিরা আমাদের আম কেন কিনবে? এটি আমোদের আম রপ্তানির বড় প্রতিবন্ধকতা।'
Comments