খাদ্যাভ্যাস যেভাবে মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে

শবনম জাবীন চৌধুরী

রাত দুইটা। আশরাফ হোসেনের টেবিলে ইতোমধ্যে পাঁচ-ছয়টি খালি চায়ের কাপ জমে গেছে। আগামীকাল অফিসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের ফাইল জমা দেওয়ার শেষ সময়। সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে রাতের খাবার সেরেই তিনি ল্যাপটপ নিয়ে কাজে বসেছেন।

ঘড়ির কাঁটা যত সামনে এগোচ্ছে, ততই যেন বাড়ছে আশরাফের টেনশন—‘কালকে ঠিকঠাক ফাইলটা জমা দিতে পারব তো?’ আর এমন মানসিক অবস্থায় তার মন বারবার কেবল এক কাপ চাতেই যেন স্বস্তি খুঁজে ফিরে।

আমাদের মানসিক অবস্থার ওপরে খাদ্যাভ্যাস অনেকটাই নির্ভরশীল। মন, শরীর ও ওজনের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম সমীকরণ রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য ও খাদ্যাভ্যাসের এই সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার।

নেগেটিভ সেলফ-ইমেজ

আমাদের বডি ইমেজের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কারও ওজন বেশি হলে তার মধ্যে এক ধরনের হীনমন্যতা তৈরি হতে পারে। এই নেগেটিভ সেলফ-ইমেজ বিভিন্নভাবে তার মধ্যে বিষণ্ণতা সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে একজন ব্যক্তি ওজন কমানোর জন্য প্রয়োজনের তুলনায় কম খেতে শুরু করতে পারেন।

ঠিক একইভাবে, যারা আন্ডারওয়েট, তারা লো ড্রাইভ হয়ে যেতে পারে এবং আত্মবিশ্বাস কমে যায়। ওজন বাড়ানোর জন্য তারা খাদ্যাভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসেন। অনেক সময় তারা বিভিন্ন ফাস্ট ফুড ও অন্যান্য অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন।

অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা

অনেকেই নিজের শারীরিক গঠন ও আউটলুক নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসাতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কথা। এই ধরনের ব্যক্তিরা অত্যন্ত রোগা হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের স্থূল মনে করেন এবং খাবার নিয়ে অতিরিক্ত হিসাব-নিকাশ করেন।

তারা ওজন কমানোর জন্য খাবার এড়িয়ে চলেন বা পর্যাপ্ত পরিমাণে খেতে চান না। বিভিন্ন ডায়েট প্ল্যান অনুসরণ করে কিংবা দীর্ঘ সময় উপবাস থেকে তারা দৈনন্দিন খাবারের পরিমাণ অত্যন্ত কমিয়ে ফেলেন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে খাওয়ার পর ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করেন।

বিষণ্ণতা

বিষণ্নতায় আক্রান্ত হলে কারও ক্ষুধা বেড়ে যেতে পারে, আবার কারও ক্ষুধা কমে যেতে পারে। কোনো ধরনের ডায়েট পরিকল্পনা ছাড়াই এক মাসের মধ্যে শরীরের ওজন ৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া বিষণ্ণতায় একটি লক্ষণ হতে পারে। ক্ষুধা বেড়ে গেলে ডিপ্রেসিভ ওভারইটিং দেখা দিতে পারে, আর ক্ষুধামন্দা দেখা দিলে খাদ্যগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

মানসিক চাপ

খেয়াল করলে দেখবেন, আমরা যখন মানসিক চাপে থাকি, তখন অনেকেরই মিষ্টি, চিনি, জাঙ্ক ফুড বা কার্বোহাইড্রেটজাতীয় খাবারের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যায়। এই ধরনের খাবার সাময়িকভাবে ভালো লাগার অনুভূতি সৃষ্টি করে।
মিষ্টিজাতীয় খাবার খেলে তা আমাদের মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামিক-পিটুইটারি-অ্যাড্রেনাল এক্সেসকে প্রভাবিত করে এবং স্ট্রেস বা মানসিক চাপের প্রতি শরীরের প্রতিক্রিয়াকে সাময়িকভাবে কমিয়ে দিতে পারে। এর ফলে কিছু সময়ের জন্য মন স্বস্তিবোধ করতে পারে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে বারবার এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস ওজন বৃদ্ধি, বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা এবং মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

ম্যালঅ্যাডাপটিভ কোপিং

মন খারাপ হলে অতিরিক্ত খাওয়া একটি ভুল মোকাবিলা কৌশল, যাকে ম্যালঅ্যাডাপটিভ কোপিং বলা হয়। মন খারাপের সময় আমরা খোলা জায়গায় কিছুক্ষণ হাঁটতে যেতে পারি, জিমে গিয়ে ব্যায়াম করতে পারি, ডায়েরি লেখার অভ্যাস থাকলে নিজের অনুভূতিগুলো সেখানে লিখে রাখতে পারি অথবা পছন্দের কোনো মানুষের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারি। এসব কৌশলকে অ্যাডাপটিভ কোপিং বলা হয়।

কিন্তু অনেক সময় আমরা এসব স্বাস্থ্যকর উপায় অনুসরণ না করে মন খারাপের সময় অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি খোঁজার চেষ্টা করি।

মানসিক রোগ

কিছু মানসিক রোগে, যেমন সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই অপুষ্টিতে ভোগেন। এর একটি কারণ হলো তাদের মধ্যে এমন একটি ভ্রান্ত বিশ্বাস তৈরি হতে পারে যে তাদের খাবারে বিষ মেশানো হয়েছে। এই ধারণার কারণে তারা খাবার খেতে চান না। ফলে তাদের ওজন কমে যেতে পারে এবং বিভিন্ন ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।