অপরাধ ও বিচার

‘একটা কন্ট্রাডিকশন দিলেই খুনির আসামিও খালাস পায়, অথচ ১০৯টা কন্ট্রাডিকশন দিয়েও এই রায়’

‘এই রায় অন্যায়, এই রায় জনগণের বিরুদ্ধে, এই রায় আইন বিরোধী। আমরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আমরা আপিল করব।’
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আইনজীবী আবদুল্লাহ-আল-মামুন। ছবি: সংগৃহীত

শান্তিতে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে 'শায়েস্তা' করার জন্য শ্রম আইন লঙ্ঘন মামলায় ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তার আইনজীবী আবদুল্লাহ-আল-মামুন।

রায় ঘোষণার পর আদালত থেকে বের হয়ে আজ সোমবার বিকেল ৪টার দিকে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, 'এই রায় অন্যায়, এই রায় জনগণের বিরুদ্ধে, এই রায় আইন বিরোধী। আমরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আমরা আপিল করব।'

তিনি দাবি করেন, 'রাষ্ট্রপক্ষ কোনো কিছু প্রমাণ করতে পারেনি। আমরা ১০৯টি কন্ট্রাডিকশন দিয়েছি। একটা কন্ট্রাডিকশন দিলেই খুনির আসামিও খালাস পেয়ে যায়। অথচ, ১০৯টা কন্ট্রাডিকশন দিয়েছি, ১০৫টা সাজেশন দিয়েছি, তারপরও এই রায়।'

তিনি বলেন, 'আইন অনুযায়ী এক বছরের নিচে সাজা হলে আপিলের শর্তে জামিন দিতে হয়। আজ আমরা আদালত থেকে আপিলের শর্তে জামিন পেয়েছি। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, নির্দিষ্ট সময়ে আপিল করা হবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিটি মামলায় আদালতে উপস্থিত থেকেছেন। আপিলেও তিনি উপস্থিত থাকবেন।'

এর আগে তিনি ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতের এই রায়কে 'নজিরবিহীন ও অপূর্ণাঙ্গ' উল্লেখ করে বলেন, 'প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের জন্ম দিয়ে এ দেশের ৯০ শতাংশ নারীকে ঋণমুক্ত করেছেন, তাদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করেছেন। তার বিনিময়ে তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। আজকে তার গ্রামীণ ব্যাংকের শাখা-প্রশাখা সারা পৃথিবীতে গড়ে উঠেছে।'

তিনি বলেন, 'ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের পর এখন বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীর দারিদ্র বিমোচনের জন্য সামাজিক ব্যবসার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। অর্থাৎ, যুবকরা শিক্ষিত হয়ে চাকরির পেছনে ঘুরবে না। তারা নিজেরা ব্যবসা করবে এবং উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে সহানুভূতি নেবেন। পরে সেই টাকা ফেরত দেবেন। এই লাভ একটার পর একটা কলকারাখানা গড়ে তুলবে। এই থিউরিতে তিনি গড়ে তুলছেন সামাজিক ব্যবসা।'

তিনি আরও বলেন, 'সারা পৃথিবী এই ব্যবসা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশে ৫২টি প্রতিষ্ঠান তিনি গড়ে তুলেছেন সামাজিক ব্যবসা হিসেবে। এরই অংশ হিসেবে আজ গ্রামীণ টেলিকম একটি সামাজিক ব্যবসা।'

আইনজীবী আবদুল্লাহ-আল-মামুনের ভাষ্য, 'অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি (ড. ইউনূস) নাকি শ্রমিকদের স্থায়ী করেননি। অথচ, আইনে আছে, শ্রমিকের চাকরি ছয় মাস হলে তিনি অটোমেটিক্যালি স্থায়ী হয়ে যাবেন। আলাদা করে স্থায়ী করার কোনো কারণ নেই। এবং সুপ্রিম কোর্টের আদেশেও তাই বলছে। অথচ, এটাতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।'

তিনি বলেন, 'আইনে বলা আছে, শ্রমিকের বার্ষিক মজুরি এবং ছুটিসহ দেওয়া। আইনে আছে, যদি না দেওয়া হয়, সেটা তার মূল মজুরির সঙ্গে যুক্ত হবে। এটা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু তাকে এখানে অপরাধী করা হয়েছে।'

'শ্রমিকদেরকে লভ্যাংশের ৫ শতাংশ যদি দেওয়া না হয়, তাহলে আইনের ২৩৬ ধারায় বলা আছে, এর জন্য সময় নির্ধারণ করে দেবে। সময়ের পর জরিমানা করবে। জরিমানার পর পাবলিক ডিমান্ড রিকোভারি অ্যাক্ট অনুযায়ী আদায় করবে। সরকারের কাছে আপিল করবে। আপিলের পর তার বিরুদ্ধে মামলা হবে। অথচ, এর কোনো পদ্ধতি গ্রহণ না করে সিভিল বিষয়ের ভেতরে ক্রিমিনাল অপরাধ দেখানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন, সিভিল আদালতে মামলা করার পর আদালত যদি রায় দেয়, সেই রায় বাস্তবায়ন না হলে তারপর সেটা ক্রিমিনাল মামলা হবে,' যোগ করেন তিনি।

'আমরা আদালতে যে কথাগুলো বলেছি, রায়ে সেগুলো উল্লেখ করেনি' দাবি করে আইনজীবী আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, 'নিয়ম হচ্ছে, বিচারক ওপেন কোর্টে পুর্ণাঙ্গ রায় পড়বেন। যখনই দেখা গেল, তার রায়ের প্রতিটি লাইনে লাইনে ভুল, তখন লাইনে লাইনে বাদ দিয়ে যাচ্ছেন; তখন পুর্ণাঙ্গ রায় বাদ দিয়ে তিনি শুধু আদেশটি প্রদান করে গেলেন। এটা আইনে বরখেলাপ। নিয়ম হচ্ছে, আসামির উপস্থিতিতে সম্পূর্ণ রায় পড়ে শোনাতে হবে।'

'ড. ইউনূসের মামলার জন্য এক মাসে ৯-১০টা তারিখ দিয়েছেন। এই মাসে তিনটা কোর্ট এসেছে। কোনো কোর্টের এজলাস তৈরি করা হয়নি। ১৫ দিনের জন্য আইনজীবীকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। নিজেরা এজলাস তৈরি করে, তড়িঘড়ি করে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত আদালত পরিচালনা করার ইতিহাস তৈরি করে আজকের এই রায় ঘোষণা করা হয়েছে,' যোগ করেন তিনি।

Comments