একই স্বপ্ন বারবার দেখার কারণ

অতি পরিচিত কিছু স্বপ্ন, বিশেষ করে দুঃস্বপ্ন ঘুরেফিরে আজীবন আমাদের তাড়া করে বেড়ায়। এমনটা কেন ঘটে, তা নিয়ে মনোবিজ্ঞানে বহু ঘাঁটাঘাঁটি হয়েছে।
ইলাস্ট্রেশন: সৈয়দা আফরিন তারান্নুম

অনেক ওপর থেকে সাঁই সাঁই করে নিচে পড়ে যাচ্ছেন, ক্রমশ তলিয়ে যেতে যেতে হুট করে ঘুমটা ভেঙে গেল। বুঝতে পারলেন, স্বপ্ন দেখছিলেন। এমন স্বপ্ন প্রায়ই দেখেন। শুধু আপনি নয়, অনেকেই। হয়তো স্কুলের চৌহদ্দি পেরিয়ে এসেছেন ১৪ বছর হতে চলল– তবু এখনও অঙ্কের বোর্ড পরীক্ষায় ১ ঘণ্টা পর পৌঁছাচ্ছেন প্রায়ই। তবে তা বাস্তবে নয়, স্বপ্নে। এমন অতি পরিচিত কিছু স্বপ্ন, বিশেষ করে দুঃস্বপ্ন ঘুরেফিরে আজীবন আমাদের তাড়া করে বেড়ায়। স্বপ্নরা হয়ে যায় পরিচিত মানুষের মতোই।

বারবার দেখা হলে মনে হয়, আমাদের আগেও কখনো দেখা হয়েছে। এমনটা কেন ঘটে, তা নিয়ে মনোবিজ্ঞানে বহু ঘাঁটাঘাঁটি হয়েছে। এমনকি স্বপ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে অনেইরোলজি বা স্বপ্নবিজ্ঞান নামের আলাদা একটি শাখাও। এসব বিদ্যা থেকে ধার করে নিয়ে, ঘুমের মধ্যে মানুষ কেন একই স্বপ্ন বারবার দেখে, তা নিয়েই আজকের এই লেখা।

এসব বারবার দেখা স্বপ্নের পেছনে নাটের গুরু হিসেবে বাকিসব কাজের মতোই ভূমিকা রাখে মানুষের অবচেতন মন। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোই আসলে এতে ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে অসম্পূর্ণ চাহিদা, হতাশার ক্ষেত্র বা অতীতের এমন কোনো সমস্যা– যার এখনো কোনো সমাধান হয়নি ইত্যাদি বিষয় অন্যতম। সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে অবচেতন মনের ভয়।

খেয়াল করলে দেখা যাবে, পুনরাবৃত্ত স্বপ্নগুলো বেশিরভাগ সময়ই ভয় পাইয়ে দেয়। এই ভয়, যা আমরা জেগে থাকা অবস্থায় অবদমনের মধ্য দিয়ে লুকিয়ে রাখি নিজেরও কাছ থেকে– তারই প্রকাশিত রূপ। আপাতদৃষ্টিতে যেসব সমস্যা আমরা মেনে নিয়ে দিনযাপন করি, আমাদের অবচেতন মনে তা লুকানো থাকে। ঘুমানোর পর আমাদের ডিফেন্স মেকানিজম সেভাবে কাজ করে না বলেই তা ভয়াল রূপে বারবার আমাদের সামনে আসতে থাকে।

পুনরাবৃত্ত স্বপ্নগুলো মোটাদাগে ২ প্রকার। সাধারণ ও বিশেষ। সাধারণ স্বপ্নগুলো অনেকেই দেখে থাকে, অন্যদিকে বিশেষ স্বপ্নের নকশা বোনা হয় ব্যক্তির জীবনের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করে। সাধারণত বারবার দেখা হয় এমন স্বপ্নের মধ্যে রয়েছে অনেক উঁচু থেকে নিচে পড়া, জরুরি কোনো কাজে দেরি করে ফেলা, বাস বা ট্রেনে ঠিক সময়ে উঠতে না পারা, দাঁত বা চুল পড়ে যাওয়া, পথ হারিয়ে ফেলা ইত্যাদি। এছাড়াও আরেকটি সাধারণ ও বারবার দেখা স্বপ্ন হচ্ছে ঘুমের মধ্যে কথা বলতে না পারা, যাকে আলাদা করে 'স্লিপ প্যারালাইসিস' বা 'বোবায় ধরা' বলা হয়।

'এমন যদি হতো, আমি পাখির মতো উড়ে উড়ে বেড়াই সারাক্ষণ!' – আকাশে উড়ে চলা পাখিদের দেখে উড়তে শখ হয়নি, এমন মানুষ পাওয়া বিরল। যেমন উড়তে শখ হয়েছিল ইকারাসেরও একদিন। আর এই উড়তে চাওয়ার ইচ্ছে অনেকেরই বারবার পূরণ হয় স্বপ্নে। দেখা যায় এ ছাদ থেকে ও ছাদে উড়ে বেড়াচ্ছে স্পাইডারম্যানের মতো লাফঝাঁপ দিয়ে কিংবা পাখিরই মতো ডানা গজিয়েছে।

অনেক বেশি মানসিক চাপে থাকলে স্বপ্ন আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় প্রিয় শৈশবেও, নিজস্ব সেফ হেভেনে। সবচেয়ে বেশি নিরাপদ ছিলাম যেখানে, বারবার দেখা স্বপ্নেরা অনিরাপদ সময় থেকে কিছুক্ষণের জন্য মুক্তি দেয় ঘুমের ভেতর। এমনকি বহুদিন না দেখা প্রিয়জনের মুখও বারবার ফিরে আসতে পারে স্বপ্নে। আদতে মানুষের বিভিন্ন প্রকার মানসিক বা শারীরিক চাহিদার স্ফূরণই গড়ে দেয় এসব স্বপ্নের ইমারত।

তাই বলা চলে, শুধু ভয়ই নয়, অনেক সময় ইচ্ছেপূরণ দৈত্য হিসেবেও আগমন ঘটে স্বপ্নের এই 'রিপিট মোডে'র। স্বপ্নগুলো দেখার সময় মনে হয় যেন ভালো কোনো সিনেমা বারবার দেখা হচ্ছে, পছন্দের কোনো জায়গায় বারবার যাওয়া হচ্ছে।

অনেকের জন্য পুনরাবৃত্ত স্বপ্নের চক্র এক সময় স্বাভাবিক হয়ে এলেও কারো কারো মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিষয়টি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ভালো ঘুম না হওয়া, দুশ্চিন্তায় জড়িয়ে পড়া, মাথাব্যথা ইত্যাদি বিভিন্ন সমস্যাই হতে পারে। সেক্ষেত্রে জীবনযাপনে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়।

যেমন ঘুমানোর আগে নির্দিষ্ট কিছু সময় সব ধরনের ঝুটঝামেলা বাদ দিয়ে, ফোন বা অন্যান্য ডিভাইস দূরে সরিয়ে নিবিষ্ট মনে মেডিটেশন বা ধ্যান, আরামদায়ক গান শোনা অথবা কারো কারো জন্য প্রার্থনাও কার্যকর হতে পারে। এ ছাড়া নিজস্ব 'খোয়াবনামা' লিখতে থাকাও একটি ভালো উপায়। কেননা একটি স্বপ্নকে যখন যৌক্তিকভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, তখন এর রহস্য কমে যাবে এবং এর ফলে তা বারবার দেখার প্রবণতাও কমে আসার সম্ভাবনা থাকে।

তথ্যসূত্র:

১। https://www.healthline.com/health/recurring-dreams#theories

২।https://www.sleepfoundation.org/dreams/dream-interpretation/recurring-dreams#:~:text=Experiencing%20recurring%20dreams%20may%20point,unmet%20needs%20or%20process%20trauma

৩।https://edition.cnn.com/2023/04/09/health/recurring-dreams-meaning-cause-wellness/index.html?fbclid=IwAR0MeJmt4NCE9y3LxiQE4A0D5kglhgOxFIdi1aZ2skQlQNzVg7Ucqw3Dhas

Comments