ডিজিটাল সেবায় ভ্যাটের ফাঁস, বিপরীতমুখী নীতির খেল
অনলাইন সেবাকে ভ্যাটের আওতায় আনার প্রক্রিয়াটার মধ্যে কেমন যেন ‘ধরে আবার ছেড়ে দেওয়ার’ একটা খেলা সেই প্রথম থেকেই দেখা যাচ্ছে।
খেলাটার শুরু সেই ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে। সেবার ব্র্যান্ডেড গ্রোসারি শপের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন শপগুলোকেও চার শতাংশ ভ্যাটের আওতায় আনার প্রস্তাব আসে। কিন্তু, কয়েকটি দিন যেতে না যেতেই অবস্থান বদলে যায় সরকারের। সে সময়ের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কাজটি ঠিক হয়নি স্বীকার করে নিয়ে তার প্রচেষ্টা থেকে সরেও যান।
কিন্তু, ক্যালেন্ডারে তিনটি বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবার এসে গেল পাঁচ শতাংশ ভ্যাটের প্রস্তাব। গেল বছরের সে প্রস্তাবটি সংসদে ওঠার পরদিনই আবার সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান জানালেন, ছাপার ভুলে এমনটা হয়েছে বলাতে সবাই নিভৃত হলেন।
এবার ২০১৯-২০ সালের বাজেটে ভার্চুয়াল বিজনেস ক্যাটাগরিতে পড়ে শুধু ই-কমার্সই নয়, সকল অনলাইন সেবা খাত পেয়ে গেল সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট। আবারও সংশ্লিষ্টদের চক্ষু চড়কগাছে।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের বাজেট বক্তৃতায় ভার্চুয়াল বিজনেসের ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স বিষয়ে কিছুই নেই। কিন্তু, অর্থ বিলে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ভার্চুয়াল বিজনেসের জন্যে অনেকটা চুপিসারেই রয়ে গেছে এই ভ্যাটের বোঝা।
সহজ কথায় হিসেবটা যা দাঁড়াল, রাস্তার জ্যাম ঠেলে শপিং নিউমার্কেটের গাদাগাদির মধ্যে না গিয়ে মোবাইলের স্ক্রিনে স্পর্শের মাধ্যমে কেনাকাটা করতে যে নাগরিক অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলেন, তাকে আবারও সেই ঠেলাঠেলির বিড়ম্বনায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা।
যে লোকটি বাসার ইলেকট্রিক কাজ বা গ্যাসের চুলা মেরামতের জন্যে আর বাজারের দোকানে মিস্ত্রি খুঁজতে যান না, বরং অ্যাপে অর্ডার করে নিমিষেই কাজটি করে নিতে পারতেন; এসি সার্ভিসিংয়ের জন্যে আর যাকে মোবাইলে স্পর্শের বাইরে আর কিছুই করতে হয় না, ভার্চুয়াল সেবায় ভ্যাট বাড়ানোর মাধ্যমে তাকে আবারও গতানুগতিকতায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাই আমরা দেখতে পাচ্ছি।
কারণ, অ্যাপের ব্যবহারের মাধ্যমে কাপড় ইস্ত্রির কাজ করাতে যে নাগরিক মাত্র অভ্যস্ত হয়েছেন, মুদিখানার বাজারও যিনি এখন অনলাইনে অর্ডার করে করছেন, তাকে বাড়তি ভ্যাটের খরচের মধ্যে ফেলে দিয়ে আবারও মোড়ের দোকানে বা বাজারে নিয়ে যাওয়ার আয়োজন হচ্ছেই যেন। না হলে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কাপড় ইস্ত্রি করানো, মুদিখানার কেনাকাটা বা তালা সারাইয়ের মিস্ত্রি ডাকলেও তার জন্যে গুণতে হবে ভ্যাট।
ফুড ডেলিভারি কোম্পানির মাধ্যমে বাসায় বা অফিসে খাবার আনার অর্ডার করবেন সেখানেও ভ্যাটের খড়গ। খাবার কোম্পানির ভ্যাট তো আছেই। এখন ভার্চুয়াল ব্যবসা হওয়ায় ডেলিভারির জন্যেই থাকবে বাড়তি ভ্যাট।
অনেকেই এখন ঘরে বসেই টাকা খরচ করে অনলাইনে পড়াশোনা করছেন। দশ পনেরো হাজার টাকার বেশ ভালোমানের কোর্সও এখন পাওয়া যায়। সেটি কি ভ্যাটের বাইরে থাকবে? না, যেহেতু ভার্চুয়াল ব্যবসা সুতরাং ভ্যাট সেখানেও ঢুকবে।
প্রস্তাবিত সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট যে আসলে পেছনের দিকে ছুটে চলারই একটি প্রক্রিয়া, সেটি আর কাউকে বলে দিতে হচ্ছে না। প্রচলিত মার্কেট থেকে যারা অনলাইনের মার্কেট প্লেসে আসছিলেন, খরচ বাড়িয়ে তাদেরকে আবারও অফলাইনে নিয়ে যাওয়ার আয়োজন দেখা যাচ্ছে ফি-বছরের বাজেট প্রক্রিয়ায়।
সরকারকে নিশ্চয়ই খরচ মেটাতে ভ্যাট-ট্যাক্স নিতে হবে। কিন্তু, কোন ব্যবসায় কখন নিতে হবে সে বিষয়েও তো পরিষ্কার থাকা দরকার। যে ব্যবসাটি মাত্র যাত্রা শুরু করল, গ্রাহক সুবিধা নিতে শুরু করার আগেই তার গলায় ভ্যাটের ফাঁস!
দুনিয়া জুড়ে আমরা যেমন দেখি, অনলাইন টিকিটিং বাড়ছে, হোক সে বিমানের বা বাস-ট্রেনের টিকিট; বা সিনেমার টিকিট। বাংলাদেশেও তেমনটা হতে শুরু করেছে কেবল। কেবলই আমরা ই-এডুকেশনের জমানায় যাবো-যাচ্ছি করছি। টুরিজমেও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের প্রসারে বাংলাদেশেও লেগেছে ডিজিটালাইজেশনের হাওয়া।
বহুদিনের ক্লিশে সেবা ছেড়ে মানুষ দিনকে দিন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এসব সেবার দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে, তখনই ভ্যাট-ট্যাক্সের খড়গ। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের স্বপ্নও কিন্তু সাধারণদেরকে এমনভাবেই দেখানো হয়েছে যে, ঘরে বসে সব করে ফেলা যাবে নিমিষেই। আর সরকারের দেখানো সেই স্বপ্নপথেই এখন যুক্ত হল ভ্যাটের বোঝা।
অনলাইন আমাদেরকে যেখানে এতোটা সুবিধা দিয়ে দিলো যে, অজগ্রামের মানুষটিও তার ফোনকে ব্যবহার করে অর্ডার করে ফেলতে পারছেন ঢাকার সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ডের আধুনিক পণ্যও। কিন্তু, প্রস্তাবিত এই ভ্যাট পাস হলেই অনলাইনে অর্ডার মানেই খরচ বাড়বে গ্রামের ওই তরুণ বা তরুণীটিরও। এ যেন ডিজিটাল সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের জরিমানা।
জ্যামের ঢাকা বা চট্টগ্রামে সাধারণের চলাচলের জন্য বিকল্প হিসেবে এসেছে রাইড শেয়ারিং সেবা, সেখানেও বসছে সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাটের কোপ। ঢাকা শহরে এখন দিনে ৪০ হাজারের বেশী রাইড হচ্ছে। এর একটিও কিন্তু এখন ভ্যাটের বাইরে থাকবে না। ফলে এখানেও খরচ কিছুটা হলেও বাড়বে সেবা গ্রহীতার। আবার যিনি গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালিয়ে সেবাটি দিচ্ছেন তার ওপরেও কিন্তু ট্যাক্স আছে, চার শতাংশ হারে।
এই যখন পরিস্থিতি তখন আমরা দেখতে পাচ্ছি, সরকার স্টার্টআপদের জন্যে ১০০ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ রেখেছেন। ঠিক কেমন যেমন মিলছে না। দুই হাজার কোটি টাকার ভার্চুয়াল বিজনেসের বাজার থেকে সাড়ে সাত শতাংশ হিসেবে ভ্যাট নিয়ে আবার একশ কোটি দেওয়া হচ্ছে ভার্চুয়াল জগতের কোম্পানির সংখ্যা বাড়াতে।
বিজ্ঞানের উদ্ভাবনী সেবা আবিষ্কারের জন্যেও রাখা হয়েছে ৫০ কোটি টাকার থোক। ফলে এক দিকে উদ্ভাবনের বরাদ্দ, অন্যদিকে ইতিমধ্যে যেগুলো উদ্ভাবন হয়েছে সেটিকে দমিয়ে দেওয়ার জন্যে বাড়তি কর।
অন্যদিকে আবার যে ডিজিটাল রাস্তার ওপর দিয়ে ভার্চুয়াল সেবা চলবে সেই মোবাইল ফোন অপারেটরদের যেকোনো সেবার ওপরেও পাঁচ শতাংশ সম্পূরক শুল্কের চপেটাঘাত, গত চার বছর ধরে বছর বছর যেটি বেড়েই চলেছে।
সব মিলে সরকারের ডিজিটাল সেবা নীতিতে এক জগাখিচুড়ি অবস্থা বিরাজমান। মানুষকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উঠে আসতে। আবার ডিজিটাল সেবার ওপর বসছে বাড়তি কর। নীতির এই অনৈতিক খেলাও বন্ধ হওয়া দরকার।
মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, সিনিয়র রিপোর্টার, দ্য ডেইলি স্টার
Comments