এ আর নতুন কী

আমাদের দেশে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন অস্বাভাবিক কিছু নয়। একইভাবে শাসক দলের আধিপত্যও স্বাভাবিক। বিএনপি যদি ক্ষমতায় থাকত তাহলে আওয়ামী লীগ কর্মীরাও একই রকম আচরণ পেতেন। আমরা এগুলো জানি, আমরা এগুলো বলি। তবুও আমরা আশা করি, এই অবস্থার উন্নয়ন হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেনের সমর্থকরা সম্প্রতি রাজধানীর গোপীবাগে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ছবি: সংগৃহীত

গত রোববার (২৬ জানুয়ারি) ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেন এবং আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর প্রার্থী রোকন উদ্দিন আহমেদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় সমর্থকরা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। প্রায় ৩০ মিনিট ধরে চলা সংঘর্ষে দুই সাংবাদিকসহ ১৫ জন আহত হন। উভয়পক্ষই মামলা করতে পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন। পুলিশ এক পক্ষের মামলা গ্রহণ করলেও অপর পক্ষের মামলা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। পাঠক নিশ্চয়ই অনুমান করতে দ্বিধায় পড়বেন না যে, কোন পক্ষের মামলা গ্রহণ করা হয়েছে আর কোন পক্ষের মামলা গ্রহণ করা হয়নি! শুধু তা-ই নয়, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আওয়ামী লীগের দেওয়া মামলায় নাম আছে এমন পাঁচজন বিএনপি কর্মীকে নগরীর কয়েকটি জায়গা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফলস্বরূপ, বিরোধী নেতাকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এই আতঙ্কে তারা তাদের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নামতে অনীহা প্রকাশ করছেন।

আমাদের দেশে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন অস্বাভাবিক কিছু নয়। একইভাবে শাসক দলের আধিপত্যও স্বাভাবিক। বিএনপি যদি ক্ষমতায় থাকত তাহলে আওয়ামী লীগ কর্মীরাও একই রকম আচরণ পেতেন। আমরা এগুলো জানি, আমরা এগুলো বলি। তবুও আমরা আশা করি, এই অবস্থার উন্নয়ন হবে। আওয়ামী লীগ গত ১২ বছর ধরে (২০০৮ থেকে ২০২০)  ক্ষমতাসীন। এই দীর্ঘসময় কি পরিবর্তন আনার জন্য যথেষ্ট নয়? নির্বাচন কোনও দৈনন্দিন বিষয় না। বেশ কয়েক বছর পরপর নির্বাচন আসে। তাহলে আমাদের ভোটাররা কি আশা করতে পারেন না যে নির্বাচন চলাকালে বিরোধীদের প্রতি আরও বেশি সহনশীলতা দেখানো হবে?

সম্ভবত খুবই উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো পুলিশের পক্ষপাতমূলক আচরণ। কারণ নির্বাচনের দিন এবং তার আগের দিনগুলোতে পুলিশের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি বক্তব্য নির্বাচনের ফলাফলের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। ভোটাররা ভালো করেই জানেন যে মেয়ররা আসবেন আবার চলে যাবেন, কাউন্সিলররা আসবেন আবার চলে যাবেন। এমনকি ক্ষমতাসীন দলও রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসবে আবার চলেও যাবে। কিন্তু পুলিশের সঙ্গে তাদের (ভোটারদের) চিরকাল থাকতে হবে।

ওয়ারি থানা কেন বিএনপির অভিযোগ আমলে নেয়নি? আমরা কি তাহলে এটাই বিশ্বাস করব যে কেবল বিএনপির কর্মীরাই ছিল সবচেয়ে জঘন্য এবং অন্যপক্ষ ছিল গান্ধীর অহিংস মতবাদের অনুসারী?

পুলিশ প্রতিটি আধুনিক দেশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু একটি দেশ সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য পুলিশের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। আমদের দাবি অনুযায়ী কোনো দেশ যদি গণতান্ত্রিক নীতি অনুসরণ করে চলে, তাহলে নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশের কাজ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পুলিশ কেবল হয়রানি, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ, মারধর এবং গ্রেপ্তার করার জন্য নয়। মানুষকে নিরাপদ ও স্বস্তির বোধ দেওয়ার দায়িত্বও তাদের। পুলিশের কার্যক্রম প্রতিনিয়ত মানুষের চোখের সামনে দৃশ্যমান। পুলিশের অন্যায় বা দুর্নীতি বা অনৈতিক কর্মকাণ্ড, রাষ্ট্র কাঠামোর ওপর মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করে দেয়।

স্পষ্টতই আমার উপরোল্লেখিত আদর্শ থেকে পুলিশ অনেকটাই দূরে সরে গেছে। বছরের পর বছর ধরে তারা এই অবস্থায় পৌঁছেছে। প্রতিটি সরকারই পুলিশকে তাদের পক্ষে অন্যায্যভাবে ব্যবহার করেছে। (এই মুহূর্তে দুটি বিশেষ দৃশ্য আমার মনে পড়ছে। একটি হচ্ছে প্রখ্যাত ছাত্রনেতা, প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং দুই বারের মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীকে পুলিশ লাঞ্ছিত করেছিল। অপরটি পুলিশের আঘাতে বিএনপির সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার রক্তাক্ত ছবি। দুজনেই নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন বিরোধীদলে থাকা অবস্থায়। পুলিশের পক্ষপাতমূলক আচরণ এই দুটি ঘটনার চেয়ে আর কিছুতেই ভালভাবে চিত্রিত হয় না)।  ‘কোটা সংস্কার’ আন্দোলন এবং পরে স্কুল ও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ‘নিরাপদ সড়ক’ আন্দোলনের সময় পুলিশের আচরণ জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপকভাবে কমিয়েছে।

তবুও আমরা আশা করি নির্বাচনের সময় পুলিশ কিছুটা হলেও নায্যতা- নিরপেক্ষতার পরিচয় দেবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, প্রত্যাশার সঙ্গে যার যোজন যোজন ফারাক। নিরপেক্ষতার ছিটেফোটাও যখন দৃশ্যমান নয়, তখন আসন্ন সিটি নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু হবে তা নিয়ে আমাদের সত্যিই চিন্তা করা দরকার। কদিন আগে একজন পুলিশ কর্মকর্তার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে তিনি দুই মেয়র প্রার্থীর কর্মীদের বোঝাতে ‘তাদের’ এবং ‘আমাদের’ শব্দ দুটি ব্যবহার করছেন।

সমপরিমাণ উদ্বেগের বিষয় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকও এ কথা বলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন, নির্বাচন কমিশন চাইলে স্বাধীন তদন্ত করতে পারে। তবে যদিও এই কলাম লেখার সময় পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন সেই প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি। গতকাল (২৮ জানুয়ারি) দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত একটি লেখাতে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আমরা নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে একটি উত্তরের প্রত্যাশায় আছি।

জাতীয় নির্বাচনের পরে ঢাকা সিটি নির্বাচনে আমরা আশা করতে চাচ্ছি, নির্বাচন কমিশন এমন উদ্যোগ নেবে যা জনগণের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনবে।  নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও জনআস্থা ফিরিয়ে আনা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, প্রত্যশার সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে আছি আমরা। কার্যত বিরোধীদের আপত্তিগুলোর কোনটিই গুরুত্ব সহকারে নেওয়া হয়নি। একজন নির্বাচন কমিশনার যেভাবে তথ্য উল্লেখ করে বলছেন যে, অন্য কমিশনারদের সঙ্গে একমত পোষণ করছেন না বলে তিনি যেভাবে ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে গেছেন, তা খুবই অস্বস্তিকর। তার একটি পর্যবেক্ষণও আমলে নেওয়া হয়নি। কেন? তার দৃষ্টিভঙ্গি, পর্যবেক্ষণ কী অসত্য? তা বিবেচনায় নিয়ে আলোচনা করলে দেশের বা নির্বাচন কমিশনের বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে?

নির্বাচন কমিশনের এটা বিবেচনায় রাখা দরকার যে, তারা যা করছেন বা ভাবছেন, জনভাবনা তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতা কাঠামোর গভীরে নিজেকে জড়াতে কোনো প্রকার প্রচেষ্টা বাদ দেয়নি। আশা করা যায় তাদের গণতান্ত্রিক প্রশংসাপত্র শক্তিশালী করার জন্য সরকার সিটি নির্বাচনের সময় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সবার জন্য সমান সুযোগ উন্মুক্ত রাখবে।

নির্বাচন কমিশন ও সরকারের কাছে যা প্রত্যাশা, তা সম্পূর্ণ ভুল বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। যার ফলে বিরোধীরা হয়রানির শিকার হতেই থাকে, ক্ষমতাসীনরা নির্বাচন কমিশনের নিয়মকানুনকে অবজ্ঞা অব্যহত রাখে, পুলিশের একচোখা নীতির পরিবর্তন হয় না। গণমাধ্যম প্রতিনিয়ত সেই সংবাদ প্রকাশ করে। ফলে, এ আর নতুন কী?

 

মাহফুজ আনাম: সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার।

Comments

The Daily Star  | English

EC denies AL permission for December 10 rally

Decides to hold discussion at Dhaka district AL office

1h ago