আপনি কেমন আছেন?

গণমাধ্যমকে বলা হয় সমাজের আয়না। যদিও এই আয়নায় এখন সমাজ ও রাষ্ট্র কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন করবার অবকাশ রয়েছে। এই আয়নায় এখন যুক্ত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া বা ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বিশেষ করে ফেসবুকে এখন প্রচুর গুজব, মিথ্যা, প্রোপাগান্ডা আর বিষোদগার চললেও নানা বিষয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের এমন সব তথ্য ও ছবি দেখা যায়, যা অনেক সময় গণমাধ্যম এড়িয়ে যায় বা নানাবিধ সেন্সরশিপ ও ভীতিকর বাস্তবতায় এড়িয়ে যেতে বাধ্য হয়। ফলে মানুষ কেমন আছে, তা জানা-বোঝার একটা ভালো উপায় এই সোশ্যাল মিডিয়া।
ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে আর কোনো যানবাহন না পেয়ে এক রিকশায় সওয়ার পরিবারের ছয় আবালবৃদ্ধবনিতা। ছবি: প্রবীর দাশ

গণমাধ্যমকে বলা হয় সমাজের আয়না। যদিও এই আয়নায় এখন সমাজ ও রাষ্ট্র কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন করবার অবকাশ রয়েছে। এই আয়নায় এখন যুক্ত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া বা ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বিশেষ করে ফেসবুকে এখন প্রচুর গুজব, মিথ্যা, প্রোপাগান্ডা আর বিষোদগার চললেও নানা বিষয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের এমন সব তথ্য ও ছবি দেখা যায়, যা অনেক সময় গণমাধ্যম এড়িয়ে যায় বা নানাবিধ সেন্সরশিপ ও ভীতিকর বাস্তবতায় এড়িয়ে যেতে বাধ্য হয়। ফলে মানুষ কেমন আছে, তা জানা-বোঝার একটা ভালো উপায় এই সোশ্যাল মিডিয়া।

একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলাম ফেসবুকে এরকম যে, ‘আপনি কেমন আছেন’। সেখানে কয়েকটি অপশন ছিল। যেমন খুব ভালো থাকলে ১০, একটু কম ভালো থাকলে ৮, আরেকটু কম ভালোতে ৬, খারাপ থাকলে ৪ এবং খুব অসুবিধায় বা সংকটে থাকলে ২। এই কেমন থাকাটা সার্বিক অর্থে। অর্থনৈতিক, শারীরিক, মানসিক সব মিলিয়ে। অর্থাৎ একটা গড় হিসাব করা। এটি কোনো অ্যাকাডেমিক গবেষণা নয়। বরং খেলার ছলে প্রশ্ন করা এবং সেখান থেকে প্রকৃত বাস্তবতাটি উপলব্ধির চেষ্টা করা।

চার শ জনের বেশি এই জরিপে অংশ নিয়েছেন। তবে এর মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ৩৯৮ জন। ফলে আমরা আমাদের এই ইনফরমাল গবেষণার স্যাম্পল সাইজ ধরছি ৪০০, যার উপর ভিত্তি করে গড় হিসাব করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, যারা উত্তর দিয়েছেন তারা সবাই এই লেখকের সাথে ফেসবুকে যুক্ত, মানে ফেসবুকবন্ধু ও ফলোয়ার। সঙ্গত কারণেই উত্তরদাতাদের পেশা ও বয়সেও রয়েছে বৈচিত্র্য। আছেন তরুণ, মাঝবয়সী, নারী-পুরুষ সকলেই। পেশায় শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, গৃহিণী, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী ইত্যাদি।

এদের মধ্যে ১০ অর্থাৎ সবচেয়ে ভালো আছেন ৬৫ জন, যা শতকরা হিসাবে ১৬ দশমিক ২৫ ভাগ। স্কোর ৮ অর্থাৎ একটু কম ভালো ৮৩ জন, শতকরা ২০ দশমিক ৭৫ ভাগ। আরেকটু কম ভালো, অর্থাৎ ৬ স্কোর ১১৭ জন, শতকরা ২৯ দশমিক ২৫ ভাগ। ৪ অর্থাৎ খারাপ আছেন ৯৮ জন, শতকরা ২৪ দশমিক ৫ ভাগ এবং স্কোর ২ মানে খুব খারাপ অবস্থায় আছেন ৩০ জন, শতকরা ৭ দশমিক ৫ ভাগ। উত্তরদাতাদের মধ্যে চারজন ১০ ও ৮ এর মাঝামাঝি ৯ বলেছেন। আমরা সেটিকে ১০ ধরেছি। ৯ জন উত্তরদাতা ৮ ও ৬-এর মাঝামাঝি ৭ বলেছেন। বিশ্লেষণের সুবিধার্থে আমরা তাদের ৮ ধরেছি। ৬ ও ৪-এর মাঝামাঝি ৫ বলেছেন ৫ জন। তাদেরকে ৬ ধরা হয়েছে। ৪ ও ২ এর মাঝামাঝি ৩ বলেছেন ৪ জন। আমরা তাদের ৪ ধরেছি। দুজন লিখেছেন ১। আমরা তাদের ২ ধরেছি। তবে যে ৫ জন শূন্য লিখেছেন, তাদের এই জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণের বাইরে রাখা হয়েছে।

এই জরিপ বা গবেষণার ফলাফল কি পুরো দেশের বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে? সহজ উত্তর, না। আবার এই ফলাফলকে একেবারে উড়িয়ে দেয়ারও সুযোগ নেই। কারণ অনানুষ্ঠানিকভাবে হলেও এই জরিপে যারা অংশ নিয়েছেন তারা সমাজের মোটামুটি শিক্ষিত ও সচেতন অংশ। তারা প্রত্যেকেই সমাজের কোনো না অংশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ফলে তাদের মতামতের মূল্য আছে। অতএব এই সংক্ষিপ্ত জরিপের যে ফলাফল, সেখানে সামগ্রিকভাবে দেশের ১৭ কোটি মানুষের ভালো থাকা মন্দ থাকার প্রতিফলন না ঘটলেও মোটামুটি আন্দাজ করা যায় যে, এ মুহূর্তে আমরা কেমন আছি?

ধরা যাক ১০, অর্থাৎ খুব ভালো আছেন ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ মানুষ। আমাদের সারা দেশের মোট জনসংখ্যার কত শতাংশ লোক বলতে পারবেন যে তারা খুব ভালো আছেন এবং যাদের স্কোর ১০? সেই সংখ্যাটি কি ১৬-১৭ শতাংশের বেশি হবে? ভালো আছেন, কিন্তু হয়তো কিছু সমস্যা আছে, এরকম উত্তরদাতার শতকরা হার ২০ দশমিক ৭৫। আপনার আশপাশে খোঁজ নিয়ে দেখুন এই হিসাবটা মেলে কি না। ভালো আছেন কিন্তু সমস্যাও আছে, অর্থাৎ কিছু অর্থনৈতিক সমস্যা আছে, পারিবারিক ও সামাজিক নানা অসুবিধা আছে, দেশের এই সংকটকালে মন-মেজাজ খারাপ, বিরক্ত—এরকম লোকেরাই সম্ভবত ৬ স্কোরে আছেন। তাদের শতকরা হার ২৯ দশমিক ২৫। এটি বস্তুত মধ্যবর্তী অবস্থান এবং দেখা যাচ্ছে শতকরা হিসাবে এই স্কোর সবচেয়ে বেশি। দেশের সামগ্রিক হিসাবেও বোধ করি এই মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা লোকের সংখ্যাই বেশি।

খারাপ অবস্থায় আছেন অর্থাৎ স্কোর ৪, এরকম উত্তরদাতার শতকরা হার ২৪ দশমিক ৫ এবং খুব খারাপ অবস্থায় আছেন ৭ দশমিক ৫ ভাগ উত্তরদাতা। সবচেয়ে খারাপ বা সংকটে থাকা লোকের সংখ্যা এখানে দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে কম। ৪০০ জন উত্তরদাতার মধ্যে মাত্র ৩০ জন। এটি মনে হতে পারে খুব আশাব্যঞ্জক। কিন্তু বাস্তবতা নিশ্চয়ই এরকম নয়। কারণ ফেসবুকে এই জরিপে যারা অংশ নিয়েছেন, তারা মোটামুটি সবাই সমাজের অগ্রসর জনগোষ্ঠী। কিন্তু ফেসবুকের মতো সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন না, এরকম লোকের সংখ্যাই বেশি। আবার এই লেখকের সঙ্গে যুক্ত ৪০০ উত্তরদাতার মধ্যে এখানে ৩০ জন খুব খারাপ থাকার কথা বললেও আরেকজন ব্যক্তি যদি তার বন্ধুদের মধ্যে এরকম জরিপ চালান, দেখা যাবে সংখ্যাটা একইরকম থাকবে না। তাছাড়া দেশের সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর উপরে এ ধরনের জরিপ চালানো হলে দেখা যাবে এ মুহূর্তে খুব সংকটে থাকা বা একদমই ভালো নেই, এরকম মানুষের সংখ্যা অনেক। তবে এই ইনফরমাল জরিপে খুব ভালো, একটু কম ভালো এবং মোটামুটি ভালো থাকা মানুষের যে সংখ্যা ও শতকরা হার পাওয়া গেলো, সামগ্রিক হিসাবে বোধ হয় সেটি খুব বেশি এদিক-ওদিক হবে না।

এ মুহূর্তে দেশের ১৬-১৭ শতাংশ মানুষ যদি খুব ভালো এবং ২০ শতাংশের বেশি মানুষ খুব ভালোর চেয়ে একটু কম ভালো থাকেন, সেটিও কম কথা নয়। আবার আমরা যদি খুব ভালো, ভালো এবং মোটামুটি ভালো থাকাকে যোগ করি তাহলে দেখা যাবে এই তিন ধরনের মানুষের সংখ্যা ৬৬ শতাংশের বেশি। এই সংখ্যা ও শতকরা হার ১৭ কোটি দিয়ে ভাগ করলে খুব খারাপ চিত্র আসবে না। বরং করোনার মতো একটা ভয়াবহ আন্তর্জাতিক বিপদের কালেও মানুষের ভালো থাকা মন্দ থাকার যে চিত্রটা পাওয়া গেলো, সেটি হয়তো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাজে লাগতেও পারে।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সাল এবং ২০১৮ সালের প্রথমার্ধে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির যে জোরালো ধারা ছিল, ২০১৮ সালের দ্বিতীয়ার্ধ হতে তা কিছুটা শ্লথ হতে শুরু করে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্য উত্তেজনা, ইউরোপের অর্থনীতির মন্থর গতি এবং ব্রেক্সিট নিয়ে অনিশ্চয়তা বিশ্ব প্রবৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এরকম বাস্তবতায় ২০১৯ সালের শেষদিকে করোনাভাইরাস নামে এক অদৃশ্য আততায়ীর হানায় পুরো বিশ্ব এলোমেলো। মানুষের জীবন তো বটেই, অর্থনীতিও পঙ্গু হবার দশা। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও করোনার কারণে সরকারি চাকরিজীবী ছাড়া সব পেশার মানুষের জীবন জীবিকাই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। অসংখ্য মানুষ বেকার হয়েছেন, আরও হবেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বলছে, করোনার কারণে সারা বিশ্বে প্রায় ১৬০ কোটি মানুষ বেকার হবে। বিকল্প আয়ের উৎস ছাড়া এই মানুষদের টিকে থাকার কোনো উপায় থাকবে না। নিশ্চয়ই সেই ১৬০ কোটির মধ্যে বাংলাদেশের অনেক মানুষ রয়েছেন। সুতরাং দেশে বেকারত্বের মিছিলে নতুন করে আরও কত লোক যুক্ত হবেন এবং তাদের জীবন কীভাবে চলবে, সরকার তাদের জন্য কতটুকু সহায়তা দিতে পারবে, দিলেও তা সবার কাছে সঠিকভাবে পৌঁছাবে কি না, সেসব নিয়ে সংশয় তো রয়েছেই। সুতরাং ‘আপনি কেমন আছেন’—এই প্রশ্নটি আর কয়েক মাস পরে করলে হয়তো চিত্রটা অন্যরকম হবে। কিন্তু তারপরও সবাই সুস্থ ও নিরাপদে থাকুন, দ্রুত করোনামুক্ত হোক দেশ ও পৃথিবী, খুব ভালো থাকা মানুষের সংখ্যা ও শতকরা হার আরও বাড়ুক, এই প্রত্যাশা।

আমীন আল রশীদ: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এটিডর, রংধনু টেলিভিশন।

[email protected]

(দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নিবে না।) 

Comments

The Daily Star  | English

Dhaka footpaths, a money-spinner for extortionists

On the footpath next to the General Post Office in the capital, Sohel Howlader sells children’s clothes from a small table.

Now