২০১৬ সালের পর থেকে আম রপ্তানি কমেছে ৮৫ শতাংশ

বাংলাদেশ থেকে ২০১৬ সালের পরে আম রপ্তানির হার প্রায় ৮৫ শতাংশ কমে গেছে। অধিক মুনাফার আশায় আমদানিকারক দেশগুলোর পরামর্শ না মেনে নিম্ন মানের আম রপ্তানি করা এর প্রধান কারণ। যথাযথ প্রক্রিয়া না মানার পরেও রপ্তানির সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
স্টার অনলাইন গ্রাফিক্স

বাংলাদেশ থেকে ২০১৬ সালের পরে আম রপ্তানির হার প্রায় ৮৫ শতাংশ কমে গেছে। অধিক মুনাফার আশায় আমদানিকারক দেশগুলোর পরামর্শ না মেনে নিম্ন মানের আম রপ্তানি করা এর প্রধান কারণ। যথাযথ প্রক্রিয়া না মানার পরেও রপ্তানির সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

খাদ্য সুরক্ষায় ঝুঁকি এড়াতে অনেক আমদানিকারক দেশ উত্তম কৃষি পদ্ধতি নিশ্চিত করার পরামর্শ দেয়। উৎপাদনের পাশাপাশি মোড়কজাত ও মজুদ করার ক্ষেত্রেও তারা সতর্ক হতে বলে। যে কারণে মৌসুমের আগে চুক্তিভিত্তিক চাষিদের বাছাই করার পরামর্শ দেয় কৃষি অধিদপ্তর। যেন আম উৎপাদনে চাষিরা নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে।

উৎপাদন থেকে শুরু করে রপ্তানি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া যথাযথভাবে মানা হয়েছে কি না তা পরীক্ষা করে অধিদপ্তরের প্লান্ট কোয়ারেন্টিন উইং। অথচ ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে আম রপ্তানি শুরুর দুই বছর পরে রপ্তানিকারীরা চুক্তিভিত্তিক কৃষকদের উপেক্ষা করে স্থানীয় বাজার থেকে আম কিনতে শুরু করে। ডিএই’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রসংশাপত্র দেন যে, আমগুলো নির্ধারিত কৃষকের বাগান থেকেই কেনা হয়েছে এবং উদ্ভিদ কোয়ারেন্টিন উইংয়ের কর্মকর্তারা প্রশংসাপত্র দেন— আমদানিকারক দেশগুলোর প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী আমগুলো উত্তম কৃষি পদ্ধতি মেনেই উৎপাদন করা হয়েছে।

স্থানীয় বাজার থেকে কেনা আমগুলো আমদানিকারক দেশগুলোতে পৌঁছানোর পরে বেশির ভাগ আমে পোকা-মাকড়ের সংক্রমণ দেখা যায়। বিশেষত আমেরিকা ও ইউরোপে আমগুলো প্রত্যাখ্যান ও ধ্বংস করা হয়েছিল। বিদেশের বিমানবন্দরে আম প্রত্যাখ্যান হওয়ার হার বাড়তে থাকায় আমদানিকারক দেশগুলোতে বাংলাদেশি ফলের চাহিদা ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট ইউনিয়ন এলাকার আম উৎপাদক রবিউল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘রপ্তানি মানের আম উত্পাদন করেও আমরা ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে গেছি। কারণ স্থানীয় বাজারে নিরাপদ আমের চাহিদা বেড়ে গেছে। স্থানীয় ক্রেতারা ভালো দাম দিয়ে আমাদের আম কিনছেন। যদি আমরা কেবল রপ্তানির ওপর নির্ভর করে থাকতাম তাহলে আমাদের লোকসান হতো।’

ডিএই কর্মকর্তাদের মতে, রাজশাহী জেলার চুক্তিভিত্তিক অধিকাংশ কৃষকই এ বছর রপ্তানির জন্য আম বিক্রি করার সুযোগ পাননি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাত্র একজন কৃষক রপ্তানিকারীদের কাছে এ পর্যন্ত প্রায় ১০ টন বিক্রি করতে পেরেছেন।

শিবগঞ্জে দুই শ আম উৎপাদকদের সংগঠন নিরাপদ আম উৎপাদক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল খান শামীম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমরা যখন রপ্তানি মানের আমের উত্পাদন করতে যাই, তখন আমাদের ব্যয় বেড়ে যায়। একটি বাগান থেকে যদি আমরা তিন টন আম সংগ্রহ করি, রপ্তানির জন্য আমরা এক টন মানসম্পন্ন আম পাই। এতে দাম বেড়ে যায়।’

ইসমাইল জানান, এ বছর তিনি রপ্তানিকারীদের প্রায় ১০ টন আম্রপালি জাতের আম সরবরাহ করেছেন। সুইজারল্যান্ডে যে আম পাঠানো হয়েছে, তা তিনিই সরবরাহ করেছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্ল্যান্ট কোয়ারেন্টিন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মো. ফজলুল হক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘চুক্তিভিত্তিক কৃষকরা উত্তম কৃষি পদ্ধতি অনুসরণ করে পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরাপদ আম উত্পাদন করতে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। এই পদ্ধতিতে নির্ধারিত পরিমাণে কীটনাশক ও সার ব্যবহার করা হয়। ফল-ব্যাগিং পদ্ধতি অনুসরণ করে উৎপাদনের পরে দক্ষ শ্রমিকরা আম সংগ্রহ করে।’

তিনি বলেন, ‘চুক্তিভিত্তিক কৃষকদের কাছ থেকে আম কিনলে ভালো দাম দিতে হবে বলে রপ্তানির সময় ব্যবসায়ীরা স্থানীয় বাজার থেকে আম কিনতে পছন্দ করেন। গত কয়েক বছরে যা ঘটেছে তা হলো, কিছু ব্যবসায়ী কৃষকদের এড়িয়ে বাজার থেকে কম দামে আম কিনেছিল এবং আম পরীক্ষার ফলাফলগুলোও তাদের পক্ষে জোগাড় করেছিল। বেশিরভাগ আম ছিল কীট-সংক্রমিত। শেষ পর্যন্ত ক্রেতা দেশগুলো আম প্রত্যাখ্যান করেছে। যে কারণে গত কয়েক বছরে রপ্তানি খুব কম হয়েছে।’

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১২ লাখ টন আম উৎপাদন করে। এর ১০ শতাংশ পর্যন্ত রপ্তানি করলে স্থানীয় বাজারের চাহিদার ওপর প্রভাব পড়ে না।

কৃষি অধিদপ্তর জানায়, পোকা দমনের জন্য ২০১৫ সালে কৃষকরা যখন প্রথম আম গাছে ফলের ব্যাগ ব্যবহারের চীনা পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তখন আম রপ্তানির সম্ভাবনা দেখা দেয়। সে বছরই প্রথমবারের মতো ইউরোপ ও মধ্য প্রাচ্যে ১৬৫ টন আম পাঠানো হয়। এর মধ্যে মাত্র ১০ টন আম রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে নেওয়া হয়েছিল। বাকি আম নেওয়া হয় দক্ষিণের জেলাগুলো থেকে। পরের বছর এখন পর্যন্ত আমের সর্বোচ্চ রপ্তানি হয়েছে ৬৬৫ টন, যার ৯০ শতাংশ ছিল দেশের প্রধান আম উৎপাদনকারী জেলা রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের।

এতে উৎসাহিত হয়ে রাজশাহী অঞ্চলের কৃষকরা ২০১৭ সালে রপ্তানির লক্ষ্যে প্রায় দুই কোটি নিরাপদ আম উত্পাদন করেন। কিন্তু সে বছর তারা মাত্র দুই দশমিক আট টন রপ্তানিকারীদের কাছে বিক্রি করতে পেরেছিলেন। সে বছর মোট ৩২৪ টন আম রপ্তানি করা হয়েছিল। যার বেশিরভাগই ছিল বাজার থেকে কেনা। ২০১৮ সালের চিত্র ছিল একই রকম। উৎপাদকরা মাত্র ২৩১ টন আম রপ্তানিকারীদের কাছে বিক্রি করতে পেরেছিলেন। গত বছর আম রপ্তানি ১০০ টনের নিচে নেমে আসে। ২০১৬ সালের তুলনায় যা ৮৫ শতাংশ কম।

কৃষকদের ক্ষতি হওয়ায় ২০১৭ সালে ১০ জুলাই এই অঞ্চলের কৃষি খাদ্য উৎপাদনকারী সমিতির আহ্বায়ক আনোয়ারুল হক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অভিযোগ করেন।

অভিযোগপত্রে তিনি বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্ল্যান্ট কোয়ারেন্টিন উইংয়ের কিছু কর্মকর্তা কীটনাশক-ব্যবহারকারী উত্পাদকদের পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন। তারা অজৈব আম রপ্তানির জন্য প্রত্যয়ন দিয়েছিলেন যার ফলে জৈব আম চাষিদের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।

বাংলাদেশ খাদ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহফুজুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি আনোয়ারুলের অভিযোগের তদন্ত করে। ওই বছরের ১ নভেম্বর তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দেয়। তাতে বলা হয়, কর্মকর্তারা কীটনাশক-ব্যবহারকারী উৎপাদকদের সমর্থন করেছেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে জৈব আমের প্রতি কর্মকর্তাদের ‘অবহেলা ও উদাসীনতা’ ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। কমিটির পক্ষ থেকে নিরাপদ আমের প্রচারের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে নিরাপদ আম উৎপাদক, রপ্তানিকারক ও অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব আছে বলে উল্লেখ করা হয়। কৃষকদের দাবি, তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশগুলি কার্যকর করা হয়নি। পরের বছরগুলোতেও তাদের একই সমস্যায় পড়তে হয়েছে।

ফেনীর আম রপ্তানকারী মো. শাহাবুদ্দিন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘রপ্তানির জন্য আম কেনার সময় সব রপ্তানিকারী বা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান একই কাজ করেন না। নামকরা রপ্তানিকারীরা নিয়ম লঙ্ঘন করেন না। অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে কিছু অসাধু রপ্তানিকারকরা মিলে লাভের জন্য নিম্ন মানের আম রপ্তানি করেন। যার কারণে আমাদের সুনাম নষ্ট হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘রপ্তানিকারীরা যখন কোনো বাগান থেকে আম কেনেন, তখন কৃষি কর্মকর্তারা প্রশংসাপত্র দেন। তারা আম পরীক্ষাও করেন। এগুলো কোয়ারেন্টিন স্টেশনে নিয়ে যাওয়ার পরে আবারও প্রশংসাপত্র দেওয়া হয়। আপনি দেখুন, কর্মকর্তারা দুটি পর্যায়ে জড়িত এবং তাদের প্রশংসাপত্র নিয়ে বিদেশে আম পাঠানোর পরেও প্রত্যাখ্যিত হচ্ছে। এখানে ব্যবসায়ীরা একা দোষী নয়।’

‘সাধারণত, রপ্তানিকারীরা চুক্তিভিত্তিক কৃষকদের কাছ থেকে আম কেনার সময় বাজারমূল্যের চেয়ে ২০ টাকা এবং কখনো ৪০ টাকা বেশি দাম দেয়। অনেক রপ্তানিকারী এই অতিরিক্ত ব্যয় এড়াতে চান। তারা বিদেশি বাজারে ভারতীয় ও পাকিস্তানি রপ্তানিকারীদের সাথে প্রতিযোগিতা করেন। ইউরোপীয় মধ্য-পূর্বাঞ্চল ও এশীয় দেশগুলোতে বাংলাদেশি আম বাজারজাত করার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু আম রপ্তানির নীতিমালার অভাব ও অসততার কারণে আমরা তা পারছি না। এবার করোনার কারণে বিশ্বজুড়ে লকডাউন ও ভ্রমণ বিধিনিষেধের ফলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি’— বলেন মো. শাহাবুদ্দিন।

প্ল্যান্ট কোয়ারেন্টিন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক ফজলুল হক আরও বলেন, ‘নিরাপদ আম চাষিদের দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে সরকার রাজশাহী এবং আরও কিছু অঞ্চলে কোয়ারেন্টিন স্টেশন স্থাপনের কথা বিবেচনা করছে। এ জন্য আমাদের একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।’

বর্তমানে রপ্তানিযোগ্য আম পরীক্ষার জন্য রাজশাহী অঞ্চল থেকে নারায়ণগঞ্জে শ্যামপুরে নিয়ে যেতে হয়।

Comments