ঢাকার সঙ্গে উত্তর-পশ্চিম-দক্ষিণাঞ্চলের রেল যোগাযোগ সমস্যার শিগগির সমাধান নেই

রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দেশের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের রেল যোগাযোগের বিদ্যমান সমস্যা খুব শিগগির সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা নেই। রেল যোগাযোগের উন্নতিতে এ রুটের জন্য দুটি প্রকল্প নেওয়া হলেও, ঋণ পেতে দেরি ও খরচ কমানোর নির্দেশনার কারণে রেল ট্র্যাকের সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় ধরে আটকে আছে।
rail-line.jpg-1.jpg
ছবি: স্টার

রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দেশের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের রেল যোগাযোগের বিদ্যমান সমস্যা খুব শিগগির সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা নেই। রেল যোগাযোগের উন্নতিতে এ রুটের জন্য দুটি প্রকল্প নেওয়া হলেও, ঋণ পেতে দেরি ও খরচ কমানোর নির্দেশনার কারণে রেল ট্র্যাকের সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় ধরে আটকে আছে।

এ রুটে রেল যোগাযোগের বর্ধিত চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ রেলওয়ের (বিআর) নেওয়া প্রকল্প দুটি হচ্ছে- যমুনা নদীর ওপর একটি রেল সেতু নির্মাণ এবং জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী পর্যন্ত ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ।

প্রথম প্রকল্পটির ২০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের মধ্যে সম্পূর্ণ কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আর দ্বিতীয় প্রকল্পটির দৃশ্যমান কাজ এখনো শুরু হয়নি।

জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী প্রকল্প অনুমোদনের দুই বছরেরও বেশি সময় পার হলেও চীনের সঙ্গে এখনো ঋণ চুক্তি সই হয়নি।

বাংলাদেশ রেলওয়ের নথি থেকে জানা যায়, ১৪ হাজার ২৫০ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্প ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়ন হওয়ার কথা।

মোট প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে আট হাজার ৭৫৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার কথা চীন সরকারের। তবে, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ঋণ চুক্তির বিষয়ে এখনো কোনো সাড়া পায়নি।

ঋণ চুক্তি সই করার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে এ বছর জানুয়ারিতে রেল মন্ত্রণালয় তৃতীয়বারের মতো চীন সরকারকে চিঠি দেয়। চিঠিতে প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত উপযোগিতা পেতে দুই প্রকল্পের সমন্বয়ের গুরুত্বের বিষয়টি নিয়ে জোর দেওয়া হয়।

রেল কর্মকর্তারা জানান, একটিকে বাদ দিয়ে অপর প্রকল্প শেষ হলে রেলের বর্ধিত চাহিদার সমস্যা সমাধান হবে না।

এদিকে, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী প্রকল্পের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে গত বছরের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়। ফলে এ নিয়ে ঠিকাদারের সঙ্গে আবারও আলোচনায় বসতে হয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকল্প ব্যয় কমানোর নির্দেশনা দিলেও, রেল কর্মকর্তারা দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হওয়ায় খরচ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

তারা বলেন, আলোচনায় ঠিকাদার কাজ শুরুর পর প্রকল্প শেষ করতে চার বছর সময় লাগার কথা জানিয়েছেন।

রেলওয়ের মহাপরিচালক ধীরেন্দ্র নাথ মজুমদার জানান, ঋণ চুক্তি সই ও ঠিকাদারের সঙ্গে পুনরায় আলোচনার পর কাজ শেষের নির্ধারিত সময়সীমা জানিয়ে দেওয়া হবে এবং সময়ের কথা মাথায় রেখে ঠিকাদারকে দ্রুত কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হবে।

প্রতিবন্ধকতা

রাজধানীর সঙ্গে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের রেল যোগাযোগে ট্রেনের দেরি গত কয়েক বছরে একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগের জন্য নির্মিত জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী রুটটি সিঙ্গেল লাইনের।

রেল কর্মকর্তাদের মতে, সিঙ্গেল লাইন দিয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২২টি ট্রেন চলাচল করতে পারে। বর্তমানে ওই রুটে প্রতিদিন ৪২টি ট্রেন চলাচল করে। বর্ধিত সংখ্যক ট্রেন চলাচলের কারণে ট্রেনগুলোকে কোনো স্টেশনে অপেক্ষা করে একে অপরকে চলার জায়গা করে দিতে হয়। আর এ অপেক্ষার কারণে ট্রেনের সময়সূচীতে দেরি হয়।

এ ছাড়া, জয়দেবপুর ও বঙ্গবন্ধু সেতুর (পূর্ব) মধ্যবর্তী স্টেশনগুলোর দূরত্ব তুলনামূলকভাবে বেশ দীর্ঘ। ফলে ট্রেনগুলোর অপেক্ষার সময়ও দীর্ঘ হয়ে যায়।

বঙ্গবন্ধু সেতুতেও ট্রেনের দেরি হয়। সেতু অতিক্রম করার সময় ট্রেনগুলোকে ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটারের ‘সীমিত’ গতিতে চলতে হয়। এতে সেতুর পূর্ব ও পশ্চিম স্টেশনের মধ্যে সাত কিলোমিটার দূরত্ব পার হতে ট্রেনের প্রায় আধাঘণ্টা সময় লেগে যায়।

দুই সমস্যা

রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন একাধিকবার জানিয়েছেন, যমুনা নদীর ওপর রেল সেতু ও জয়দেবপুর থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ রুটে ট্রেনের দেরি হওয়ার সমস্যা সমাধান করা যাবে না।

২০১৬ সালের জানুয়ারিতে সরকার যমুনা নদীর ওপর একটি ডাবল লাইন রেলসেতু নির্মাণের প্রকল্প নেয়। এর দীর্ঘ সময় পর গত বছরের আগস্টে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়।

প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, ১৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকার এ প্রকল্প ২০২৪ সালের আগস্টের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। চার দশমিক আট কিলোমিটার এই সেতু নির্মাণ শেষ হলে প্রতিদিন এ রুটে ৮৮টি ট্রেন চলাচল করতে পারবে।

জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী রুটে ১৭৪ কিলোমিটার সিঙ্গেল লাইনকে ডুয়েল গেজ ডাবল লাইনে রূপান্তর করতে সরকার ২০১৮ সালের নভেম্বরে ১৪ হাজার ২৫০ কোটি ৬১ লাখ টাকার প্রকল্প নেয়।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের সঙ্গে আলোচনা শেষ করে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের মার্চে চীন সরকারকে চুক্তিতে সই করার অনুরোধ জানিয়ে একটি চিঠি দেয় মন্ত্রণালয়। গত দুই বছরে মন্ত্রণালয় চীন সরকারকে একই চিঠি তিন বার পাঠায়। সর্বশেষ চিঠি পাঠানো হয় এ বছর জানুয়ারির শেষ দিকে।

চীনা অর্থায়ন ও চীনা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বাস্তবায়ন হতে যাওয়া তিনটি রেল প্রকল্পের ব্যয় পর্যালোচনা করতে গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় একটি কমিটি গঠন করে।

কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দুটি প্রকল্পের ব্যয় কমিয়ে আনতে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেয়। এর মধ্যে একটি প্রকল্প হচ্ছে জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী প্রকল্প।

নির্দেশনা অনুযায়ী, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী রেলপথ সম্প্রসারণ প্রকল্পের জন্য সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদিত ১১ হাজার ৫৮৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকার চুক্তি মূল্য থেকে ঠিকাদারকে এক হাজার ৪৯৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা কম ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। এই পরিমাণ ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি মূল্যের ১২ দশমিক ৯১ শতাংশ।

গত বছরের ৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ রেলওয়ের এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওই নির্দেশনা নিয়ে চীনা ঠিকাদারের সঙ্গে আলোচনা করা এবং সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির কাছে আবারও ক্রয় প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সভায় এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) ধীরেন্দ্র নাথ মজুমদারের নেতৃত্বে তিনটি কমিটিও গঠন করা হয়। গত মাসে তিনি রেলওয়ের মহাপরিচালকের দায়িত্ব নেন।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ধীরেন্দ্র নাথ মজুমদার জানান, ইতোমধ্যে তারা খরচ কমানোর বিষয়ে ঠিকাদারকে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছেন এবং সেটির পর্যালোচনা চলছে।

‘আমরা শিগগিরই তাদের উত্তর পাব বলে আশা করছি’, গত ৪ মার্চ তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন।

ঋণ পেতে দেরির বিষয়ে ধীরেন্দ্র নাথ বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে আমরা ঠিকাদারকে তাদের কাজের গতি বাড়াতে বলব। আমরা প্রকল্পের অন্তর্বর্তী সময় কমিয়ে দেব।’

‘যেহেতু এটা একটা নতুন লাইন, তার প্রকল্পের কাজগুলো দ্রুতই করা সম্ভব হবে।’

তিনি বলেন, ‘তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেই আমাদের জন্য ভালো।’

Comments

The Daily Star  | English
MP Azim’s body recovery

Feud over gold stash behind murder

Slain lawmaker Anwarul Azim Anar and key suspect Aktaruzzaman used to run a gold smuggling racket until they fell out over money and Azim kept a stash worth over Tk 100 crore to himself, detectives said.

8h ago