আড্ডা

একটি গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি সিনেমা হল

বেশ কিছুদিন ধরেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অবস্থা ভালো নয়। মাঝে বাংলা সিনেমায় অশ্লীলতা মহামারী আকার ধারণ করেছিল। সে অবস্থা থেকে পরিত্রাণ এলেও সিনেমার ক্ষেত্রে আসেনি আগের সেই ভালো সময়

আনন্দধারা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে প্রাধান্য দিয়েই বরাবরই কাজ করে যাচ্ছে। পাঠকদের কাছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র তুলে ধরা আনন্দধারার একটি বড় লক্ষ্য। বেশ কিছুদিন ধরেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অবস্থা ভালো নয়। মাঝে বাংলা সিনেমায় অশ্লীলতা মহামারী আকার ধারণ করেছিল। সে অবস্থা থেকে পরিত্রাণ এলেও সিনেমার ক্ষেত্রে আসেনি আগের সেই ভালো সময়। এমন অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় বের করার জন্য আনন্দধারার নিয়মিত প্রচেষ্টা হিসেবে কথা হয় বাংলাদেশের কয়েকজন বিখ্যাত পরিচালকের সঙ্গে। যাদের হাতে নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশের বেশকিছু ব্যবসাসফল এবং দর্শকনন্দিত সিনেমা। এ আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সহসভাপতি মনতাজুর রহমান আকবর, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির মহাসচিব বদিউল আলম খোকন, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির যুগ্ম মহাসচিব শাহীন সুমন, সোহানুর রহমান সোহান এবং দীপংকর দীপন। সঞ্চালনায় ছিলেন আনন্দধারার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রাফি হোসেন

বাংলা সিনেমা নিয়ে আড্ডা। ছবি : শাহরিয়ার কবির হিমেল

রাফি হোসেন: সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাদের ব্যস্ততার মাঝেও এ আয়োজনের জন্য সময় দেয়ার জন্য। আজকের আলোচনা শুরু করতে চাই এই প্রশ্ন দিয়ে যে, বর্তমান অবস্থা থেকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উত্তরণের উপায় কী?

বদিউল আলম খোকন: প্রথমেই বলব বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের কাজের সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সরকারের সহযোগিতার। আমরা পরিচালক সমিতি থেকে নিয়মিতভাবেই প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছি এ সমস্যা সমাধানের। বর্তমানে আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের পর তা প্রদর্শন করা। সিনেমা তৈরি, পরিবেশনা বা প্রচারণা সবই ঠিক আছে। কিন্তু প্রদর্শনের জায়গাতে সমস্যার কারণে আমরা নানামুখী সমস্যা মোকাবেলা করছি। বাংলাদেশে হলের সংখ্যা কমে গেছে এটা ঠিক। কিন্তু হল নেই তা বলা যাবে না। হল আছে। কিন্তু একটি গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি। তাদের পছন্দমতো সিনেমা হলে তবেই আমরা সিনেমা প্রদর্শন করতে পারি, অন্যথায় পারি না। আমরা আগে থার্টি ফাইভে সিনেমা শ্যুট করতাম। নেগেটিভে শ্যুট করে পজেটিভে এনালগ পদ্ধতিতে সিনেমা হলে প্রদর্শিত হতো। এখন ডিজিটাল পদ্ধতি এসেছে বাংলাদেশেও। এর ফলে এখন আর নেগেটিভে শ্যুট হয় না। এ পরিবর্তনটা আসার সঙ্গে সঙ্গেই একটি গোষ্ঠীর হাতে হলগুলো চলে গেছে। শাহিন সুমনের পরিচালনায় জাজ মাল্টিমিডিয়ার ‘ভালোবাসার রঙ’ সিনেমা দিয়ে এদেশের ডিজিটাল সিনেমার যাত্রা শুরু। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জাজ মাল্টিমিডিয়া সব হল তাদের করায়ত্ত করে নিয়েছে। শুরুতে এ ডিজিটাল পদ্ধতি এদেশে আনার পেছনে তাদের হয়তো উদ্দেশ্য ভালোই ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন তারা দেখল, ব্যবসা বেশ ভালোই হচ্ছে, তখন থেকেই এ জায়গাটি হয়ে গেছে মনোপলির মতো। এখন হলগুলোতে সিনেমা দেখানোর জন্য যে ডিজিটাল মেশিন দরকার, তা জাজ মাল্টিমিডিয়া সরবরাহ করছে। তাদের কাছ থেকে মেশিন ভাড়া নিয়ে তারপর হলে সিনেমা দেখাতে হচ্ছে।

রাফি হোসেন: তাদের কাছ থেকেই মেশিন কেন নিতে হচ্ছে? হলগুলোর মেশিন কেন নেই?

বদিউল আলম খোকন: এটা অনেকটা ব্রিটিশদের চা খাওয়ানোর মতো ব্যাপার। তারা আমাদের দেশের মানুষকে প্রথমে বিনামূল্যে চা খাওয়াত। এরপর যখন মানুষ চায়ে অভ্যস্ত হয়ে গেল, তখন তাদের কাছে চা বিক্রি করা শুরু করল। এখানেও ব্যাপারটা তেমনই। প্রথমে তারা মেশিন বিনামূল্যে দিয়ে ‘ভালোবাসার রঙ’ সিনেমাটি প্রদর্শন করে। তারা বলে ভালো লাগলে আপনারা নিজেরা মেশিন কিনে নেবেন। কিন্তু কেউ আর তেমন কেনেনি। ফলে জাজের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে হলগুলোতে সিনেমা চালাতে হচ্ছে। এ মেশিনের ভাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি টিকিট থেকেও তাদেরকে আলাদাভাবে চার্জ দিতে হচ্ছে। এর ফলে সবার ব্যবসা ঠিক থাকছে বা বাড়ছে। কিন্তু ব্যবসা কমছে প্রযোজকের। সেই সঙ্গে হলে টিকিট বিক্রির টাকাও সঠিকভাবে প্রযোজক পাচ্ছেন না। এভাবেই দিনের পর দিন প্রযোজকরা ঠকতে ঠকতে সিনেমা বানানো ছেড়ে দিচ্ছে। আর এ জায়গাতেই সরকারের সহযোগিতা এই মুহূর্তে খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। হলগুলোতে সরকার থেকে যদি এখনই মেশিন সরবরাহ করা হয়, তাহলে এ সমস্যা আর থাকে না। এতে করে টিকিটের দামও কিছুটা কমে যাবে। ফলে আরো বেশি দর্শক হলে আসবে।

জাজ তাদের সিনেমা মুক্তি দেয়ার জন্য হল মালিকদের চাপ দিচ্ছে। তাদের লগ্নিকৃত সিনেমা এলে সেই সিনেমা হলে চালাতেই হবে। না চালালে হলে তাদের মেশিন দেবে না। ফলে হল মালিকরা না চাইলেও তাদের সিনেমাই চালাতে হচ্ছে। এ নিয়ে আমরা সরকারের সঙ্গে দফায় দফায় মিটিং করেছি এবং করছি। প্রযোজকরা ভালোবেসে সিনেমা বানান। তাদের যদি লাভ না-ও হয়, অন্তত লগ্নিকৃত টাকা ফিরে এলেই তাদের চলে। তাও সম্ভব হচ্ছে না। সবার সহযোগিতা পেলে এবং মেশিনগুলো যদি আমরা পাই, তাহলে আরো বেশি সিনেমা তৈরি হবে।

রাফি হোসেন: জাজ মাল্টিমিডিয়ার কারণে যেহেতু আপনাদের এত সমস্যা হচ্ছে, তাদের সঙ্গে কি আপনারা আলোচনায় বসেননি?

সোহানুর রহমান সোহান: তাদের সঙ্গে আমাদের অনেকবারই আলোচনা হয়েছে। তিনি অনেকবারই বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু তা আর রাখতে পারছেন না। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে তিনি আর ভাবছেন না। ভারতনির্ভর হয়েই তিনি কাজ করছেন। কোনোভাবে আমাদের দেশের দু-তিনজন শিল্পী নিয়ে পুরোপুরি ভারতে সিনেমা নির্মাণ করে নিয়ে চলে আসছেন। যার কারণে আমাদের সিনেমা মুখ থুবড়ে পড়ছে।

প্রদর্শনের সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আরো একটি সমস্যা পাইরেসি। এখানে পাইরেসি ঠেকানোর কোনো রাস্তা নেই। একটি সিনেমা একবার পাইরেটেড হয়ে গেলে আর তা হলে চালনো সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে একজন প্রযোজককে ডেকে এনে চলচ্চিত্র বানিয়ে তাকে তো আর জেনে-বুঝে পথে বসানো যায় না। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখন প্রযুক্তি অনেক উন্নত। এখন ঘরে বসে বিরাট স্ক্রিনে আপনি ঝকঝকে-তকতকে সিনেমা দেখতে পারছেন। আর হলে গেলে তো সেই পরিবেশটা পেতে হবে। সেই পরিবেশটাই বেশিরভাগ হলে নেই। উপযুক্ত পরিবেশ প্রতিটি হলে নিশ্চিত করতে হবে। এটা আনন্দ করার কিছুটা সময়। সেই সময়টা আনন্দঘন করার জন্য যা যা প্রয়োজন, তার সবকিছুই সেখানে থাকতে হবে। সেখানে বাচ্চাদের খেলার জায়গা থাকবে, সেখানে খাবারের ভালো দোকান থাকবে, সঙ্গে আরো প্রয়োজনীয় কিছু বিষয় থাকতে হবে। এরপরই সবার আস্তে আস্তে অভ্যাস তৈরি হবে সিনেমা দেখার। এখন আমাদের দেশের মানুষের অভ্যাস বদলে গেছে। অশ্লীল সিনেমার কারণে দর্শক হারায় আমাদের দেশের সিনেমা। সেই সমস্যা থেকে যখন অনেক আন্দোলন করে মুক্তি পাওয়া গেল এখন সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াল জাজ মাল্টিমিডিয়া। দর্শকহীন হলে যখন কোনো হল মালিক লগ্নি করতে ভয় পাচ্ছিলেন, তখন অল্প কিছু বিনিয়োগ করে সেই হলগুলোকে এভাবে দখল করে নেয় জাজ। হল মালিকরাও খুশি, কারণ তারা নতুন কোনো লগ্নি ছাড়াই এভাবে ব্যবসা করতে পারছে।

দেশে হলের সংখ্যাও আরও বাড়াতে হবে। কেননা, কাছাকাছি হল হলে তবেই হলে দর্শক সংখ্যা বাড়বে। হলে যেতে যদি দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়, তাহলে আগ্রহ হারায় বেশিরভাগ মানুষই। উন্নত দেশগুলোকে দেখেন, তারা হলে একটা পরিবর্তন এনেছে। যার কারণে মানুষ ঘরে বিরাট স্ক্রিনে সিনেমা দেখতে পারলেও হলে ঠিকই যাচ্ছে। হলে পরিবেশ উন্নত হওয়াতে দর্শক তাদের আছে। আমরা হলে পরিবর্তন আনতে পারছি না বলেই সিনেমাতেও পরিবর্তন আনতে পারছি না।

বা থেকে সোহানুর রহমান সোহান, শাহিন সুমন এবং দীপংকর দীপন। ছবি : শাহরিয়ার কবির হিমেল

রাফি হোসেন: এখানে আপনারা যারা এখানে এসেছেন, তারা তো সবাই হিট সিনেমার নির্মাতা। আপনাদের কাছেই জানতে চাই, হিট সিনেমার সংজ্ঞা কী? কী করলে সিনেমা হিট হবে?

সোহানুর রহমান সোহান: যে সিনেমা বেশি ব্যবসা করে সেটাই হিট। আমরা যখন সিনেমা বানাই, তখন দর্শকদের কথা মাথায় রেখেই বানাই। দর্শক কী পেলে মন ভরে দেখবে, সেটাই মুখ্য। উদাহরণ হিসেবে ধরতে পারেন বাহুবলী-২-এর কথা। তারা সিনেমাটি প্রচুর টাকা খরচ করে বানিয়েছে এবং ব্যবসাও করেছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। এখনকার বাজার ধরতে গেলে বাজেট একটা বড় ব্যাপার।

মনতাজুর রহমান আকবর: আমার দেশের মানুষ কী চায় সেটা প্রথম ব্যাপার। আমার দেশের মানুষ যাত্রা এবং মঞ্চ দেখা দর্শক। আমাদের মাথায় রাখতে হয়, তারা কেমন মেলোড্রামা চায়। তারা উচ্চস্বরে বলা ডায়ালগ পছন্দ করে নাকি নিচুস্বরে। আমাদের সিনিয়র পরিচালকদের একেকজন পরিচালক একেকভাবে সিনেমা বানিয়েছেন। সেগুলো দেখে আমরা শিখেছি। আমার মনে হয়েছে প্রথমে দরকার দর্শকের মনে দাগ কাটার মতো একটি গল্প। সামাজিক অ্যাকশনধর্মী সিনেমাই আমাদের দেশে বেশি চলেছে। আর চলেছে রোম্যান্টিক সিনেমা। একটা সিনেমা ব্যবসাসফল হলে আমরা বাকিরা সেটা দেখছি। সেটা কেন ব্যবসাসফল হলো তা দেখে আরও কিছু শেখার চেষ্টা করি। নির্মাণের মধ্যেও একটা ব্যাপার থাকে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা কতটা সুন্দর করে সিনেমাটি দর্শকের সামনে তুলে ধরতে পারি, সেটাও একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এ সবকিছুর পরিশীলিত উপস্থাপন হলেই একটি সুপারহিট সিনেমা নির্মাণ করা সম্ভব।

বদিউল আলম খোকন: সমসাময়িক সময়ের কথা মাথায় রেখে সিনেমা বানাতে হয়। ‘বেদের মেয়ে জোসনা’-র পর এমন ধারার আরও অনেক সিনেমা বানানো হয়েছে। কিন্তু সেগুলো আর ‘বেদের মেয়ে জোসনা’-র মতো হিট হয়নি। সিনেমা বানানোর সময় দর্শকের মনের পরিবর্তনটাও মাথায় রাখা দরকার। প্রতিদিন ভাত, মাছ খেতে খেতে একদিন একটু পোলাও খেতে মন চাইবে। সেটা বুঝতে হবে। দর্শককে ঠিক কোন সময় কোন ধরনের গল্পের সিনেমা দিলে তারা তা নেবে, সেটাও বুঝতে হবে। মানুষের মন পরিবর্তনশীল। পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে সবার ভেতরে পরিবর্তন আসে।

দীপংকর দীপন: এ আয়োজনে আমি একেবারেই তরুণ। কারণ আমার মাত্র একটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। সফল হয়েছি বলেই আবার সিনেমা বানাতে হচ্ছে। আমি মূলত মার্কেট মাথায় রেখেই সিনেমা বানিয়েছিলাম। আমি প্রথমেই চিন্তা করেছি আমার সিনেমার মূল দর্শক কারা হবে। কোন বয়সের দর্শককে আমি সিনেমা হলে আনতে পারব। অনেক মানুষের ভেতরেই সিনেমা হলে যাওয়ার অভ্যাসটা নষ্ট হয়ে গেছে। আমি দেখেছি যাদের বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছর, তাদের এখন সিনেমা হলে আনাটা তুলনামূলক সহজ। তারা দুপুর বা সন্ধ্যায় কিছুটা অবসরে থাকে। এর থেকে বেশি বয়সের যারা, তাদের আরও কিছু প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। যেমন পরিবারকে সময় দেয়া বা এমন আরও অনেক কিছু। যার কারণে এই ১৫ থেকে ৩০ বছরের মানুষ টার্গেট করে আমি গল্প চিন্তা করলাম। তাদের চাহিদা খুঁজে বের করলাম। দেখলাম তারা প্রচুর হিন্দি এবং দক্ষিণ ভারতের সিনেমা দেখে ফেলেছে। এর পাশাপাশি হলিউডের কমার্শিয়াল সিনেমা দেখেছে। এ বিষয়টা অবশ্যই আমাকে মাথায় রাখতে হয়েছে। আগে শুনতাম, আমি যেভাবে গল্প বলতে চাইছি, তা দর্শক বুঝবে কিনা তা ভেবে আমার চিন্তাকে একটু অবনমন করতে হবে। কিন্তু আমি ভাবলাম আমি মফস্বল থেকে আসা একটা ছেলে, যা বুঝি দর্শকরাও সেটা অবশ্যই বুঝবে। সেটা ভেবেই আমি ‘ঢাকা অ্যাটাক’ নির্মাণ করেছি। নির্মাণের পর দেখলাম দর্শক আমার থেকেও ভালো বোঝে এবং আমার নির্মাণ ত্রুটিগুলো তারা আমাকে ধরিয়ে দিয়েছে।

আমি সিনেমা বানানোর সময় আমার নিজের কিছু ব্যাপার খুঁজে বের করলাম। এগুলো একান্তই আমার ব্যক্তিগত চিন্তা। আমি প্রথমে যেটা পেলাম, সেটা হলো হলে বসে সিনেমা দেখার সময় আমার দর্শক যেন ১০ থেকে ১৫ মিনিটের ভেতরে ভুলে যায় যে, সে বাড়িতে বা বাইরে কোনো অশান্তি রেখে এসেছে। সব ভুলে সে যেন একটি ভিন্ন জগতে প্রবেশ করে। এটা করতে গেলে সিনেমার প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি অভিনয়, অংশ বাস্তবসম্মত হওয়া দরকার। যাতে মানুষের মনে হয়, এ জগৎটা বাস্তব। আর দ্বিতীয় হলো বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে খেলা। আমাদের দেশের দর্শকরা হলে ঢুকেই নির্মাতার বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে খেলতে শুরু করেন অবচেতনভাবেই। তারা বলতে বা বুঝতে শুরু করেন এরপর এই হবে। এই বুদ্ধিমত্তার খেলায় নির্মাতাকে জিততে হবে। দর্শকের বুদ্ধিমত্তার ওপরের জিনিস দিতে হবে। তাহলেই সেই দর্শক আমাকে নির্মাতা হিসেবে শ্রদ্ধা করবে। তৃতীয় যেটা পেলাম সেটা হলো এমন কিছু অভিজ্ঞতা দর্শককে দিতে হবে, যেটা শুধু হলেই পাওয়া সম্ভব। বাসায় বসে পাওয়া যাবে না। হলের বিরাট স্ক্রিনের সঙ্গে সাউন্ড এবং অন্যান্য বিষয়কে সুন্দরভাবে উপস্থাপন। আমি সিনেমা হলে চাইলেই একটু কম আলো ব্যবহার করতে পারি, যেটা টিভিতে সম্ভব না। লাইটের এই ভিন্নতা দর্শক পছন্দ করে। এসব বিষয় মাথায় রেখেই ‘ঢাকা অ্যাটাক’-এর গল্প শুরু হলো। আমি এটা বানাতে গিয়ে বুঝলাম, আমি যত ভালো কিছ্ইু বানাই না কেন, দর্শক যদি নিজে এ গল্পের সঙ্গে আটকে না যায়, তাহলে এর সার্থকতা থাকবে না। দর্শককে এ গল্পের সঙ্গে আটকে ফেলতে হবে এবং তাকেও গল্পের সঙ্গে সঙ্গে টেনে নিতে হবে। তার জন্য আমরা এডিট প্যানেলে অনেক কাজ করেছি। ডিজিটাল হওয়াতে আমরা এটা অনেক সহজে এটা করতে পেরেছি।

তবে আমরা সিনেমাটি বানানোর পর যে পরিমাণে সাড়া পেয়েছি আমাদের ব্যবসায়িক হিসেবে তা পাইনি। একটি সিনেমা ভারতে বিপণন হলে তারা একশ’ টাকার টিকিট পায় প্রায় চল্লিশ টাকা আর আমরা পাই সতের টাকা। কিন্তু টাকা বুঝে নেয়ার সময় এ টিকিটের যথার্থ হিসাবটা আমরা পাইনি। পেলে আমাদের লাভের খাতা অনেক বড় হওয়ার কথা ছিল। আমাদের ধারণা ছিল, সেটা ১২ থেকে ১৩ কোটি টাকা হবে। কিন্তু তা হয়নি। এখন পৃথিবীর কোথাও সিনেমা থেকে ব্যবসার একমাত্র উপায় বক্স অফিস না। আরও অনেকভাবে আয় করতে হয়। যেমন- টেলিভিশন স্বত্ব, অনলাইন স্বত্ব ইত্যাদি। আপনারা জেনে অবাক হবেন, কলকাতার সিনেমা টিকে আছে টেলিভিশনে সিনেমার স্বত্ব বিক্রি করে। আজ যদি সেখানে টেলিভিশনে সিনেমা বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে কলকাতায় সিনেমার নির্মাণ অন্তত আশি ভাগ কমে যাবে। সেখানে গেলে দেখবেন তাদের সিনেমা হলে তেমন দর্শক হয়তো নেই। দেড় কোটি টাকায় একটা সিনেমা বানিয়ে তা এক কোটি টাকায় বিক্রি করে দেয় কোনো একটি টিভি চ্যানেলে। আর বাকি টাকা হল এবং অন্যভাবে তুললেই চলে। এর সঙ্গে সারা বিশ্বে বিপণন করতে হবে। এ আলোচনায় বাহুবলী-২-এর কথা এসেছে। এ সিনেমাটি চায়নাসহ বাইরের বেশকিছু দেশ থেকে বড় অঙ্কের একটি টাকা আয় করেছে। যেটায় আমরা পিছিয়ে আছি। আমরা যদি শুধু বাংলাদেশে বক্স অফিসের ওপর নির্ভর করতাম, তাহলে আমাদের খরচের টাকাও উঠত না।

আমাদের দেশে এখন নির্মাণ করতে গেলে গল্প বলাটা হতে হবে দারুণ। আমাদের দেশের তরুণরা নিজেদের অজান্তেই আমাদের দেশের সিনেমাকে তুলনা করে বসে দক্ষিণ ভারতের সিনেমার সঙ্গে। সেই অনুযায়ী তাল মিলিয়ে আমাদের নির্মাণে পরিবর্তন আনতে হবে। এ বিষয়ে আমরা যেন কোনোভাবেই পিছিয়ে না পড়ি, তা দেখতে হবে।

আর সর্বশেষ যে বিষয়টি সিনেমা নির্মাণে মাথায় রাখতে হবে তা হলো অভিনয় শিল্পী নির্বাচন। এ সবকিছু মিলে একটি সিনেমা ভালো হয়ে ওঠে। আমার মনে হয়, আজকের দিনে একটি সিনেমা সফল হওয়ার জন্য এসব বিষয়ই জরুরি।

শাহীন সুমন: আসলে আমাদের দেশে এখন যেহেতু প্রদর্শন করাটাই মুশকিল, তাই হিট কীভাবে হবে, তা বলাটাও মুশকিল। আমি যখন আমার ক্যারিয়ার শুরু করেছিলাম, তখন বাংলাদেশে হল ছিল প্রায় ১৪শ’। সেই সময় অসংখ্য হিট সিনেমা আমাদের ছিল।

একটি হিট সিনেমার জন্য ভালো গল্প যেমন দরকার, তেমনি দরকার বাজেট। পাঁচশ’ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাহুবলীর সঙ্গে আমাদের এক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সিনেমার তুলনা করে যদি বলা হয়, আমরা অমন সিনেমা বানাতে পারিনি, তখন খুব দুঃখ লাগে। আমি এ ব্যাপারের নিন্দাও জানাই। আমাদের দেশেও মেধাবী নির্মাতা আছেন। কিন্তু যথার্থ বাজেট একটি বড় অন্তরায় বলেই আমি মনে করি। ডাক্তার যেমন রোগীর পালস দেখে অনেক বিষয় বোঝেন, তেমনিভাবে আমাদের নির্মাতাদেরও উচিত দর্শকের পছন্দ বুঝে গল্প এবং অন্যান্য বিষয় নির্ধারণ করা। আরেকটি বিষয় হলো, সেন্সর নীতিমালা। এ আধুনিক যুগে এসেও পুরনো আমলের সেন্সর নীতিমালা এখনো বহাল তবিয়তেই আছে। আমরা অনেক বিষয় নিয়েই কাজ করতে পারছি না। আমাদের দেশের প্রায় সবাই জানে এদেশে দুর্নীতি পুলিশ থেকে শুরু করে মন্ত্রী পর্যন্ত সব জায়গাতেই আছে। ডাক্তার, শিক্ষকসহ সব জায়গাতেই দুর্নীতি রয়েছে। আমরা যদি কোনো মন্ত্রী বা পুলিশকে দুর্নীতিবাজ দেখাই, সেটা সেন্সর বোর্ড ছাড় দিচ্ছে না। সিনেমায় আমরা দিন বদলের জন্য যে কিছু করব তা পারছি না। যার কারণে আমরা বর্তমান সময়ের দর্শকের মন মতো কিছু গল্প যে বলতে পারব তা পারছি না। আমাদের হাত-পা বাঁধা। এ সমস্যার সমাধান হলে সিনেমার মান অনেক উত্তরণ হবে।

জাজ মাল্টিমিডিয়ার কারণে যে সমস্যাগুলো হচ্ছে, সেটাও একটি ব্যাপার। জাজ যখন আসে, তখন তাদের ভেতরে এদেশের সিনেমার জন্য ভালোবাসা ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তা নষ্ট হয়েছে। আমাদের দেশের একটি দুষ্টচক্রের পাল্লায় পড়ে তারা নষ্ট হয়েছে। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে থাকা কিছু মানুষই তাদের কুবুদ্ধি দিয়ে এ অবস্থায় এনেছে। বাংলাদেশে মাত্র তিনশ’ হল থাকলেই ব্যবসা রমরমা থাকবে। এর বেশি হলের খুব বেশি দরকারও নেই। তবে এ আলোচনায় যে সমস্যাগুলো এসেছে, সেগুলোর সমাধান করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতির যে ছিদ্রগুলো রয়েছে, তা বন্ধ হওয়া খুবই জরুরি।

আমরা সরকারের মুখাপেক্ষী। অনেকবার আশ্বাস পেয়ে তা বাস্তবায়ন না দেখে আমরা এখন আর আশ্বাসে বিশ্বাস রাখতে পারছি না। আমাদের তথ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে যথাযথ সহযোগিতা না পাওয়াটা আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা বলে আমার মনে হয়। এটা আমাদের জন্য দুঃখজনক ব্যাপার। আপনাদের মাধ্যমে আমরা তার পদে অন্য কাউকে দেয়া হোক এ দাবি পুনর্ব্যক্ত করছি।

বাঁ থেকে মনতাজুর রহমান আকবর এবং বদিউল আলম খোকন। ছবি : শাহরিয়ার কবির হিমেল

সোহানুর রহমান সোহান: আমরা মোবাইলেই এখন সব সিনেমা দেখতে পারছি। যার কারণে একটি নির্দিষ্ট ফরমুলায় আর ছবি হিট করা যায় না। এখন এমন কিছু করতে হবে, যা ভিন্ন রকম। আগে বাস্তব বিষয়টা আনতে চাইতাম। জীবনের গল্পটাই তুলে ধরতাম এবং দর্শক তা পছন্দও করত। কিন্তু বর্তমানের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ভারতের চ্যানেলগুলোর নাটকের কথাই যদি বলি, সেগুলো আমাদের সিনেমা থেকেও অনেক বেশি এগিয়ে গেছে। সারা বিশ্বের চ্যানেলই এখন খুব সহজেই দেখা যাচ্ছে। অনেক দেশের টিভি অনুষ্ঠান আরও বেশি আধুনিক। যার কারণে আমার মনে হয় হিট ছবি বানাতে গেলে এখন এমন কিছু বানাতে হবে, যা আগে মানুষ দেখেনি।

রাফি হোসেন : গিয়াসউদ্দিন সেলিমের ‘মনপুরা’ একটি হিট সিনেমা। এর নয় বছর পর তার বানানো ‘স্বপ্নজাল’ সেভাবে ব্যবসা করেনি। কিন্তু আমার মনে হয়েছে ‘মনপুরা’ থেকে অনেক বেশি ভালো সিনেমা ‘স্বপ্নজাল’। আপনারা যেহেতু এ বাণিজ্যিক সিনেমাই তৈরি করেন, তাই আপনাদের কাছে একটু বুঝতে চাই যে, দর্শক কেন এ সিনেমাটি সেভাবে নিল না?

বদিউল আলম খোকন: ‘মনপুরা’-র সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় বিষয় হলো এর গানগুলো। আমাদের দেশের মানুষের মনে এখনো মাটির গন্ধ ভালো লাগে। দোতারার সুর এখনো সবার মনে নাড়া দেয়। ‘মনপুরা’-র মতো সিনেমা দেখতে দেখতে এখন দর্শকও একটু পরিবর্তন চায়। আর নয় বছর পর দর্শকেরও তো চাহিদার পরিবর্তন হয়েছে। ‘স্বপ্নজাল’-এর মধ্যে একটি দুর্বোধ্যতা আছে। আমি নিজেই বুঝিনি। কিন্তু এযাবৎকালে যতগুলো বাম্পার হিট ছবি আছে, তার সবক’টিই খুব সহজ-সরল গল্প নিয়ে তৈরি। ‘মনপুরা’ দিয়ে মানুষের মনে যে সাড়া পড়েছিল, তা ‘স্বপ্নজাল’ দিয়ে পড়েনি। প্রযুক্তিগতভাবে অনেক ভালো হলেও এ গল্পটাই ‘স্বপ্নজাল-এর জন্য বাধা বলে আমার মনে হয়।

মনতাজুর রহমান আকবর: সাধারণত ছেলেই ঘরের প্রাচীর টপকে প্রেম করে। কিন্তু ‘মনপুরা’-য় ছিল উল্টো। মেয়েটি নৌকা চালিয়ে ছেলেটির কাছে যেত। এই একটি ব্যতিক্রম বিষয়ই কিন্তু দর্শককে আকর্ষিত করে রেখেছে। আর সঙ্গে তো গান ছিলই। ‘মনপুরা’-র মতো গান ‘স্বপ্নজাল’-এ ছিল না। ‘মনপুরা’-র পরিচালকের সিনেমা দেখতেই দর্শক হলে গিয়েছিল। কিন্তু এসব কমতির কারণেই তারা হতাশ হয়েছে। দীপংকর দর্শকদের নিয়ে যে মাঠ পর্যালোচনা করেছে, সেটি যদি তিনি করতেন তাহলে ‘স্বপ্নজাল’ ভালো যেত।

দীপংকর দীপন: আমরা যখন টেলিভিশন প্রোগ্রাম তৈরি করতাম, তখন আমাদের যুদ্ধ করতে হয়েছে মানুষের রিমোট টেপার অভ্যাসের বিরুদ্ধে। এমন কিছু তৈরি করতে হলো, যাতে মানুষ রিমোট না টিপে আমার অনুষ্ঠানটি দেখে। আর এখন সিনেমা বানাতে গিয়ে যুদ্ধ করতে হচ্ছে মানুষের সিনেমা না দেখার যে অভ্যাস তৈরি হয়েছে তার বিরুদ্ধে। আর সেই সঙ্গে হলের পরিবেশ নিয়ে যে সমস্যা, তাও আছে। এমন অবস্থায় আমি ধরে-বেঁধে দর্শককে হলে নিতে পারব না। হলে নিতে হলে গল্প এবং নতুনত্ব দিয়ে নিতে হবে। আর সেই সঙ্গে আছে সিনেমার প্রচার। আমি মনে করি, এ সিনেমায় আগে মানুষ কখনো দেখেনি সেই ব্যাপারটি নেই। আর সেই সঙ্গে ‘স্বপ্নজাল’-এর প্রচারে প্রচণ্ড রকমের ব্যর্থতা রয়েছে।

রাফি হোসেন: বর্তমানে নিয়মিত প্রযোজক কারা আছেন?

বদিউল আলম খোকন: এখন নিয়মিত তেমন প্রযোজক নেই। এখনকার প্রযোজক হচ্ছেন ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন টিভি চ্যানেল। আগে যারা নিয়মিত প্রযোজক ছিলেন, তারা এখন অনেকটাই পিছিয়ে গেছেন। বর্তমান পরিবেশের কারণেই এ অবস্থা। এই গোষ্ঠীর হাত থেকে যখন হলগুলো মুক্ত হবে, তখন পুরনো প্রযোজক ফিরে আসবেন।

রাফি হোসেন: দীপন, এত সমস্যার ভেতরেও ‘ঢাকা অ্যাটাক’ নিয়ে তোমরা কীভাবে সফল হলে?

দীপংকর দীপন: আমরা কোনো উৎসবকে লক্ষ্য করে সিনেমা মুক্তি দিইনি। কারণ আমরাও বেশ ভালোই বুঝছিলাম, সেই সময়ে ভারত থেকে আসা সিনেমার ভিড় আর সঙ্গে দেশেরও অনেক সিনেমার মাঝে আমাদের পড়তে হবে। সেগুলোর সঙ্গে নানাভাবেই পাল্লা দিতে হবে। তাই যেখানে আশপাশে কোনো বড় ছবি নেই, তেমন সময় নিয়েছিলাম।

রাফি হোসেন: আমরা এখন দেখছি, আমাদের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি মানেই শাকিব খান। এটা কি সম্ভব যে একজন নায়কের দ্বারা ইন্ডাস্ট্রি চলবে?

সোহানুর রহমান সোহান: আমাদের চলচ্চিত্রের অধঃপতনের এটাও একটা কারণ যে, আমরা একজন হিরোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছি। এক সময় ছিল যখন আলমগীর ভাই, রাজ্জাক ভাই, সোহেল রানা, ইলিয়াস কাঞ্চন এমন অনেক হিরো ছিলেন। এক সঙ্গে অনেক হিরো নিয়ে আমরা কাজ করতে পারতাম। কিন্তু যখন সালমান শাহ, নাইম বা শাকিবরা এলো তখন আগের সেই হিরোরা বাবার চরিত্রে চলে গেলেন। এখন আবার সেই সময় আসছে যে, শাকিবের বয়স প্রায় শেষের দিকে। এখনই ওর বয়সের ছাপ চেহারায় কিছুটা বোঝা যায়। প্রায় আঠারো বছরের বেশি হলো ও এ ইন্ডাস্ট্রিতে আছে। যদিও সে যথেষ্ট মেইনটেইন করে চলছে, কিন্তু সেটাও তো আর খুব বেশিদিন চলবে না। এভাবে চলতে থাকলে চলচ্চিত্র শিল্প আর সামনের দিকে এগোতে পারবে না। ‘আয়নাবাজি’-তে চঞ্চল খুব ভালো অভিনয় করেছে। এমন যদি বছরে চারটা সিনেমা হয়, আমরা যদি চারটা হিরো পাই, তাহলে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি ঘুরে দাঁড়াবে।

শাহিন সুমন: শাকিব খানের সঙ্গে সর্বাধিক প্রায় ২০টি সিনেমা আমি করেছি। আজকের এ অবস্থানে আসার পেছনে তার নিজের চেষ্টা, সাধনা এবং কৃতিত্ব রয়েছে। নতুন নায়ক এখানে সেভাবে আসছে না। পরপর দুটি সিনেমার দুটিই হিট এমন একজন নায়ক চঞ্চল চৌধুরী। কিন্তু তাকে আসলে দর্শকরা নেন ভিন্নভাবে। গ্রামের সহজ-সরল টাইপ চরিত্রে দর্শক তাকে নেন। কিন্তু নায়ক হতে হলে আসলে মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত নায়ক হতে হয়। যেটা আমাদের দেশে এখন উদাহরণ হিসেবে আছে শাকিব খান, এবং সেটা তার শত্রুরাও স্বীকার করবে। নতুন নায়কদের মধ্যেও প্রফেশনালিজমের খুবই অভাব আছে। আমি চঞ্চল চৌধুরী, আরিফিন শুভ দুজনের সঙ্গেই কাজ করতে চেয়েছি। কিন্তু তাদের ভেতরে কিছু সমস্যা পেয়েছি। সে জন্য শেষ পর্যন্ত তাদের সঙ্গে কাজ করিনি। এ নায়করা তাদের ভেতরের সমস্যাগুলো যদি সমাধান না করেন, তাহলে আসলেই নতুন নায়ক পাওয়া কষ্টকর হবে।

বদিউল আলম খোকন: একটি সিনেমা করার জন্য আসলে স্ক্রিপ্ট বড় কথা নয়। অনেক সময় স্ক্রিপ্ট ছাড়াও সিনেমা হয়ে যায়। সিনেমা বানান পরিচালক। সিনেমায় অভিনয় শিল্পী যদি একটি সিনেমা করেন সেটা হিট হয়ে গেলে ঔদ্ধত্যবোধ জন্মে, তখন তাকে নিয়ে কাজ করা যায় না। শাকিব তেমন নন। স্পট বয়দের সঙ্গে পর্যন্ত সে কখনো খারাপ ব্যবহার করেনি। তার অন্য সমস্যা আছে কিন্তু কোনো অহঙ্কারবোধ বা ঔদ্ধত্যতা নেই। শাকিবের প্রথম ছবি হিট হওয়ার পর তার কাছে যে প্রস্তাবই এসেছে, সে তাতে সাইন করেছে। তার হিসাব ছিল একটি ছবি হিট হবে, আবার একটি একটু কম চলবে। হতে পারে আরেকটি আবার ফ্লপ করবে। কিন্তু ছবি যদি না-ই করি, তাহলে আর এই হিসাব আসবে কী করে?

দীপংকর দীপন: আমি হিট পাঁচটি সিনেমা করার জন্য নিজের লক্ষ্য ঠিক করেছি এবং আমি অনুভব করি, এ পাঁচটি সিনেমা শেষ না করে আমার মরাও ঠিক না। সিনেমাগুলোর প্লটও আমার প্রস্তুত। আমি আমার পরবর্তী সিনেমার জন্য শাকিব এবং শুভর বাইরেও আরেকজন নায়কের জন্য চেষ্টা করছি। এবিএম সুমন, তাসকিন, বাপ্পী- তারাও ভালো কাজ করছেন। সব মিলিয়ে বিকল্প কিছু নায়ক আমাদের আছে। আরও কিছু নতুন মুখ আমাদের দরকার, যাদের একই সঙ্গে গ্ল্যামার, অভিনয় এবং সদিচ্ছা আছে। সেই সঙ্গে পুরো সিনেমার ব্যাপারে যারা শ্রদ্ধাশীল।

রাফি হোসেন: শেষ প্রশ্ন আপনাদের কাছে, যৌথ প্রযোজনা নিয়ে আপনাদের ভাবনা কী?

মনতাজুর রহমান আকবর: এ জায়গাটি আরেকটি সমস্যার ব্যাপার। আর এ সমস্যা করছেন মন্ত্রী নিজে। আমি বলব দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেই তিনি একটি কাজ করছেন আর তা হলো, সাফটা চুক্তির আওতায় সিনেমা এদেশে নিয়ে আসা। কলকাতা থেকে সিনেমা বানিয়ে এনে এখানে রিলিজ করা হচ্ছে। এটা দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে ধ্বংস করা ছাড়া আর কিছু না।

বদিউল আলম খোকন: যৌথ প্রযোজনায় আগে থেকেই নিয়ম ছিল, যে দেশের সঙ্গেই যৌথ প্রযোজিত সিনেমা করা হবে, সেই দেশের আর আমাদের দেশের শিল্পী থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ হবে অর্ধেক-অর্ধেক। কিন্তু সেটা মানা হচ্ছিল না। সেটা নিয়েই সমস্যা হচ্ছিল। একইভাবে সাফটা চুক্তি নিয়েও ঘাপলা আছে। আমাদের দেশ থেকে পুরনো সিনেমা নিয়ে ভারতের নতুন ছবি আনা হচ্ছে। এমনকি, আমাদের ছবি সেখানে চালানোও হচ্ছে না, এমন অবস্থা। আমাদের এখন কথা হচ্ছে, আমাদের দেশের ছবি যদি প্রস্তুত থাকে তাহলে ঈদ, পূজা বা অন্য কোনো বিশেষ সময়ে সাফটার আওতায় কোনো সিনেমা রিলিজ করতে পারবেন না।

দীপংকর দীপন: আমার কাছে মনে হয় দুই দেশ মিলে সিনেমা করতে হবে সে জন্য অর্ধেক-অর্ধেক কলাকুশলী নিয়ে সিনেমা বানাব, এটা যৌথ প্রযোজনার উদ্দেশ্য নয়। এমন একটা গল্প, যেটাতে দুটি দেশ মিশে আছে সেটার জন্যই যৌথ প্রযোজনা প্রয়োজন। আমি সামনে এমন একটি সিনেমা বানাব।

রাফি হোসেন: আপনাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ কষ্ট করে আমাদের সময় দেয়ার জন্য। বাংলাদেশের সিনেমাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের এ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। আগামীতেও আশা করি আপনাদের সহযোগিতা পাব।

Comments