অভিন্ন প্রশ্নে এইচএসসি পরীক্ষা কতটা ন্যায্য?
এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে রাস্তায় নামতে হয়েছে। কিন্তু, ন্যায্য দাবির জন্য কেন রাস্তায় নামতে হবে? দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই যদি পাবলিক পরীক্ষার নীতি প্রণয়ন করা হতো, তাহলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।
বাংলাদেশ অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। তদুপরি, দেশের সব অঞ্চলের দুর্যোগের ধরনও এক নয়। ফলে সবার জন্য একই ধরনের পরীক্ষাব্যবস্থা সব পরিস্থিতিতে সমানভাবে কার্যকর নাও হতে পারে।
সম্প্রতি কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে দেশের অনেক জেলা ও অঞ্চল কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। হাজারো পরীক্ষার্থী কোমরসমান পানি পেরিয়ে, নৌকা, রিকশা কিংবা ভ্যানে করে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছেছে এবং ভেজা শরীরেই পরীক্ষা দিয়েছে। আবার অনেকে কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারেনি বলে খবরে জানা গেছে। যারা পরীক্ষা দিতে পেরেছে, তারাও স্বাভাবিক মানসিক অবস্থায় পরীক্ষা দিতে পারেনি। তবুও পরীক্ষাটি স্থগিত করা হয়নি। অঞ্চলভিত্তিক বা বোর্ডভিত্তিক প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হলে পানিবন্দি বা দুর্যোগকবলিত এলাকার পরীক্ষা সহজেই স্থগিত করা যেত। শুধু চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে, যা অভিন্ন প্রশ্ন নীতির জন্য চ্যালেঞ্জ।
অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা ন্যায্যতার ক্ষেত্রে মৌলিক সংকট তৈরি করে। কারণ, রাজধানীর স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা যে সুযোগ-সুবিধা পায়, দেশের চর, হাওর, পাহাড়ি এলাকা কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামের শিক্ষার্থীরা তার সমপরিমাণ সুযোগ পায় না। শহরের শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে দক্ষ ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, আধুনিক ল্যাব, ডিজিটাল ক্লাসরুমসহ নানা ধরনের সহায়ক শিক্ষা ব্যবস্থা। অন্যদিকে বহু গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংকট প্রকট, দক্ষ ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব, বিজ্ঞানাগার নেই, প্রযুক্তিগত সুবিধা সীমিত এবং শিক্ষার্থীদের আর্থিক সক্ষমতাও তুলনামূলক দুর্বল।
শহরের সব শিক্ষার্থীও সমান সুযোগ-সুবিধা পায় না। সেখানেও শিক্ষাগত বৈষম্য রয়েছে। ফলে শিক্ষা-বাস্তবতায় এত বৈচিত্র্য ও বৈষম্য বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও সবার জন্য অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়াকে ন্যায্যতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা কঠিন।
শিক্ষাতত্ত্বে সমতা ও ন্যায্যতা দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সমতা বলতে সবাইকে একই সুযোগ বা একই ব্যবস্থা প্রদানকে বোঝায়। আর ন্যায্যতা বলতে প্রত্যেকের বাস্তব অবস্থা, সক্ষমতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ন্যায়সঙ্গত সুযোগ নিশ্চিত করাকে বোঝায়।
যেমন: ঢাকার শিক্ষার্থীরা দক্ষ শিক্ষক, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান ও সমৃদ্ধ শিক্ষার পরিবেশ পায়, সেখানে চরাঞ্চল, হাওর, পাহাড়ি বা প্রান্তিক এলাকার শিক্ষার্থীরা শিক্ষকসংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও সীমিত শিক্ষাসুবিধার মধ্যে বেড়ে ওঠে। তাই শহর ও গ্রামে সমান বরাদ্দ দিলে সমতা হবে, কিন্তু ন্যায্যতা নিশ্চিত হবে না।
ঢাকার শিক্ষার্থী একই প্রশ্নে যে মানের উত্তর দিতে পারবে, হাওরাঞ্চল বা চরাঞ্চলের শিক্ষার্থী সেই প্রশ্নে সেই মানের উত্তর দিতে পারবে না। জন রলসের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘অ্যা থিউরি অব জাস্টিস’-এর ন্যায্যতার তত্ত্ব ও সমসাময়িক শিক্ষাতত্ত্বের আলোকে বলা যায়, প্রকৃত শিক্ষাগত ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন অপেক্ষাকৃত বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা ও সুযোগ নিশ্চিত করা হয়।
এ অবস্থায় অভিন্ন প্রশ্নপত্র কার্যত অসম বাস্তবতার ওপর কৃত্রিম সমতার আবরণ মাত্র, ন্যায্যতা নয়। ব্যাপারটি এমন—একই দৌড়ে সবাইকে অংশ নিতে বলা হচ্ছে, কিন্তু সবার দৌড় শুরুর অবস্থান এক নয়।
প্রশ্নপত্রের সমতা নিশ্চিত করার আগে শিক্ষার সুযোগের ন্যায্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশে যখন যে সরকার আসে, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা পদ্ধতি ও পরীক্ষা নিয়ে শুধু ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষা’ চালায়। বিগত সরকারগুলো কখনো পাঠ্যবই, কখনো শিক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তন করেছে। শিক্ষণফল পেতে হলে অবশ্যই পরিবর্তন প্রয়োজন, কিন্তু তা হতে হবে সুদূরপ্রসারী এবং অঞ্চলভিত্তিক, লিঙ্গভিত্তিক ও সুবিধাভিত্তিক বাস্তবতার নিরিখে।
প্রশ্নপত্র প্রণয়নে প্রতি বছর পূর্ববর্তী বছরের হুবহু প্রশ্ন বাদ দিয়ে নতুন প্রশ্ন করা হয়; সাধারণত দু-একটি প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি ঘটে। এটি প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সাধারণ রীতি। পরীক্ষার্থীরাও এভাবেই চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়। অভিন্ন প্রশ্নপত্র তৈরির সময় কীভাবে সব বোর্ডের পূর্ববর্তী বছরের প্রশ্ন সমন্বয় করা হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অভিন্ন প্রশ্নে এবার যারা পরীক্ষা দিচ্ছে, তারা প্রশ্ন ‘কমন’ পাওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তও হচ্ছে বলে অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক গণমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানসম্মত মূল্যায়নের অভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সেসব দেশে অভিন্ন বা মানসম্মত মূল্যায়নের আগে শিক্ষার ন্যূনতম মান, দক্ষ শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা হয়েছে। অভিন্ন প্রশ্নপত্র তখনই কার্যকর হয়, যখন শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগও তুলনামূলকভাবে সমান থাকে।
অভিন্ন প্রশ্নপত্রের ধারণা একেবারে ভালো নয়, এ কথা বলার সুযোগ নেই। তবে অঞ্চলভিত্তিক শিক্ষার্থীদের সুযোগের ন্যায্যতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বোর্ডভিত্তিক প্রশ্নের পরিবর্তে অঞ্চলভিত্তিক প্রশ্ন করা যায় কিনা, তা বিবেচনা করা যেতে পারে। বিভাগীয় শহরগুলোর জন্য অভিন্ন প্রশ্ন হতে পারে; অন্যদিকে হাওর, চর, পাহাড়ি অঞ্চল বা গ্রামের জন্য আলাদা অভিন্ন প্রশ্ন হতে পারে।
শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রকৃত ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু পরীক্ষার প্রশ্ন এক করলেই চলবে না; শিক্ষার সুযোগও এক করতে হবে। অন্যথায় অভিন্ন প্রশ্নপত্র সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য আরও বড় বৈষম্যের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
প্রশ্ন এক হতে পারে, কিন্তু প্রস্তুতির সুযোগ যদি এক না হয়, তবে ফলাফলও কখনো ন্যায্য হবে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সুযোগ-সুবিধার ন্যায্যতার ভিত্তিতে শিক্ষাকাঠামো ও শিক্ষানীতি ঢেলে সাজাতে হবে। এটাই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ।
মাহামুদুল হক: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
[email protected]