বন্যা নয়, ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি: চট্টগ্রামকে আর কত বছর ডুবতে হবে?
বর্ষা এলেই চট্টগ্রামের মানুষের মনে আতঙ্ক ফিরে আসে। আকাশে কালো মেঘ জমলেই তারা আবহাওয়ার পূর্বাভাসে খোঁজেন, এবার পানি কতটুকু উঠবে। ঘরের আসবাব কোথায় সরাবেন, গবাদিপশু কোথায় রাখবেন, সন্তানদের নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেবেন—সেই হিসাব শুরু হয়ে যায়। এ দৃশ্য নতুন নয়। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, বর্ষা এলেই চট্টগ্রামের কোনো না কোনো এলাকা ডুবে যায়। সরকার বদলায়, জনপ্রতিনিধি বদলায়, উন্নয়নের ভাষা বদলায়, কিন্তু চট্টগ্রামের বন্যার চিত্র বদলায় না।
এ বছর টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও খাগড়াছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কোথাও লাখো মানুষ পানিবন্দি, কোথাও শুকনা খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট, কোথাও কৃষকের ফসল তলিয়ে গেছে। পানি নেমে গেছে, সংবাদপত্রের শিরোনামও বদলেছে, কিন্তু মানুষের ক্ষতি থেকে যাবে বছরের পর বছর।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রতি বর্ষায় একই সংবাদ পড়তে অভ্যস্ত হয়ে গেছি?
সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, এই দুর্যোগকে এখন আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অবশ্যই আছে। অতিবৃষ্টি হবে, পাহাড়ি ঢল নামবে, সেটি বাস্তবতা। কিন্তু সেই বৃষ্টিকে ভয়াবহ দুর্যোগে পরিণত করছে মানুষের তৈরি অব্যবস্থাপনা। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল দখল, জলাধার ভরাট, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নদী ও খালের নাব্যতা কমে যাওয়া এবং দীর্ঘদিনের অবহেলা চট্টগ্রামকে স্থায়ী ঝুঁকির শহরে পরিণত করেছে।
প্রতি বছর আমরা প্রতিশ্রুতি শুনি—জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প হবে, নতুন খাল খনন হবে, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে, নদী সংস্কার হবে। বাস্তবে, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ে, ব্যয় বাড়ে, কিন্তু মানুষের দুর্ভোগ কমে না। কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়, অথচ প্রথম ভারী বৃষ্টিতেই শহর ও গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। তাই প্রশ্ন ওঠে, এই উন্নয়ন আসলে কার জন্য?
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার মূল কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দ্রুত নগর সম্প্রসারণ, খাল, নালা ও জলাধারের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকা, জোয়ার-ভাটার প্রভাব ও পানিপ্রবাহের বাস্তব পরিস্থিতি পরিকল্পনায় যথাযথভাবে বিবেচনায় না আনা এবং খালগুলোর পর্যাপ্ত খনন, সম্প্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি। কিন্তু তার জন্য কার্যত কোনো উদ্যোগ আমরা দেখি না। যা নেওয়া হয় তা বাস্তবায়নে গড়িমসিই বেশি দেখা যায়। বাস্তবায়ন হলেও অধিকাংশ সময় তড়িঘড়ি করে করা হয় এবং তার ফলও তেমনই হয়। ফলাফল সেই চিরচেনা জলাবদ্ধতা আর মানুষের ভোগান্তি।
২০১৭ সালে চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন বাবদ একটি প্রকল্প তিন বছরের জন্য অনুমোদন দেওয়া হলেও নানা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নগত সমস্যার কারণে মেয়াদ বারবার বাড়াতে হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটি ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ, তিন বছরের প্রকল্প শেষ হতে ১১ বছর সময় লাগছে। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা, যা সংশোধিত হয়ে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। সর্বশেষ সংশোধনীতে ব্যয় কিছুটা কমিয়ে ৮ হাজার ৫৯১ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। (প্রথম আলো, ৬ জুলাই ২০২৬)
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল পরিকল্পনা পর্যায়ে। যথাযথ মাঠসমীক্ষা, বিস্তারিত জরিপ, পানিপ্রবাহ বিশ্লেষণ, জোয়ার-ভাটার প্রভাব এবং খাল-নালা-জলাধারের সমন্বিত মূল্যায়ন ছাড়াই তাড়াহুড়ো করে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। ফলে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করতে গিয়ে একের পর এক নতুন জটিলতা সামনে আসে এবং প্রকল্পের প্রথম দেড় থেকে দুই বছর কার্যত কোনো ভৌত কাজই শুরু করা যায়নি। বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পরিকল্পনার অসামঞ্জস্যের কারণে একাধিকবার প্রকল্প সংশোধন করতে হয়েছে।
এ ছাড়া, ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে শেষ পর্যায়ে সিল্ট ট্র্যাপ, নালা সম্প্রসারণ, ফুটপাতসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও প্রকল্পের অগ্রগতি প্রায় ৯৮ শতাংশ, তবুও হিজড়া খাল ও জামাল খান খালের কাজ এখনো শেষ হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুরুতেই সঠিক পরিকল্পনা ও বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা করা হলে সময়, অর্থ ও জনদুর্ভোগ তিনটিই অনেকাংশে কমানো যেতো। (প্রথম আলো, ৬ জুলাই ২০২৬)
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এখানেই। শিল্প, বাণিজ্য ও আমদানি রপ্তানির বড় অংশ এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। অথচ সেই চট্টগ্রামই প্রতি বছর কয়েক দিনের বৃষ্টিতে কার্যত অচল হয়ে পড়ে। একটি অর্থনৈতিক কেন্দ্রকে বছরের পর বছর একই সংকটে ফেলে রাখা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা এখনো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রতিক্রিয়াশীল। পানি ওঠার পর ত্রাণ যায়, আশ্রয়কেন্দ্র খোলে, প্রশাসন মাঠে নামে। কিন্তু পানি ওঠার আগেই ঝুঁকি কমানোর জন্য কী করা হয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুব কমই পাওয়া যায়। দুর্যোগ মোকাবিলার চেয়ে দুর্যোগ প্রতিরোধে বিনিয়োগ অনেক বেশি কার্যকর। কিন্তু আমাদের পরিকল্পনায় সেই দর্শন এখনো শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এখানে রাজনৈতিক দায়ও এড়ানোর সুযোগ নেই। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, চট্টগ্রামের মানুষ প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগের শিকার হন। তাই এটি কোনো এক সরকারের ব্যর্থতা নয়, বরং ধারাবাহিক নীতিগত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে আমরা বারবার স্বল্পমেয়াদি সমাধানে সন্তুষ্ট থেকেছি। ফলাফলও একই রয়ে গেছে।
আমাদের স্বীকার করতে হবে, চট্টগ্রামের সমস্যা কেবল বৃষ্টির নয়। এটি পরিকল্পনার, সুশাসনের ও জবাবদিহির সমস্যা। খাল দখলমুক্ত করা, নিয়মিত খনন, পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, আধুনিক ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক, জলাধার সংরক্ষণ ও সমন্বিত নগর পরিকল্পনা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। একইসঙ্গে প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি ও ব্যয়ের ওপর কার্যকর জনজবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
চট্টগ্রামের মানুষ সহানুভূতি চান না। তারা প্রতি বছর ত্রাণের ছবিও দেখতে চান না। তারা চান এমন একটি শহর, যেখানে বর্ষা মানেই আতঙ্ক হবে না; কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পানির নিচে চলে যাবে না; কোনো পরিবারকে বারবার নতুন করে জীবন শুরু করতে হবে না।
আমরা প্রায়ই বলি, বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই উন্নয়নের বাস্তব পরীক্ষা হয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। যদি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ও প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র প্রতি বর্ষায় একইভাবে ডুবে যায়, তাহলে উন্নয়নের দাবিকে মানুষ প্রশ্ন করবেই।
চট্টগ্রামকে প্রতি বছর ডুবতে দেখা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। একে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়াও উচিত নয়। একটি শহর, অঞ্চল ও লাখো মানুষের জীবনকে বছরের পর বছর একই সংকটের মধ্যে ফেলে রাখা কোনো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের পরিচয় হতে পারে না।
প্রতি বছরের মতো বর্ষা আগামী বছরও আসবে। আগামী বছরও কি আমরা চট্টগ্রাম নিয়ে একই সংবাদ পড়ব, একই কান্না শুনব এবং একই প্রতিশ্রুতি শুনে আবার ভুলে যাব? নাকি এবার সত্যিই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আর বলতে না হয়, ‘ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, বর্ষা এলেই চট্টগ্রাম ডুবে যায়।’
মো. আব্বাস: করপোরেট কমিউনিকেশনস নিয়ে কাজ করছেন।
[email protected]