ডিজিটাল ডিক্লাটারিং--কী, কেন ও কীভাবে

আধুনিক যুগ কর্মব্যস্ততার যুগ। এ যুগে নিজেকে গুছিয়ে জীবনকে সহজ করতে প্রয়োজন পড়ে সুদীর্ঘ পরিকল্পনা। সমকালীন নাগরিক জীবনের কর্মব্যস্ত নর-নারী তাদের ছুটির দিনগুলোও ব্যয় করেন ঘর গোছানোর পেছনে। দিনের পর দিন জমে থাকা অপ্রয়োজনীয় উপকরণে ভরে ওঠে ঘর, যা সরাতে পারলে খুঁজে পাওয়া যায় এক প্রশান্তির পরিবেশ। এই প্রক্রিয়াটিকে ইংরেজিতে ‘ডিক্লাটার’ বলা হয়।
ডিজিটাল ক্লাটারিং কমাতে কিছু মূল বিষয়ের দিকে নজর দিতে হয়। ছবি: স্টার
ডিজিটাল ক্লাটারিং কমাতে কিছু মূল বিষয়ের দিকে নজর দিতে হয়। ছবি: স্টার

আধুনিক যুগ কর্মব্যস্ততার যুগ। এ যুগে নিজেকে গুছিয়ে জীবনকে সহজ করতে প্রয়োজন পড়ে সুদীর্ঘ পরিকল্পনা। সমকালীন নাগরিক জীবনের কর্মব্যস্ত নর-নারী তাদের ছুটির দিনগুলোও ব্যয় করেন ঘর গোছানোর পেছনে। দিনের পর দিন জমে থাকা অপ্রয়োজনীয় উপকরণে ভরে ওঠে ঘর, যা সরাতে পারলে খুঁজে পাওয়া যায় এক প্রশান্তির পরিবেশ। এই প্রক্রিয়াটিকে ইংরেজিতে 'ডিক্লাটার' বলা হয়।

অপরদিকে, আমাদের প্রযুক্তি নির্ভর দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে আষ্ঠেপিষ্টে জড়িয়ে আছে নানা ধরণের অ্যাপস, ফোনের গ্যালারি, কিংবা মেসেজিং সাইট। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এসব প্রযুক্তির মধ্যে ডুবে থাকা মানুষের কাছে এগুলোই বাস্তব জীবন থেকে দূরে থাকার সাময়িক, কিন্তু ধারাবাহিক আশ্রয়স্থল।

প্রতিদিন ব্যবহারের ফলে অপ্রয়োজনীয় বহু উপকরণের সন্নিবেশে এক সময় সৃষ্টি হয় ডিজিটাল জটলা ও বিশৃঙ্খলার। 

বাস্তব জীবনের জটলার মতো এটিও ব্যবহারকারীর মানসিক চাপ ও অশান্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। এর থেকে মুক্তির উপায় হতে পারে ডিজিটাল ক্লাটারিং বা ডিজিটাল বিশৃঙ্খলা। এই পদ্ধতির সঙ্গে যারা অপরিচিত কিংবা যারা এই পদ্ধতি অনুসরণের পরিকল্পনা করছেন, তারা আজকের আলোচনা থেকে জেনে নিতে পারেন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। 

'ডিজিটাল ডিক্লাটার' বলতে কী বোঝায়?

ডিক্লাটার শব্দটির এসেছে ক্লাটার থেকে, যার অর্থ বিশৃঙ্খলা। অর্থাৎ, ডিক্লাটার হচ্ছে এর বিপরীত। এই শব্দটির সঙ্গে অনেকে অপরিচিত হলেও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। মূলত, ঘর থেকে অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াকেই ডিক্লাটার বলা যায়। ডিজিটাল ডিক্লাটার শব্দটি আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে জড়িত।

ডিজিটাল জীবনে ডিক্লাটারিং এর অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
ডিজিটাল জীবনে ডিক্লাটারিং এর অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

কোনও একদিন পড়বে কিংবা কাজে লাগাবে ভেবে অধিকাংশ নেটিজেনরা প্রতিদিন বিভিন্ন ই-বুক ডাউনলোড, ফেসবুকের বিভিন্ন পেইজ সেভ বা ফেভারিট বারে বুকমার্ক করার মতো কাজগুলো করে থাকেন। তবে, 'সেইদিন'টা হঠাত করে আর আসে না।

একজন শিক্ষার্থী বা পেশাজীবী তাদের নির্দিষ্ট কোনো কাজ বা অ্যাসাইনমেন্টের জন্য ছবি, ডকুমেন্টসহ অনেক ফাইল ডাউনলোড করে রাখেন। যার অধিকাংশই অপ্রয়োজনীয়। এই ফাইলগুলো ডাউনলোড ফোল্ডারে জায়গা দখল করে রাখে। 

কিছু ফাইল, বিশেষত, ছবি দেখে মানুষ স্মৃতি বিজড়িত হতে পারে—মনে পড়ে যেতে পারে পুরনো কোনো মধুর ঘটনা। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং অপ্রয়োজনীয় ফাইলে ভরে ওঠে  ফোল্ডারগুলো, এবং তৈরি হয় ডিজিটাল ক্লাটার। এই বিষয়টির সুরাহা করতে হলে প্রথম ধাপ হওয়া উচিৎ বিনা কারণে সংরক্ষিত ফাইলগুলোর একটি তালিকা তৈরি।

ডিজিটাল ডিক্লাটারিং বলতে বোঝায় ডিজিটাল স্পেস, যেমন ফোন ও ল্যাপটপের ফোল্ডার, ব্রাউজারে সংরক্ষিত ফেভারিটস-ট্যাব, সোশ্যাল মিডিয়া চ্যানেল, মেসেজিং অ্যাপ, ক্লাউড স্টোরেজ এবং এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইলগুলোর ডিক্লাটারিং বা পরিচ্ছন্নতার প্রক্রিয়া। ঘরের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বা ঘর গোছানোর সময় যে প্রশান্তির অনুভূতি মেলে, ঠিক তেমনই শান্তি পাওয়া যায় ডিজিটাল ডিক্লাটারিং এর সময়েও।

কেন করা উচিৎ?

চালু করার সঙ্গে সঙ্গেই ডিভাইসে বিভিন্ন অ্যাপস, ছবি ও অন্যান্য সফটওয়্যার চালু হয়ে যায়। ফলে দরকারি ফাইলগুলো খুঁজে পেতে সময় নষ্ট হয়। এক পর্যায়ে এ বিষয়টি ব্যবহারকারীর ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে, যার ফল হিসেবে দৈনন্দিন কাজে মনোনিবেশ করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে।

ডিজিটাল ডিক্লাটারিং প্রক্রিয়ার মাধ্মে এসব অপ্রয়োজনীয় ফাইল চিহ্নিত করে মুছে ফেলা যায়। ফলে ডিভাইসের গতি বেড়ে যায় নিমিষে। এতে ব্যবহারকারীর মনের শান্তি নিশ্চিতের পাশাপাশি তার সময় বাচিয়ে কর্মক্ষেত্রে উপযোগিতা বাড়াতে সাহায্য করে।

ফাইল-ফোল্ডার গুছিয়ে রাখা

প্রথমেই যেটা করতে হবে, তা হচ্ছে নির্দিষ্ট ফোল্ডারে ফাইল সংরক্ষণ করা।

ডিজিটাল জীবনে ডিক্লাটারিং এর অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
ডিজিটাল জীবনে ডিক্লাটারিং এর অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

দৈনন্দিন জীবনকে স্বস্তিদায়ক ও শৃঙ্খলাপূর্ণ করতে ব্যক্তিজীবন ও কর্মজীবনকে আলাদা রাখাই জরুরি। ডিজিটাল জীবনেও কাজ ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য আলাদা ফোল্ডার তৈরি করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলো সংরক্ষণের জন্যে ওয়ানড্রাইভ, ড্রপবক্স বা গুগল ড্রাইভের মতো ক্লাউড স্টোরেজ হতে পারে দারুণ সমাধান, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলোর ব্যাক আপ রাখা যায়।

বেশিরভাগ ব্যবহারকারীর ডিজিটাল ফাইল তাদের ডিভাইসে বিশৃঙ্খলভাবে থাকে। নির্দিষ্ট কোনো নামের পরিবর্তে এলোমেলো কিছু নামে ফোল্ডারগুলো তৈরি করা হয়। যেমন, নিউ ফোল্ডার ১, নিউ ফোল্ডার ২ বা এমন সাধারণ কিছু। এসব ফোল্ডার আবার বিভিন্ন ফাইলে ঠাসা থাকে। নির্দিষ্ট নাম না থাকায় পরবর্তীতে আর দরকারের সময় প্রয়োজনীয় ফাইল খুঁজে পাওয়া যায় না।

এ সমস্যা মেটাতে ফাইলগুলোকে কাজের ধরন অনুযায়ী নাম দিতে হবে।  ৭ থেকে ৮ শব্দের বড় নামের পরিবর্তে সংক্ষিপ্ত নাম, যেমন, টু ডু লিস্ট সেপ্টেম্বর উইক-১ এর পরিবর্তে শুধু সেপ্টেম্বর-১ দিয়ে ফোল্ডারের নামকরণ করতে হবে।  তবে, খেয়াল রাখতে হবে যেন নামটা অর্থবহ হয় এবং পরে যাতে দ্রুত খুঁজে পাওয়া যায়।

ইমেইল ব্যবস্থাপনা

প্রায় সব ব্যবহারকারী ইমেইল গুছিয়ে রাখতে হিমশিম খান। বিজ্ঞাপনী মেসেজ, সোশ্যাল মিডিয়া সাইটের নোটিফিকেশনসহ বিভিন্ন স্প্যাম ইনবক্সকে খুবই বিশৃঙ্খল করে তোলে। এমন অবস্থায় দরকারি ইমেইল খুঁজে পাওয়া যেমন কষ্টসাধ্য, তেমনই সময় সাপেক্ষ।

ডিজিটাল জীবনে ডিক্লাটারিং এর অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
ডিজিটাল জীবনে ডিক্লাটারিং এর অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

পেশাগত কারণে বা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজে সাবস্ক্রাইব করা নিউজলেটারের প্রয়োজন ফুরালে সেগুলোকে আনসাবস্ক্রাইব বা ব্লক করে রাখতে হবে।

এছাড়া, 'আনরোল ডট মি' এবং 'ক্লিনফক্স'র মতো টুলগুলো ব্যবহার করে অবাঞ্ছিত ইমেইল সোর্স থেকে মেম্বারশিপ বাতিল করা হতে পারে কার্যকরী। যারা মাইক্রোসফট আউটলুক ব্যবহার করেন, তারা 'সুইপ টু' ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ইমেইল অ্যাড্রেস থেকে আসা ইমেইলগুলোকে 'ডিলিটেড আইটেম' ফোল্ডার সহ সুনির্দিষ্ট ফোল্ডারে স্থানান্তর করতে পারবেন।

যেসব পুরনো ইমেইল বারবার দেখার বা খোলার দরকার পড়ে না, সেগুলোকে আর্কাইভ করে দেয়া যায়। অন্যদিকে নিয়মিত স্প্যাম ফোল্ডার পরীক্ষা করে দেখতে হবে, কারণ অনেক সময় দরকারি ইমেইল স্প্যাম ফোল্ডারে চলে যায়।

তবে, পেশাগত এবং ব্যক্তিগত জীবনের জন্য আলাদা ইমেইল অ্যাড্রেস ব্যবহার করাই সার্বিকভাবে ভালো সিদ্ধান্ত।

কুইক অ্যাক্সেস টূলবারের সুষ্ঠূ ব্যবহার

প্রয়োজনীয় ফাইল বা অ্যাপসগুলোতে দ্রুত খোলার জন্য ডিভাইসের টাস্কবারে 'কুইক এক্সেস' সুবিধা থাকে। অনেকে এই সুবিধার অপব্যবহার করেন—সব ধরনের ফাইল বা অ্যাপ এখানে নিয়ে আসেন, যার ফলে এর মূল উদ্দেশ্য বিফলে যায়।

এর বদলে, আপনি যদি দরকারি ফাইলগুলোকে নির্দিষ্ট ফোল্ডারে রাখতে পারেন, তবে  পরে সেগুলোর অবস্থান জানা থাকে এবং পরে সেগুলোর খুব দ্রুত এক্সেসও মেলে। শুধু যেসব অ্যাপ, সফটওয়্যার বা ফাইল প্রতিদিন ব্যবহার করেন, সেগুলোই কুইক আক্সেসে রাখবেন।

বুট-আপ অ্যাপের ব্যবস্থাপনা

ডিভাইস চালু করার সময় কিছু কিছু লঞ্চিং প্রোগ্রাম বা বুট-আপ অ্যাপ রয়েছে, যেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যায়। যার সবগুলো দরকারি নাও হতে পারে। এগুলো কম্পিউটার ও মোবাইলের প্রসেসিং ক্ষমতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে এবং এর গতি কমিয়ে দেয়।

পিসি ও মোবাইলের সেটিংস দেখে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হওয়া অ্যাপগুলো বন্ধ করে দেওয়া যায়। এতে ডিভাইসের গতি বাড়োবে এবং কাজ করতে আরও সুবিধা হবে।

স্টোরেজ স্পেসের ব্যবস্থাপনা

'সিসিক্লিনার' এক জনপ্রিয় অ্যাপ যা পিসি এবং মোবাইলে ব্যবহার করা যায়। এই অ্যাপ ডিভাইসের অবাঞ্ছিত ফাইলগুলোকে মুছতে এবং স্থান বাঁচাতে সাহায্য করবে।

বর্তমানের স্মার্ট-ফোনগুলোতে প্রচুর পরিমাণে মেমরি থাকে। তা সত্ত্বেও মোবাইলের অনেক বেশি অপ্রয়োজনীয় ছবি জমে স্টোরেজ স্পেস শেষ হয়ে যেতে পারে।

ডিজিটাল জীবনে ডিক্লাটারিং এর অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
ডিজিটাল জীবনে ডিক্লাটারিং এর অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

নিয়ম করে ডিক্লাটার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রতি সপ্তাহে অপ্রয়োজনীয় এবং একই রকম দেখতে ছবিগুলোকে মুছে ফেলা যায়৷

যেসব অ্যাপ নিয়মিত ব্যবহার করা হয় না বা খুব শিগগির ব্যবহারের পরিকল্পনা নেই, সেগুলোকে মুছে ফেলাই ভালো।

যেসব বুকমার্ক এবং ব্রাউজার এক্সটেনশন আর দরকার হয় না সেগুলোও মুছে ফেলতে হবে।

গুড প্র্যাকটিস

ডিজিটাল ডিক্লাটারিংয়ের জন্য সপ্তাহের একটি সুনিদৃষ্ট দিন (যেমন প্রতি শনিবার) আলাদা করে রাখা যায়, যাতে ডিক্লাটারিংয়ের জন্য সময় খুঁজে বের করার বিষয়ে চিন্তা করতে না হয়। এছাড়াও, নিয়মিত ডিক্লাটার করলে ডিজিটাল জীবনে কখনোই বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে না।

অন্যদিকে, ইন্সটাগ্রাম বা টুইটারের নোটিফিকেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন নোটিফিকেশনগুলো বন্ধ রাখার কথা বিবেচনা করা যায়। এছাড়া, অনেকের কাছে একাধিক পাসওয়ার্ড মনে রাখাটা দুরূহ হতে পারে, যাদের জন্যে পাসওয়ার্ড ম্যানেজার হতে পারে একটি উত্তম ব্যবহার। সবশেষে, নিয়মিত ট্র্যাশ বা ডিলিটেড আইটেমস ফোল্ডার খালি করতে হবে।

এই চর্চাগুলোকে সবার দৈনন্দিন জীবনের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে এতে অবিচল থাকার চেষ্টা করতে হবে। ডিজিটাল ডিক্লাটার করে আপনার ডিজিটাল জীবনকে সুশৃঙ্খল রাখুন—জীবনে শান্তি বেড়ে যাবে, মানসিক চাপ কমবে এবং সার্বিকভাবে জীবনের গুণগত মান বাড়বে।

অনুবাদ করেছেন এস এম সোহাগ

 

Comments

The Daily Star  | English
Inflation in Bangladesh

Economy in for a double whammy

With inflation edging towards double digits and quarterly GDP growth nearly halving year on year, pressure on consumers is mounting and experts are pointing at even darker clouds.

8h ago