যে কারণে জটিল হয়ে উঠছে চীন-তাইওয়ান সম্পর্ক

‘এক চীন’ নীতি বাস্তবায়ন করতে তাইওয়ানকে যেকোনো মূল্যে করায়ত্ত করতে চায় বেইজিং। এই দ্বন্দ্ব অবশ্য নতুন নয়। এর নেপথ্যের গল্প জানতে হলে ফিরতে হবে কয়েক শতাব্দী পেছনে।
চীন তাইওয়ান সম্পর্ক
ছবি: সংগৃহীত

গত বছরের আগস্টের কথা। চীনের আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে তাইওয়ান সফরে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি। চীন এ ঘটনাটিকে খুবই বিপজ্জনক হিসেবে নেয়। গত ২ যুগে ন্যান্সির ছাড়া কোনো শীর্ষ পর্যায়ের মার্কিন রাজনীতিবিদ সেখানে যাননি।

চীন মনে করে তাইওয়ান তাদেরই অংশ। তবে তাইওয়ান বিশ্বাসী নিজেদের স্বাধীনতায়। তাদের নিজস্ব সংবিধান আছে। তারা চীনের অংশ হতে চায় না। রক্ষা করতে চায় নিজেদের সার্বভৌমত্ব।

'এক চীন' নীতি বাস্তবায়ন করতে তাইওয়ানকে যেকোনো মূল্যে করায়ত্ত করতে চায় বেইজিং। এই দ্বন্দ্ব অবশ্য নতুন নয়। এর নেপথ্যের গল্প জানতে হলে ফিরতে হবে কয়েক শতাব্দী পেছনে।

দক্ষিণপূর্ব চীনের উপকূল থেকে ১০০ মাইল দূরের দ্বীপ তাইওয়ান। ১৭ শতকে কিং রাজবংশের শাসনামলে দ্বীপটি প্রথমবারের মতো চীনের নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। ১৮৯৫ সালে জাপানের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে দ্বীপটি তাদের হাতে তুলে দেয় চীন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আবারো চীনের দখলে আসে তাইওয়ান।

১৯৪৯ সালের কথা। ক্ষমতায় তখন চিয়াং কাই-শেক। তার নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জিতে যান মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বাধীন সমাজতন্ত্রীরা।

কাই-শেকের দল পরিচিত ছিল কুওমিনতাং নামে। তারা চলে যায় তাইওয়ানে। ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত নিজেদের চীনের বৈধ শাসক দাবি করে তাইওয়ান থেকে সরকার পরিচালনা করেন তারা। এমনকি, তারা জাতিসংঘের স্বীকৃতিও পান। ১৯৭১ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে তারাই এগিয়েছিলেন।

অবশেষে ১৯৭১ সালে মাও সে তুংয়ের সরকার জাতিসংঘের স্বীকৃতি পায়। চীন নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হয়, পায় ভেটো ক্ষমতা।

এই ঘটনাটি চীন ও তাইওয়ান ব্যবহার করছে একে অপরের বিরুদ্ধে। তাইওয়ান বলছে, তারা মাওয়ের সময় কিংবা তারও আগে ১৯১১ এর বিপ্লবের পর চীনের অংশ ছিল না। অপরদিকে, কাই-শেকের সরকারের কথা তুলে চীন বলছে, তাইওয়ান তাদেরই অংশ।

১৯৭৯ সালে আমেরিকা মাওয়ের উত্তরসূরিদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ও কুওমিনতাংয়ের প্রতি সমর্থন তুলে নেয়। আন্তর্জাতিক পরিসরে একা হতে থাকে তাইওয়ান। বর্তমানে ভাটিক্যানসহ মাত্র ১৪ দেশ তাইওয়ানের সার্বভৌম মানে।

তাইওয়ানে ন্যান্সি পেলোসির সফরের পর কঠোর হয়েছে চীন। দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এমনকি কঠোর শক্তি প্রয়োগের কথাও বলছেন। বিপরীতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, তাইওয়ান আক্রান্ত হলে পাশে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র।

চাপে রাখার কৌশল হিসেবে গত বছরের আগস্টের পর থেকে তাইওয়ানের উপকূলে বেশ কয়েকবার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে চীন, চালিয়েছে সামরিক মহড়াও। মহড়ার সময় তাইওয়ানের চারপাশ দিয়ে উড়েছে ৯১টি সামরিক উড়োজাহাজ।

কুওমিনতাং তাইওয়ানকে চীনের অংশই মনে করতেন। কিন্তু, তাইওয়ানে বর্তমানে ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক প্রোগ্রেসিভ পার্টি (ডিপিপি) চায় সার্বভৌমত্ব।

বিপরীতে, তাইওয়ানের স্বায়ত্তশাসন ও প্রাদেশিক সরকারের বিষয়ে চীনের আপত্তি নেই। কিন্তু, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে চায়।

চীনের বিরোধিতায় তাইওয়ান জাতিসংঘের সদস্য হতে পারেনি। বৈশ্বিক করোনা মহামারি মোকাবিলায় সফল হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার 'ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলি'তে পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকতে পারেনি তাইওয়ান। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার কারণে অর্থনৈতিক জোট জি-৭ এ ক্ষেত্রে তাইওয়ানের পক্ষে ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৯ থেকে 'এক চীন' নীতি মেনে চললেও, সম্পর্ক এগিয়ে নেয় তাইওয়ানের সঙ্গেও। তাদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও অস্ত্রের অন্যতম বড় বাজার তাইওয়ান। এটি মোটেও সহজভাবে নেয়নি বেইজিং।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের করা তাইওয়ান অ্যাক্ট অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। একইসঙ্গে অস্ত্র বিক্রি, সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগও রেখে চলছে। তাইওয়ানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চলছে 'কৌশলগত দ্বিচারিতা'।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে তাইওয়ানের কাছে ১৮ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করে যুক্তরাষ্ট্র। তাইওয়ানে মার্কিন দূতাবাসের জন্য খরচ করা হয় ২৫০ মিলিয়ন ডলার।

১৯৭৯ সালের পর তাইওয়ানের এত ঘনিষ্ঠ আর কখনো হয়নি যুক্তরাষ্ট্র।

সেই সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে আগ্রহী বাইডেন।

বর্তমানে চীন সামরিক শক্তিতে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দেশ। যদি তারা তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ করতে যুদ্ধের পথ বেছে নেয়, তাহলে সম্ভাবনা আছে যুক্তরাষ্ট্রেরও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার।

অনেক সামরিক বিশ্লেষক মনে করে যে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় এই ২ দেশ এখনই কোনো যুদ্ধে জড়াবে না।

সামরিক শক্তির হিসাবে চীনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে তাইওয়ান। তবে সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে প্রতিরক্ষাখাতে তারা ব্যয় বাড়িয়ে চলেছে। এ খাতে এ বছর রেকর্ড ১৯ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে তাইওয়ান। যদিও চীনের ব্যয় এর ১২ গুণ বেশি।

তাইওয়ানকে চাপে রাখতে নানান কৌশল নিয়েছে চীন। ২০২০ সালে তাইওয়ানের ১০ সরকারি সংস্থার তথ্য ও ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে অন্তত ৬০০ ইমেইল অ্যাকাউন্ট হ্যাক করার অভিযোগ আছে চীনের বিরুদ্ধে।

এমনকি, তাইওয়ানে পর্যটনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে চীন। সেখানে পর্যটকের সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে। চীনের চাপে তাইওয়ানের সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তিও করতে পারছে না অনেক দেশ। সিঙ্গাপুর ও নিউজিল্যান্ড ছাড়া খুব বেশি উন্নত দেশের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নেই।

তাইওয়ানের নাগরিকদের মধ্যে অন্তত ৬১ ভাগই নিজেদেরকে 'তাইওয়ানিজ' পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। নিজেদের 'চীনা' মনে করেন ৩ শতাংশ মানুষ। ১৯৯৪ সালে এই হার ছিল প্রায় ২৬ শতাংশ। এ ছাড়া, সেখানকার ৩৩ শতাংশ বাসিন্দা নিজেদের চীনা ও তাইওয়ানিজ উভয়টিই মনে করেন।

তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের আরেকটি বড় স্বার্থের জায়গা সেমিকন্ডাক্টর বা 'চিপ'। কম্পিউটার, মোবাইল, যানবাহন—কোথায় ব্যবহার হয় না এই চিপ।

২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৬০ ভাগ চিপ শুধুমাত্র তাইওয়ানেই তৈরি হয়। তাই চীন একে দখলে রাখতে পারলে এর ব্যবসা একচেটিয়াভাবে নিজেদের দখলে রাখতে পারবে৷

তবে তাইওয়ানেরও আছে নিজস্ব পরিকল্পনা। চীনের পরিচয়ে নয়, বরং সেমিকন্ডাক্টরের ব্যবসায় বিশ্বে নিজ পরিচয়ে পরিচিত হতে চায় তারা।

অ্যাপল ও অন্যান্য মার্কিন কোম্পানির প্রধান চিপ সরবরাহকারী তাইওয়ানের পাশে যুক্তরাষ্ট্রের দাঁড়াতে চাওয়ার পেছনে এটিও ভূমিকা রেখেছে। এ ছাড়া, তাইওয়ানের সহায়তা নিয়ে নিজেদের দেশেও চিপের বাজার গড়ে তুলতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে চীন ভবিষ্যতে কী করবে এবং তাদের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাবে—সেগুলো এখন দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: সিএফআর ও বিবিসি

Comments