অফিসের কাছাকাছি নাকি কম ভাড়ার বাসা: ঢাকায় কোনটি লাভজনক?
ঢাকায় বাসা খোঁজার সময় একটি হিসাব প্রায়ই সামনে আসে। অফিসের কাছাকাছি বাসা নিলে ভাড়া বেশি। একটু দূরে গেলে একই টাকায় তুলনামূলক বড় বা ভালো বাসা পাওয়া যায়। তখন মনে হয়, দূরেই থাকি। মাস শেষে কয়েক হাজার টাকা অন্তত বাঁচবে। কিন্তু বাসায় ওঠার কয়েক সপ্তাহ পর শুরু হয় অন্য হিসাব। প্রতিদিনের বাস ভাড়া, রিকশা ভাড়া, রাইড শেয়ারিংয়ের খরচ, যানজটে বসে থাকা সময়—সব যোগ করলে কম ভাড়ার বাসাটি কি সত্যিই কম খরচের থাকে?
ঢাকার বাস্তবতায় তাই শুধু বাসা ভাড়া দেখে সিদ্ধান্ত নিলে হিসাব ভুল হতে পারে। কোন বাসাটি আপনার জন্য লাভজনক, সেটি বুঝতে আরও কয়েকটি বিষয় মিলিয়ে দেখা দরকার।
শুধু বাসা ভাড়ার পার্থক্য হিসাব করবেন না
ধরা যাক, অফিসের কাছাকাছি একটি বাসার ভাড়া ২০ হাজার টাকা। একটু দূরে একই ধরনের বাসা পাওয়া গেল ১৫ হাজার টাকায়। প্রথম দেখায় মাসে পাঁচ হাজার টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। এবার যাতায়াতের খরচ যোগ করুন। প্রতিদিন অফিসে যাওয়া-আসায় ২০০ টাকা খরচ হলে মাসে ২২ কর্মদিবসে ব্যয় দাঁড়ায় ৪ হাজার ৪০০ টাকা। মাঝেমধ্যে দেরি হলে সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা রাইড শেয়ারিং নিতে হতে পারে। তখন পাঁচ হাজার টাকা কম ভাড়ার সুবিধা প্রায় পুরোটাই যাতায়াতে চলে যেতে পারে। তাই বাসা দেখার সময় কাগজে বা ফোনের নোটে ভাড়া ও সম্ভাব্য মাসিক যাতায়াত খরচ পাশাপাশি লিখে দেখুন।
ঢাকায় দূরত্ব কিলোমিটারে মাপলে হিসাব মিলবে না
অফিস থেকে বাসা আট কিলোমিটার দূরে শুনে খুব বেশি মনে না-ও হতে পারে। কিন্তু ঢাকায় আট কিলোমিটার যেতে কত সময় লাগবে, সেটিই আসল প্রশ্ন। বাসাটি পছন্দ হলে অফিসের সময় অনুযায়ী একদিন ওই এলাকা থেকে যাতায়াত করে দেখুন। সকাল নয়টায় অফিস হলে সকাল আটটার দিকে রাস্তাটির অবস্থা কেমন, আবার সন্ধ্যায় ফেরার সময় গাড়ি পাওয়া যায় কি না—এসব বোঝার চেষ্টা করুন। শুক্রবার দুপুরে ২০ মিনিটে অফিস পৌঁছানো যায় বলে কর্মদিবসেও একই সময় লাগবে, এমন ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
বাসা থেকে মূল সড়কে পৌঁছানোর হিসাবও করুন
বাসার ঠিকানায় পরিচিত কোনো এলাকার নাম দেখেই যাতায়াত সহজ ধরে নেবেন না। বাসাটি মূল সড়ক থেকে কতটা ভেতরে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন বাস ধরার আগে রিকশায় মূল সড়কে যেতে হলে সেই সময় ও খরচ আলাদাভাবে যোগ হবে। সকালে ৫০ টাকা এবং রাতে ফেরার সময় আরও ৫০ টাকা রিকশা ভাড়া খুব বেশি মনে না-ও হতে পারে। কিন্তু মাস শেষে শুধু বাসা থেকে মূল সড়কে যাতায়াতেই কয়েক হাজার টাকা চলে যেতে পারে।
বাড়ির অন্য সদস্যদের যাতায়াত হিসাব করুন
আপনার অফিসের কাছাকাছি বাসা হলেই যে সেটি পুরো পরিবারের জন্য সুবিধাজনক হবে, এমন নয়। পরিবারের অন্য কেউ হয়তো অন্য এলাকায় চাকরি করেন, সন্তানের স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয় অন্যদিকে। আবার নিয়মিত কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় যাতায়াতের প্রয়োজনও থাকতে পারে।
তাই শুধু একজনের অফিসকে কেন্দ্র করে বাসা খোঁজার আগে বাড়ির অন্য সদস্যরা প্রতিদিন কোথায় এবং কীভাবে যাতায়াত করেন, সেটিও হিসাব করুন। আপনার এক ঘণ্টা সময় বাঁচাতে গিয়ে পরিবারের আরেক সদস্যকে প্রতিদিন তিন ঘণ্টা রাস্তায় কাটাতে হলে বাসাটি শেষ পর্যন্ত খুব একটা লাভজনক নাও হতে পারে। সবার নিয়মিত গন্তব্য বিবেচনা করে মাঝামাঝি বা যেখান থেকে যাতায়াত তুলনামূলক সহজ, এমন এলাকা বেছে নেওয়া বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে।
ফেরার সময় পরিবহন পাওয়া যায় কি না দেখুন
সকালে অফিসে যাওয়ার সময় বাস বা অন্য পরিবহন সহজে পাওয়া গেলেও রাতে ফেরার সময় একই অবস্থা নাও থাকতে পারে। বিশেষ করে যাদের অফিস ছুটি দেরিতে হয়, তাদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। বাসা নেওয়ার আগে সন্ধ্যা বা রাতে ওই পথে পরিবহন পাওয়া যায় কি না, খোঁজ নিন। রাতে নিয়মিত সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা রাইড শেয়ারিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হলে কম ভাড়ার সুবিধা দ্রুতই কমে যেতে পারে।
আপনার দুই ঘণ্টা সময়েরও দাম আছে
প্রতিদিন সকালে এক ঘণ্টা এবং সন্ধ্যায় দেড় ঘণ্টা রাস্তায় কাটালে মাসে কত সময় শুধু যাতায়াতেই যাচ্ছে, একবার হিসাব করুন। কম ভাড়ার বাসায় থেকে হয়তো টাকা বাঁচছে, কিন্তু ঘুম, বিশ্রাম বা নিজের কাজের সময় কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে যাদের নির্দিষ্ট অফিস সময়ের বাইরেও কাজ করতে হয়, তাদের জন্য দীর্ঘ যাতায়াত আরও ক্লান্তিকর হতে পারে। রাত করে অফিস থেকে বের হয়ে আবার দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার বিষয়টিও সিদ্ধান্তের সময় মাথায় রাখা দরকার।
অফিসের গাড়ি থাকলে রুট জেনে নিন
আপনার কর্মস্থলে কর্মীদের জন্য পরিবহন সুবিধা থাকলে অফিসের কাছাকাছি বাসা খোঁজার আগে গাড়ির রুট ও স্টপেজগুলো জেনে নিন। অফিস থেকে বেশ দূরের কোনো এলাকায় থেকেও যদি বাসার কাছাকাছি অফিসের গাড়িতে ওঠার সুযোগ থাকে, তাহলে যাতায়াত সহজ হতে পারে। শুধু অফিস থেকে দূরত্ব দেখে কোনো এলাকা বাদ না দিয়ে পরিবহন সুবিধার হিসাবটিও মিলিয়ে দেখুন।
সপ্তাহে কয়দিন অফিস করেন, সেটিও বড় বিষয়
আপনি যদি সপ্তাহে পাঁচ বা ছয় দিন অফিসে যান, অফিসের কাছাকাছি থাকার সুবিধা প্রতিদিনই পাবেন। কিন্তু সপ্তাহে দুই দিন অফিস এবং বাকি দিন বাসা থেকে কাজ করলে শুধু অফিসের জন্য বেশি ভাড়ার বাসা নেওয়া লাভজনক না-ও হতে পারে। একইভাবে নিয়মিত বাইরে কাজ করতে হলে বা কর্মস্থলের জায়গা বদলের সম্ভাবনা থাকলে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেটিও ভাবুন।
বাসার অন্য সুবিধাগুলো বাদ দেবেন না
শুধু অফিস কাছে বলে এমন বাসা নেওয়া ঠিক হবে না, যেখানে বাজার, ফার্মেসি বা প্রয়োজনীয় পরিবহন পাওয়া কঠিন। আবার শুধু কম ভাড়া বলে এমন জায়গায় ওঠাও ঠিক নয়, যেখান থেকে প্রতিটি প্রয়োজনেই অনেক দূরে যেতে হয়। বাসার আকার, নিরাপত্তা, পানি, গ্যাস, এলাকার পরিবেশ এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনের জায়গাগুলোও হিসাবের অংশ। যাতায়াত খরচ বাঁচাতে গিয়ে অন্য খাতে নিয়মিত বেশি টাকা খরচ হলে লাভের হিসাব আবার বদলে যাবে।
এক মাসের মোট খরচ লিখে তুলনা করুন
সিদ্ধান্ত নেওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হতে পারে দুটি বাসার জন্য আলাদা হিসাব করা। বাসা ভাড়া, সার্ভিস চার্জ, মূল সড়কে যাওয়ার খরচ এবং পরিবারের নিয়মিত যাতায়াতের সম্ভাব্য ব্যয় যোগ করুন। সঙ্গে মাসে কয়েক দিনের জরুরি রাইডের খরচও ধরুন। এরপর দেখুন দুই বাসার মোট খরচের পার্থক্য আসলে কত। যদি অফিসের কাছের বাসায় থাকতে মাসে দুই হাজার টাকা বেশি লাগে, কিন্তু প্রতিদিন দুই ঘণ্টা সময় বাঁচে, তাহলে সেই বাড়তি খরচ আপনার কাছে যৌক্তিক হতে পারে। আবার পার্থক্য যদি অনেক বেশি হয় এবং দূরের বাসা থেকে যাতায়াত সহজ হয়, কম ভাড়ার বাসাই ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে।
ঢাকায় অফিসের কাছাকাছি বাসা নাকি কম ভাড়ার বাসা—সবার জন্য এক উত্তর নেই। শুধু বাড়িওয়ালাকে মাসে কত টাকা দিচ্ছেন, সেটিই বাসার খরচ নয়। নিজের এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের যাতায়াতে কত টাকা যাচ্ছে, মূল সড়কে পৌঁছাতে কত খরচ হচ্ছে, রাস্তায় কত সময় কাটছে এবং প্রতিদিনের জীবন কতটা সহজ বা কঠিন হচ্ছে সবই এই হিসাবের অংশ। তাই বাসা ভাড়ার অঙ্কটি একা না দেখে পুরো পরিবারের এক মাসের জীবনযাপনের হিসাব মিলিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো।



