টাকা পাচারে ব্যস্ত সরকার অসহায় মানুষের কান্না শুনতে পায় না: রিজভী

মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বিএনপি সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আজ বিএনপির কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

বিএনপি সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, রাজনৈতিক চরিত্র হারিয়ে আওয়ামী লীগ এখন বন্দুকনির্ভর দলে পরিণত হয়েছে।

আজ সোমবার নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ মন্তব্য করেন।

রিজভী বলেন, 'একদলীয়—একতরফা ডামি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মসনদের অবৈধ মেয়াদ প্রলম্বিত করে আরও বেপরোয়া হয়ে জনগণের ওপর নতুন মাত্রায় জুলুম চালাচ্ছে ডামি সরকার। মানুষের বেঁচে—বর্তে থাকার অধিকার, জান—মাল, মানবাধিকার, জননিরাপত্তা লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে। তাদের একগুঁয়েমি ও বৈরিতার আঘাতে গণতন্ত্র কবরে শায়িত। রাষ্ট্রের পেশীশক্তি দিয়ে বিরোধী দল দমনের অভিনব সব পন্থা বিগত দেড় দশক ধরে অব্যাহত আছে। বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি মোকাবিলা করতে গিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর বাড়াবাড়ি বলপ্রয়োগ, একইসময় ক্ষমতাসীন দলের পাল্টা কর্মসূচি সংঘাতময় বিভীষিকার পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।'

তিনি বলেন, 'দৃষ্টান্তহীন নতুন মডেলের একদলীয় বাকশাল ২.০ প্রতিষ্ঠার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সমর্থক, উচ্ছিষ্টভোগী, দালাল ছাড়া দেশের সাধারণ মানুষ যেন উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে। বিরোধী দল নিষ্পেষণ—দলন—গ্রেপ্তার—হত্যা আর সাধারণ জনগণের রক্ত চুষে খাওয়াই এখন মাফিয়া সরকারের ব্রত। জনজীবনকে তারা দুর্বিষহ করে তুলেছে। এ দেশে স্বস্তিকর জীবনযাপন বলে কিছু নেই। একটা ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের ভেতরে বাংলাদেশকে নিপতিত করা হয়েছে। মানুষ আর সইতে পারছে না। অসহায় মানুষের বুকফাটা কান্নার শব্দ এই লুটপাট টাকা পাচারে ব্যস্ত সরকার শুনতে পাচ্ছে না। গ্যাস নাই, চুলা ঠান্ডা, রাস্তায় যানজট, বিদ্যুতের সীমাহীন লোডশেডিং, পুতি—দুর্গন্ধময় ওয়াসার ময়লা পানি, বাজারে আগুন। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, সড়কে মৃত্যু, খুন, ডায়রিয়াসহ নিত্যপণ্যের দাম আওয়ামী সিন্ডিকেট লাগামহীন ঘোড়ার পিঠে চড়িয়ে দিয়েছে।'

'বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে সভ্যতার জন্য বৈরী সংগঠন ছাত্রলীগ গড়ে তুলেছে নারীর শ্লীলতাহানিসহ সন্ত্রাস আর নৈরাজ্যের অভয়ারণ্য। সকল বিশ্ববিদ্যালয় এখন রক্তাক্ত এবং নারীদের জন্য বিপজ্জনক স্থান। সরকারি দলের প্রশ্রয়ে শহর—নগর—বন্দর—জনপদে দাপিয়ে বেড়ানো কিশোর গ্যাংয়ের ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, হামলা ও খুনাখুনিতে মানুষ আতঙ্কিত। দেশকে পরিণত করা হয়েছে পৃথিবীর এক নম্বর শব্দ আর বায়ু দূষণের ভাগাড়ে,' যোগ করেন তিনি।

বিএনপির এই সিনিয়র নেতা বলেন, 'শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, পুরো দেশটাকেই যাতনাময়—বিষাদলোকে পরিণত করেছে ভোট ডাকাতির মাফিয়া সরকার। নিত্যপণ্যের বাজার লুটেরা মাফিয়া—সিন্ডিকেটের হাতে বর্গা দিয়েছেন শেখ হাসিনা। ক্রমাগত দ্রব্যমূল্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে জনগণ। মাহে রমজানকে সামনে রেখে এখন থেকেই সরকারের সিন্ডিকেট চক্র জনগণের পকেট কাটতে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চাল, ভোজ্যতেল, চিনি ও খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমানোর ঘোষণা দিলেও বাজারে এর কোনো প্রভাব তো পড়েইনি, উল্টো গত ১০ দিনে রমজানসংশ্লিষ্ট কয়েকটি পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।'

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, 'চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত বছরের ব্যবধানে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে ৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ। কোনো কোনো পণ্যের দাম দ্বিগুণ ছাড়িয়েছে। যেমন গত বছর এই সময়ে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হওয়া পেঁয়াজ এখন বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়। অর্থাৎ দাম বেড়েছে তিন গুণের বেশি। একই অবস্থা মাংস ও মাছের বাজারেও।'

'নিত্যপণ্যের বাজার সিন্ডিকেট যে সরাসরি শেখ হাসিনা নিয়ন্ত্রিত তা বিভিন্ন সময় ইশারা ইঙ্গিতে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী—নেতারা প্রকাশ্যে বলেছেন। ডামি সরকারের বাজার লুটের কারণে আজ জনগণ সর্বস্বান্ত। বাজারে দ্রব্যমূল্যের আগুনে পুড়ছে সাধারণ মানুষ আর অর্থ বিত্তের পুকুরে সাঁতার কাটছে সরকারের লোকজন,' বলেন তিনি।

'রাজনৈতিক চরিত্র হারিয়ে আওয়ামী লীগ এখন বাকসর্বস্ব বন্দুকনির্ভর দলে পরিণত হয়েছে' মন্তব্য করে রিজভী বলেন, 'এই দলটির সব পর্যায়ের নেতাদের কথাবার্তায় আচার—আচরণে জনগণের প্রতি অশ্রদ্ধা—অবহেলা ফুটে ওঠে। গণতন্ত্রের নামে কায়েমি স্বার্থবাদীরা অপপ্রচারকে হাতিয়ারে পরিণত করেছে। জনগণের অদৃষ্ট যে ভালো নয়, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনলেই সেটি মনে হয়। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে নিরুদ্দেশ করে শেখ হাসিনা রাজা—প্রজার শাসন কায়েম করেছেন। তিনি নিজেকে রানী বা সম্রাজ্ঞী ভাবেন বলেই বাংলাদেশের মসনদকে তার পৈত্রিক সম্পদ বলে মনে করেন। এই মসনদে জনগণের কোনো অধিকার নেই।'

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এক বক্তব্যের উল্লেখ করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, 'গত শনিবার দুপুরে ওবায়দুল কাদের বলেছেন যে, "দেশে বিএনপি সবচেয়ে বড় উগ্রবাদী দল। দেশে উগ্রবাদের জন্ম বিএনপির হাত ধরে।" ওবায়দুল কাদের সাহেবের কিছু বলার আর করার কিছু নেই। তিনি আওয়ামী লীগের জড় পদার্থে পরিণত হয়েছেন। যেভাবে চালানো হয় তিনি সেভাবেই চলেন। যে দেশে আওয়ামী লীগের মতো একটি দলের অস্তিত্ব থাকে সে দেশে উগ্রবাদ খুঁজতে যাওয়া মূর্খের স্বর্গে বাস করা। জনগণপীড়ক অত্যাচারী, ন্যায়বিচার শূন্য প্রশাসন, স্বার্থপর—লোভী আওয়ামী লীগ মাত্র তিন মাসেই বেছে বেছে বিএনপির ৩৪ জন নেতাকর্মীকে খুন করেছে। সরকারি মদদে ও অবহেলায় কারাগারে ১৫ জন নেতাকর্মীর মৃত্যু নিশ্চিত করার পরও ওবায়দুল কাদের সাহেব আপনারা কাকে উগ্রশক্তি বলেন? ওবায়দুল কাদের সাহেবকে জিজ্ঞাসা করি—গণতান্ত্রিক বিশ্বের তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই কেন? গণতন্ত্রের সূচকে বাংলাদেশের আরও পতন হচ্ছে কেন ? পৃথিবীর বিশ্বাসযোগ্য মর্যাদাসম্পন্ন সংগঠনগুলোর জরিপে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় ? তার বক্তব্য বরাবরই বিরোধের ছায়াকে প্রলম্বিত করে। তিনি দখলদার মাফিয়া টিমের মুখপাত্র।'

এরপর রিজভী মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বিএনপির কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

আগামীকাল মঙ্গলবার দুপুর ২টায় রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের মিলনায়তনে বিএনপির আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

২১ ফেব্রুয়ারি ভোর ৬টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ এবং কালো পতাকা উত্তোলন করবে বিএনপি।

এরপর কালো ব্যাজ পরে প্রভাতফেরিতে অংশগ্রহণের জন্য বলাকা সিনেমা হলের সামনে দলীয় নেতা—কর্মীদের জমায়েত এবং আজিমপুর কবরস্থানে ভাষা শহীদদের মাজার জিয়ারত শেষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করবে বিএনপি।


 

Comments

The Daily Star  | English

Trade at centre stage between Dhaka, Doha

Looking to diversify trade and investments in a changed geopolitical atmosphere, Qatar and Bangladesh yesterday signed 10 deals, including agreements on cooperation on ports, and overseas employment and welfare.

3h ago