বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন: আইএমএফ

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মুদ্রানীতি দেশটির চলমান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে। তবে এটি স্থিতিশীল করতে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

গতকাল বুধবার আইএমএফ'র এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন টোকিওতে সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, 'তারা (বাংলাদেশ) মূল্যস্ফীতি কমাতে মুদ্রানীতি কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে। সেখানে মূল্যস্ফীতি কমছে। তবে মূল্যস্ফীতি টেকসইভাবে কমাতে ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রায় দ্রুত নেমে আসা নিশ্চিত করতে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন।'

'রিজিওনাল ইকোনমিক আউটলুক আপডেট ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক' শীর্ষক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ থেকে সাংবাদিকরা ভার্চুয়ালি অংশ নেন।

আইএমএফ'র ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গত ১৭ জানুয়ারি সর্বশেষ মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নতুন নীতিতে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করতে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা আছে। এর মধ্যে পলিসি হার ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে আট শতাংশ করা ও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ১১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা। মুদ্রার বিনিময় হারের অস্থিরতা রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও 'ক্রলিং পেগ' নীতি গ্রহণ করেছে।

চলতি অর্থবছর শেষে দেশে মূল্যস্ফীতি সাড়ে সাত শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের সর্বশেষ মুদ্রানীতি প্রসঙ্গে শ্রীনিবাসন বলেন, 'একের পর এক অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে অনেক দেশের মতো বাংলাদেশকেও করোনা মহামারি থেকে শুরু করে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ ও পরবর্তী সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে।'

তিনি আরও বলেন, 'সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ আইএমএফ'র ঋণ চেয়েছিল। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে বেশকিছু ব্যবস্থা নেওয়ার শর্ত আছে। একটি হচ্ছে—অবশ্যই মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে হবে। অন্যটি হলো—দরিদ্র ও আর্থিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিদের রক্ষা করার সময় আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। প্রশাসনিক সংস্কারও এসব শর্তের মধ্যে আছে।'

সার আমদানি ও স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের বকেয়া পরিশোধের জন্য সরকার ব্যাংকগুলোকে যে বিশেষ বন্ড দিয়েছে সে সম্পর্কে এই আইএমএফ কর্মকর্তা বলেন, 'আপনাদের বিকল্প কী আছে তা দেখতে হবে। আইএমএফ'র ঋণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজস্ব সংগ্রহ জোরদার রাখতে ও খরচ কমানোসহ অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিশ্চিত করতে সরকার কাজ শুরু করছে।'

'সুতরাং, সেই প্রেক্ষাপটে আর্থিক সংহতি বড় ভারসাম্য আনতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আর কতটুকু সংহতি তারা আনতে পারবে? এটি এমন একটি বিষয় যার আরও সুনির্দিষ্ট উত্তরের জন্য আগামী মাসগুলোয় বাংলাদেশে কাজ করা আইএমএফ টিম মূল্যায়ন করবে।'

বাংলাদেশের আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি সঠিক পথে আছে কিনা জানতে চাইলে শ্রীনিবাসন বলেন, 'বিস্তৃতভাবে বলতে গেলে, হ্যাঁ। দুই মাস আগে বাংলাদেশের ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আমাদের পর্যালোচনা হয়েছিল এবং ঋণের শর্তগুলো পূরণের ক্ষেত্রে তা সন্তোষজনক ছিল।'

'কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছিল। এর আংশিক কারণ নির্বাচনের আগে আর্থিক হিসাব নেতিবাচক ছিল। রপ্তানি বাড়ানো ও আমদানি কমার কারণে চলতি হিসাব যৌক্তিকভাবে ভালো করছিল।'

'নির্বাচন শেষ হয়েছে। অনিশ্চয়তা কেটে গেছে। আশা করছি, আর্থিক হিসাব স্থিতিশীল হয়ে উঠবে।'

এশিয়ার সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, 'ভালো খবর হচ্ছে—আমরা এশিয়ার ২০২৩ ও ২০২৪ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করেছি। বেশিরভাগই ইতিবাচক। আমাদের হিসাবে এশিয়ার গড় মূল্যস্ফীতি ২০২২ সালের তিন দশমিক আট শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে দুই দশমিক ছয় শতাংশে নেমে এসেছে। তবে, এখনো ঝুঁকি রয়ে গেছে। যেমন, আর্থিক পরিস্থিতি এখনো অস্থির।'

নীতিনির্ধারকদের কোন বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আর্থিক তদারকি জোরদার ও ঝুঁকি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি রাজস্ব একীকরণ মূল বিষয়।'

Comments

সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নেওয়ার পরও বাজারে অর্থ ঢালছে বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নেওয়ার পরও অর্থনীতিতে নতুন অর্থের সরবরাহ করা হচ্ছে, যা একটি পরস্পরবিরোধী উদ্যোগ। ফলে, এটি উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

যদিও চলতি অর্থবছরের শুরুতে সরকারকে ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কারণ এ ধরনের অর্থায়ন ভোক্তা মূল্য সূচক বা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে অবদান রাখে।

এছাড়া ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানটি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার বৃদ্ধি অব্যাহত রেখেছে। গত বছরের মার্চ থেকে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপর আছে।

যেকোনো দেশের অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে নীতি সুদহার বা রেপো রেট। তাই বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো অর্থ সরবরাহ, মূল্যস্ফীতি ও তারল্য নিয়ন্ত্রণে এটি ব্যবহার করে থাকে।

গত ১৭ জানুয়ারি প্রকাশিত নতুন মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক রেপো রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৮ শতাংশ করেছে। মূলত ২০২২ সালের মে থেকে আর্থিক নীতিতে কড়াকড়ি শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তারপর থেকে এ নিয়ে অষ্টমবারের মতো নীতি সুদহার বাড়ানো হলো।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনো বিভিন্ন উপায়ে অর্থনীতিতে অর্থ ঢালছে। যেমন- বিভিন্ন ব্যাংককে তারল্য সহায়তা, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোকে বিশেষ তারল্য সহায়তা ও বিশেষ ট্রেজারি বন্ডের বিপরীতে বিশেষ রেপো সুবিধা দিচ্ছে।

সাধারণত তারল্য ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকগুলো রেপো সুবিধা, নিশ্চিত তারল্য সহায়ক সুবিধা, নিশ্চিত রেপো সুবিধা, স্থায়ী ঋণ সুবিধা ও ইসলামী ব্যাংকের তারল্য সুবিধার আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে থাকে।

এভাবে গত ২৮ জানুয়ারি নিলামে ৩৩টি ব্যাংক ও একটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ১০ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রেপো ও নিশ্চিত তারল্য সহায়তার আওতায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ১৩ লাখ ৮ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা এক বছর আগে ছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিশ্রুতি নোটের বিপরীতে কিছু ইসলামী ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রেখেছে। এই সুবিধায় একটি ব্যাংক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ঋণ নিতে পারে।

গত ২৮ ডিসেম্বর পাঁচটি ইসলামি ব্যাংকসহ সাতটি দুর্বল ব্যাংককে ২২ হাজার কোটি টাকা জরুরি তহবিল থেকে ঋণ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলো হলো- ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক।

এখানে উল্লেখ্য সার ও বিদ্যুতের বকেয়া বিল পরিশোধে সরকার বিশেষ ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করেছে। ওই বন্ডের বিপরীতে গত ২২ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ছয়টি ব্যাংককে ১২ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক এই অর্থ নিয়েছে। তবে, অন্য ব্যাংকগুলো রেপো রেটে নিলেও ইসলামী ব্যাংক শূন্য সুদহারের বন্ডের বিপরীতে এই অর্থ নিয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, সরকারের জন্য টাকা ছাপানোর প্রক্রিয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্থগিত করলেও অর্থ সরবরাহ এখনো চলছে।

তিনি বলেন, 'এ অর্থায়ন অব্যাহত থাকলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা কাজে লাগবে না।'

তিনি আরও বলেন, বন্ড বা অন্য কোনো সরকারি সিকিউরিটিজের বিপরীতে অর্থ সরবরাহ করাও অর্থ ছাপানোর একটি ফর্ম, যা মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াবে।

চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি-জুন মাসের জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বলেছিলেন, মার্কিন ডলার সরবরাহ করে ব্যাংকগুলো থেকে বড় অঙ্কের অর্থ তুলে নিয়েছে  কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাই ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন বাজারে টাকা ঢালছে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, প্রভাব একই রকম হবে।

তিনি বলেন, 'বিশেষ বন্ডের বিপরীতে অর্থ সরবরাহ করায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। এই টুল ব্যবহার না করে সরাসরি সরকারকে অর্থ সরবরাহ করতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংকগুলোকে বন্ডের বিপরীতে নগদ অর্থের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়াবে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষক আশিকুর রহমান বলেন, 'কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নিয়েছে এবং রেপো রেট বাড়িয়েছে। অন্যদিকে দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য টাকা ছাপাচ্ছে।'

'এটি একটি পরস্পরবিরোধী উদ্যোগ। কোনো অর্থনীতিতে এভাবে অর্থ সরবরাহ করা হলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে,' যোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, 'যখন বাজারে ২২ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করা হয়, তখন মানি মাল্টিপ্লায়ার এফেক্টের কারণে বাজারে এক লাখ কোটি টাকার প্রভাব পড়ে।'

তিনি দুর্বল ও সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য টাকা ছাপানো বন্ধ করে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনার সুপারিশ করেন।

Comments

তারল্য সংকটে আরও বেড়েছে সুদহার

দীর্ঘদিন ধরে তারল্য সংকটের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ও ব্যাংক খাত। ফলে ট্রেজারি বিল, বন্ড ও ব্যাংক ঋণের সুদহার বেড়েছে।

এদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমাতে গত ১৭ জানুয়ারি চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে আছে। তাই মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে মুদ্রানীতিতে সুদহার আরও বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

গত বছরের অক্টোবরে ঋণের গড় সুদহার দাঁড়িয়েছিল ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশে, যা একই বছরের জুনে ছিল ৭ দশমিক ৩১ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের সুদহারের সীমা প্রত্যাহার করে নতুন ফর্মুলা চালুর পর থেকে সুদহার বাড়তে শুরু করে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন ফর্মুলা অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ব্যাংক ঋণের সুদহার দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৮৯ শতাংশে। আগামীতে এই সুদহার ১২ শতাংশ পেরিয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বিলের ছয় মাসের মুভিং এভারেজ রেটের ওপর ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ পয়েন্ট মার্জিন আরোপ করতে পারে, যা স্মার্ট নাম পরিচিত। চলতি মাসে স্মার্ট হার ছিল ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ, গত বছরের জুলাইয়ে ছিল ৭ দশমিক ১০ শতাংশ।

শুধু ব্যাংক ঋণ নয়, ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহারও এখন উচ্চমাত্রায় পৌঁছেছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ছাপানো বন্ধ করায় চলতি অর্থবছরে সুদহারের এই বৃদ্ধি অব্যাহত আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক মাস আগে ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ৭ থেকে ৮ শতাংশ থাকলেও এখন তা ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

এদিকে ঋণের চাহিদা কমলেও সুদহার ঊর্ধ্বমুখী। নভেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ, যা আগের মাসের ১০ দশমিক ০৯ শতাংশ থেকে কম।

ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমরানুল হক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ঋণের চাহিদা বাড়লে সুদহার বাড়বে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কেটে যাওয়ায় সামনের দিনগুলোতে ঋণের চাহিদা বাড়বে।'

গত ২৪ জানুয়ারির নিলামে ৩৫টি ব্যাংক ও একটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান তারল্য ঘাটতি মেটাতে রেপো সুবিধার আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ১৫ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।

এমরানুল হকের মতে, বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে অস্থিতিশীলতার কারণে ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটের পড়েছে। তাই এখন তারল্য প্রবাহ বাড়ানো বড় একটি চ্যালেঞ্জ।

'রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বাড়লে ব্যাংকগুলোর তারল্য প্রবাহ বাড়বে,' বলেন তিনি।

এখানে উল্লেখ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২১ সালের আগস্ট থেকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোকে ডলার সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। যা তারল্য সংকটের অন্যতম একটি কারণ। কারণ, ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রক সংস্থা ২০২১ সালের আগস্ট থেকে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করে ব্যাংকিং খাত থেকে সমপরিমাণ টাকা তুলে নিয়েছে।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নিয়েছে, তাই তারল্য সংকট প্রত্যাশিত ছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন মুদ্রানীতিতে পলিসি রেট বা রেপো রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৮ শতাংশ করেছে। ২০২২ সালের মে মাস থেকে কঠোর অবস্থানে যায় বাংলাদেশ ব্যাংক, তারপর থেকে এই নিয়ে অষ্টমবারের মতো বাড়ানো হলো রেপো রেট।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো ঋণের ব্যয় বাড়ানো।

মোহাম্মদ আলী বলেন, উচ্চ সুদহারের কারণে আগামীতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হবে না। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ বেঁধে দেওয়া হয়েছিল সুদহার

তিনি আরও বলেন, 'আবার বেকারত্ব বাড়ারও ঝুঁকি আছে, যা আরেকটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

তবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এলে তারল্য সংকট থাকবে না বলে জানান তিনি।

ঋণের চাহিদা কমাতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ১১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

(এই প্রতিবেদনটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন রবিউল কমল)

Comments

রিজার্ভ স্থিতিশীল ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে মুদ্রানীতি: ঢাকা চেম্বার সভাপতি

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতি নিয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেছেন, এই মুদ্রানীতি দেশের আর্থিক খাতকে পুনর্জীবিত ও প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সহায়তা করবে।

তিনি বলেন, একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে প্রয়োজনীয় অর্থ প্রবাহ নিশ্চিত করা ও মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া কঠোর নীতিকে স্বাগত জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার।

বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে মুদ্রানীতিতে 'ক্রগিং পেগ' পদ্ধতি অনুসরণের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে ডিসিসিআই। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার (রেপো রেট) ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৮ শতাংশে উন্নীত করে বাজারে মুদ্রা প্রবাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার এ উদ্যোগ কার্যকর হবে বলে ঢাকা চেম্বার সভাপতি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে এ নীতি সুনির্দিষ্ট প্রভাব রাখবে।

তাছাড়া অন্যান্য প্রি-ফাইন্যান্সিং ও রি-ফ্যাইন্যান্সিং স্কিমের মাধ্যমে সিএমএসএমই খাতকে সহায়তার উদ্যোগকে স্বাগত জানান তিনি।

সর্বশেষ ঘোষিত মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে 'স্মার্ট' এর উপর ভিত্তি করে ঋণের সুদ হার নির্ধারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল, তবে সেটি খুব বেশি কার্যকর হয়েছে বলে মনে হয়নি। কারণ গত ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৫ শতাংশ, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫ শতাংশের চেয়ে বেশি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা আনতে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে নেওয়া উদ্যোগের সুফল পাওয়া যাবে।

চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি-জুন মেয়াদে সরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭ দশমিক ৮ শতাংশ। যদিও অর্থবছরের প্রথমার্ধে জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদে ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে অর্জিত হয়েছিল মাত্র ১৮ শতাংশ।

অপরদিকে জানুয়ারি-জুন মেয়াদে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে অর্জিত হয়েছিল মাত্র ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা, গত মেয়াদের অর্জিত মাত্রার চেয়ে কম নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা আরও বেশি প্রত্যাশা করেছিল।

এ অবস্থায় ঢাকা চেম্বার সভাপতি আশা প্রকাশ করেন, যথাযথ আর্থিক ঋণ কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে বেশি হারে ঋণ প্রবাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্যোগ গ্রহণ করবে। সরকারি খাতে ঋণ কমার পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধি করতে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বৃদ্ধি, সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছতা সাধন এবং অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের ওপর জোরারোপ করেন তিনি।

মুদ্রা বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা আনতে ঢাকা চেম্বার সভাপতি মনে করেন, 'ক্রগিং পেগ' পদ্ধতি বাজারকে কিছুটা স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হবে, তবে এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমাতে রায়ার্স ক্রেডিট, ইউজেন্স এলসি, ডেফার্ড পেমেন্ট এবং এক্সপোর্ট ফ্যাক্টরিং প্রভৃতি বিষয়গুলো বিকল্প উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনার দাবি করছে ডিসিসিআই।

দেশে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে তারল্য বৃদ্ধিতে 'এক্সপোর্টার রিটেনশন কোটা (ইআরকিউ)' হার আগের ১৫ শতাংশ, ৬০ শতাংশ এবং ৭০ শতাংশের তুলনায় যথাক্রমে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, ৩০ শতাংশ এবং ৩৫ শতাংশ নামিয়ে আনা হয়েছে। এছাড়াও পেমেন্টের ক্ষেত্রে রেগুলেটরি ক্যাপিটালের ৪০ শতাংশ অফশোর ব্যাংকিং অপারেশনস থেকে ধারের সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ডিসিসিআই সভাপতি মনে করেন, এ উদ্যোগ বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতিতে স্থিতিশীল করবে, যদিও সীমিত হস্তক্ষেপ ও সুসংগঠিত নীতি কাঠামোর আওতায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারকে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

Comments

জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাড়িয়েছে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা

অর্থনীতিতে চলমান চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস (জিডিপি) ৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে।

আজ বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশিত মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থাকায় মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ করা হলো।

অর্থবছরের প্রথমার্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ নীতিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল, কিন্তু গত বছর মার্চ থেকে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ইতিবাচক থাকবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, 'বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকার ও অন্যান্য অংশীদারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় উন্নতি হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।'

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার পর এ পরিবর্তন আনা হলো।

বিশ্ব ব্যাংকও চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ করেছে।

Comments

বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমাল বাংলাদেশ ব্যাংক

বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ১১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

আজ বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতে এ ঘোষণা দেয়া হয়।

এছাড়া, নতুন মুদ্রানীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৮ শতাংশ করেছে। উল্লেখ্য, এই সুদের হারকে 'রেপো রেট' বলা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে সুদের হারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ঋণ দিয়ে থাকে তাকে পলিসি রেট বা রেপো রেট বলা হয়।

এমন এক সময়ে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হলো যখন মূল্যস্ফীতি ও বিদেশি মুদ্রা সংকটের কারণে দেশের অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে আছে। এরসঙ্গে নতুন করে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে লোহিত সাগরের সংকট।

Comments

পলিসি রেট বাড়িয়ে ৮ শতাংশ করল বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংক আজ বুধবার চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের জন্য মুদ্রানীতি প্রকাশ করেছে। মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে।

নতুন মুদ্রানীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৮ শতাংশ করেছে। উল্লেখ্য, এই সুদের হারকে 'রেপো রেট' বলা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে সুদের হারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ঋণ দিয়ে থাকে তাকে পলিসি রেট বা রেপো রেট বলা হয়।

রেপো রেট বেড়ে যাওয়ায় ঋণ নেওয়া আগের চেয়ে ব্যয়বহুল হবে।

এমন এক সময়ে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হলো যখন মূল্যস্ফীতি ও বিদেশি মুদ্রা সংকটের কারণে দেশের অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে আছে। এরসঙ্গে নতুন করে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে লোহিত সাগরের সংকট

Comments

মূল্যস্ফীতি কমাতে নতুন মুদ্রানীতি দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক

চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন মুদ্রানীতিতে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চ সুদহার বজায় থাকবে, যা গত দুই বছর ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে চাহিদা কমাতে ও দাম নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক নীতি ধরে রেখেছিল। সেই হিসাবে, ঋণের সুদ বাড়াতে পলিসি রেট বা রেপো রেট বাড়িয়ে ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ করা হয়।

এর আগে, গত জুনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট বাড়িয়ে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ করে, যা জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে।

এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ছয় মাসের মুভিং এভারেজ রেট অব ট্রেজারি বিল (স্মার্ট) চালু কর, এজন্য আগের ৯ শতাংশ সুদ হারের সীমা তুলে নেওয়া হয়। এরপর থেকে বাজারে অতিরিক্ত তারল্য কমে যাওয়ায় সুদের হার বাড়তে থাকে।

এমন এক সময়ে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে যখন মূল্যস্ফীতি ও বিদেশি মুদ্রা সংকটের কারণে দেশের অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে আছে। এরসঙ্গে নতুন করে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে লোহিত সাগরের সংকট।

দেশের মূল্যস্ফীতি মার্চ থেকে ৯ শতাংশের ওপরে ছিল, নভেম্বরে ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ থেকে সমান্য কমে ডিসেম্বরে ৯ দশমিক ৪১ শতাংশে নেমে এসেছে।

Comments

বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: ডিসিসিআই সভাপতি

মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের অর্থনীতি বেশকিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে উল্লেখ করে যেকোনো মূল্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ব্যারিস্টার মো. সামীর সাত্তার।

সোমবার দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে সংগঠনটি।

সামীর সাত্তার বলেন, ভূ-অর্থনৈতিক সংকট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ অনেক উন্নয়নশীল অর্থনীতির চেয়ে বেশ ভালো অবস্থানে আছে। যদিও মুডিস'স ইনভেস্টর সার্ভিস বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং এবং দেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে, তারপরেও ২০২৬ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনকে সামনে রেখে অর্থনীতিতে গতি আনতে কিছু পদক্ষেপ প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতির কারণে আমাদের অর্থনীতি বেশকিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে এবং যেকোনো মূল্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতির বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা একান্ত আবশ্যক। পণ্যের মূল্য কমিয়ে আনতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির সঙ্গে রাজস্ব নীতিগুলোর সমন্বয় করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো বৈদেশিক মুদ্রা বাজারের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে নিয়ে আসা। এ ব্যাপারে যথাযথ ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের কাছ থেকে রেমিট্যান্স পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য বাজারভিত্তিক বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়াও, সরকারকে অবশ্যই রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্যকরণে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যাতে করে আমাদের প্রথাগত বাজার ও গতানুগতিক প্রথাগত পণ্যের বাইরেও সম্ভাবনাময় একাধিক বাজারে ভিন্ন ভিন্ন নতুন পণ্য রপ্তানি থেকে আয় বৃদ্ধি করা যায়।

ব্যারিস্টার সাত্তার মনে করেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে রাজস্ব আহরণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করা উচিত। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে কর অফিস খোলা এবং কর অফিসের কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য একটি যথাযথ ম্যাপিং প্রয়োজন। রাজস্ব বাড়াতে অনানুষ্ঠানিক খাতকে যথাযথভাবে করের আওতায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব আদায় কার্যক্রম নিশ্চিত করতে রাজস্ব বোর্ডের জনশক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্পূর্ণ অটোমেশনের মাধ্যমে করজাল বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে।

এ ছাড়াও, ক্রমবর্ধমান মন্দঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের জন্য সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং খাতে কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দেন ডিসিসিআই সভাপতি। একইসঙ্গে তিনি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও নতুন সুযোগ সৃষ্টির ব্যাপারে আর্থিক খাতকে মসৃণভাবে চলার পথ সুগম করার ওপর জোরারোপ করেন।

Comments

টানা ১১ বছরেও কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি

একদিকে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অন্যদিকে অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে টানা ১১ বছরের মতো রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে পারেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

সংস্থাটির তথ্য অনুসারে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। এটি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৪৪ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা কম।

গত অর্থবছরে কর আদায় বেড়েছে মাত্র ৮ শতাংশ। এর আগের বছরের ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রায় অর্ধেক।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ও আইএমএফের সাবেক অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ঘাটতি বিষয়ে আমরা যা ধারণা করেছিলাম তার তুলনায় ঘাটতি আছে।'

তিনি আরও বলেন, 'মূল সমস্যা হচ্ছে এনবিআরের প্রশাসনিক সক্ষমতার অভাব। সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক মন্দাও দেখা দিয়েছে।'

'কর্পোরেট আয় কমেছে। আমদানির পাশাপাশি পণ্যের দামও কমেছে,' যোগ করেন তিনি।

এনবিআরের তথ্যে জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরের জুলাই-জুনে আমদানি-রপ্তানি থেকে কর আদায় মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯১ হাজার ৭১৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

আয় ও ভ্রমণ কর আদায় ৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ১২ হাজার ৯২১ কোটি টাকা হয়েছে।

সংস্থাটির তথ্যে আরও জানা গেছে, রাজস্ব আদায়ের সবচেয়ে বড় উৎস ভ্যাট আদায়ের পরিমাণ ১১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। এটি এনবিআরের রেকর্ড আদায় ১ লাখ ২০ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরের বাজেট পাসের ২ সপ্তাহ পর পুরো বছরের রাজস্ব আদায়ের তথ্য জানা গেছে। বাজেটে এনবিআরকে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তথ্যে দেখা যায়, নতুন লক্ষ্যমাত্রা ২০২৩ অর্থবছরের মোট সংগ্রহের তুলনায় ৩২ শতাংশ বেশি।

অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর আরও বলেন, 'লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব হবে। সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ বেশি কর আদায় করতে পারবে এনবিআর।'

পিআরআই স্টাডি সেন্টার অন ডোমেস্টিক রিসোর্স মোবিলাইজেশনের (সিডিআরএম) পরিচালক মোহাম্মদ এ রাজ্জাকের আশঙ্কা বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করায় চলতি অর্থবছরে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও ডিপ্রেসেড হতে পারে।

তিনি মনে করেন, 'সুদের হার বাড়ানো ও ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধি অর্থনৈতিক গতিশীলতা কমিয়ে আনবে এবং রাজস্ব আদায় আরও কঠিন হবে।'

Comments

Pages