বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গেজেটস

বাজারে কি কেবল ইউএসবি-সি পোর্ট থাকবে

আজকাল সব ধরনের ইলেকট্রনিক গ্যাজেটে যে পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে তা হলো ইউএসবি টাইপ-সি পোর্ট। অথচ অল্প সময় আগেও দেখা যেত মাইক্রো ইউএসবি।
ইউএসবি টাইপ-সি পোর্ট। ছবি: সংগৃহীত

আজকাল সব ধরনের ইলেকট্রনিক গ্যাজেটে যে পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে তা হলো ইউএসবি টাইপ-সি পোর্ট। অথচ অল্প সময় আগেও দেখা যেত মাইক্রো ইউএসবি।

আসুন জেনে নেওয়া যাক ইউএসবি টাইপ-সি সম্পর্কিত কিছু তথ্য; ইউএসবি-সি কী, কতটা গতিসম্পন্ন এবং অন্যান্য স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে দামের পার্থক্য।

ইউএসবি-সি কী?

ইউএসবি-সি বা ইউএসবি টাইপ সি-কে স্মার্ট ডিভাইসের তারযুক্ত সংযোগের একটি সর্বজনীন স্ট্যান্ডার্ড বলা চলে। অতীতের মাইক্রো-ইউএসবি এবং ইউএসবি-এর জায়গা দখল করে নিয়েছে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে। এর জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ হলো পিল-আকৃতির ডিজাইন, যা ডিভাইসের উপরে বা নিচের অংশে সহজে প্রবেশ করতে সক্ষম।

গত কয়েক বছরে বাজারে আসা বেশির ভাগ মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট বা ল্যাপটপে ইউএসবি-সি পোর্ট দেখা যায়। এর মাধ্যমে ফোনের ব্যাটারি দ্রুত চার্জ হয় এবং ডেটা দ্রুত স্থানান্তর করা যায়। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম আইফোন। অ্যাপল ইউএসবি-সি পোর্টের বিপরীতে ব্যবহার করে লাইটনিং কানেক্টর।

অ্যাপল ইউএসবি-সি পোর্টের বিপরীতে ব্যবহার করে লাইটনিং কানেক্টর

ইউএসবি-সি'র ব্যবহার শুরু হয় ২০১৪ সালে। তবে বিশ্বের এমন কিছু অংশ রয়েছে যেখানে এখনো এটি মূলধারার অনুষঙ্গ হতে পারেনি। একটি ইউএসবি-সি কানেক্টরে প্রতি পাশে ১২টি করে মোট ২৪টি পিন থাকে। যার মধ্যে ১৬টি পিন ডেটা স্থানান্তর, ৪টি পিন চার্জ এবং ৪টি গ্রাউন্ড পিনের কাজ করে।

ইউএসবি-সি কতটা গতি সম্পন্ন?

ইউএসবি-সি এর 'সি' দিয়ে শুধু সংযোগকারী এবং প্লাগের আকৃতিকে বোঝায়। অনেকে মনে করেন, সব ধরনের ইউএসবি-সি ক্যাবল দ্রুত গতি সম্পন্ন। আসলে তা নয়।

ইউএসবি-সি কেবল একটি ফিজিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড, ডেটা স্ট্যান্ডার্ড নয়। একটি ইউএসবি-সি'র ডেটা স্ট্যান্ডার্ড না দেখে ক্যাবল কত দ্রুত হবে তা বলা যায় না।

ইউএসবি ডেটা স্ট্যান্ডার্ড যেমন ইউএসবি ২.০, ৩.০, ৩.১, ৩.২, বা ৪ তারের গতি জানতে সাহায্য করে। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে অক্ষরগুলো আকৃতি এবং সংখ্যাগুলো গতির প্রতিনিধিত্ব করে।

যে কারণে ইউএসবি-সি মূলধারায় আসতে পারেনি

ইউএসবি-সি'র ব্যবহারিক সুবিধা নিয়ে বলার আগে এটির সমস্যার বিষয়টি উল্লেখ করতে হয়—যার মধ্যে রয়েছে বিভ্রান্তিকর নাম। ইউএসবি ইমপ্লিমেন্টার্স ফোরাম (ইউএসবি-আইএফ) হলো সেই গ্রুপ যা ইউএসবি-সি উদ্ভাবন করেছে এবং নতুন ইউএসবি স্ট্যান্ডার্ডের নামকরণ এর জন্য দায়ী।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০০৮ সালে ইউএসবি ৩.০ স্ট্যান্ডার্ড বাজারে আসে যা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইউএসবি ৩.১ জেন ১ নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে এটিকে বলা হয়, ইউএসবি ৩.২ জেন ১। একইভাবে ইউএসবি ৩.২ স্ট্যান্ডার্ডকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইউএসিবি ৩.২ জেন ২x২ বলা হয়। এমন বিভ্রান্তিকর নামকরণের জন্য ইউএসবি-সি গ্রহণযোগ্যতার হার ধীরগতির।

ইউএসবি-সি প্রজন্ম এবং গতি

এ ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর নামের পাশাপাশি প্রতিটি প্রজন্মের গতিতেও ব্যাপক পার্থক্য দেখা যায়। তবে নতুন প্রজন্মের ইউএসবি শুধু ইউএসবি-সি সাপোর্ট করে। কিন্তু এগুলো মূলধারায় পরিণত হতে অনেক সময় নেয়।

উদাহরণ হিসেবে, স্যামসাংয়ের সর্ব শেষ ফ্ল্যাগশিপ ফোন গ্যালাক্সি এস২২ আল্ট্রাতে রয়েছে ২০ জিবিপিএস গতির ২.২ ইউএসবি। কিন্তু মিড রেঞ্জের ফোন গ্যালাক্সিত এ৫৩'তে এখনো ৪৮০ এমবিপিএস গতির ইউএসবি ২.০ রয়েছে। যেহেতু এই ডেটা স্ট্যান্ডার্ড খুব একটা প্রচলিত নয়, তাই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নতুন স্ট্যান্ডার্ড উন্নত করতে তেমন আগ্রহ দেখায় না।

এ ক্ষেত্রে ৪০ জিবিপিএস সম্বলিত সবচেয়ে দ্রুতগতির ডেটা স্ট্যান্ডার্ড হলো ইউএসবি ৪। যা থান্ডারবোল্ট ৩ এর ওপর নির্ভরশীল। থান্ডারবোল্ট ৩ মূলত একটি মালিকানাধীন সফটওয়ার যা ২০১৫ সালে ইন্টেল তৈরি করে। অ্যাপল প্রথম ২০১৬ ম্যাকবুক প্রো ল্যাপটপে বাণিজ্যিকভাবে এটি ব্যবহার করে।

পরবর্তীতে ২০১৯ সালে ইন্টেল ইউএসবি ইমপ্লিমেন্টার ফোরামে থান্ডারবোল্ট ৩ স্পেসিফিকেশন করে নতুন ইউএসবি ৪ ডেটা স্ট্যান্ডার্ড প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে যা নির্মাতারা তাদের ডিভাইসে অবাধে ব্যবহার করতে পারে। এটি মূলধারায় ৪০ জিবিপিএস স্থানান্তর গতি আনতে সাহায্য করেছে। সহজ কথায়, ইউএসবি ৪ হলো থান্ডারবোল্ট ৩-এর রয়্যালটি-মুক্ত সংস্করণ।

আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে, এসব গতি বিষয়ক সংখ্যাগুলোর বেশিরভাগই তাত্ত্বিক। বাস্তবে ব্যবহৃত ক্যাবলের গুণাগুণের ওপর নির্ভর করে ইউএসবির অন-পেপার গতি যে কোনো জায়গায় ৬০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়।

ইউএসবি-সি কি লাইটনিংয়ের চেয়ে ভালো?

হ্যাঁ, ইউএসবি-সি প্রায় সব ক্ষেত্রেই লাইটনিংয়ের চেয়ে ভালো। লাইটনিং কানেক্টরের সর্বোচ্চ ডেটা ট্রান্সফার গতি মাত্র ৪৮০ এমবিপিএস—যা কিনা ২০০০ সালের ইউএসবি ২.০ গতির সমপরিমাণ। অর্থাৎ, আধুনিক আইফোনগুলো এখনো ২০ বছরেরও বেশি পুরোনো প্রযুক্তিতে আটকে আছে।

দ্বিতীয়ত, আধুনিক মান অনুযায়ী চার্জ করার ক্ষেত্রে লাইটনিং কানেক্টর অবিশ্বাস্যভাবে ধীরগতির। ফ্ল্যাগশিপ অ্যান্ড্রয়েড ফোনগুলো বর্তমানে ৪৫ ওয়াট থেকে ১০০ ওয়াট বা তারও বেশি পর্যন্ত যে কোনো জায়গায় যেতে পারে, যেখানে আইফোন কেবল প্রায় ২৫ ওয়াট পর্যন্ত যায়।

এ ক্ষেত্রে না বললেই নয় যে, ইকোসিস্টেমের ওপর নিয়ন্ত্রণের একটি অংশ হারাতে পারে বলে অ্যাপল তার আপাত সুবিধা থাকা স্বত্বেও আইফোনগুলোতে ইউএসবি-সি তে সুইচ করতে অস্বীকার করে। লাইটনিং ক্যাবল এবং অ্যাডাপ্টার বিক্রি করে কোম্পানির লাভের কথা তো বাদই রইল। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন অবশ্য আইফোনগুলোকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইউএসবি-সিতে সুইচ করার জন্য বাধ্যতামূলক করেছে।

 

তথ্যসূত্র: মেইক ইউজ অব

গ্রন্থনা: আসরিফা সুলতানা রিয়া
 

Comments