বাংলাদেশ

নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের জন্য অ্যামনেস্টির ১০ দফা মানবাধিকার সনদ

মানবাধিকার সনদে আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার অনুযায়ী, মানবাধিকার রক্ষার বাধ্যবাধকতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
অ্যামনেস্টির মানবাধিকার সনদ
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সব রাজনৈতিক দলের মূল পরিকল্পনায় যেন মানবাধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়নের বিষয়টি থাকে, তা নিশ্চিত করতে মানবাধিকার সনদে সব দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

৭ জানুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ১০ দফা মানবাধিকার সনদে এ আহ্বান জানায় সংগঠনটি।

গতকাল বৃহস্পতিবার নিজেদের ওয়েবসাইটে এই সনদ প্রকাশ করে তারা।

মানবাধিকার সনদে আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার অনুযায়ী, মানবাধিকার রক্ষার বাধ্যবাধকতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। এসব চুক্তির মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর), ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন ইকোনমিক, সোশ্যাল অ্যান্ড কালচারাল রাইটস (আইসিইএসআর) আছে।

এর পাশাপাশি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সংবিধানে থাকা মানবাধিকার বিষয়ক বাধ্যবাধকতার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।

অ্যামনেস্টির ১০ দফা মানবাধিকার সনদ হচ্ছে-

১. মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সম্মান করুন ও রক্ষা করুন।

২. প্রতিবাদের সুরক্ষা দিন।

৩. রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান করুন।

৪. গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দায়মুক্তির অবসান ঘটান।

৫. নারীর অধিকার রক্ষা করুন।

৬. ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের অধিকার রক্ষা করুন।

৭. মৃত্যুদণ্ড বাতিল করুন।

৮. জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই ব্যবস্থা নিন।

৯. হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনের ক্ষেত্রে দায়মুক্তির অবসান ঘটান।

১০. করপোরেট দায়বদ্ধতা ও শ্রম অধিকার সমুন্নত রাখুন।

অ্যামনেস্টি এই ১০ দফার সবগুলোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেছে এবং ১০টি দফাতেই কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলো হলো-

১. মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা

এই দফায় সুপারিশ করা হয়েছে-

  • মত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার চর্চার জন্য সাইবার নিরাপত্তা আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনে গ্রেপ্তারদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি এবং মামলা বাতিল করা
  • আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ডতে সাইবার নিরাপত্তা আইন সংশোধন করা। এই আইনের ২১, ২৫ ও ২৮ ধারা বাতিল করা।
  • মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধ ধরে জেল ও জরিমানার বিধান বাতিল করা।
  • মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তির গোপনীয়তা, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকারের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রাপ্তি ও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণসহ কার্যকর প্রতিকারের আইন প্রবর্তন করা
  • সাংবাদিকদের হয়রানি করতে ও ভয় দেখাতে আইনের অপব্যবহার বন্ধ করা

২. প্রতিবাদের সুরক্ষা দিন

এই দফায় সুপারিশ করা হয়েছে-

  • জনতার বিক্ষোভ মোকাবিলার ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত শক্তির ব্যবহার বন্ধ করা
  • শান্তিপূর্ণ সমাবেশের সুরক্ষাসহ তা পালনে সহায়তার বাধ্যবাধকতা পূরণ করা। বিধিনিষেধসহ যেকোনো প্রতিক্রিয়া যেন আইনসম্মত, প্রয়োজনীয়, সমানুপাতিক ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয় তা নিশ্চিত করা
  • সব গ্রেপ্তার যেন যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ড অনুযায়ী করা হয় তা নিশ্চিত করা। গ্রেপ্তারের কারণ ও আটক রাখার স্থান জানানো, গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে অবিলম্বে বিচারকের সামনে হাজির করা, আইনি পরামর্শ পাওয়া নিশ্চিত করা ইত্যাদি এর মধ্যে আছে।

৩. রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান

এই দফায় সুপারিশ করা হয়েছে-

  • আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের অধিকার রক্ষা করা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্ত করা এবং দায়ীদের জবাবদিহির মধ্যে আনা।
  • স্বাধীনভাবে পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য ভাসানচরে সাংবাদিক, জাতিসংঘের প্রতিনিধি, দাতা ও মানবিক সংস্থাসহ নাগরিক সমাজের সংগঠন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর যেন অবাধ প্রবেশাধিকার থাকে তা নিশ্চিত করা।
  • রোহিঙ্গা শিশুদের যথাসময়ে উপযুক্ত, মানসম্মত ও আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা
  • রোহিঙ্গারা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন বা লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন, তাদের নিজ দেশসহ এমন কোনো স্থানে স্থানান্তর না করার বিষয়টি নিশ্চিত করা।
  • স্থানান্তর, প্রত্যাবাসন, ত্রাণ, উন্নয়ন সম্পর্কিত বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং তাদের সঙ্গে আলোচনা করা। এই আলোচনায় নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও অন্যান্য প্রান্তিক গোষ্ঠীর সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা।
  • রোহিঙ্গা সংকটের একটি সমন্বিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহযোগিতামূলক সমাধান খুঁজে পেতে প্রতিবেশী দেশ, আঞ্চলিক সংস্থা ও বৈশ্বিক অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা।

৪. গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দায়মুক্তির অবসান ঘটান

এই দফায় সুপারিশ করা হয়েছে-

  • আপত্তি ছাড়াই গুম থেকে সবার সুরক্ষা সনদ অনুমোদন করা এবং গুমকে ফৌজদারি অপরাধ ধরে আইনি ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা।
  • বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক সফরের জন্য গুমবিষয়ক জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপের অনুরোধ গ্রহণ করা।
  • গুমের শিকার ব্যক্তি, তাদের পরিবারের জন্য পূর্ণ ও কার্যকর ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা।
  • র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব), পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অন্যান্য বিভাগের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে, বিশেষত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগের কার্যকর, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা।

৫. নারীর অধিকার রক্ষা

এই দফায় সুপারিশ করা হয়েছে-

  • নারীর প্রতি সহিংসতায় যুক্তদের জবাবদিহি করতে আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা। সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
  • আইনি সহায়তাসহ বিচারিক ও আইনি পরিষেবাগুলোতে নারীদের কার্যকর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, লিঙ্গবৈষম্যের অধিকার কার্যকরভাবে ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ করতে আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং বিচার বিভাগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোতে নারীদের সমান প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দেওয়া।
  • লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকাররা যেন সময়মতো ও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পান তা নিশ্চিত করা এবং তাদের জন্য ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন করা।
  • সারাদেশে আরও আশ্রয়কেন্দ্র ও সেফ হাউস চালু করা ও কার্যকরভাবে তথ্য প্রচার করা।

৬. ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের অধিকার রক্ষা

এই দফায় সুপারিশ করা হয়েছে-

  • সংসদে উত্থাপিত বৈষম্যবিরোধী বিল ২০২২ আইনে পরিণত করা।
  • পার্বত্য চুক্তিতে উল্লেখ করা মানবাধিকার সংস্কার সম্পূর্ণভাবে কার্যকর করা।
  • ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর সমতা অর্জন, মানবাধিকারসহ মৌলিক স্বাধীনতার পূর্ণ ও সমান উপভোগ নিশ্চিতকরণে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ
  • সংখ্যালঘুদের জন্য সমতা সংক্রান্ত সাংবিধানিক নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা এবং সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা।

৭. মৃত্যুদণ্ড বাতিল

এই দফায় সুপারিশ করা হয়েছে-

  • মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাতিল করা ও মৃত্যুদণ্ড রহিত করার লক্ষ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ওপর সরকারি স্থগিতাদেশ দেওয়া।
  • মৃত্যুদণ্ড বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও মানদণ্ড নির্ধারিত বিধিনিষেধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় আইনে পরিবর্তন আনা।
  • মৃত্যুদণ্ড অপরাধের অনন্য প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে এমন কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ না থাকার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং এর সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি জড়িত তা বলা

৮. জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই পদক্ষেপ

এই দফায় সুপারিশ করা হয়েছে-

  • জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়নে উপযুক্ত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
  • জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষ বা জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা এবং তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা। স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি প্রশমিত করা।
  • বেশি কার্বন নির্গমনকারী দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় আলোচনায় বাংলাদেশের জলবায়ু প্রভাবকে অগ্রাধিকার দেওয়া

৯. হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনের ক্ষেত্রে দায়মুক্তির অবসান

এই দফায় সুপারিশ করা হয়েছে-

  • হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনের ঘটনায় পুঙ্খানুপুঙ্খ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত পরিচালনা করা। মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
  • রাষ্ট্র থেকে ভুক্তভোগীদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়া। এর মধ্যে আর্থিক ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসাসেবা ও পুনর্বাসন অন্তর্ভুক্ত।
  • ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটসের (আইসিসিপিআর) ঐচ্ছিক প্রোটোকল অনুমোদন করা এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে কনভেনশনের ২২ অনুচ্ছেদের অধীনে ঘোষণা জারি করা।

১০. করপোরেট দায়বদ্ধতা ও শ্রম অধিকার সমুন্নত রাখা

এই দফায় সুপারিশ করা হয়েছে-

  • বাংলাদেশ শ্রম আইনে শিশুর সংজ্ঞা সংশোধন করা। এটিকে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ ও বাংলাদেশের শিশু আইন ২০১৩ এর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করা। শিশুশ্রমিক নিয়োগের জন্য করপোরেশনগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা।
  • শ্রমিকদের বিক্ষোভে সহিংস দমন-পীড়ন বন্ধ করা, শ্রমিক নেতাসহ অন্য বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
  • শ্রমিকরা যেন সংগঠন করার স্বাধীনতার অধিকার চর্চা করতে পারেন, কারখানা পর্যায়ে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও তাতে যোগদানের মাধ্যমে যাতে সম্মিলিত দর-কষাকষি করতে পারেন, সরকারি কর্তৃপক্ষ ও কারখানার মালিকদের সঙ্গে সংলাপ করতে পারেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশসহ ধর্মঘটের স্বাধীনতার অধিকার ভোগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা।
  • পোশাক কারখানার শ্রমিকরা যেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মানদণ্ডে অনুযায়ী পর্যাপ্ত মজুরি পান নিশ্চিত করা।
  • বাংলাদেশ শ্রম আইনের পঞ্চম তফসিল সংশোধন
  • কর্মক্ষেত্রে মৃত্যু ও আঘাতের বিষয়ে জাতীয় ভাণ্ডার চালু করা

Comments