রাজনীতি

আমরা কোনো বিরোধী দলকে হয়রানি করছি না: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

‘মানবাধিকারের দিক থেকে বাংলাদেশ একটি আদর্শ দেশ। অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে এটা একটা আদর্শ দেশ।’
আমরা কোনো বিরোধী দলকে হয়রানি করছি না: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন | ছবি: টেলিভিশন থেকে নেওয়া

কোনো বিরোধী দলকে হয়রানি করা হচ্ছে জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, যারা সন্ত্রাসী তাদের শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে।

আজ মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

মানবাধিকার সংগঠন রবার্ট এফ কেনেডি হিউম্যান রাইটস (আরএফকেএইচআর) আজ তাদের ওয়েবসাইটে বিবৃতি প্রকাশ করে বলেছে, নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধীদের নির্যাতন করা হচ্ছে, জেলে দেওয়া হচ্ছে—এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মোমেন বলেন, 'আমরা কোনো বিরোধী দলকে হয়রানি করছি না, কোনো নির্যাতন করি নাই। যারা সন্ত্রাসী, যারা মানুষের বাড়ি-ঘর জ্বালায়, জনগণের সম্পত্তি; বিশেষ করে বাস-ট্রেন-ট্রাক জ্বালানোর জন্য পাওয়া যাচ্ছে, জীবিত মানুষকে মারছে, তাদের আমরা শাস্তির আওতায় আনছি। আমরা কোনো রাজনৈতিক কারণে কাউকে হয়রানি করছি না। আমরা যাদের গ্রেপ্তার করছি তারা হচ্ছে সন্ত্রাসী।'

'আমাদের দেশের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা। আমরা আহ্বান করবো; যারা সন্ত্রাসী কাজে লিপ্ত আছেন, তারা সেটা পরিহার করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবেন,' বলেন মোমেন।

আরএফকেএইচআর-এর বিবৃতিতে মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, নির্বাচনের ব্যাপারেও তারা কথা বলেছেন—এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'আমি বিবৃতিটি দেখিনি। তাই বেশি কথা বলতে পারব না। মানবাধিকারের দিক থেকে বাংলাদেশ একটি আদর্শ দেশ। অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে এটা একটা আদর্শ দেশ। গাজার দিকে তাকান; কী ধরনের হিউম্যান রাইটস হচ্ছে? অন্যান্য উন্নত দেশেও মলে-ক্লাবে-স্কুলে মেরে ফেলে। আমরা তো সেই অবস্থায় না। আমাদের দেশে কোনো মলে আক্রমণ নাই, মসজিদে আক্রমণ নাই, ক্লাবে আক্রমণ করে মেরে ফেলে না। বিনা বিচারে কাউরে মারে না।

'আমরা সেই দেশ, যে দেশে ৩০ লাখ লোক প্রাণ দিয়েছে গণতন্ত্রের জন্য, মানবাধিকারের জন্য। আমরা সেই উত্তরাধিকার। আমাদের কাছ থেকে অন্যরা হিউম্যান রাইটস-জাস্টিস সম্পর্কে লেসন নেওয়া দরকার,' যোগ করেন মোমেন।

আপনি পাঁচ বছর ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, এর মধ্যে আমরা অনেক সাফল্যের কথা জানি, ব্যর্থতা কী জানতে চাইলে মোমেন বলেন, 'সাফল্যের কথা বলতে পারি। ব্যর্থতা কী আমি জানি না।'

রোহিঙ্গা সংকটের উল্লেখ করলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'রোহিঙ্গা এখনো যায়নি, সেটার অগ্রগতি খুব ভালো। আমরা আশা করি, যে কোনো সময় রোহিঙ্গা ফেরত যাবে। তবে রোহিঙ্গা যে বাংলাদেশ চাইলে বা মিয়ানমার চাইলেই ফেরত যাবে তেমন না। অন্যান্য বহুবিদ প্রতিষ্ঠান...তারা চায় না রোহিঙ্গা ফেরত যাক। এটা বেশ সমস্যা আছে। আমার ধারণা, তারা চলে যাবে।'

চীনের মধ্যস্থতায় আমরা ভেবেছিলাম নির্বাচনের আগেই কিছু রোহিঙ্গা ফিরে যাবে কিন্তু মিয়ানমারের পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো—এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'পাইলট প্রজেক্টে আমরা অগ্রসর হয়েছিলাম। মিয়ানমার মোটামুটিভাবে রাজি হয়েছিল ওদের নিয়ে যাবে। মিয়ানমারের কয়েকজন কর্মচারী বাংলাদেশে এসেছেন। ওদের সঙ্গে কয়েকবার আলাপ করেছেন এবং রোহিঙ্গারা সবাই ওই দেশে যেতে চায়। একটা পর্যায়ে মোটামুটি চলে যাওয়ার উদ্যোগ হয়। তখন কিছু বিদেশি শক্তি আমাদের বললো, ওখানে পাঠায়েন না। বরং তাদের আমরা নিয়ে যাব কিন্তু তারা কেউ নেয়-টেয় নাই; অল্প কয়েকজন নিয়েছে। আর তারা বললো যে, আপনার দেশে ১৭০ মিলিয়ন লোক আছে, আরও এক মিলিয়ন নিলে আপনাদের কোনো ঝামেলা হবে না। ওদের বরং স্কিল ট্রেনিং দিয়ে রেখে দেন, দে উইল বি...এ জন্য এটার ধীরগতি হলো। আর এখন তো মিয়ানমারে কিছুটা অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। সুতরাং আমরা জানি না।'

গত পাঁচ বছরের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কে একটা অস্বস্তির জায়গা তৈরি হয়েছে, এটা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা নাকি অন্য কোনো কারণ আছে জানতে চাইলে মোমেন বলেন, 'আমাদের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর। আমি ঘানাতে ছিলাম গত সপ্তাহে। সেখানে মার্কিন অনেক প্রতিনিধি দল, একজন কেবিনেট মেম্বার, পিআর টু দ্য ইউএন, অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট, ডেপুটি অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট; সবাই আমার সঙ্গে সাক্ষাত করেন এবং তারা আমাদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। আমরা একটা প্রোগ্রাম যৌথভাবে আয়োজন করি।'

গণমাধ্যমকর্মীর উদ্দেশে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'যেগুলো নিয়ে আপনি অস্বস্তির কথা বললেন, তারা সেগুলোর কোনোটাই তোলেন নাই। আমি মনে করি, আমরা আগামীতে আমাদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে।'

মোমেন আরও বলেন, 'তারা যেটা চায়, আমরাও সেটা চাই। আমরা চাই, দেশে একটা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করব। তারাও চায় দেশে একটা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। তার সঙ্গে তারা যোগ করেছে অহিংস। আমরা বলেছি, আমরা নিশ্চয়তা দিতে পারব না। কারণ এটা আমাদের সংস্কৃতির ওপর নির্ভর করবে। এটা নির্ভর করবে সব দল ও মতের নেতৃত্বের আন্তরিকতা ও ঐকান্তিক ইচ্ছার ওপর। তারা সেটা বোঝে। সুতরাং তাদের সঙ্গে আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক।

'তারা বন্ধু বলেই আমাদের উপদেশ দেয় এবং উপদেশ যেটা ভালো হয়, আমরা গ্রহণ করি। যেটা বাস্তববাদী না সেটা আমরা গ্রহণ করি না। তারা সেটার জন্য রাগও করে না। অমুক স্যাংশন হচ্ছে, অমুক স্যাংশন হচ্ছে—এগুলো আপনারা বলেন। ওরা আমাদের এসব বলে-টলে না।'

কেনা-বেচার ব্যাপারে আপনি বলেছিলেন, ওরা বিক্রি করতে চায়, আমরা নিতে চাই না—এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'সব রাষ্ট্র, আমাদের রাষ্ট্রদূতরাও বিভিন্ন দেশে যে আমার এই জিনিসটা নাও। আমরা কম বলি কিন্তু বড় বড় বড়লোকের দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরা সব সময় তার দেশে অধিক চুক্তি দেওয়ার জন্য, তার দেশের জিনিস কেনার জন্য পীড়াপীড়ি করে। রীতিমত পীড়াপীড়ি করে। এটা তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের অংশ। আমরা কিছু মনে করি না।'

পশ্চিমারা যাদের বিরোধী দল বলছে, আপনি তাদের বলছেন সন্ত্রাসী—গণমাধ্যমকর্মীর এমন বক্তব্যের জবাবে মোমেন বলেন, 'না, যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে তাদের আমি সন্ত্রাসী বলছি।'

তিনি আরও বলেন, 'যাদের আমরা ধরেছি, আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যাদের ধরা হয়েছে তাদের ভিডিও ফুটেজ থেকে সন্ত্রাসের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পেয়েছে বলেই ধরেছে। আমাদের কোনো রাজনৈতিক নেতাকে ধরার কোনো ইচ্ছা নেই।'

সংসদে যারা বিরোধী দল, তাদের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তাহলে নির্বাচনটা কোথায় হচ্ছে জানতে চাইলে গণমাধ্যমকর্মীর উদ্দেশে মোমেন বলেন, 'আমি এটা বলতে পারব না; আসন ভাগাভাগি...আমি শুনছি তারা কনটেস্ট, আমরাও কনটেস্ট। এখন আপনি হয়তো বেশি জানেন। তার জন্য এসব বলাবলি করছেন।

'আমি আজকেও দেখলাম টিভি স্ক্রলে তারা (জাতীয় পার্টি) বলছে সর্ব আসনে কনটেস্ট করবে। আপনি যদি আরও কিছু বেশি বোঝেন, সে জন্য বলছেন। আমি এগুলো জানি না। আমি মানুষের হৃদয় পড়তে পারি না,' যোগ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, মার্কিন রাষ্ট্রদূত নির্বাচনের আগে বোয়িং কেনার ব্যাপারে বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছেন—এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'নির্বাচনের আগে না, অনেক আগে থেকে মার্কিন সরকার বিক্রি করতে...আমরা কিছু কিনতে চাচ্ছি কারণ আমাদের তো যাত্রী অনেক বেশি। আমাদের টাকারও সমস্যা, তারা প্রস্তাব দিয়েছে।'

'টাকা-পয়সা হলে আরও উড়োজাহাজ কেনা হবে,' বলে জানান মোমেন।

কেনা-বেচার সঙ্গে আমেরিকার চাপ; ভিসা নিষেধাজ্ঞার কোনো সম্পর্ক আছে কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'কেনা-বেচাটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সব সময়ই আমাদের দেয়। নির্বাচনের সময় মনে করে আপনি একটু দুর্বল। দেখেন না, দেশের বিভিন্ন সংস্থা; বেতন বাড়াও, অমুক করো—নির্বাচনের সময় বেশি বেশি বলে কিন্তু ওদেরটা নির্বাচনের সময় করলে লাভ নাই। কারণ নির্বাচনের সময় তাদের ভোট আমার দরকার নাই। যাদের ভোট, ওদের আমরা কিছু পাত্তা দেই।

'চাপ না, অনুরোধ করে। অনুরোধকে আমরা চাপ মনে করব কেন! আমরাও তো তাদের বলি এই করো, সেই করো, এটা কি চাপ? না। তারা এখন বলছে, আমরা (বোয়িং কেনার) পয়সা কমিয়ে দেবো। এটা ভালো,' বলেন মোমেন।

সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে যে, আমেরিকা চায় না এই সরকার ক্ষমতায় থাকুক; সেন্টমার্টিন দ্বীপ চায়—এ ব্যাপারে মোমেন বলেন, 'ওগুলো আমি জানি না।'

Comments