বিএনপি কেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করতে চায় না

সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদ বলছে, ‘জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।’ অর্থাৎ সমাবেশ ও শোভাযাত্রা করার অধিকার দলমত নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের আছে। কিন্তু সেটি শর্তসাপেক্ষ। অর্থাৎ ‘যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে’।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। স্টার ফাইল ছবি

সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদ বলছে, 'জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।' অর্থাৎ সমাবেশ ও শোভাযাত্রা করার অধিকার দলমত নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের আছে। কিন্তু সেটি শর্তসাপেক্ষ। অর্থাৎ 'যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে'।

শুধু এই বিধানটি নয়, সব সাংবিধানিক অধিকারই এরকম শর্তসাপেক্ষ। অর্থাৎ স্বাধীনতা কখনো নিঃশর্ত বা অ্যাবসলিউট হয় না। কেননা তাতে নৈরাজ্য হয়। যেমন: বাকস্বাধীনতার প্রসঙ্গেও সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের নিশ্চয়তা দান করা হইলো।' তার মানে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বিষয়ে কেউ কথা বললে সংবিধান তাকে সুরক্ষা দেবে না। কারণ তার বাকস্বাধীনতাটি শর্তসাপেক্ষ।

মুশকিল হলো, জনসভা বা সমাবেশ ও মিছিল কিংবা শোভাযাত্রার ক্ষেত্রে যে 'যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধের' কথা বলা হয়েছে, সেটি সব সরকারের আমলেই দেখা গেছে তাদের বিরোধী মতের দলগুলোর জন্য একরকম এবং সরকারি দলের জন্য অন্যরকম। অর্থাৎ সংবিধানের এই 'যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধের' প্রসঙ্গটি বিরোধী মতের দল ও সংগঠনের বেলায় যতটা সক্রিয় থাকে, সরকারি দলের বা সরকারের অনুগত দল ও সংগঠনের বেলায় ততটা সক্রিয় থাকে না। যে কারণে দেখা যায়, বিরোধী দলগুলো যখনই কোথাও সমাবেশ করতে চায়, তাদের পছন্দের জায়গায় খুব সহজে অনুমতি মেলে না। আবার সরকারি দল ও সরকারের অনুগত ও সমর্থনপুষ্ট দল বা সংগঠনের শোভাযাত্রায় পুলিশ যে ভূমিকা রাখে, বিরোধী দল ও মতের মিছিল ও শোভাযাত্রায় পুলিশের ভূমিকা সেরকম নয়। অর্থাৎ সংবিধানের বিধানটি দলমত নির্বিশেষে সবার জন্য প্রযোজ্য হওয়ার কথা থাকলেও রাষ্ট্র বা সরকার সেটি প্রয়োগ করে নিজের সুবিধা অনুযায়ী। দেশে যে একটি সুস্থ, সহনশীল ও সৌহার্দপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে ওঠেনি, তার পেছনে মূল কারণ সংবিধান ও আইনকে নিজের সুবিধা মতো প্রয়োগের এই প্রবণতা।

এই কথাগুলোর বলার কারণ আগামী ১০ ডিসেম্বর রাজধানীতে বিএনপির সমাবেশের ভেন্যু নিয়ে জটিলতা। তারা চাচ্ছে বিভাগীয় শহরে তাদের সমাবেশের সমাপনী কর্মসূচিটা নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় করবে। কিন্তু সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেই অনুমতি দিচ্ছে না।

আমাদের সরকার, সরকারি দল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একাকার হয়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রগুলোকে আর আলাদা করা যাচ্ছে না। দেশে যে সহনশীল ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে ওঠেনি, তার পেছনে এটিও একটি কারণ। অর্থাৎ সরকারে যে দলই থাকুক না কেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করবে—সেটি এখনও প্রত্যাশার ভেতরে রয়ে গেছে। রয়ে গেছে বলেই সরকারি দল যা চাইবে সেটিই সরকারের চাওয়া এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেই চাওয়ার বাইরে কতটুকু যেতে পারে— সেটি বিরাট প্রশ্ন।

বিএনপির এই সমাবেশকে ঘিরে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসছে। যেমন:

১. বিএনপি কেন নয়াপল্টনেই সমাবেশ করতে চায়?

২. সোহরাওয়ার্দী উদ্যান রাজধানীর ভেতরে এবং একটি ঐতিহাসিক স্থান ও বিরাট মাঠ হওয়ার পরেও তারা কেন সেখানে যেতে চায় না?

৩. আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি শেষ পর্যন্ত নয়াপল্টনে সমাবেশের অনুমতি না দেয় তখন বিএনপি কী করবে? নয়াপল্টনেই সমাবেশ করবে? তখন কী পরিস্থিতি হবে? বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, 'আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নয়াপল্টনেই ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমরা অন্য কোথাও সমাবেশের কথা ভাবছি না। সমাবেশ পল্টনেই করব।'

৪. বিএনপি যেহেতু আগেও নয়াপল্টনে সমাবেশ করেছে, ফলে ১০ ডিসেম্বর এখানে তাদের সমাবেশের অনুমতি দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সরকারের অসুবিধা কোথায়? রাস্তায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হবে? গুরুত্বপূর্ণ সড়ক আটকে সমাবেশ কিংবা মিছিল করার ঘটনা নতুন নয়। ক্ষমতাসীন দলও এটা করে। তাহলে বিএনপি যদি ১০ তারিখ তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করতে চায় তাতে অসুবিধা কী?

৫. আগামী ১০ ডিসেম্বর বিএনপি যদি সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করে, তাহলে সেই দাবির সপক্ষে তারা কি জনমত গড়ে তুলতে পারবে বা তারা কি সত্যিই সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করতে পারবে কিংবা নির্বাচন নিয়ে তাদের প্রধান যে দাবি নির্দলীয় সরকার— সেই বিধান ফিরিয়ে আনতে সংবিধান সংশোধনে সরকারকে বাধ্য করতে পারবে? যদি না পারে তাহলে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী?

৬. বিএনপি মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভাষ্য মতে যদি সত্যিই আগামী ১০ তারিখ সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন শুরু হয়, তাদের বিএনপির শরিক এবং সরকারবিরোধী অন্যান্য দলগুলোর ভূমিকা কী হবে? তারা সরকারি দল এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে কতক্ষণ দাঁড়াতে পারবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর চট করে দেওয়া কঠিন। তবে বিএনপি কেন নয়াপল্টনেই সমাবেশ করতে চায় তার কিছু ব্যাখ্যা দলের তরফে দেওয়া হয়েছে, যেমন:

১. বিএনপি নেতা সেলিমা রহমান বলেছেন, 'আমাদের তো কোনোদিনই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান দেয় না। আমরা সব সময় পার্টি অফিসের সামনেই সমাবেশ করি, এটা না দেওয়ার কিছু নেই।' সেলিমা রহমান জানান, তারা নিজেদের সুবিধার জন্য দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করতে চান। প্রশ্ন হলো, সুবিধাটা কী? নয়াপল্টন এলাকাকে তারা নিরাপদ মনে করছে? এখানে দলের কার্যালয় বলে তারা পুরো সমাবেশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারবে এবং দলের নেতারা কার্যালয়ের ভেতরে সার্বক্ষণিক অবস্থান করতে পারবেন, এই সুবিধার জন্য?

২. বিএনপি বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় সব সময় ছাত্রলীগের সরব উপস্থিতি থাকে। বিএনপি নেতা-কর্মীরা সেখানে নানাভাবে বাধা পেতে পারেন। তাছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কয়েকটি নতুন স্থাপনা তৈরি হয়েছে। ফলে সমাবেশের স্থানও অনেক ছোট হয়ে গেছে।

৩. বিভাগীয় শহরগুলোতে এতদিন বিএনপির যে সমাবেশ হয়েছে, সেখানে সরকার পরোক্ষভাবে চাপ দিয়ে গণপরিবহন বন্ধ করে সমাবেশ ব্যাহত করার চেষ্টা করলেও আওয়ামী লীগ পুরো শক্তি নিয়ে মাঠ দখল করেনি। কিন্তু ঢাকায় সেই ছাড় তারা দেবে না। বরং ঢাকার সমাবেশে যাতে খুব বেশি মানুষ জড়ো হতে না পারেন এবং সমাবেশটি যাতে সফল না হয়, সরকার ও সরকারি দলের তরফে সেই চেষ্টা থাকবে। কারণ আন্দোলনের মূল কেন্দ্র ঢাকা। সুতরাং বিভাগীয় পর্যায়ের সমাবেশের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন পরে বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, সরকার সেটি ভেঙে দিতে চাইবে।

৪. বিএনপি এই মুহূর্তে সংঘর্ষে জড়াতে চায় না। আবার ঢাকার সমাবেশ সফল করার ব্যাপারেও তারা চাপে আছে। কেননা এখান থেকেই তারা সরকারের পদত্যাগের একদফা দাবি আদায়ের ঘোষণা দিতে চায়। সুতরাং এই সমাবেশ ব্যর্থ করে দিতে সরকার ও সরকারি দল কঠোর অবস্থানে থাকবে। ফলে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের আশেপাশে সমাবেশ করতে পারলে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুবিধা হবে।

শেষ পর্যন্ত বিএনপির এই সমাবেশ নয়াপল্টনে নাকি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হবে, সেটি এখনই বলা মুশকিল। কারণ, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। তবে জনমনে যে প্রশ্নটি আছে তা হলো, যেহেতু এই সমাবেশে সরকারের পদত্যাগের একদফা দাবি জানাবে বলে ঘোষণা দিয়েছে, ফলে এরকম একটা 'নো রিটার্ন' পয়েন্টে যাওয়ার পরে আর সেখান থেকে ফেরা যাবে না বলে তারা কি সমাবেশের পরেও অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে চায়? তারচেয়েও বড় প্রশ্ন, এই সমাবেশে যোগ দিতে সারা দেশ থেকে বিএনপির নেতা-কর্মীরা কি নির্বিঘ্নে ঢাকায় আসতে পারবেন? ৮ তারিখ থেকে কি সারা দেশ থেকে ঢাকামুখী গণপরিবহন চলবে নাকি ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে?
 

আমীন আল রশীদ: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন

(দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নেবে না।)

Comments