কোটাব্যবস্থায় মেধাবীরাই হয়ে গেছে সবচেয়ে অনগ্রসর জনগোষ্ঠী

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা কখনোই কোটাব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বাতিল চাননি—না ২০১৮ সালে চেয়েছিলেন, না এখন চাচ্ছেন। বরং সমাজের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করে একটা ন্যূনতম পরিমাণ কোটা রাখার পক্ষেই তারা দাবি জানিয়ে এসেছেন।

গত ছয় বছরে—২০১৮ থেকে ২০২৪—কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে দুবার বেশ বড় ছাত্র আন্দোলনের সাক্ষী হলো বাংলাদেশ। যদিও ব্যবধান ছয় বছরের, তবে শিক্ষার্থীদের দাবি একই।

২০১৮ সালে প্রথম দাবিটি ছিল বিদ্যমান ৫৬ শতাংশ কোটা ব্যবস্থার সংস্কার। সেই সময় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মুক্তিযোদ্ধা কোটা, যা মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও নাতি-নাতনীদের জন্য সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ সংরক্ষণ করত।

কোটা সংস্কারের সমর্থকরা যুক্তি দেন, এটি বৈষম্যমূলক এবং মেধার ভিত্তিতে সুযোগ প্রদানের নীতির পরিপন্থী।

সার্বিক দিক বিবেচনায় সরকারি চাকরিতে কোটা কমিয়ে তা ১০ শতাংশে নামানোর দাবিতে ২০১৮ সালে বিক্ষোভে নেমেছিল সারা দেশের লাখো শিক্ষার্থী।

অবশেষে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী চাকরিতে সব ধরনের কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন।

সে অনুযায়ী চাকরিতে (৯ম থেকে ১৩তম গ্রেড) সব ধরনের কোটা বাতিল করে প্রজ্ঞাপন দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

সম্প্রতি হাইকোর্ট একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের সেই প্রজ্ঞাপন অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়। ফলশ্রুতিতে আবারও আন্দোলনে নেমেছে শিক্ষার্থীরা।

এই ইস্যুতে মন্তব্য করতে গিয়ে গত ৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রী বলছেন, 'আমরা দেখছি যে কোটা আন্দোলন; আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য যে কোটা, সেটা বাতিল করতে হবে, নারীদের কোটা বাতিল করতে হবে, এ ধরনের নানা কথা শোনা যাচ্ছে। সেটা একবার বাতিল করা হয়েছিল, কিন্তু ফলাফলটা কী? পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরীক্ষার হিসাব যদি দেখা যায়, তাহলে দেখা যেত আগে কোটা থাকাতে মেয়েরা যে সংখ্যায় সুযোগ পেত, সে সুযোগ কিন্তু এই গত কয় বছরে পায়নি। এটা হলো বাস্তবতা। এমনকি অনেক অনেক জেলা, প্রত্যন্ত অঞ্চল, সেই অঞ্চলের মানুষগুলো কিন্তু বঞ্চিত থেকে গেছে। তারাও চাকরি পাচ্ছে না।'

এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে কোটা বাতিল হওয়ার ফলে চাকরিব্যবস্থায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে একটা বড় প্রভাব পড়েছে উপরে উল্লেখিত জনগোষ্ঠীর ওপরে।

এখানে দুটি বিষয় উল্লেখযোগ্য—

১. আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা কখনোই কোটাব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বাতিল চাননি—না ২০১৮ সালে চেয়েছিলেন, না এখন চাচ্ছেন।

বরং সমাজের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করে একটা ন্যূনতম পরিমাণ কোটা রাখার পক্ষেই তারা দাবি জানিয়ে এসেছেন। দাবি ছিল, কোটা ১০ শতাংশ রাখার। আন্দোলনকারীদের অনেকে সেটা ১৫ শতাংশ হলেও নাখোশ হতেন না।

অথচ সেসময় সরকারই আগ বাড়িয়ে সব ধরনের কোটা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

কাজেই এটা বলা অনুচিত হবে যে শিক্ষার্থীদের কারণেই উল্লিখিত জনগোষ্ঠী সামনে এগুতে পারছে না, সমাজে পিছিয়ে পড়ছে।

২. এ কথা সত্যি যে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে কোটার প্রয়োজন ছিল। আর তাই ১৯৭২ সাল থেকে ‍দেশের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয়। সেসময় সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়োগ হতো কোটায়। যা পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে কমিয়ে ১৯৮৫ সালে ৫৫ শতাংশে নামানো হয়। পরে যেটা ৫৬ শতাংশ করা হয়।

অর্থাৎ স্বাধীনতার প্রথম ১৪ বছরেই কোটার পরিমাণ কয়েক ধাপে সর্বমোট ২৪ শতাংশ কমানো হয়েছিল।

এই কোটা ব্যবস্থায় নারীদের ১০ শতাংশ, জেলায় ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য পাঁচ শতাংশ, প্রতিবন্ধীদের জন্য এক শতাংশ বরাদ্দ। আর সবচেয়ে বেশি ৩০ শতাংশ বরাদ্দ ছিল মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য।

প্রশ্ন হলো, স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর এসেও দেশে অনগ্রসর জনগোষ্ঠী বলতে আমরা কাদের বুঝি? এর সংজ্ঞাটা কী?

২০১৮ সালে এই ৫৬ শতাংশ কোটাব্যবস্থা বাতিল করায় ঠিক কোন কোন জনগোষ্ঠী পিছিয়ে পড়েছে? কারা তারা?

উদাহরণস্বরূপ বলা হয়েছে, বিসিএসে মেয়েদের সুযোগ কমেছে। অর্থাৎ মেয়েরা সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কোটা না থাকায়। একইসঙ্গে বিভিন্ন জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও বঞ্চিত হচ্ছে চাকরি থেকে।

বাস্তবতা হলো দেশের সরকারি চাকরি ব্যবস্থায় সিংহভাগই যেহেতু এতদিন কোটার ভিত্তিতে নিয়োগ হতো, কাজেই কোটা বাতিল হলে তারা এই বিশেষ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে—কার্যত তার প্রভাব পড়বেই।

নারীদের ১০ শতাংশ বলি কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের ১০ শতাংশ মানুষের কথা বলি—যারা নিজ নিজ জায়গায় অনেকটাই পিছিয়ে—কোটা বাতিল হওয়ায় তারা চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে একটা বাঁধার সম্মুখীন হচ্ছেন। এটা স্বাভাবিক, অনুমেয়। সেকারণে তাদের জন্য ন্যূনতম কোটার ব্যবস্থা রাখা জরুরি, যা আন্দোলনকারীরাও স্বীকার করছেন।

কিন্তু মোট কোটার ৫৬ শতাংশের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কিংবা নাতি-নাতনিদের জন্য রাখা সর্বোচ্চ যে ৩০ শতাংশ বরাদ্দ, এটা বাতিল হলে তারা কোন ধরনের বাধার সম্মুখীন হচ্ছে?

তবে কি তারাও সমাজের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অংশ?

এখন প্রশ্ন, আদতে কারা পিছিয়ে পড়ছে কোটা বাতিলের কারণে? স্বাধীনতার ৫৩ বছর ধরে কোটাব্যবস্থার মতো বিশেষ সুবিধা নিয়ে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্ম? নাকি কোটাব্যবস্থা থাকার কারণে দিনের পর দিন পরিশ্রম সত্ত্বেও সরকারি চাকরিতে মেধাভিত্তিক নিয়োগের পূর্ণাঙ্গ সুযোগ না পেয়ে পিছিয়ে পড়া লাখ লাখ মেধাবী শিক্ষার্থী?

স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরে এসেও কোটাব্যবস্থা এভাবে চলমান থাকলে এমন সময় দূরে নয় যে মেধাবীরাই হয়ে উঠবে সমাজের সবচেয়ে অনগ্রসর জনগোষ্ঠী।

[email protected]

Comments