বিশ্বের যে ৯ স্থানে হাঙরের আক্রমণ সবচেয়ে বেশি

বিশ্বের কিছু কিছু জায়গায় হাঙরের আক্রমণের হার তুলনামূলক অনেক বেশি এবং এসব জায়গায় আক্রমণের হার প্রতি বছরই বাড়ছে।
ছবি: রয়টার্স

বছরের এই সময়টায় বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় মানুষের ওপর হাঙরের আক্রমণের খবর পাওয়া যায়। জুলাই মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের উপকূলে ২ দিনের ব্যবধানে হাঙরের ৫টি আক্রমণের ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ নজরদারি বাড়িয়েছে। নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডের পানিতে সম্প্রতি ৫০টি হাঙরের উপস্থিতি দেখা গেছে। ফ্লোরিডার উপকূলেও মানুষের খুব কাছ দিয়ে হাঙরকে সাঁতার কাটতে দেখা গেছে।

হাঙরের আক্রমণের খবর মাঝে মাঝে সংবাদমাধ্যমে আসলেও এই সামুদ্রিক প্রাণীর আক্রমণের হার খুবই কম। বিশ্বজুড়ে হাঙরের আক্রমণের তালিকা তৈরি করা ইন্টারন্যাশনাল শার্ক অ্যাটাক ফাইলের (আইএসএএফ) তথ্য অনুসারে, প্রতি ৪০ লাখে একজন মানুষ হাঙরের আক্রমণের শিকার হয়।

বিশ্বের ৮০০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে গত বছর বিনা প্ররোচনায় হাঙরের আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে মাত্র ৫৭টি, যার মধ্যে ৫টি ছিল প্রাণঘাতী। যাইহোক, বিশ্বের কিছু কিছু জায়গায় হাঙরের আক্রমণের হার তুলনামূলক অনেক বেশি এবং এসব জায়গায় আক্রমণের হার প্রতি বছরই বাড়ছে।

২০১২-২০২১ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশ্বের এমন কিছু জায়গার কথা জানা যাক, যেখানে হাঙরের আক্রমণের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে।

 

ফ্লোরিডা, যুক্তরাষ্ট্র (২৫৯টি আক্রমণ)

আইএসএএফের তথ্য অনুসারে, সেপ্টেম্বর মাসে বিকেল ২-৩টার মধ্যে ফ্লোরিডার ভলুসিয়া কাউন্টিতে সার্ফিং করতে গেলে হাঙরের কামড় খাওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। বিশ্ববিখ্যাত ডেয়টোনা সৈকতের অবস্থান এই কাউন্টিতেই। হাঙরের আক্রমণের বেশি ঝুঁকির কারণে এই সৈতকটি 'বিশ্বের হাঙরের আক্রমণের রাজধানী' নামে পরিচিত। শহরের আরও দক্ষিণে অবস্থিত নিউ স্মিরনা সৈকত হাঙরদের অবাধ বিচরণক্ষেত্র।

অস্ট্রেলিয়া (১৪৩টি আক্রমণ)

২০২২ সালে এখানে বিনা প্ররোচনায় হাঙরের আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে ৯টি। ৪টি নিউ সাউথ ওয়েলসে, ৪টি ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ায় এবং একটি ভিক্টোরিয়ায়।

সাধারণত পানির ওপর ভাসমান সার্ফ বোর্ড, ওয়াটার স্কি বা অন্য কোনো ভাসমান বস্তুর ওপর থাকার সময় হাঙরের আক্রমণের শিকার হন ভুক্তভোগীরা। ফ্লোরিডা প্রোগ্রাম ফর শার্ক রিসার্চের পরিচালক গ্যাভিন নায়লার বলেন, 'পানির ওপর আঘাত করলে যে শব্দ তৈরি হয়, তা তৈরি থেকে বিরত থাকুন।'

ছবি: রয়টার্স

হাওয়াই, যুক্তরাষ্ট্র (৭৬টি আক্রমণ)

হাওয়াই রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপ মাউই হাঙরের আক্রমণের ক্ষেত্রে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা। এই দ্বীপটির পানির নিচের ভূখণ্ডের ব্যতিক্রমী বিস্তৃতির কারণে এটি টাইগার হাঙরের জন্য আকর্ষণীয়। মাউই উপকূলের ঢাল (স্লোপ) অন্যান্য উপকূল থেকে ভিন্ন হওয়ায় এখানে প্রচুর পরিমাণে মাছ পাওয়া যায়। ফলে হাঙরদের আনাগোনাও এখানে বেশি থাকে।

হাঙরের বিচরণক্ষেত্রে মাছ ধরাটাও খুব ঝুঁকিপূর্ণ। ২০২৩ সালে হাওয়াইয়ে মাছ ধরার সময় একজন হাঙরের আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন।

দক্ষিণ আফ্রিকা (২৯টি আক্রমণ)

২০১২-২০২১ সালের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকায় বিনা প্ররোচনায় হাঙরের আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে ২৯টি, যার মধ্যে ৬টি ছিল প্রাণঘাতী। সর্বশেষ আক্রমণের ঘটনাটি ঘটেছে ওয়েস্টার্ন কেপের গ্যানসবাই উপকূলে। এই উপকূল থেকে ঐতিহাসিকভাবে সাদা হাঙর দেখা যেত। তবে সম্প্রতি আরেক সামুদ্রিক প্রাণী ওরকার কারণে এই উপকূলে হাঙররা আর অবাধে বিচরণ করতে পারছে না।

সাউথ ক্যারোলাইনা, যুক্তরাষ্ট্র (৪৫টি আক্রমণ)

সাউথ ক্যারোলাইনার এই ৪৫টি আক্রমণের সবগুলোই প্ররোচনা ছাড়া এবং কোনোটিই প্রাণঘাতী ছিল না। বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটেছে চার্লসটন, হরি ও ব্যুফোর্টের উপকূলে।

ইউনিভার্সিটি অব মিয়ামি রোজেনস্টেইল স্কুলের শার্ক রিসার্চ অ্যান্ড কনজারভেশন প্রোগ্রামের পরিচালক নীল হ্যামারশ্ল্যাগ বলেন, 'সমুদ্রে গেলে যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায় হাঙরের আক্রমণের শিকার হতে পারেন, এটা ধরে নিতে হবে। ভালো খবর হচ্ছে হাঙরদের খাদ্যতালিকায় মানুষ অন্তর্ভুক্ত নেই এবং তারা মানুষ এড়িয়ে চলতে চায়।'

ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র (২৯টি আক্রমণ)

সান ডিয়েগো উপকূল ক্যালিফোর্নিয়ার সবচেয়ে হাঙর উপদ্রুত এলাকা। ১৯২৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত এখানে ২৬টি হাঙরের আক্রমণের ঘটনা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, গ্রীষ্মে আক্রমণের পরিমাণ বেড়ে যায়। কারণ তখন সৈকতে প্রচুর মানুষের উপস্থিতি থাকে। তবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হচ্ছে সন্ধ্যা ও ভোর। হাঙর বিশেষজ্ঞ ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক শার্ক ট্রাস্ট অ্যান্ড শার্ক কনজারভেশন সোসাআটির সাবেক প্রধান রিচার্ড পিয়ার্স বলেন, 'কম আলোতে হাঙরের দৃষ্টি ও শনাক্তকরণ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে অনেক সময় তারা আক্রমণের ক্ষেত্রে ভুল করে।'

নর্থ ক্যারোলাইনা, যুক্তরাষ্ট্র (৩১টি আক্রমণ)

নর্থ ক্যারোলাইনার ব্রানসউইক কাউন্টিতে সবচেয়ে বেশি হাঙরের আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। ১৯৩৫ সালে থেকে এ পর্যন্ত ১৭টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে সেখানে।

নর্থ ক্যারোলাইনা সি গ্রান্টের 'কোস্টওয়াচ' গ্রন্থে চাক ব্যাংলি লিখেছেন, 'নর্থ ক্যারোলাইনার উপকূলীয় জলসীমা সামুদ্রিক প্রাণীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ  রুট। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে বসবাসকারী বেশিরভাগ প্রজাতির হাঙর বছরের কখনো না কখনো এদিক দিয়ে পার হয়।'

রিউনিয়ন আইল্যান্ড (১৯টি আক্রমণ)

মাদাগাস্কার ও মরিশাসের মাঝখানে ভারত মহাসাগরে অবস্থিত রিইউনিয়ন একটি ঘন বনাঞ্চলসমৃদ্ধ দ্বীপ। এখানে প্রচুর বন্যপ্রাণী আছে এবং দ্বীপের চারপাশের স্বচ্ছ পানিতে প্রচুর হাঙ্গরেরও আনাগোনা রয়েছে।

২০১২-২০২১ সালের মধ্যে এখানে ৮টি প্রাণঘাতি আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, যা দ্বীপটিকে হাঙরের আক্রমণের দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় পরিণত করেছে। দ্বীপটির ভৌগলিক অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিয়ে না গেলে হাঙরের আক্রমণের মুখে পড়ার ঝুঁকি আছে।

ব্রাজিল (১০টি আক্রমণ)

ব্রাজিলের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দেশটির পূর্বাঞ্চলের পেরনামবুকো রাজ্যে হাঙরের আক্রমণের ঘটনা ৬ গুণ বেশি ঘটে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ওশানোগ্রাফি অ্যান্ড একুয়াকালচারের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার ১৯৯০ এর দশক থেকে পারনামবুকোর পানিতে এত 'বিশাল সংখ্যক অপ্ররোচিত হাঙরের আক্রমণের' ব্যাপারে তদন্তের জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অর্থায়ন করতে চায়।

তথ্যসূত্র: সিএনএন

 

Comments