তথ্য সুরক্ষার নামে কি গণমাধ্যমকে হয়রানি করা হবে?

বাংলাদেশ যখন নানা ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করে চলেছে, তখন আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিয়মিতভাবে খাদ্য সংকটের বিষয়ে সতর্ক করে যাচ্ছেন। আবার সরকার গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিতেও নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এক শ্রেণির আমলা ও নীতিনির্ধারক আছেন, যারা মুক্ত গণমাধ্যমের ধারণায় ভালো কোনো কিছু খুঁজে পান না। তারা যেকোনো অজুহাতে এতে শেকল পরানোর সুযোগ হাতছাড়া করেন না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, কোনো কিছুই তাদের এ কাজের উৎসাহকে দমাতে বা এ ধরনের কাজের গতিকে ধীর করতে সক্ষম হচ্ছে না।
ছবি: টিনি এবং টুনি

বাংলাদেশ যখন নানা ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করে চলেছে, তখন আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিয়মিতভাবে খাদ্য সংকটের বিষয়ে সতর্ক করে যাচ্ছেন। আবার সরকার গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিতেও নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এক শ্রেণির আমলা ও নীতিনির্ধারক আছেন, যারা মুক্ত গণমাধ্যমের ধারণায় ভালো কোনো কিছু খুঁজে পান না। তারা যেকোনো অজুহাতে এতে শেকল পরানোর সুযোগ হাতছাড়া করেন না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, কোনো কিছুই তাদের এ কাজের উৎসাহকে দমাতে বা এ ধরনের কাজের গতিকে ধীর করতে সক্ষম হচ্ছে না।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি (ডিএসএ) অত্যন্ত বিতর্কিত ও নিয়ন্ত্রণমূলক। যেটি ইতোমধ্যে দেশের মুক্ত গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে ক্ষতিসাধন করেছে। এরপর হঠাৎ করেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি আরও কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক উদ্যোগ নিয়ে হাজির হয়েছে, যা আমাদের গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ঠদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ২০২২ সালের ২ অক্টোবর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে ২৯টি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে 'গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোর সুরক্ষা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব এবং এ বিষয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে জনসচেতনতা বাড়াতে পারলে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে আমরা খুশি হবো। এ ক্ষেত্রে সরকার এবং গণমাধ্যম একই অবস্থানে রয়েছে এবং একসঙ্গে কাজ করতে পারা আমাদের জন্য খুশির খবর।

তবে যখন আমরা দেখি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো বিষয়ক ঘোষণায় অস্পষ্টতা এবং এর অধীনে থাকা সংস্থাগুলোর তালিকায় অস্বচ্ছতা রয়েছে, তখনি সমস্যা শুরু হয়। ২৯টি সংস্থাকে তালিকাভুক্ত করার যুক্তিটি স্পষ্ট নয়। যে সংস্থাগুলোকে এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার কারণে সাংবাদিকদের কাজে বাধা সৃষ্টি হতে পারে, তার মধ্যে কয়েকটি হলো- বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক। যেমন- সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, এনবিআর, সেতু বিভাগ, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, বিদ্যুৎ ‍বিভাগ, ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর ইত্যাদি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে যখন স্পষ্টভাবে কিছু উল্লেখ না করেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন সাংবাদিকদের বিভ্রান্ত এবং উদ্বিগ্ন হতে হয় যে, পুরো ভবন নাকি শুধু ডিজিটাল অপারেটিং সিস্টেম এর আওতাভুক্ত। সুতরাং পরবর্তী সময়ে একজন সাংবাদিক যখন বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রবেশ করবেন, তখন কি তিনি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোয় 'অবৈধভাবে' প্রবেশ করার দায়ে অভিযুক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবেন? এ অপরাধে কী একজন সাংবাদিকের বিচার হতে পারে? একজন সাংবাদিক এসব সংস্থার সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে কতটুকু প্রবেশাধিকার পাবেন, প্রশ্নটি নিঃসন্দেহে বিষয়টির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। একজন সাংবাদিক কি এখন বাংলাদেশ বিমান, পানি উন্নয়ন বোর্ড, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোর তালিকাভুক্ত দুটি স্টক এক্সচেঞ্জ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে তাদের সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করতে পারবেন?

একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের জাতীয় বিমান সংস্থার কথা ধরা যাক। আমরা জানি যে, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক (যা এয়ার-ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে), টিকিটিং সিস্টেম, বিমানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ইত্যাদি সুরক্ষিত করা দরকার। কিন্তু যাত্রীসেবা, বিমানের লাভ, কর্মীদের যোগ্যতা ও কর্মক্ষমতা, বাণিজ্যিক কার্যক্রম, ফ্লাইটগুলোর পরিষেবা ইত্যাদি নিয়ে যে অভিযোগ রয়েছে তার বিষয়ে? এ বিষয়গুলো কাভার করার জন্য সাংবাদিকদের অবশ্যই এ ধরনের প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোর তালিকাভুক্ত হওয়ায় এবং এর মাধ্যমে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, সে বিষয়টি পরিষ্কার না থাকায় অবশ্যই সেটা আমাদের প্রবেশাধিকার সীমিত করবে এবং ঘন ঘন প্রবেশাধিকার চাওয়া হলে তা প্রত্যাখ্যান করা হবে। একইভাবে উদ্বেগের সম্ভাবনা এই যে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদের চিন্তাধারা গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করতে আরও বেশি অনিচ্ছুক হবেন। এতে পুরো পরিবেশটি উন্মুক্ত না হয়ে বরং বিধিনিষেধের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। একসময় হয়ত বলা হবে, আমরা শুধু এসব সংস্থার জনসংযোগ কর্মকর্তার (পিআরও) সঙ্গে কথা বলতে পারব এবং সেখানে অন্যান্য কর্মকর্তাদের যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হবে। এরপর একসময় আমরা হয়ত সেখানে সাংবাদিকদের পাঠানো বন্ধ করে সংস্থাগুলোর সংবাদ বিজ্ঞপ্তির জন্য অপেক্ষা করব। আমরা আশঙ্কা করছি, নতুন এই গেজেট সাংবাদিকতাকে 'জন সংযোগের' পর্যায়ে নামিয়ে দেবে এবং আমাদের 'জনগণের জন্য কাজ' করতে বাধা দেবে, যেটা গণমাধ্যমের কাজ।

এ ছাড়াও রয়েছে শাস্তির বিধান, যার মধ্যে আছে ৭ বছর থেকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা। কঠোর শাস্তির বিধানের পাশাপাশি এই আইনের অস্পষ্টতার কারণে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালন প্রায় ভীতিকর হয়ে উঠেছে। তাছাড়া যে অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, তার ন্যূনতম সংজ্ঞাও আমাদের জানা নেই।

পুরো প্রক্রিয়াটি তত্ত্বাবধান করবেন একজন মহাপরিচালক, শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে যার ক্ষমতা অপরিসীম।

আইনে বলা হয়েছে, 'মহাপরিচালকের নিকট যদি যুক্তিসংগতভাবে বিশ্বাস করিবার কারণ থাকে যে, তাহার অধিক্ষেত্রভুক্ত কোনো বিষয়ে কোনো ব্যক্তির কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোর জন্য হুমকিস্বরূপ বা ক্ষতিকর, তাহা হইলে তিনি স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বা কাহারও নিকট হইতে কোনো অভিযোগপ্রাপ্ত হইয়া উহার অনুসন্ধান করিতে পারিবেন।' এ ক্ষেত্রে তিনি যেকোনো ব্যবস্থা নিতে পারেন এবং একজন সরকারি কর্মচারী হওয়ায় সেখানে গণমাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সুতরাং এর পরিণতি হবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।

আমরা যারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দাবি করি, এ যেন তাদের সঙ্গে উপহাস। গত বুধবার সরকার ডিজিটাল সোশ্যাল মিডিয়া এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য খসড়া আইন চূড়ান্ত করেছে। যেখানে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনকে (বিটিআরসি) ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, 'সরকারের গোপনীয়তাকে হুমকির মুখে ফেলে' এমন বিষয়বস্তু তারা ব্লক করতে, সরিয়ে ফেলতে বা মুছে ফেলতে পারবে। সুতরাং আমরা কি ধরে নিতে পারি, সরকার যে কাজগুলো করে তা গোপন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে? এখানে মূলত পুরনো 'অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট' নতুন মোড়কে হাজির করা হয়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধির কর্মকাণ্ড জনগণের কাছে প্রকাশের মাধ্যমে সরকারের জবাবদিহি বজায় রাখার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের প্রাথমিক ভূমিকা কী? কোনো সরকার কি স্বেচ্ছায় জানাবে যে, তাদের প্রকল্পগুলো দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে অথবা তারা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে। এ ধরনের আইন সরাসরি স্বাধীন গণমাধ্যমের, বিশেষ করে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে কাজ করবে। চূড়ান্ত খসড়ায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সমস্ত নিয়ন্ত্রণমূলক আইন 'নিউজ এবং কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স কনটেন্টের প্রকাশক অথবা অনলাইনে প্রকাশিত সংবাদের প্রকাশকের' ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। আইনটি অন্যান্য বিষয়ের দিক থেকে অস্পষ্ট হতে পারে, তবে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট স্পষ্ট।

গত কয়েকদিনের মধ্যে গেজেট আকারে প্রকাশিত 'গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো' এবং ওটিটি আইনের চূড়ান্ত খসড়ার সঙ্গে আমাদের কাছে দুটি নতুন ইঙ্গিত এসেছে, তা হলো- স্বাধীন গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চলছে।

এগুলো কি আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি? আমরা এখনই এ ধরনের উপসংহারে পৌঁছাতে চাই না, তবে সেটি না করাও ক্রমান্বয়ে বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পাবলো নেরুদার কবিতার দুটি লাইন স্মরণ করতে পারি, 'গাছের সব ফুল ছিঁড়ে ফেলা যায়, কিন্তু বসন্তের আগমন ঠেকানো যায় না।' এভাবে বলা যায়, 'আমরা যেটাকে সঠিক বলে মনে করি, সেটা বলতে না দিলেও, সেই চিন্তা বা ভাবনায় কি বাধা দেওয়া যাবে?'

মাহফুজ আনাম: সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার

অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান

Comments