বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন আরও বাড়াতে আইনি পরিবর্তন আসছে

আইএমএফ জানিয়েছে, স্বায়ত্তশাসনের অভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারছে না।
রপ্তানির প্রকৃত তথ্য
স্টার ডিজিটাল গ্রাফিক্স

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার-১৯৭২ সংশোধন করতে যাচ্ছে সরকার। বিশ্বের অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে মিল রেখে এই সংশোধনী আনা হবে। উদ্দেশ্য হলো- কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও স্বায়ত্তশাসন বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া। যেন বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় নিজে থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে এর প্রাথমিক খসড়া প্রস্তুত করেছে বলে জানা গেছে। ওই খসড়া সংশোধনী অনুমোদনের জন্য সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে।

দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ও আর্থিক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতেও তেমন কোনো অগ্রগতির মুখ দেখেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ফলে, বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রমের সমালোচনা করছেন।

শুধু বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদরা নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারে পরিবর্তন আনার সুপারিশও করেছে আইএমএফ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রম বিষয়ক আইএমএফের কারিগরি সহায়তা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'আইনটি সংশোধন করা দরকার। যেন নতুন মুদ্রানীতির মূল উদ্দেশ্য হয় মূল্য স্থিতিশীলতা এবং নীতিগুলো সেই অনুযায়ী সাজানো হয়।'

আইএমএফ জানিয়েছে, স্বায়ত্তশাসনের অভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারছে না।

এতে বলা হয়, ২০০৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার (বিবিও) পরিবর্তনের পরে কিছুটা উন্নতি দেখেছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে একটি মূল্যায়ন গ্রহণের পর স্বায়ত্তশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাঠামো ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আসেনি।

আইএমএফের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন বাড়াতে এই সংশোধনী প্রয়োজন। তাহলে জবাবদিহিতা ব্যবস্থা উন্নত হবে এবং অগ্রাধিকার খাতে সরাসরি ঋণ সীমাবদ্ধ করতে পারবে।

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সংশোধনীর বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করে আইএমএফ।

গত এপ্রিলে আইএমএফের ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যালোচনার সময় সরকার ঋণদাতা সংস্থাটিকে বলেছিল, ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের খসড়া সংশোধনী পর্যালোচনার সময় আইএমএফের সহায়তা চাওয়া হবে। কারণ আইনটি আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা নিশ্চিত করতে চায় বাংলাদেশ।

ঋণ কর্মসূচির সময়ের মধ্যে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য সংশোধনী জমা দিতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। ৪২ মাসের এই কর্মসূচি গত বছরের জানুয়ারিতে অনুমোদন দেওয়া হয়।

খসড়া সংশোধনীতে বলা হয়েছে, বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা কিছু থাকুক না কেন, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যে কোনো নির্দেশনা জারির একমাত্র এখতিয়ার থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংকের।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্ষমতাশীল হলে দেশের জন্য ভালো।

আরেক সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দরকার।

তিনি বলেন, 'বর্তমানে নিয়ম-নীতির ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন রয়েছে। তবে রাজনৈতিক অর্থনীতি এতে প্রভাব ফেলছে।'

ড. আতিউর রহমানের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করলে অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে। সরকার যখন স্বায়ত্তশাসনের গুরুত্ব বুঝতে পারবে, তখন এর স্বাধীনতার পক্ষে যাবে।

আতিউর রহমান ও মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন দুজনেই গভর্নরের পদকে সাংবিধানিক করার পক্ষে মত দেন।

১৯৯৮ সালের নভেম্বর থেকে ২০০১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত গভর্নরের দায়িত্ব পালন করা মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, গভর্নরের মেয়াদ ছয় বছর করা যেতে পারে।

'তবে এ কথা বলতে গিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া হলো- আমি যখন গভর্নর ছিলাম, তখন ক্ষমতা ছিল সীমিত। কিন্তু কেউ কখনো কাজে বাধা দেয়নি।'

তিনি বলেন, 'একজন গভর্নরের আইনগতভাবে ক্ষমতা আছে। তবে আমি মনে করি, ক্ষমতা একটি প্রতীকী বিষয়। এটা নির্ভর কবে কে কীভাবে ক্ষমতার ব্যবহার করছে তার ওপর।'

ড. ফরাসউদ্দিন জানান, তিনি সরকারকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ নিতে দেননি।

তিনি আরও জানান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের হাতে ক্ষমতা ন্যস্ত থাকলেও তৎকালীন অর্থমন্ত্রীকে না জানিয়ে তিনি বেশ কয়েকবার টাকার দর সমন্বয় করেছিলেন।

তিনি বলেন, ব্যাংকের বোর্ডে কতজন বসতে পারবেন ও তাদের মেয়াদ নিয়ে কঠোর নীতিমালা রয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু নিয়ম শিথিল করা হয়েছে। যেমন ঋণ পরিশোধে নমনীয়তা ও ঋণ পুনঃতফসিল নীতিমালা শিথিল করার প্রস্তাব দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তারপরও খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে ব্যর্থ হয়েছে ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ সংস্থা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেকটি ভুল ছিল- ২০২০ সালের এপ্রিলে সুদহারের ঊর্ধ্বসীমা ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দেওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তে ঋণ মূলত সস্তা হয়ে যায়। অবশ্য আইএমএফের পরামর্শে চলতি বছরের ৮ মে সুদের হার বাজারভিত্তিক করা হয়েছে।

ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, 'নয় থেকে দশবার ঋণ পুনঃতফসিলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। সুদ মওকুফ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এসব বন্ধ করতে হবে।'

Comments