গণহারে পুলিশ ও প্রশাসন কর্মকর্তাদের বদলি কী বার্তা দিচ্ছে?

‘যেখানে কোনো ঝুঁকি নেই, চ্যালেঞ্জ নেই, পরীক্ষা নেই, সেখানে নিরপেক্ষতা ও সততার প্রশ্ন অবান্তর।’

সাম্প্রতিক কয়েকটি সংবাদ শিরোনাম:

১. দুই পুলিশ কমিশনার, ১ ডিসি, ৫ এসপিকে প্রত্যাহার ও ৩ ওসিকে বদলির নির্দেশ নির্বাচন কমিশনের (দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ১০ ডিসেম্বর ২০২৩)

২. পুলিশ কমিশনার এবং ডিসি-এসপি-ওসি বদলির নতুন নির্দেশনা ইসির (দেশ রূপান্তর, ১০ ডিসেম্বর ২০২৩)

৩. ৩৩৮ থানার ওসি ও ১৫৮ জন ইউএনওকে বদলির প্রস্তাবে অনুমোদন দিল ইসি (প্রথম আলো, ৭ ডিসেম্বর ২০২৩)

৪. চার শতাধিক ওসি-ইউএনও বদলে ইসির সম্মতি (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর, ৭ ডিসেম্বর ২০২৩)

৫. দুই ডিআইজি এক ডিসি ৫ এসপি প্রত্যাহার (যুগান্তর, ১১ ডিসেম্বর ২০২৩)

এই সংবাদ শিরোনামগুলো দেখে যে প্রশ্নটি মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে সেটি হলো, নির্বাচন কমিশন কেন এভাবে গণহারে প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলি ও প্রত্যাহারের অনুমোদন দিচ্ছে?

প্রশ্নটা এ কারণে যে, রাজনীতি ও ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি যেহেতু নির্বাচনে নেই, অতএব নির্বাচন দুইশো ভাগ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ, এমনকি নির্দলীয় সরকারের অধীনে হলেও যে আওয়ামী লীগই জিতবে এবং তারাই যে আবারও সরকার গঠন করবে সেটি দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।

কেননা, এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী বলতে মাঠে আছে জাতীয় পার্টি, যারা মূলত আওয়ামী লীগ বলয়েরই দল।

ইসলামিক দলগুলোর মধ্যে চরমোনাই পীরের ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ ছাড়া আর কোনো দলের প্রার্থীদের জামানত রক্ষার মতো ভোটও পাওয়ার কথা নয়। জামায়াতের নিবন্ধন নেই, অতএব তাদের ভোটে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। বামপন্থি দলগুলোর মধ্যে যারা ভোটের মাঠে আছে, তারাও আওয়ামী লীগের সঙ্গেই আছে এবং নৌকা প্রতীকেই ভোট করছে। সুতরাং ভোট নিয়ে উন্মাদনা যতই থাকুক, এবারের ভোটও কার্যত একতরফাই হবে এবং খেলা শুরুর আগেই ফলাফল নির্ধারিত।

এটি ভালো হলো নাকি খারাপ; দেশের উন্নয়ন ও অর্থনীতির গতি ধরে রাখতে এটির প্রয়োজন ছিল নাকি ছিল না, সেটি অন্য তর্ক।

প্রশ্ন হলো, এরকম নির্বাচনের মধ্যে নির্বাচন কমিশন যে গণগারে পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলি ও প্রত্যাহারের নির্দেশ দিচ্ছে, তার কারণ কী? এই পুলিশ কর্মকর্তারা নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করবেন? তারা প্রভাব বিস্তার করে কী করবেন? ভোটের ফলাফল তো জানা।

তাহলে নির্বাচন কমিশন কি নিজেদের সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা প্রমাণের চেষ্টা করছে? বাস্তবতা হলো, প্রধান দলগুলোর অংশগ্রহণে ভোট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ না হলে ইসির সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা প্রমাণের কিছু নেই। তারা পক্ষপাতদুষ্ট থাকলেও যা হবে, নিরপেক্ষ থাকলেও তা-ই হবে।

যদিও কর্মকর্তাদের এই বদলির বিষয়ে নির্বাচন কমিশন বলছে, মন্ত্রণালয় থেকে তাদের বদলির তালিকা দেওয়া হয়েছিল, কমিশন তা অনুমোদন করেছে। প্রসঙ্গত, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হওয়ার পরে সরকারি কর্মকর্তাদের বদলির ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সম্মতির প্রয়োজন হয়। তার মানে, মন্ত্রণালয়ের চাহিদা অনুযায়ী এই বদলি হচ্ছে। মন্ত্রণালয় মানে সরকারের নির্বাহী বিভাগ। অর্থাৎ সরকারের চাহিদা অনুযায়ী এই বদলি হচ্ছে।

সেখানেই ওই একই প্রশ্ন, সরকার কেন তাদেরকে বদলি করতে চায়? তারা নির্বাচনে নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালন করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে? নাকি সরকার যে ধরনের নির্বাচন দেখতে চায়, সেই ধরনের নির্বাচন করার ক্ষেত্রে এই কর্মকর্তারা যোগ্য নন? এবার যে ধরনের নির্বাচন হচ্ছে, যেটি মূলত একতরফা—সেখানে এই ধরনের বদলি ও প্রত্যাহার কি খুব জরুরি? এর একটি কারণ কি এই যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে ভোট নিয়ে একটা উন্মাদনা তৈরির চেষ্টা করা?

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বলতে মানুষ এখন পর্যন্ত বোঝে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। আগস্ট ট্র্যাজেডির পরে আওয়ামী লীগ দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায় এবং বাকশাল নামে দলের একটি অংশ দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকলেও একটা সময় পরে আওয়ামী লীগের দুটি অংশ ও বাকশাল ঠিকই একীভূত হয়ে যায়। কেননা মানুষ আওয়ামী লীগ বলতে আওয়ামী লীগই বোঝে। কোনো খণ্ডিত অংশকে নয়।

একইভাবে এবার যেহেতু বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না এবং বিদ্যমান ব্যবস্থায় তারা নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে আগেই ঘোষণা দিয়েছে, ফলে সরকারের পৃষ্ঠাপোষকতায় বিএনপির কিছু নেতা তৃণমূল বিএনপি এবং আরেকটি অংশ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) নামে দুটি দল গঠন করেছেন। তারা ভোটে আছে। কিন্তু এই দলগুলোর শীর্ষ নেতারাই জয়ী হবেন না, যদি না সরকারের সঙ্গে তাদের কোনো সমঝোতা হয়। অর্থাৎ মানুষ বিএনপি বলতে বিএনপিকেই বোঝে। তৃণমূল বিএনপি বা বিএনপির আগে পরে কোনো শব্দ জুড়ে দিয়ে অন্য কোনো দলকে নয়।

জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। এই নামে কয়েকটি দল থাকলেও জাতীয় পার্টি বলতে মানুষ এরশাদের জাতীয় পার্টিকেই বোঝে।

এমন বাস্তবতায় যেহেতু ভোট ও মাঠের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না, ফলে এই নির্বাচনকে শেষ পর্যন্ত অংশগ্রহণমূলক বলা যাবে কি না, সেটি বিরাট প্রশ্ন।

আবার অনেক দল অংশ নিলে এবং বিপুল ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করলে সেটিকে হয়তো অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলা যাবে, কিন্তু ভোট মানেই যেহেতু প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ফলাফল আগে জানা যাওয়ার কথা না, অতএব সেটিকে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলার সুযোগ নেই। ভালো নির্বাচন বলার সুযোগ নেই।

ভালো নির্বাচন মানেই হলো প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো অংশ নেবে এবং সেখানে সবার জন্য সমান ‍সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে।

অনেক সময় সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য ভোটকে গুলিয়ে ফেলা হয়। পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াটি শান্তিপূর্ণ হওয়ার পরও সেই ভোট গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে। যেমন: একটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটের ফল ঘোষণা পর্যন্ত হানাহানি হলো না; কোনো প্রার্থীর প্রচারে বাধা দেওয়া হলো না, কাউকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে চাপ দেওয়া হলো না, কিন্তু দেখা গেল মানুষ ভোটকেন্দ্রে যায়নি বা ভোটার উপস্থিতি খুবই কম। যেহেতু আমাদের সংবিধানে এটি বলা নেই যে, ন্যূনতম কত শতাংশ ভোট পেতে হবে, বরং ১০ শতাংশ ভোট পেয়েও যেহেতু জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়া যায়, সুতরাং কোনো একটি ভোটে যদি ২০ শতাংশ মানুষও ভোট দেয়, তারপরও ওই ভোটকে অবৈধ বলার সুযোগ নেই। ওই সামান্য সংখ্যক ভোট পেয়ে যিনি নির্বাচিত হয়েছেন, তাকেও অবৈধ বলা যাবে না। কিন্তু এই নির্বাচনটি কি গ্রহণযোগ্য হলো?

আবার পুরো নির্বাচনটি শান্তিপূর্ণ হলো, প্রচুর মানুষ ভোট দিল, কিন্তু ফল পাল্টে দেওয়া হলো। সেটিকে সুষ্ঠু নির্বাচন বলা গেলেও গ্রহণযোগ্য বলার সুযোগ নেই। অর্থাৎ সহিংসতামুক্ত নির্বাচন মানেই সেটি গ্রহণযোগ্য ভোট নয়।

এসব মানদণ্ড বিবেচনায় আগামী ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে হয়তো অংশগ্রহণমূলক, অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ বলা যাবে; হয়তো অনেক আসনে বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনও হবে—কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি খুব ভালো নির্বাচন হবে না। কেননা যত ভালো এবং যত নিরপেক্ষ নির্বাচনেই হোক না কেন, এই ভোটের ফলাফল কী হবে, সেটি দেশের মানুষ এখন জানে। অতএব যে খেলার ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত, সেই খেলা যত নিয়ম-কানুন ও শৃঙ্খলা মেনেই হোক না কেন; যত শান্তিপূর্ণই হোক না কেন, সেটিকে খেলা বলা যায় না।

এই ধরনের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ থাকাও খুব কঠিন নয়। কেননা প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো ভোটের মাঠে নেই।

একজন মানুষ কতটা সৎ, সেটি নির্ভর করে তিনি অসৎ হওয়ার সুযোগ পাওয়ার পরেও সৎ থাকলেন কি না, তার ওপর। অর্থাৎ যেখানে নিরপেক্ষ থাকাটা কঠিন, যেখানে নিজের সাহসিকতার প্রমাণ দিতে যাওয়াটা চ্যালেঞ্জিং, সেখানেই যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ ও সাহসী থাকতে পারে, তখনই তার ব্যাপারে এটি বলা যায় যে ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সত্যিই নিরপেক্ষ, সাহসী।

পক্ষান্তরে যেখানে কোনো ঝুঁকি নেই, চ্যালেঞ্জ নেই, পরীক্ষা নেই, সেখানে নিরপেক্ষতা ও সততার প্রশ্ন অবান্তর।

আমীন আল রশীদ: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন

 

(দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নেবে না।)

 

Comments